‘‘তৃতীয় চোখ’’ বা Third Eye সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?
প্রশ্নঃ ১৭১৩৮৮. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, থার্ড আই বা মানুষের তৃতীয় নেত্র আছে কি? থাকলে আমরা মানুষেরা কীভাবে ইসলামিক পদ্ধতিতে এর আমল করে নিজের ও দ্বীন ও দুনিয়ার মানুষের উপকার করতে পারি?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
উইকিপিডিয়া এবং অনলাইন নির্ভর বিভিন্ন তথ্য থেকে আমরা তৃতীয় চোখ বা Third Eye সম্পর্কে যতটুকু জানতে পেরেছি তাহলো Third Eye ধারণাটির প্রধান উৎস ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দুধর্মীয় ও যোগ-তান্ত্রিক ঐতিহ্যে। পরে বৌদ্ধধর্মের কিছু ধারায় এবং আধুনিক পাশ্চাত্য আধ্যাত্মিক চর্চায়ও ধারণাটি বিভিন্নভাবে প্রচলিত হয়েছে। তবে এর একটিমাত্র নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সূচনাকাল নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
আপনাকে সুনির্দিষ্ট উত্তর দেওয়ার আগে আমরা ধারণাটি নিয়ে কিছু আলোচনা রেখে যেতে চাই।
এক. হিন্দুধর্মে তৃতীয় চোখের ধারণা: শিবের তৃতীয় চোখ
হিন্দুধর্মে দেবতা শিবকে প্রায়ই কপালে তৃতীয় চোখসহ চিত্রিত করা হয়। সংস্কৃত ত্রিলোচন (त्रिलोचन) শব্দের অর্থ তিন চোখ বিশিষ্ট। বাংলা বর্ণ ও এর মাথায় চন্দ্রবিন্দু দিয়ে যেই সিম্বল বানানো হয় ওঁ (ॐ) হিন্দু ধর্মে সেটাই শিবের তৃতীয় চোখ হিসেবে চিহ্নিত। হিন্দু ধর্মীয় কাহিনিতে শিবের তৃতীয় চোখ জ্ঞান, শক্তি এবং ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
দুই. যোগশাস্ত্রে ‘আজ্ঞা চক্র’
যোগ ও তান্ত্রিক ঐতিহ্যের কিছু ধারায় দুই ভ্রুর মাঝের স্থানকে আজ্ঞা চক্র (Ajna Chakra) বলা হয়। আধুনিক আধ্যাত্মিক চর্চায় এটিকে তৃতীয় চোখের সঙ্গে যুক্ত করে ধ্যান, অন্তর্দৃষ্টি ও বিশেষ উপলব্ধির কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: আজ্ঞা চক্র একটি ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক ধারণা; এটি মানুষের শরীরে আবিষ্কৃত কোনো তৃতীয় চোখ বা প্রমাণিত শারীরবৃত্তীয় অঙ্গ নয়।
তিন. বৌদ্ধধর্মে Third Eye বা তৃতীয় চোখ
বৌদ্ধধর্মের কিছু ধারায় কপালে বিশেষ চিহ্ন বা আধ্যাত্মিক দৃষ্টির প্রতীক দেখা যায়। বৌদ্ধ ঐতিহ্যে জ্ঞান ও উচ্চতর উপলব্ধির ধারণাও রয়েছে। তবে হিন্দুধর্মের শিবের তৃতীয় চোখ এবং বৌদ্ধধর্মের কপালের প্রতীক—দুটিকে সর্বক্ষেত্রে একই বিশ্বাস বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
চার. চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে
মানুষের কপালের দুই চোখের মাঝখানে কোনো অদৃশ্য চোখ থাকার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে মস্তিষ্কের ভেতরে পিনিয়াল গ্রন্থি (Pineal gland) নামে একটি বাস্তব অঙ্গ আছে। এটি মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণ করে এবং ঘুম-জাগরণের ছন্দ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
পাঁচ. আধ্যাত্মিক ধারণায়
কিছু ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ধারায় তৃতীয় নেত্র বলতে বিশেষ উপলব্ধি, অন্তর্দৃষ্টি বা অদৃশ্য বিষয় দেখার ক্ষমতা বোঝানো হয়। কিন্তু পিনিয়াল গ্রন্থি আছে—এ তথ্য থেকে এমন কোনো অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় না।
ছয়. ইসলামের দৃষ্টিতে
ইসলামে তৃতীয় চোখ বা তৃতীয় চোখ খোলার ধারণা নামক কোনো শিরোনাম প্রমাণিত নয় এবং এটা ইবাদত বা আকিদারও কোনো অংশ নয়। বরং এই ধারণার বিপরিতে কুরআন-সুন্নাহে এমন কিছু আমল রয়েছে, যা মানুষের ঈমান, প্রজ্ঞা, আত্মশুদ্ধি ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা গড়ে তোলো।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُل لَّا يَعْلَمُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ
অর্থ “বলুন, আসমানসমূহ ও জমিনে যারা আছে, তারা আল্লাহ ছাড়া গায়েব জানে না।”—সূরা আন-নামল, ২৭:৬৫।
এ আয়াতের আলোকে কোনো বিশেষ জিকির বা ধ্যানের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে গায়েব দেখার ক্ষমতা অর্জনের দাবি করা যাবে না। বরং সামগ্রিকভাবে পরিপূর্ণ সুন্নাহের অনুসরণের মাধ্যমেই হিকমত ও প্রজ্ঞা এবং দূরদৃষ্টি এবং ফারাসাত হাদিস করা সম্ভব। সেই আমলগুলো কয়েকটি হলো-
১ম আমল: ফুরকান—সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করার সামর্থ্য লাভ
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَلْ لَكُمْ فُرْقَانًا
অর্থ “হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করে চলো, তাহলে তিনি তোমাদের জন্য ফুরকান (সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করার মানদণ্ড) দান করবেন।” সূরা আল-আনফাল, ৮:২৯।
এখানে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি হলো ফুরকান—সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করার সামর্থ্য। এটিকে কপালে তৃতীয় চোখ খুলে যাওয়া বা গায়েব দেখার নিশ্চয়তা হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
দ্বিতীয় আমল: নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন:
وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ
“আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসি।” সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৫০২।
হাদিসের ব্যাখ্যা: এই হাদিসে আল্লাহর ভালোবাসা, নৈকট্য ও তাঁর সাহায্য লাভের কথা এসেছে। এখানে “আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি হয়ে যান” কথাটির অর্থ এই নয় যে বান্দা আল্লাহর মতো গায়েব দেখতে শুরু করে। বরং আল্লাহর সাহায্যে তার দেখা, শোনা ও কাজ করা আনুগত্যের পথে পরিচালিত হয়।
তৃতীয় আমল : আত তাদাব্বুর ফিল কুরআন
আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ
অর্থ “তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না?” সূরা আন-নিসা, ৪:৮২।
কুরআন নিয়ে তাদাব্বুুর (শরঈ নির্দেশনা অনুসারে চিন্তা ফিকির) করার মাধ্যমে মানুষ নিজের ভুল, প্রবৃত্তির প্রতারণা, অন্যায় এবং জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝতে শেখে। এটাই অন্তর্দৃষ্টি উন্নত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
চতুর্থ আমল: যিকির ও সৃষ্টি নিয়ে ফিকির
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَىٰ جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَٰذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
অর্থ: যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে (সর্বাবস্থায়) আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করে (এবং বলে), ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এসব নিরর্থক সৃষ্টি করেননি, আপনি অত্যন্ত পবিত্র; অতএব আপনি আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন’" সূরা আলে-ইমরান: আয়াত-১৯১
সারকথা: তৃতীয় চোখের ধারণার ঐতিহাসিক শিকড় প্রধানত ভারতীয় ধর্মীয় ও যোগ-তান্ত্রিক ঐতিহ্যে। ইসলামের কাশফ, ফিরাসাত ও বাসিরাহ ধারণার সঙ্গে এর কিছু বাহ্যিক মিল মনে হতে পারে, কিন্তু এগুলোকে একই বিষয় বা একই আমলের ফল বলা যাবে না। ইসলামে প্রমাণিত পথ হলো কুরআন-সুন্নাহ অনুসারে ঈমান, তাকওয়া, ইলম ও আত্মশুদ্ধি অর্জন করা। কাজেই আল্লাহ তাআলার দেওয়া অন্তর্দৃষ্টি বা দূরদৃষ্টি হাসিল করার মাধ্যম হলো, ফরজ ইবাদতগুলো যথাযথভাবে আদায় করা। হারাম থেকে বেঁচে থাকা। সকল প্রকারের গুনাহ ছেড়ে দেওয়া। নিয়মিত তিলাওয়াত, জিকির আজকারে ব্রত থাকা। নিয়মিত তওবা-ইস্তিগফার করা এবং সাধ্যমতো অবস্থাভেদে (গোপনে/প্রকাশ্যে) সদকা করা। বান্দা এবং আল্লাহর হক রক্ষা করা এবং কোনো বিষয়ের সত্যতা যাচাই না করে বিশ্বাস না করা। এই কাজগুলো কথিত তৃতীয় নেত্র খোলার কৌশল নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আমল হিসেবে গ্রহণ করুন। যদি কেউ এইসব আমলকে আপন করে নিতে পারে তাহলে আল্লাহ তায়ালা তাকে দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতার সাথে সাথে তার অন্তর্দৃষ্টি, বাসিরাত, ফারাসাত খুলে দিবেন। আল্লাহ তাআলা তাকে হিকমত ও প্রজ্ঞা দান করবেন। এবং তাকে এমন ইলিম দান করবেন যা সে ইতিমধ্যে পড়েনি।
সতর্কতা: তৃতীয় নেত্র খোলার নামে যেসব কাজ থেকে সতর্ক থাকা আবশ্যক
- কপালের মাঝখানে মনোযোগ দিয়ে কোনো বিশেষ আলো, শক্তি বা অদৃশ্য চোখ জাগিয়ে তোলার দাবি।
- নির্দিষ্ট সংখ্যায় কোনো অপ্রমাণিত জিকির বা মন্ত্র পড়লে গায়েব দেখা যাবে—এমন প্রতিশ্রুতি।
- জিন, আত্মা বা অদৃশ্য শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে অজানা মন্ত্র, তাবিজ বা আচার অনুসরণ।
- স্বপ্ন, কল্পনা বা ব্যক্তিগত অনুভূতির ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত দাবি করা।
- এসব পদ্ধতিকে ইসলামের প্রমাণিত আমল হিসেবে গ্রহণ করার ভিত্তি নেই।
শেষ কথা: ইসলামে লক্ষ্য হলো তৃতীয় নেত্র খোলা নয়; বরং আল্লাহর হিদায়াত, তাকওয়া, সঠিক উপলব্ধি ও প্রজ্ঞা অর্জন করা। আল্লাহ কাউকে বিশেষ অন্তর্দৃষ্টি দান করতে পারেন, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট আমল করলেই অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা অর্জিত হবে—এমন নিশ্চয়তা কুরআন-সুন্নাহ দেয় না। আল্লাহ তায়ালা আমাদের বাস্তবিক অর্থে কুরআন-সুন্নাহের অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। অমুসলিমদের ধ্যান-ধারণ, ধর্ম-বিশ্বাস এবং রীতিনীতি থেকে মুসলিম উম্মাহকে হেফাজত করুন। আমিন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন