প্রবন্ধ
আপনার আমার সঙ্গী-সাথী কেমন হওয়া উচিত এবং কেন?
৩০ জুন, ২০২৬
৯৮৩
০
মানুষ স্বভাবগতভাবেই সামাজিক জীব। সে একা বাস করতে পারে না। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীদের সঙ্গে মিশেই তার জীবন গড়ে ওঠে। তাই একজন মানুষের চরিত্র, চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ ও জীবনদর্শন গঠনে তার সাহচর্যের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। মানুষ যার সঙ্গে বেশি সময় কাটায়, ধীরে ধীরে তার চিন্তা, চরিত্র, ভাষা, অভ্যাস ও জীবনদর্শনও সেই পরিবেশের প্রভাবে গড়ে ওঠে। এ কারণেই ইসলাম সঙ্গী নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে। একজন সৎ মানুষের সাহচর্য যেমন ঈমান ও আমলকে সমৃদ্ধ করে, তেমনি অসৎ মানুষের সাহচর্য অজান্তেই মানুষকে পাপ ও অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যায়।
একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে- "যেমন সঙ্গ, তেমন রং।" ইসলামী শিক্ষার আলোকে এই কথার যথেষ্ট সত্যতা রয়েছে।
কুরআনুল কারিমে প্রাসঙ্গিক কিছু মৌলিক নির্দেশনা আমরা পাই।
১. সত্যবাদী ও নেককারদের সাহচর্যে থাকার নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক।"
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা শুধু তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দেননি; বরং তাকওয়া অর্জনের একটি কার্যকর মাধ্যমও বলে দিয়েছেন- সত্যবাদী ও নেককার মানুষের সাহচর্য গ্রহণ। কারণ সৎ মানুষের সঙ্গে চললে তার উত্তম চরিত্র, সুন্দর আমল ও আল্লাহভীতি অন্যের মাঝেও প্রভাব ফেলে।
২. আল্লাহকে স্মরণকারীদের সঙ্গ ত্যাগ না করা
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ
আপনি নিজেকে তাদের সঙ্গেই রাখুন, যারা সকাল-সন্ধ্যা তাদের প্রতিপালককে আহ্বান করে তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে।
এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে নেককার ও আল্লাহভীরু লোকদের সাহচর্য গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই আয়াত আমাদের শেখায়, দুনিয়ার চাকচিক্য দেখে নেককার মানুষের মজলিস ত্যাগ করা উচিত নয়। যারা আল্লাহকে স্মরণ করে, তাদের সঙ্গে বসা ও চলাফেরা করা মানুষের অন্তরকে জীবন্ত রাখে এবং ঈমানকে শক্তিশালী করে।
৩. কিয়ামতের দিন অসৎ বন্ধুত্বের পরিণতি
আল্লাহ তাআলা বলেন,
الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ
সেদিন পরস্পরের বন্ধুদের অধিকাংশই একে অপরের শত্রু হয়ে যাবে; তবে মুত্তাকীরা ব্যতিক্রম।
অর্থাৎ, যেসব বন্ধুত্ব দুনিয়ার স্বার্থ, ভোগ-বিলাস বা গুনাহের ওপর প্রতিষ্ঠিত, কিয়ামতের দিন তা শত্রুতায় পরিণত হবে। প্রত্যেকে অপরকে পথভ্রষ্ট করার জন্য দোষারোপ করবে এবং নিজেকে বাঁচাতে চাইবে। পক্ষান্তরে, যে বন্ধুত্ব আল্লাহভীতি, ঈমান ও নেক আমলের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, সেই বন্ধুত্ব কিয়ামতের দিনও অটুট থাকবে এবং একে অপরের জন্য কল্যাণ ও মুক্তির কারণ হবে। তাই একজন মুমিনের উচিত এমন বন্ধু নির্বাচন করা, যে তাকে আল্লাহর আনুগত্য ও জান্নাতের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
৪. অসৎ বন্ধুর জন্য অনুশোচনা
অসৎ সঙ্গের কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার পর চরম অনুশোচনা ও আফসোস হবে, তখন আর কিছু করার থাকবে না। আর মনে রাখতে হবে অসৎ সঙ্গের সাথে শয়তান জড়িত থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
یٰوَیۡلَتٰی لَیۡتَنِیۡ لَمۡ اَتَّخِذۡ فُلَانًا خَلِیۡلًا
لَقَدۡ اَضَلَّنِیۡ عَنِ الذِّکۡرِ بَعۡدَ اِذۡ جَآءَنِیۡ ؕ وَکَانَ الشَّیۡطٰنُ لِلۡاِنۡسَانِ خَذُوۡلًا
হায় আমার দুর্ভোগ! আমি যদি অমুক ব্যক্তিকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম!
আমার কাছে তো উপদেশ এসে গিয়েছিল, কিন্তু সে (ওই বন্ধু) আমাকে তা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। আর শয়তান তো (এমনই চরিত্রের যে, সময়কালে সে) মানুষকে অসহায় অবস্থায় ফেলে চলে যায়।
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনের এক করুণ দৃশ্য তুলে ধরেছেন। সেদিন মানুষ অসৎ বন্ধুর কারণে গভীর অনুতাপ করে বলবে, "হায়! যদি আমি তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করতাম।" কারণ সেই বন্ধু তাকে আল্লাহর স্মরণ, সত্যের পথ ও সৎ উপদেশ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। এরপর আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন, শয়তানের স্বভাবই হলো মানুষকে বিভ্রান্ত করা; কিন্তু বিপদের সময় সে তাকে একা ফেলে পালিয়ে যায়। তাই এমন সঙ্গী-সাথী নির্বাচন করা উচিত, যে আল্লাহর পথে চলতে সাহায্য করে, গুনাহের পথে নয়।
এ প্রসঙ্গে হাদীস থেকে যে শিক্ষাগুলো পাওয়া যায়
১. সৎ সঙ্গ ও অসৎ সঙ্গ বিষয়ে সুগন্ধি বিক্রেতা ও কামারের হাপরের উপমা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
عَنْ أَبِي مُوسَى رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: " مَثَلُ الجَلِيسِ الصَّالِحِ وَالسَّوْءِ، كَحَامِلِ المِسْكِ وَنَافِخِ الكِيرِ، فَحَامِلُ المِسْكِ: إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيحًا طَيِّبَةً، وَنَافِخُ الكِيرِ: إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ رِيحًا خَبِيثَةً "
আবু মুসা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম (ﷺ) বলেছেনঃ সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উপমা হল, কস্তুরী বহনকারী ও কামারের হাঁপরের ন্যায়। মৃগ-কস্তুরী বহনকারী হয়ত তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি কিছু খরিদ করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি লাভ করবে সুবাস। আর কামারের হাঁপর হয়ত তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে পাবে দুর্গন্ধ ।
-সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৩৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬২৮
এই হাদিসটি ভালো ও মন্দ সাহচর্যের প্রভাব বোঝানোর সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
২. মানুষ তার বন্ধুর রীতি-নীতি অনুসরণ করে
আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ
الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ " .
মানুষ তার বন্ধুর রীতি-নীতির অনুসারী হয়ে থাকে। সুতরাং লক্ষ্য করবে সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।
-সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৩; সুনানে তিরমিযি, হাদিস: ২৩৭৮
মানুষের চরিত্র, চিন্তা-চেতনা, অভ্যাস ও জীবনাচরণে তার বন্ধুর গভীর প্রভাব পড়ে। ধীরে ধীরে সে বন্ধুর ভালো-মন্দ স্বভাব গ্রহণ করতে শুরু করে। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এমন বন্ধু বেছে নেওয়া উচিত, যে আল্লাহর আনুগত্য, নেক আমল ও উত্তম চরিত্রের দিকে উদ্বুদ্ধ করে।
৩. বন্ধুত্ব ও শত্রুতা উভয়ই হতে হবে আল্লাহ জন্য
আবু উমামা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ
مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ وَأَبْغَضَ لِلَّهِ وَأَعْطَى لِلَّهِ وَمَنَعَ لِلَّهِ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ الإِيمَانَ .
যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ভালবাসবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুশমনী করবে; আর দান করবে আল্লাহর জন্য এবং দান করা থেকে বিরত থাকবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, সে ব্যক্তি তার ঈমান পরিপূর্ণ করেছে। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৬৮১; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৫৬১৭
সৎ সাহচর্যের উপকারিতা
ঈমান বৃদ্ধি পায়।
নেক আমলের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
ইবাদতে উৎসাহ পাওয়া যায়।
চরিত্র সুন্দর হয়।
গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়।
দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই কল্যাণ লাভ হয়।
বিপদের সময় সঠিক পরামর্শ ও সহায়তা পাওয়া যায়।
অসৎ সাহচর্যের ক্ষতি
গুনাহকে সহজ মনে হয়।
ঈমান দুর্বল হয়ে যায়।
ইবাদতে অলসতা আসে।
মিথ্যা, গীবত, অশ্লীলতা ও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে।
নৈতিক অধঃপতন ঘটে।
শেষ পর্যন্ত দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আমাদের করণীয়
আলেম-ওলামা ও নেককার ভাল মানুষদের সাহচর্য গ্রহণ করা।
মসজিদ ও দ্বীনি পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা।
এমন বন্ধু নির্বাচন করা, যারা আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
পাপাচার, অশ্লীলতা ও অবাধ্যতার পরিবেশ থেকে দূরে থাকা।
সন্তানদের বন্ধুমহলের প্রতি অভিভাবকদের সতর্ক দৃষ্টি রাখা।
শেষ কথা
একজন মানুষের ভবিষ্যৎ গঠনে তার সাহচর্যের প্রভাব অপরিসীম। ভালো মানুষের সাহচর্য মানুষকে আল্লাহর দিকে এগিয়ে দেয়, আর মন্দ মানুষের সাহচর্য ধীরে ধীরে তাকে পাপ ও ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। তাই প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য হলো বন্ধুত্ব ও সাহচর্য নির্বাচনে অত্যন্ত সচেতন হওয়া। কারণ আজ যার সঙ্গে চলছি, কাল কিয়ামতের দিন তার সঙ্গেই উঠতে হতে পারে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ভাষায়,
أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ
তুমি তারই সঙ্গী হবে যাকে তুমি ভালবাস। -সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৮৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৪০
আরেক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে দিন আল্লাহর রহমতের ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিজের (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দিবেন।
وَرَجُلاَنِ تَحَابَّا فِي اللَّهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ،
সে দু’ব্যক্তি যারা পরস্পরকে ভালোবাসে আল্লাহর ওয়াস্তে, একত্র হয় আল্লাহর জন্য এবং পৃথকও হয় আল্লাহর জন্য। -সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৬০
সুতরাং, ভালো মানুষের সাহচর্য ইহকাল ও পরকালের সফলতার অন্যতম মাধ্যম, আর মন্দ মানুষের সাহচর্য ইহকাল ও পরকালের ধ্বংসের অন্যতম কারণ।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
দাওয়াত, হাদিয়া ও উপঢৌকন
হাদিয়া, উপঢৌকন ও দাওয়াত আদান- প্রদান ইসলামী শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল ও প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু...
হিংসাঃ চুলার আগুণের মতই ভয়াবহ!
মানবেতিহাসের শুরুর দিককার কথা। পৃথিবীতে মানব পরিবার বলতে তখনো কেবলই হযরত আদম আলাইহিস সালামের পরিবার।...
আদর্শ শিক্ষকের গুণাবলী
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর... আদর্শ শিক্ষকের পরিচয় হলো- যে শিক্ষক তার নিবিড় অধ...
শান্তি সম্প্রীতি ও উদারতার ধর্ম ইসলাম
নামে যার শান্তির আশ্বাস তার ব্যাপারে আর যাই হোক, সন্ত্রাসের অপবাদ দেয়ার আগে তার স্বরূপ উদঘাটনে দু'দণ...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন