সৌদির চাঁদ অনুসরণকারী ইমামের পেছনে নামাজ: শরঈ অবস্থান কী?
প্রশ্নঃ ১৬২৮৭৫. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমার একটি ফিকহি বিষয় সম্পর্কে জানার আগ্রহ রয়েছে।
যদি কোনো ইমাম সাহেব সৌদি আরবের চাঁদ দেখার ভিত্তিতে বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহা উদযাপন করেন এবং তিনি সেই অনুযায়ী পৃথক ঈদের জামাতের ইমামতিও করেন, তাহলে—
১. এমন ইমামের পিছনে সাধারণভাবে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ আদায় করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হবে কি?
২. যদি বিশেষ কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়—যেমন অন্য কোনো জামাত বা ইমাম সহজলভ্য না থাকে, অথবা ভ্রমণ, কর্মস্থল বা অন্য কোনো বাস্তব কারণে তার পিছনেই নামাজ পড়তে হয়—সেক্ষেত্রে তার ইমামতিতে নামাজ আদায় করা যাবে কি?
৩. নাকি এ ধরনের বিশেষ পরিস্থিতিতেও তার পিছনে জামাতে নামাজ না পড়ে একাকী নামাজ আদায় করাই উত্তম ও শরীয়তসম্মত হবে?
কুরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য ফকীহদের বক্তব্যের আলোকে দলিলভিত্তিক উত্তর জানালে উপকৃত হব। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রিয় প্রশ্নকারী!
বাংলাদেশে অবস্থান করে সৌদি আরবের চাঁদ দেখার ভিত্তিতে ঈদ করা হানাফি মাযহাবের প্রচলিত মত এবং জমহুরের আমলের বিপরীত। কারণ, রমজান ও ঈদ কোনো আন্তর্জাতিক উৎসব নয় যে পৃথিবীর সব অঞ্চলে একই দিনে পালন করতেই হবে; বরং এগুলো চাঁদ দেখার সঙ্গে সম্পৃক্ত ইবাদত।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ﴾
“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে, সে যেন এ মাসে রোজা রাখে।"—সূরা আল-বাকারা: ১৮৫
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,
«صُومُوا لِرُؤْيَتِهِ، وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ»
“তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা শেষ করো।”—সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম
আরেক হাদিসে কুরাইব رحمه الله-এর বর্ণনায় এসেছে, শামের চাঁদ দেখা ও ইবনু আব্বাস رضي الله عنه-এর মদিনায় অবস্থানের চাঁদ দেখার মধ্যে পার্থক্য হয়েছিল। ইবনু আব্বাস رضي الله عنه শামের চাঁদ দেখাকে মদিনার জন্য যথেষ্ট মনে করেননি এবং বলেন,
«هَكَذَا أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ»
“রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের এভাবেই নির্দেশ দিয়েছেন।”—সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০৮৭
এ হাদিস থেকেই ইখতিলাফুল মাতালি‘ তথা বিভিন্ন অঞ্চলের চাঁদ দেখার ভিন্নতা বিবেচনার পক্ষে শক্তিশালী দলিল পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের মুসলমানরা যুগ যুগ ধরে স্থানীয় চাঁদ দেখা, স্থানীয় আলেমদের সিদ্ধান্ত এবং প্রচলিত হানাফি ফিকহের ভিত্তিতে রমজান ও ঈদ পালন করে আসছেন। অতএব, কোনো ব্যক্তি হঠাৎ অন্য একটি দেশের চাঁদ দেখাকে ভিত্তি করে পৃথকভাবে ঈদ শুরু করলে বিষয়টি শুধু একটি ব্যক্তিগত ইবাদতের সিদ্ধান্ত থাকে না; সমাজে নতুন বিভাজন ও বিশৃঙ্খলার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا﴾
“তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না।”—সূরা আলে ইমরান: ১০৩
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِي فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ»
“তোমাদের মধ্যে যে আমার পরে জীবিত থাকবে, সে বহু মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নত এবং হেদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত আঁকড়ে ধরবে।”—সুনানে আবু দাউদ, ৪৬০৭; জামে তিরমিজি, ২৬৭৬
তাই নিজের পছন্দের একটি মতকে কেন্দ্র করে সমাজে নতুন পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
কোনো আলেম যদি কোনো বিষয়ে প্রচলিত ও জমহুরের আমল থেকে ভিন্ন কোনো মত গ্রহণ করেন, তাহলে তাঁর দায়িত্ব হলো বিষয়টি নিজের চেয়ে অধিক বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ আলেমদের সামনে উপস্থাপন করা, দলিল আলোচনা করা এবং উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা করা।
আল্লাহ বলেন,
﴿فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ﴾
“তোমরা যদি না জানো, তাহলে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো।”—সূরা আন-নাহল: ৪৩
কারণ প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের বোঝাপড়াকে শরিয়তের স্বতন্ত্র পদ্ধতিতে পরিণত করতে শুরু করলে আজ একজন একটি ব্যাখ্যা দেবেন, কাল আরেকজন আরেকটি ব্যাখ্যা দেবেন। একসময় মাযহাব, ফিকহের সিলসিলা এবং উলামায়ে কেরামের সংরক্ষিত ইলমি উত্তরাধিকার দুর্বল হয়ে যাবে এবং ব্যক্তিগত মতামতই শরিয়তের বিকল্প হয়ে দাঁড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হবে।
এ কারণেই শরিয়তের মধ্যে ইজতিহাদ সবার জন্য উন্মুক্ত ব্যক্তিগত পছন্দ নয়; যোগ্যতার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ»
“বিচারক ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছালে দুই সওয়াব পান, আর ইজতিহাদ করে ভুল করলে এক সওয়াব পান।”—সহিহ বুখারি, ৭৩৫২; সহিহ মুসলিম, ১৭১৬
অর্থাৎ ইজতিহাদ ও ব্যক্তিগত খেয়াল এক জিনিস নয়।
তবে এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য বুঝতে হবে।
সৌদির চাঁদ অনুসরণ করে বাংলাদেশে ঈদ করা ভুল—এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে, সেই ইমাম ব্যক্তিগতভাবে “বাতিল” হয়ে গেছেন এবং তাঁর পেছনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সহিহ হবে না।
ইমামের কোনো কাজ ভুল হওয়া এবং তাঁর পেছনে নামাজ সহিহ হওয়া—দুটি পৃথক বিষয়।
সুতরাং পাঁচ ওয়াক্ত ফরজের ক্ষেত্রে শুধু এই একটি ভুলের কারণে তাঁর ইমামতিকে বাতিল ঘোষণা করা সমীচীন নয়। তাঁর আকীদা সহিহ, নামাজের শর্ত ও রুকন যথাযথ এবং তাঁর নিজের নামাজ সহিহ হলে, শুধু এই মতভেদের কারণে তাঁর পেছনে নামাজকে বাতিল বলা যাবে না।
এমনকি কোনো ব্যক্তি এ বিষয়ে ভুল পদ্ধতি গ্রহণ করলেও, তার পেছনে পূর্বে আদায় করা ঈদ/জুমা/ পাঞ্জেগানা নামাজ পুনরায় পড়তে হবে—এমন কথা বলা যায় না। কারণ কাজটি ভুল হওয়া আর নামাজ বাতিল হওয়া এক বিষয় নয়।
তবে তাঁর এই মত ও আমলের কারণে যদি মুসল্লিদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়, স্থানীয় জামাত ভেঙে যায়, মানুষ পরস্পরকে ভুল বা গোমরাহ বলতে শুরু করে এবং উম্মাহর মধ্যে ফিতনা ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে বিষয়টি আর নিছক ব্যক্তিগত ইখতিলাফের পর্যায়ে থাকে না।
এ অবস্থায় করণীয় হলো,
প্রথমত, তাঁকে অপমান, গালাগালি বা জনসম্মুখে হেয় না করে বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের সঙ্গে আলোচনা করা।
দ্বিতীয়ত, তাঁকে তাঁর চেয়ে বিজ্ঞ আলেমদের সামনে বসানো এবং ইখতিলাফুল মাতালি‘, স্থানীয় আমল, মাযহাব ও উম্মাহর ঐক্যের বিষয়গুলো দলিলসহ বুঝানো।
তৃতীয়ত, তিনি সংশোধন হলে বিষয়টি সেখানেই শেষ করা।
চতুর্থত, তিনি সংশোধনে রাজি না হলে এবং তাঁর অবস্থানের কারণে বাস্তবভাবে মুসল্লিদের মধ্যে ফাটল ও ফিতনা সৃষ্টি হতে থাকলে, দায়িত্বশীল উলামায়ে কেরাম প্রয়োজনবোধে তাঁকে ইমামতির দায়িত্ব থেকে সম্মানের সঙ্গে সরিয়ে দিতে পারেন। উদ্দেশ্য হবে ব্যক্তিকে অপমান করা নয়; বরং জামাতের ঐক্য, উম্মাহর শান্তি এবং শরিয়তের প্রতিষ্ঠিত ধারাবাহিকতা রক্ষা করা।
সুতরাং, বাংলাদেশে বসে সৌদি আরবের চাঁদের ভিত্তিতে ঈদ করা সঠিক নয় এবং প্রচলিত হানাফি ফিকহ ও জমহুরের আমলের বিরোধী। এর ফলে সমাজে নতুন বিভেদ সৃষ্টি হলে তা আরও নিন্দনীয়। কিন্তু এই ভুলের কারণে ইমামকে এমনভাবে “বাতিল” ঘোষণা করা যাবে না যে তাঁর পেছনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজই সহিহ হবে না।
তাঁর এই আমল ভুল হওয়া এক বিষয়, আর তাঁর ইমামতি সহিহ হওয়া আরেক বিষয়।
বিশেষ করে তাঁর নামাজ নিজেই সহিহ হলে, শুধু এই ইখতিলাফের কারণে তাঁর পেছনে নামাজকে বাতিল বলা ঠিক হবে না।
তবে ফিতনা ও বিভাজন সৃষ্টি করার আশঙ্কা থাকলে তাঁর ইমামতি চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্থানীয় দায়িত্বশীল উলামায়ে কেরামের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা উচিত। উদ্দেশ্য হবে ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নয়, বরং জামাআতের ঐক্য, উম্মাহর শান্তি এবং শরিয়তের প্রতিষ্ঠিত ধারাবাহিকতা রক্ষা করা।
শরঈ দলীল:
صحيح البخاری:
"قال أبو القاسم صلى الله عليه وسلم: «صوموا لرؤيته وأفطروا لرؤيته، فإن غبي عليكم فأكملوا عدة شعبان ثلاثين."
(کتاب الصوم (3/ 27) ط: السلطانية)
الصوم (3/ 27) ط: السلطانية)
سنن ترمذی :
"...... أخبرني كريب : أن أم الفضل بنت الحارث بعثته إلى معاوية بالشام، قال: فقدمت الشام فقضيت حاجتها واستهل علي هلال رمضان وأنا بالشام فرأينا الهلال ليلة الجمعة ثم قدمت المدينة في آخر الشهر، فسألني ابن عباس ثم ذكر الهلال فقال متى رأيتم الهلال ؟ فقلت رأيناه ليلة الجمعة فقال أأنت رأيته ليلة الجمعة ؟ فقلت رآه الناس وصاموا وصام معاوية، قال: لكن رأيناه ليلة السبت فلا نزال نصوم حتى نكمل ثلاثين يوما أو نراه، فقلت ألا تكتفي برؤية معاوية وصيامه ؟ قال: لا هكذا أمرنا رسول الله صلى الله عليه و سلم.
قال أبو عيسى حديث ابن عباس حديث حسن صحيح غريب والعمل على هذا الحديث عند أهل العلم أن لكل أهل بلد رؤيتهم."
(کتاب الصوم،باب ماجاء لکل أهل بلد رؤیتهم،ج:1،ص:148،ط:قدیمی کتب خانه)
فتاوی شامی :
"وفي النهر عن المحيط: صلى خلف فاسق أو مبتدع نال فضل الجماعة، وكذا تكره خلف أمرد وسفيه ومفلوج، وأبرص شاع برصه، وشارب الخمر وآكل الربا ونمام، ومراء ومتصنع."
(باب الإمامة،1/ 562،ط:سعید)
فتاوی ہندیة:
"والاقتداء بشافعي المذهب إنما يصح إذا كان الإمام يتحامى مواضع الخلاف بأن يتوضأ من الخارج النجس من غير السبيلين كالفصد وأن لا ينحرف عن القبلة انحرافا فاحشا."
(كتاب الصلاة، الباب الخامس في الإمامة، الفصل الثالث في بيان من يصلح إماما لغيره، ج:1، ص: 84، ط: رشيدية)
وفيه أيضا:
"قال محمد - رحمه الله تعالى - في الجامع إذا دخل الرجل مع الإمام في صلاة العيد وهذا الرجل يرى تكبيرات ابن مسعود - رضي الله تعالى عنهما - فكبر الإمام غير ذلك اتبع الإمام إلا إذا كبر الإمام تكبيرا لم يكبره أحد من الفقهاء فحينئذ لا يتابعه، كذا في المحيط."
(كتاب الصلاة، الباب السابع عشر في صلاة العيدين، ج: 1، ص: 151، ط: رشيدية)
ردالمحتار:
"وظاهر كلام شرح المنية أيضا حيث قال: وأما الاقتداء بالمخالف في الفروع كالشافعي فيجوز ما لم يعلم منه ما يفسد الصلاة على اعتقاد المقتدي عليه الإجماع، إنما اختلف في الكراهة. اهـ فقيد بالمفسد دون غيره كما ترى. وفي رسالة [الاهتداء في الاقتداء] لمنلا علي القارئ: ذهب عامة مشايخنا إلى الجواز إذا كان يحتاط في موضع الخلاف وإلا فلا. والمعنى أنه يجوز في المراعي بلا كراهة وفي غيره معها. ثم المواضع المهملة للمراعاة أن يتوضأ من الفصد والحجامة والقيء والرعاف ونحو ذلك، لا فيما هو سنة عنده مكروه عندنا؛ كرفع اليدين في الانتقالات، وجهر البسملة وإخفائها، فهذا وأمثاله لا يمكن فيه الخروج عن عهدة الخلاف، فكلهم يتبع مذهبه ولا يمنع مشربه اهـ."
(شامي، كتاب الصلاة، باب الإمامة، مطلب في الاقتداء بشافعي ونحوه هل يكره أم لا، ج: 1، ص: 563، ط: سعید)
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী, ফাতাওয়া বিভাগ, মুসলিম বাংলা
লেখক ও গবেষক, হাদীস বিভাগ, মুসলিম বাংলা
খতীব, রৌশন আলী মুন্সীবাড়ী জামে মসজিদ, ফেনী
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন