ইসলামে এত মতভেদ কেন
প্রশ্নঃ ১৬৯৩৭৮. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, acha Islam majy ato bedabed keno
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রিয় প্রশ্নকারী! ইসলাম একটি সার্বজনীন ও সহজ দ্বীন হওয়া সত্ত্বেও এতে কেন এত মতভেদ, দল-উপদল বা ভেদাভেদ দেখা যা, বিষয়টি বোঝার জন্য শরিয়তের আলোকে মতভেদকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করে দেখতে হবে।
১. স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য মতভেদ (ফিকহী বা শাখা-প্রশাখাগত বৈচিত্র্য)
নামাজে হাত কোথায় বাঁধবে, রফউল ইয়াদাইন করবে কি না, কিংবা আমীন উঁচু আওয়াজে বলবে না বলবে না—এ জাতীয় শাখা-প্রশাখাগত মতভেদ কোনো অভিশাপ নয়; বরং এটি মানুষের জন্য আল্লাহর রহমত ও ইসলামি শরিয়তের প্রশস্ততা। এর কারণগুলো হলো,
কুরআন ও হাদিসের ভাষার প্রকৃতি:
আল্লাহ তাআলা আকীদা ও মূল ফরজ বিধানগুলোকে (যেমন: আল্লাহর একত্ববাদ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রোজা, হজ, পর্দা, সুদের নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি) সম্পূর্ণ সুস্পষ্ট ও অকাট্য রেখেছেন। কিন্তু কিছু শাখা-প্রশাখাগত বিধানের শব্দে একাধিক অর্থ গ্রহণের সুযোগ রেখেছেন।
যেমন: কুরআনে ওজুর আয়াতে ‘মাথা মাসেহ’ করার কথা বলা হয়েছে। আরবী ব্যাকরণে ‘বা’ (ب) অক্ষরের কারণে ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেছেন কয়েকটা চুল মাসেহ করলেই হবে, আর ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন মাথার এক-চতুর্থাংশ মাসেহ করতে হবে। এখানে উভয়ের উদ্দেশ্যই আল্লাহর হুকুম মানা, কোনো অহংকার নয়।
সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই এর সূচনা:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগেই সাহাবিদের মাঝে মতভেদ হয়েছিল। বনু কুরাইজায় যাওয়ার সময় নবীজি (ﷺ) বললেন: “তোমরা কেউ বনু কুরাইজায় পৌঁছার আগে আসরের নামাজ পড়বে না।” পথে আসরের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার উপক্রম হলে—একদল সাহাবি বললেন, নবীজির উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত যাওয়া, তাই তারা পথেই নামাজ পড়ে নিলেন। আরেক দল বললেন, আমরা ওখানে পৌঁছেই নামাজ পড়ব, কাজা হলেও সমস্যা নেই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিষয়টি জেনে উভয় দলের কাউকেই তিরস্কার করেননি। (সহিহ বুখারি: ৯৪৬)
হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/899
চার মাযহাবের অবস্থান:
হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী—চার মাযহাবের কোনো ইমামই একে অপরকে বাতিল বা কাফের বলেননি। তাঁরা সবাই কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতেই ইজতিহাদ করেছেন।
২. নিন্দনীয় ও হারাম ভেদাভেদ
যে ভেদাভেদ দেখে মানুষ বিরক্ত ও হতাশ হয়, তা হলো, দলবাজি, পারস্পরিক কাদা-ছোড়াছুড়ি, এক দল অন্য দলকে কাফের বা জাহান্নামী ফতোয়া দেওয়া। ইসলামে এটি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও কবিরা গুনাহ।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا
তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে (কুরআন ও ইসলাম) শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিভক্ত হয়ো না। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ
নিশ্চয় যারা তাদের দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোনো কাজের দায়িত্ব আপনার নয়। (সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৫৯)
এই নিন্দনীয় ভেদাভেদের কারণ কী?
১. নফসের গোলামি ও অহংকার: নিজেকে একমাত্র সত্যপন্থী আর বাকি সবাইকে বাতিল মনে করা।
২. দ্বীনের চেয়ে দলকে বড় মনে করা: কোনো আলেম বা দলের অন্ধভক্তি করতে গিয়ে কুরআনের মূল ঐক্য ভুলে যাওয়া।
৩. হাদিসের অপব্যাখ্যা ও অজ্ঞতা: মৌলিক ফরজ আমল বাদ দিয়ে খুঁটিনাটি মতপার্থক্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়ানো।
৩. হাদিসে বর্ণিত ৭৩ দলের বাস্তবতা
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ভবিষ্যৎবাণী করে গিয়েছিলেন, আমার উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। একটি দল ছাড়া বাকি সবাই জাহান্নামে যাবে।” সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেই নাজাতপ্রাপ্ত দল কারা? তিনি বললেন, আমি এবং আমার সাহাবিরা যার ওপর প্রতিষ্ঠিত আছি। (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৬৪১)
হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/32286
এখানে মূল কথা হলো,যারা কুরআন, সহিহ হাদিস এবং সাহাবায়ে কেরামের মূল নীতিমালার (আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত) ওপর থাকবে, তারাই সঠিক পথে থাকবে। যারা নিজেদের মনগড়া ব্যাখ্যা ও চরমপন্থা তৈরি করবে, তারাই বিভ্রান্ত দলে পরিণত হবে।
একজন সাধারণ মুমিন হিসেবে আপনার করণীয় কী?
১. মৌলিক বিষয়ে অটল থাকুন: তাওহীদ, রিসালাত, আখেরাত, নামাজ, রোজা, হালাল-হারাম, এগুলোতে কোনো ভেদাভেদ নেই। এগুলো শক্তভাবে পালন করুন।
২. বিতর্ক ও সোশ্যাল মিডিয়ার ঝগড়া এড়িয়ে চলুন: যে বিতর্ক আমল নষ্ট করে এবং অন্তরে হিংসা তৈরি করে, তা থেকে দূরে থাকুন।
৩. একজন গ্রহণযোগ্য আলেমের অনুসরণ করুন: যেকোনো হক্কানী বিজ্ঞ আলেম বা ইমামের দিকনির্দেশনায় আমল করুন এবং ভিন্ন মতের আলেম বা মুসলমানদের প্রতি কটু মন্তব্য বা ঘৃণা ছড়ানো থেকে বিরত থাকুন।
৪. সকল মুসলিমকে ভাই মনে করুন: যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বিশ্বাস করে, সে আপনার দ্বীনি ভাই। তার সাথে শত্রুতা নয়, মহব্বতের আচরণ করুন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামিয়া বাবুস সালাম, বিমানবন্দর ঢাকা
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন