স্বপ্নে নবীজি (সা.)-কে দেখার শরয়ী মানদণ্ড
প্রশ্নঃ ১৬৮২১৩. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখেছে বলেছে কিন্তু স্বপ্নে নাকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাড়ি ছিল না। যেহেতু যারা জান্নাতে যাবে তাদের দাড়ি থাকবে না. এখন সে কি এটা সত্য কথা বলেছে?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
রাসূল (সা.)-এর হাদিসে এসেছে:
حَدَّثَنَا مُوسَى، قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو عَوَانَةَ، عَنْ أَبِي حَصِينٍ، عَنْ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ: "تَسَمَّوْا بِاسْمِي وَلاَ تَكْتَنُوا بِكُنْيَتِي، وَمَنْ رَآنِي فِي الْمَنَامِ فَقَدْ رَآنِي، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ لاَ يَتَمَثَّلُ فِي صُورَتِي، وَمَنْ كَذَبَ عَلَىَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ".
অনুবাদ:
মুসা (রাহ.) ... আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত যে, নবী (সা.) বলেছেন: "আমার নামে তোমরা নাম রাখো; কিন্তু আমার উপনামে (কুনিওয়াতে) তোমরা উপনাম রেখো না। আর যে আমাকে স্বপ্নে দেখে, সে ঠিক আমাকেই দেখে। কারণ শয়তান আমার আকৃতির ন্যায় রূপ ধারণ করতে পারে না। যে ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যারোপ করে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।" (সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ১১০, আন্তর্জাতিক হাদিস নং: ১১০)
উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবনু হাজার রাহ. ফাতহুল বারিতে যে আলোচনা করেছেন তার সার সংক্ষেপ হলো :
স্বপ্নে দেখা রাসূল সা.-এর অবয়বটি কি শামায়েলে বর্ণিত অবয়বের সাথে হুবহু মিলতে হবে, নাকি যেকোনো রূপে দেখলেই হবে—এ নিয়ে হাফেজ ইবনে হাজার (রাহ.) আলেমদের কয়েকটি মত তুলে ধরেছেন:
ইমাম ইবনে সিরিন (রাহ.) বলেন, স্বপ্নটি তখনই ধর্তব্য হবে, যখন নবীজি (সা.)-কে তাঁর সুপরিচিত, প্রকৃত অবয়বে (শামায়েলে বর্ণিত রূপে) দেখা যাবে। কেউ তাঁর পরিচিত অবয়বের বাইরের কোনো বর্ণনা দিলে ইবনে সিরিন বলতেন, "তুমি তাঁকে দেখোনি।"
কাজী ইয়াজ (রাহ.) একটি সুন্দর সমন্বয় করে বলেন—প্রকৃত অবয়বে দেখলে তা হলো 'হাকিকি' বা বাস্তব স্বপ্ন, যার কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। আর তাঁর প্রকৃত অবস্থার বিপরীত ভিন্ন কোনো অবয়বে দেখলে বুঝতে হবে সেটি এমন স্বপ্ন, যার 'তাবির' বা ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে।
ইমাম নববী ও আল-মাযিরি (রাহ.) বলেন, প্রকৃত বা অপ্রকৃত—যেকোনো সুরতে দেখলেই তা নবীজি (সা.)-কে দেখা হিসেবেই গণ্য হবে। তবে অবয়বের ভিন্নতা দ্বারা স্বপ্নের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বোঝায়। (যেমন—স্বপ্নে তাঁকে বৃদ্ধ অবস্থায় দেখলে তা শান্তির ইঙ্গিত, আর যুবক অবস্থায় দেখলে তা যুদ্ধের ইঙ্গিত)।
ইমাম কুরতুবি (রাহ.) বলেন, স্বপ্নে দেখা রূপটি মূলত দৃষ্টান্ত বা রূপক। স্বপ্নে তাঁর আকৃতি বলতে তাঁর 'দ্বীন বা শরীয়ত'-কে বোঝানো হতে পারে। স্বপ্নে তাঁর আকৃতিতে কোনো পূর্ণতা বা অপূর্ণতা দেখলে তা মূলত স্বপ্নদ্রষ্টার নিজস্ব দ্বীনদারির অবস্থা নির্দেশ করে।
ইবনে হাজার (রাহ.) ইবনে আবি জামরাহ-এর একটি ব্যাখ্যা উল্লেখ করে বলেন, "এ বিষয়ে এটিই আমার শোনা সবচেয়ে সেরা ব্যাখ্যা।" সেটি হলো:
"নবীজি (সা.)-এর সত্তা হলো একটি অত্যন্ত স্বচ্ছ আয়নার মতো। আয়না যেমন নিজে নিখুঁত, নবীজিও তেমন নিখুঁত। কেউ যদি স্বপ্নে তাঁর অবয়বে কোনো ঘাটতি বা অপূর্ণতা দেখে, তবে বুঝতে হবে তা স্বয়ং স্বপ্নদ্রষ্টার দ্বীন বা আমলের ত্রুটি। এটি স্বপ্নদ্রষ্টার নিজের অবস্থারই প্রতিফলন। আর তাঁকে সুন্দর রূপে দেখলে বুঝতে হবে স্বপ্নদ্রষ্টার দ্বীনি অবস্থাও ভালো।"
ইবনে হাজার আসকালানি (রাহ.)-এর সিদ্ধান্ত :
দীর্ঘ আলোচনার পর ইবনে হাজার (রাহ.) নিজের মতামত ও সব মতের সমন্বয় করে বলেন:
"আমার কাছে সব মতের সমন্বয়ে যা স্পষ্ট হয় তা হলো—নবীজি (সা.)-এর বিশেষ গুণাবলির কোনো একটি গুণসহ তাঁকে দেখলেও তা নবীজিকে দেখা হিসেবেই গণ্য হবে। তবে পার্থক্য হলো:
পূর্ণাঙ্গ রূপে দেখলে: তাঁকে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত ও শামায়েলে বর্ণিত অবয়বে দেখলে তা হলো একদম সত্য স্বপ্ন, যার কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।
অপূর্ণাঙ্গ রূপে দেখলে: আর তাঁর অবয়বে কোনো ঘাটতি দেখলে বুঝতে হবে তা স্বপ্নদ্রষ্টার নিজ অবস্থার কারণে হয়েছে এবং সে অনুযায়ী এর তাবির বা ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। তবে উভয় অবস্থাতেই বলা যায় যে, সে হাকিকত বা বাস্তবেই তাঁকে দেখেছে।"
«فتح الباري» لابن حجر (12/ 384 ط السلفية):
«قال: كان محمد - يعني ابن سيرين - إذا قص عليه رجل أنه رأى النبي صلى الله عليه وسلم قال: صف لي الذي رأيته، فإن وصف له صفة لا يعرفها قال: لم تره وسنده صحيح.
ووجدت له ما يؤيده: فأخرج الحاكم من طريق عاصم بن كليب: حدثني أبي قال: قلت لابن عباس رأيت النبي صلى الله عليه وسلم في المنام قال: صفه لي، قال: ذكرت الحسن بن علي فشبهته به، قال: قد رأيته
«فتح الباري» لابن حجر (12/ 386 ط السلفية):
«وقال القاضي عياض: يحتمل أن يكون معنى الحديث إذا رآه على الصفة التي كان عليها في حياته لا على صفة مضادة لحاله، فإن رئي على غيرها كانت رؤيا تأويل لا رؤيا حقيقة»
«فتح الباري» لابن حجر (12/ 386 ط السلفية):
«على صفته المعروفة أو غيرها كما ذكره المازري،»
«فتح الباري» لابن حجر (12/ 386 ط السلفية):
«وقال النووي: هذا الذي قاله القاضي ضعيف، بل الصحيح أنه يراه حقيقة سواء كانتعلى صفته المعروفة أو غيرها كما ذكره المازري »
«فتح الباري» لابن حجر (12/ 387 ط السلفية):
«ونحا الشيخ أبو محمد بن أبي جمرة إلى ما اختاره النووي فقال بعد أن حكى الخلاف: ومنهم من قال إن الشيطان لا يتصور على صورته أصلا فمن رآه في صورة حسنة فذاك حسن في دين الرائي وإن كان في جارحة من جوارحه شين أو نقص فذاك خلل في الرائي من جهة الدين.
قال: وهذا هو الحق، وقد جرب ذلك فوجد على هذا الأسلوب، وبه تحصل الفائدة الكبرى في رؤياه حتى يتبين للرائي هل عنده خلل أو لا، لأنه صلى الله عليه وسلم نوراني مثل المرآة الصقيلة ما كان في الناظر إليها من حسن أو غيره تصور فيها وهي في ذاتها على أحسن حال لا نقص فيها ولا شين،»
«فتح الباري» لابن حجر (12/ 387 ط السلفية):
قلت: ويظهر لي في التوفيق بين جميع ما ذكروه أن من رآه على صفة أو أكثر مما يختص به فقد رآه ولو كانت سائر الصفات مخالفة، وعلى ذلك فتتفاوت رؤيا من رآه فمن رآه على هيئته الكاملة فرؤياه الحق الذي لا يحتاج إلى تعبير وعليها يتنزل قوله: فقد رأى الحق، ومهما نقص من صفاته فيدخل التأويل بحسب ذلك، ويصح إطلاق أن كل من رآه في أي حالة كانت من ذلك فقد رآه حقيقة
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা ৷
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন