চুরির মাধ্যমে নষ্ট করা বান্দার হক আদায় ও তাওবার শরয়ি বিধান
প্রশ্নঃ ১৬৮৭২৭. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, , আমরা জানি, তাওবা করলে আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দেন কিন্তু শিরক আর কোন বান্দার হক নস্ট করে তাহলে সেই বান্দা মাফ না করা পর্যন্ত মাফ করেন না।এখন আমার প্রশ্ন হলো কোন চোর অনেক দিন চুরি করার পর চুরি ছেড়ে দিলো।এখন তো সে যে কী পরিমাণ চুরি করেছে সেটার তো হিসাব নাই।আবার যাদের কাছ থেকে চুরি করেছে তাদের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাওয়াও সম্ভব না।সে তো অনেক বান্দার হক নস্ট করেছে।এখন তার কী করনীয়?এখন কি সেই চোর শুধু মাত্র তাওবা করলে ক্ষমা পাবে?নাকি সেই সকল বান্দাদের হক আদায় করতে হবে? যদি হক আদায় করতে হয় তাহলে কিভাবে করবে?
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
নারায়ণগঞ্জ
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
চুরি ছেড়ে দেওয়া এবং আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া অবশ্যই তাওবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে চুরি যেহেতু বান্দার সম্পদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হক, তাই শুধু মুখে তাওবা করলেই বিষয়টি সম্পূর্ণ হবে না; সম্ভব হলে যাদের সম্পদ নেওয়া হয়েছে, তাদের হক ফিরিয়ে দিতে হবে। তবে এমন ক্ষেত্রে শরিয়ত মানুষের সাধ্যের বাইরে কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেয় না।
১. আন্তরিক তাওবা:
চোরকে আন্তরিকভাবে তাওবা করতে হবে- চুরি সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিতে হবে, অতীতের জন্য অনুতপ্ত হতে হবে এবং ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে।
২. চুরির পরিমাণ নির্ধারণ:
অতীতে যতটুকু চুরি করেছে, তার হিসাব বের করার জন্য যথাসম্ভব চেষ্টা করতে হবে। সঠিক পরিমাণ জানা না থাকলে নিজের স্মৃতি, পুরোনো হিসাব, লেনদেনের তথ্য ইত্যাদির মাধ্যমে সম্ভাব্য পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। কম ধরে নয়, বরং সতর্কতার জন্য এমন পরিমাণ নির্ধারণ করবে যাতে প্রবল ধারণা হয় যে তার মাধ্যমে অধিকাংশ বা সম্পূর্ণ হক আদায় হয়ে যাবে।
৩. পরিচিত মালিকের হক ফেরত দেওয়া:
যাদের পরিচয় জানা আছে এবং যাদের কাছে গিয়ে হক ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব, তাদের সম্পদ সরাসরি ফেরত দিতে হবে। তাদের কাছে নিজের অপরাধের বিস্তারিত স্বীকারোক্তি করা আবশ্যক নয়। কোনোভাবে তাদের সম্পদ তাদের কাছে পৌঁছে দিলেই হক আদায় হয়ে যাবে। যেমন- গোপনে টাকা পৌঁছে দেওয়া, ব্যাংক/মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাঠানো ইত্যাদি।
৪. মালিককে পাওয়া না গেলে:
যাদের পরিচয় জানা নেই, অথবা খুঁজে বের করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যাচ্ছে না, তাদের হকের সমপরিমাণ অর্থ তাদের পক্ষ থেকে সদকা করে দেওয়া যেতে পারে। তবে পরবর্তীতে মালিককে পাওয়া গেলে বিষয়টি তার সঙ্গে নিষ্পত্তি করতে হবে।
৫. মালিক মারা গেলে:
যদি প্রকৃত মালিক মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে তার উত্তরাধিকারীদের কাছে হক পৌঁছে দিতে হবে। উত্তরাধিকারীও না পাওয়া গেলে, যথাসম্ভব অনুসন্ধানের পর তার পক্ষ থেকে সদকা করার ব্যবস্থা করতে হবে।
৬. পরিমাণ একেবারেই জানা না থাকলে:
চুরি করা সম্পদের পরিমাণ একেবারেই জানা না থাকলে এবং কার কার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে তাও জানা না থাকলে, বিষয়টিকে অজুহাত বানিয়ে হক আদায় থেকে বিরত থাকা যাবে না। বরং সাধ্যানুযায়ী হিসাব করে একটি প্রবল ধারণাভিত্তিক পরিমাণ নির্ধারণ করে তা মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করবে। কারও কাছে পৌঁছানো সম্ভব না হলে তাদের পক্ষ থেকে সদকা করবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- বান্দার হক আদায়ের জন্য নিজের নাম প্রকাশ করে অপমানিত হওয়া বা নিজের অতীতের অপরাধ সবাইকে জানানো জরুরি নয়। মূল উদ্দেশ্য হলো হক প্রকৃত মালিকের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
আর যদি সে সত্যিই এত পুরোনো ও ব্যাপক চুরির কারণে কার কাছ থেকে কত নিয়েছে তা নির্ণয় করতে না পারে, তবুও তার জন্য তাওবার দরজা বন্ধ নয়। সে সাধ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে এবং যতটুকু হক নির্ধারণ করতে পারে, তা আদায় করবে। এরপর আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করবে। আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।
সুতরাং, সংক্ষেপে বলা যায়-
শুধু চুরি ছেড়ে দিয়ে তাওবা করাই যথেষ্ট নয়; বান্দার হক থাকলে তা যথাসম্ভব ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু মালিককে খুঁজে পাওয়া বা সঠিক পরিমাণ নির্ণয় করা বাস্তবেই অসম্ভব হলে সাধ্যানুযায়ী অনুসন্ধান ও হিসাব করে হক আদায়ের ব্যবস্থা করবে এবং যাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়, তাদের পক্ষ থেকে সদকা করবে। এরপর আন্তরিক তাওবা করবে। আশা করা যায়, এমন ব্যক্তির তাওবা আল্লাহ কবুল করবেন।
কুরআনে আল্লাহ বলেন-
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
“বলুন, হে আমার সেই বান্দারা যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন।” -সূরা আয-যুমার: ৫৩
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না
তবে এতসব গুনাহের কথা মনে করে তাওবাকারী যেন আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
" لَلَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ حِينَ يَتُوبُ إِلَيْهِ مِنْ أَحَدِكُمْ كَانَ عَلَى رَاحِلَتِهِ بِأَرْضِ فَلاَةٍ فَانْفَلَتَتْ مِنْهُ وَعَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابُهُ فَأَيِسَ مِنْهَا فَأَتَى شَجَرَةً فَاضْطَجَعَ فِي ظِلِّهَا قَدْ أَيِسَ مِنْ رَاحِلَتِهِ فَبَيْنَا هُوَ كَذَلِكَ إِذَا هُوَ بِهَا قَائِمَةً عِنْدَهُ فَأَخَذَ بِخِطَامِهَا ثُمَّ قَالَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ اللَّهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وَأَنَا رَبُّكَ . أَخْطَأَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ " .
বান্দা যখন আল্লাহর নিকট তাওবা করে তখন তিনি ঐ ব্যক্তি থেকেও অধিক খুশী হন যে মরু বিয়াবানে নিজ সওয়ারীর উপর আরোহিত ছিল। তারপর সওয়ারিটি তার থেকে পালিয়ে গেল। আর তার উপর ছিল তার খাদ্য ও পানীয়। এরপর নিরাশ হয়ে সে একটি বৃক্ষের ছায়ায় এসে শুয়ে পড়ে এবং তার সওয়ারী সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় হঠাৎ সওয়ারীটি তার সামনে এসে দাড়ায়। তখন সে উহার লাগাম ধরে ফেলে। তারপর সে আনন্দের আতিশয্যে বলে উঠে, ″হে আল্লাহ! তুমি আমার বান্দা, আমি তোমার রব।″ আনন্দের আতিশয্যে সে ভুল করে ফেলেছে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৭৪৭
অতএব, অতীতের গুনাহ যত বেশি হোক, বান্দার কর্তব্য হলো হতাশ না হয়ে সাধ্যানুযায়ী মানুষের হক আদায় করা এবং আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তাওবা করা। আল্লাহ তাআলা তাওবাকারী বান্দাকে ভালোবাসেন এবং তার তাওবায় অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাওফীক দান করেন। আমীন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুহাম্মাদ আশরাফুল আলম
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১