জুলুমবাজ স্বামীর সাথে স্ত্রীর করণীয়
প্রশ্নঃ ১৭১১৫৯. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমার স্বামী আমাকে প্রাপ্য সম্মান দেয়না। আমি তার সেবা করলে সে বিরক্ত । ফজর নামাজের জন্য বললেও এমন। তার পরিবারের সামনে আমাকে ছোট করে।এমতাবস্থায় আমি চাচ্ছি সে আমার ভালোবাসার অভাব বুঝুক সে আমাকে কাছে টানলে আমি যদি না যাই তবে কি আমার গুনাহ হবে? আগে কাছে গিয়ে আরো অবহেলা পেয়েছি। এমন পরিস্থিতিতে আমার করনীয় কি?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী বোন!
আপনার মানসিক কষ্ট এবং কঠিন পরিস্থিতিটি অত্যন্ত সহানুভূতি পাওয়ার যোগ্য। বারবার ভালোবাসা ও যত্ন দিয়ে আপনি স্বামীর কাছ থেকে ভালোবাসা, সম্মান ও একটু আন্তরিকতা প্রত্যাশা করছেন। আপনি তাঁর সেবা করেন, ফজরের নামাজের জন্যও তাঁকে ডাকেন; অথচ বিনিময়ে বিরক্তি ও অবহেলা পান। আবার তাঁর পরিবারের সামনে আপনাকে ছোট করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে বারবার কাছে গিয়ে অবহেলা পাওয়ার পর আপনার মন ভেঙে যাওয়া স্বাভাবিক।
আপনি চান, আপনার স্বামী যেন আপনার অভাব অনুভব করেন এবং বুঝতে পারেন যে আপনিও ভালোবাসা ও সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখেন। আপনার এই কষ্টকে অবহেলা করা উচিত নয়। তবে তাঁকে নিজের অভাব বোঝানোর জন্য আপনি তাঁর কাছে যাওয়া বন্ধ করলে শরিয়তের দৃষ্টিতে কী হবে, তা নির্ভর করবে পরিস্থিতি ও আপনার আচরণের ওপর।
এক. স্বামী কাছে টানলে না গেলে কি গুনাহ হবে?
আপনি যদি ‘কাছে টানা’ বলতে স্বামীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের কথা বোঝান, তাহলে বিষয়টি এভাবে বুঝুন:
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَأَبَتْ، فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا، لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ
অনুবাদ: “স্বামী তার স্ত্রীকে বিছানায় আহ্বান করলে সে যদি অস্বীকার করে এবং স্বামী তার ওপর অসন্তুষ্ট অবস্থায় রাত কাটায়, তবে সকাল পর্যন্ত ফেরেশতারা তার প্রতি অভিশাপ দিতে থাকেন।” —সহিহ বুখারি, হাদিস ৫১৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৩৬।
তবে হাদিসের অর্থ এই নয় যে, স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে যেমন আচরণই করুক না কেন, স্ত্রীকে সব পরিস্থিতিতে তাঁর ডাকে সাড়া দিতেই হবে। অসুস্থতা, শারীরিক অক্ষমতা, ক্ষতির আশঙ্কা কিংবা প্রকৃত মানসিক বিপর্যয়ের মতো গ্রহণযোগ্য ওজর থাকলে বিধান ভিন্ন হতে পারে।
আপনি আগে বারবার কাছে গিয়ে অবহেলা পেয়েছেন—এ কারণে আপনার মনে কষ্ট ও অনীহা তৈরি হওয়া বোধগম্য। আপনি যদি মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত থাকেন যে সম্পর্ক স্থাপন করা আপনার জন্য অসহনীয় হয়ে পড়ে, তাহলে আপনার পরিস্থিতি বিবেচনা না করে আপনাকে গুনাহগার বলা ঠিক হবে না।
তবে শুধু স্বামীকে কষ্ট দেওয়া, প্রতিশোধ নেওয়া কিংবা নিজের অভাব বোঝানোর জন্য কোনো গ্রহণযোগ্য ওজর ছাড়াই শারীরিক সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করাকে সাধারণভাবে বৈধ বলা যায় না। বিস্তারিত জানতে নিচের লিংকে প্রবেশ করুন। https://muslimbangla.com/masail/8457
২. আপনার স্বামীর আচরণ সম্পর্কে শরিয়ত কী বলে?
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
অনুবাদ: “তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।” —সুরা আন-নিসা, ৪:১৯।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন—
وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً
অনুবাদ: “আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” —সুরা আর-রূম, ৩০:২১।
অতএব, স্ত্রীর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ভালোবাসা ও দয়ার সম্পর্ক বজায় রাখা দাম্পত্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আপনার স্বামী যদি আপনাকে নিয়মিত অপমান করেন, তাঁর পরিবারের সামনে ছোট করেন এবং আপনার আন্তরিকতাকে অবজ্ঞা করেন, তাহলে এসব আচরণকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। স্ত্রীর যেমন স্বামীর অধিকার রক্ষা করা কর্তব্য, তেমনি স্বামীরও স্ত্রীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা কর্তব্য।
৩. এখন আপনার করণীয় কী?
প্রথমত: তাঁকে ভালোবাসা দেওয়া বন্ধ করে প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে নিজের কষ্টের কথা স্পষ্টভাবে জানান। বলতে পারেন, “আমি তোমার কাছে শুধু দায়িত্ব পালন করতে চাই না; তোমার ভালোবাসা ও সম্মানও চাই। তুমি যখন সবার সামনে আমাকে ছোট করো, তখন আমার ভেতরে খুব কষ্ট হয়। আমি চাই, আমরা একে অপরের সঙ্গে ভালোভাবে থাকি।”
দ্বিতীয়ত: তাঁর প্রতিটি কাজে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন না। সংসারের ন্যায্য দায়িত্ব পালন করুন, কিন্তু ভালোবাসা পাওয়ার আশায় নিজেকে ক্রমাগত অপমানিত হতে দেবেন না।
তৃতীয়ত: ফজরের নামাজের জন্য তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া ভালো কাজ। কিন্তু তিনি বিরক্ত হলে ঝগড়া না বাড়িয়ে সুন্দরভাবে নসিহত করুন। নামাজের দায়িত্ব তাঁর নিজের। এসম্পর্কে জানতে নিচের লিংকে প্রবেশ করুন: https://muslimbangla.com/masail/32324
চতুর্থত: আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, নিজের ইবাদত ও মানসিক সুস্থতার যত্ন নিন। স্বামীর ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অন্যায় নয়; তবে নিজের মর্যাদা ও আল্লাহর সন্তুষ্টিকে শুধু তাঁর অন্যায় আচরণ কিংবা জুলুমের ওপর নির্ভরশীল নয়।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর, বিশেষ করে দৈনিক ন্যূনতম দুই রাকাআত সলাতুল হাজত পড়ে পড়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে দাম্পত্য জীবনের সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা এবং দ্বীনদারী-ঈমানদারী ও হিদায়াত ওয়ালা জীবনের জন্য দোয়া করতে থাকুন। আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই দোয়া কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ।
পঞ্চমত : একান্তে কথা বলেও সমাধান না হলে উভয় পরিবারের বিচক্ষণ ও ন্যায়পরায়ণ লোকদের সাথে আলাপ করুন। তাদের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করুন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন