ইমামের মর্যাদা ও মসজিদ কমিটির দায়িত্ব
প্রশ্নঃ ১৬৭৭৭৭. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমার জানার বিষয় মসজিদ কমিটি অথবা ক্ষমতাদার কোন ব্যক্তি মসজিদের ইমাম এর সাথে বেতনভুক্ত কর্মচারীর মত অথবা টাকায় কিনা গোলাম এর মত আচরণ করে ঐ সমস্ত ব্যক্তিবর্গের ব্যাপারে শরীয়তের সিদ্ধান্ত কি বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন ইনশাআল্লাহ
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
মসজিদের ইমামের সাথে বেতনভুক্ত কর্মচারী বা কেনা গোলামের মতো দুর্ব্যবহার করা শরিয়তের দৃষ্টিতে গুরুতর অন্যায়, চরম অবমাননাকর এবং গুনাহের কাজ। ইসলামে ইমামের স্থান অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এবং রসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সমাজের ধর্মীয় দায়িত্বশীল। মসজিদ কমিটি বা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির জন্য ইমামকে হেয় প্রতিপন্ন করা কোনোভাবেই বৈধ নয়।
ইমামের প্রকৃত মর্যাদা ও শরিয়তের দৃষ্টিকোণ
ইসলামে ইমাম কোনো সাধারণ কাজের লোক বা কেনা গোলাম নন। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং ইমামতি করেছেন এবং তাঁর পর খুলাফায়ে রাশেদিন এই দায়িত্ব পালন করেছেন। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোরআন ভালো পড়তে পারে এবং দ্বীনি জ্ঞানে সমৃদ্ধ, সে-ই মানুষের ইমামতি করবে" (সহিহ মুসলিম) https://muslimbangla.com/hadith/8456 ।
সুতরাং, যিনি নামাজের ইমামতি করেন, তিনি মূলত আল্লাহর দরবারে পুরো জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁকে অসম্মান করা প্রকারান্তরে দ্বীনি মর্যাদাকে অসম্মান করার শামিল।
ইমামের বেতন "ভাতা", গোলামের মজুরি নয়!
ইমাম সাহেব যে অর্থ গ্রহণ করেন, তা মূলত তাঁর দ্বীনি খেদমতের জন্য সমাজ কর্তৃক প্রদত্ত একটি সম্মাননাসূচক "ভাতা" বা জীবিকা নির্বাহের অনুদান, কোনো শ্রমিকের মজুরি নয়। যেহেতু তিনি দ্বীনের কাজে পূর্ণ সময় নিয়োজিত থাকেন, তাই তাঁর ও তাঁর পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়া উম্মতের সামষ্টিক কর্তব্য। টাকা দিয়ে তাঁর যোগ্যতা বা ব্যক্তিত্ব কিনে নেওয়া হয়নি।
আয়িশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আবু বকর সিদ্দীক (রাযিঃ)-কে খলীফা বানানো হল, তখন তিনি বললেন,
لَقَدْ عَلِمَ قَوْمِي أَنَّ حِرْفَتِي لَمْ تَكُنْ تَعْجِزُ عَنْ مَئُونَةِ أَهْلِي، وَشُغِلْتُ بِأَمْرِ الْمُسْلِمِينَ، فَسَيَأْكُلُ آلُ أَبِي بَكْرٍ مِنْ هَذَا الْمَالِ وَيَحْتَرِفُ لِلْمُسْلِمِينَ فِيهِ.
আমার কওম জানে যে, আমার উপার্জন আমার পরিবারের ভরণ-পোষণে অপর্যাপ্ত ছিল না। কিন্তু এখন আমি জনগণের কাজে সার্বক্ষণিক ব্যাপৃত হয়ে গেছি। অতএব আবু বকরের পরিবার এই রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে খাদ্য গ্রহণ করবে এবং আবু বকর (রাযিঃ) মুসলিম জনগণের সম্পদের তত্ত্বাবধান করবে। https://muslimbangla.com/hadith/1940
দুর্ব্যবহারকারীদের ব্যাপারে শরিয়তের সিদ্ধান্ত: যারা ক্ষমতার দাপটে বা বিত্তের অহংকারে ইমামের সাথে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, শরিয়তের আলোকে তারা কয়েকটি বড় অপরাধে লিপ্ত:
এক. আল্লাহর নিদর্শনকে অবমাননা:
মসজিদ এবং মসজিদের ইমাম আল্লাহর দ্বীনের অন্যতম নিদর্শন (শায়ায়ের)। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে: "কেউ আল্লাহর নিদর্শনাবলিকে সম্মান করলে তা তো তার হৃদয়ের তাকওয়ারই বহিঃপ্রকাশ।" (সূরা হজ: ৩২)। বিপরীতভাবে, ইমামকে অপমান করা অন্তরের কপটতা ও অহংকারের লক্ষণ। ذَٰلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ (সূরা হজ, আয়াত: ৩২)
দুই: অহংকার ও জুলুম:
কোনো মুসলমানকে তুচ্ছ জ্ঞান করা গুনাহের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর থেকে উম্মতকে সতর্ক করেছেন। সহীহ মুসলিম https://muslimbangla.com/hadith/13358
মসজিদ কমিটির প্রকৃত দায়িত্ব ও করণীয়
মসজিদ কমিটির সদস্যরা মসজিদের মালিক নন, তারা হলেন আল্লাহর ঘরের খাদেম বা সেবক। ইমাম ও খতিবের সাথে কমিটির সম্পর্ক হওয়া উচিত শ্রদ্ধা, পারস্পরিক পরামর্শ ও সহযোগিতার। কোনো কোনো হাদিসে কিয়ামতের আলামত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অযোগ্য ও অসৎ ব্যক্তিরা মসজিদের নেতৃত্বে চলে আসবে এবং তারা আলেমদের সাথে খারাপ আচরণ করবে। " إِذَا وُسِّدَ الأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ ". https://muslimbangla.com/hadith/57
দ্বীনি বিষয়ে ইমামের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হওয়া উচিত
শরিয়ত অনুযায়ী, দ্বীনি বিষয়ে ইমামের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হওয়া উচিত। কমিটি কেবল প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনা দেখবে ইমামের কোনো ত্রুটি বা সংশোধনযোগ্য বিষয় থাকলে তা অত্যন্ত গোপনে, সসম্মানে এবং আদবের সাথে আলোচনা করতে হবে, জনসমক্ষে বা ধমকের সুরে নয়। যদি কোনো ইমাম যদি শরীয়াহ পরিপন্থি কাজ করে তাহলে তার সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। যদি যথোপযুক্ত সংশোধনের পদ্ধতি অবলম্বরের পরও তিনি নিজেকে না শোধরান; তাহলে তার ব্যক্তিত্ব রক্ষা করে স্ব সম্মানের সাথে তাকে বিদায় জানাতে হবে। কেননা দ্বীনের আর্থই হলো, কল্যাণকামিতা। https://muslimbangla.com/hadith/7155 ।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন