শিক্ষক ও দাঈর দায়িত্বের সীমারেখা
প্রশ্নঃ ১৭১৫২৮. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমার জানার বিষয় হচ্ছে একজন শিক্ষক হিসেবে ছাত্রকে বারবার সতর্ক করার পরেও যদি সে শরীয়তের আদেশ নিষেধের পাবন্দি না করে তাহলে কিয়ামতের দিন শিক্ষক হিসেবে বা জিম্মাদার হিসেবে কোন ধরনের জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে কি?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
একজন শিক্ষক মানে একজন দাঈ। দাঈর দায়িত্ব হলো, যথাযথভাবে পথ দেখানো। হিদায়াত করা আল্লাহ তাআলার হাতে। কুরআনুল কারিমের সুরাতুল গাশিয়াহ এর ২২ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এর একটি সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়ে ইরশাদ করেন, لَسۡتَ عَلَیۡہِمۡ بِمُصَۜیۡطِرٍ ۙ আপনি তাদের কর্ম নিয়ন্ত্রক নন।
বরং নবী সা. এর কাজ ছিল, পথ দেখানো। হিদায়াতের বাণী শোনানো। বুঝানো। সুতরাং শিক্ষকের দায়িত্বও এর চেয়ে বেশি নয়। কোনো শিক্ষক যদি মনে করেন, ছাত্রকে শাসন করে তিনি শিক্ষা দিয়ে-ই ছাড়বেন; তাহলে তা যথার্থ হবে না; এটা শরীয়তসম্মত হবে না।
কুরআনের অপর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন—
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
অর্থ: আপনি আপনার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করুন প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে। —সুরা আন-নাহল, ১৬:১২৫।
ব্যাখ্যা: ছাত্র কোনো শরয়ি বিধান অমান্য করলে শিক্ষককে শুধু ধমক দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং তার বয়স, মানসিক অবস্থা, পরিবেশ ও সমস্যার ধরন বিবেচনা করে কখনো উপদেশ, কখনো কঠোর সতর্কতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের নিয়মসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ইবনে উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি,
«كُلُّكُمْ رَاعٍ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، الإِمَامُ رَاعٍ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ فِي أَهْلِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَمَسْئُولَةٌ عَنْ رَعِيَّتِهَا، وَالخَادِمُ رَاعٍ فِي مَالِ سَيِّدِهِ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ» قَالَ: - وَحَسِبْتُ أَنْ قَدْ قَالَ - «وَالرَّجُلُ رَاعٍ فِي مَالِ أَبِيهِ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ»
তোমরা সকলেই রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং তোমাদের প্রত্যেককেই অধীনস্থদের (দায়িত্ব) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। ইমাম* একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি, তাঁকে তাঁর অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। পুরুষ তার পরিবারবর্গের অভিভাবক, তাকে তাঁর অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। নারী তার স্বামীগৃহের কর্ত্রী, তাকে তাঁর অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। খাদেম তার মনিবের ধন-সম্পদের রক্ষক, তাকেও তার মনিবের ধন-সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। ইবনে উমর (রাযিঃ) বলেন, আমার মনে হয়, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরো বলেছেনঃ পুত্র তার পিতার ধন-সম্পদের রক্ষক এবং এগুলো সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। তোমরা সবাই রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং সবাইকেই তাদের অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।
—সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৮৪৯ হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/849
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত নবী সা. ইরশাদ করেন,
إِنَّ الرِّفْقَ لاَ يَكُونُ فِي شَىْءٍ إِلاَّ زَانَهُ وَلاَ يُنْزَعُ مِنْ شَىْءٍ إِلاَّ شَانَهُ " .
নম্রতা যে কোন বিষয়কে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। আর যেকোন বিষয় থেকে নম্রতা বিদূরিত হলে তাকে কলুষিত করে।
সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৬৩৬৬
আন্তর্জাতিক নং: ২৫৯৪-১
হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/13415
সুতরাং শিক্ষকের দায়িত্ব ছাত্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করার যথাসাধ্য চেষ্টা করা; তার অন্তর পরিবর্তন করা নয়। তিনি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন, যথাযথভাবে সতর্ক করেন এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের চেষ্টা করেন, তাহলে ছাত্রের অবাধ্যতার কারণে শিক্ষকের ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছাত্রের গুনাহের বোঝা চাপবে না। তবে নিজের দায়িত্বে কোনো অবহেলা হয়ে থাকলে তার জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করে ভবিষ্যতে আরও যত্নবান হওয়া উচিত।
“শিক্ষকের দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীর সংশোধনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা এবং নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা। শিক্ষার্থীকে উপদেশ দেওয়া, ভুল বুঝিয়ে দেওয়া ও প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া শিক্ষকের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। ছাত্রের অন্তর পরিবর্তন করা নয়! শিক্ষকের সব চেষ্টা সত্ত্বেও শিক্ষার্থী সংশোধিত না হলে, কেবল এ কারণে শিক্ষক গুনাহগার হবেন— বিষয়টি এমন নয়। তবে শিক্ষকের অবহেলা, অন্যায় আচরণ কিংবা দায়িত্বে ত্রুটি থাকলে তিনি সে অনুযায়ী জবাবদিহির সম্মুখীন হবেন।” কাজেই নিজের দায়িত্বে হওয়া এবং শিক্ষার্থীর কল্যাণ কামনা করা উচিত। কোনো অবহেলা হয়ে গেলে তার জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করে ভবিষ্যতে আরও যত্নবান হওয়া বাঞ্চনীয়।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন