শিয়াদের জানাজার নামাজে শরিক হওয়ার শরয়ী বিধান
প্রশ্নঃ ১৫৯৬৯৫. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, শিয়াদের জানাযা পড়া একজন হানাফি মাযহাবের অনুসারীর জন্য শরয়ী হুকুম কী ??
২ জুলাই, ২০২৬
চকরিয়া
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
শিয়া সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির জানাজার নামাজ পড়া এবং তাঁদের জানাজায় শরিক হওয়ার শরয়ী হুকুম নির্ভর করে মূলত উক্ত ব্যক্তির আকিদা বা বিশ্বাসের ওপর। শিয়াদের মধ্যে আকিদাগত অনেক দল বা উপদল রয়েছে। তাই এদের জানাজায় শরিক হওয়ার হুকুমকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়:
১. যেসব শিয়ার জানাজা পড়া জায়েজ নেই:
শিয়াদের মধ্যে যারা এমন কিছু চরমপন্থী আকিদা পোষণ করে যা সরাসরি কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমা (উম্মতের ঐক্যমত) বিরোধী, ইসলামের দৃষ্টিতে তারা কাফের হিসেবে গণ্য। যেমন:
# তারা বিশ্বাস করে যে, হযরত জিবরাঈল (আ.) ওহী নিয়ে আসার সময় ভুল করে হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর কাছে চলে এসেছেন; আসলে ওহী পাওয়ার কথা ছিল হযরত আলী (রা.)-এর।
# তারা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর ওপর ব্যভিচারের অপবাদ দেয়; অথচ পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নূরে (১১ থেকে ২৬ নম্বর আয়াতে) আল্লাহ তাআলা স্বয়ং তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন।
# তারা বিশ্বাস করে যে, বর্তমান প্রচলিত পবিত্র কুরআন বিকৃত, পরিবর্তিত বা অসম্পূর্ণ।
# তারা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর সাহাবী হওয়ার বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করে। অথচ তাঁর সাহাবী হওয়ার বিষয়টি পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবার ৪০ নম্বর আয়াত দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
(এই লিংক থেকে আয়াতের অর্থসহ তাফসির দেখে নিতে পারেন: https://muslimbangla.com/sura/9/tafsir/40)
# তারা বিশ্বাস করে যে, তাদের ১২ জন ইমাম সম্পূর্ণ নিষ্পাপ, তাঁরা গায়েব বা অদৃশ্যের সবকিছু জানেন এবং সৃষ্টিজগতের ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এমনকি তারা শরিয়তের হালাল-হারাম বিধান প্রণয়ন বা পরিবর্তন করার অধিকার রাখেন বলেও বিশ্বাস করে।
যারা এ জাতীয় বাতিল ও কুফরি আকিদা পোষণ করে, তারা ইসলাম এর অন্তর্ভুক্ত নয়। এই ধরনের আকিদাসম্পন্ন কোনো শিয়া মারা গেলে একজন হানাফি বা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অনুসারী মুসলমানের জন্য তার জানাজা পড়া, তার মাগফিরাতের জন্য দুআ করা বা তার কাফন-দাফনে অংশ নেওয়া জায়েয হবে না।
পবিত্র কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
وَلَا تُصَلِّ عَلَىٰ أَحَدٍ مِّنْهُم مَّاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَىٰ قَبْرِهِ ۖ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ
অর্থ: "আর তাদের মধ্যে কারো মৃত্যু হলে আপনি কখনো তার জানাজার নামাজ পড়বেন না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবেন না। নিশ্চয়ই তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরি করেছে।" [সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৮৪]
হানাফি মাযহাবের বিশ্ববিখ্যাত ফতোয়ার কিতাব ফাতাওয়া শামীতে উল্লেখ আছে:
«وَبِهَذَا ظَهَرَ أَنَّ الرَّافِضِيَّ إنْ كَانَ مِمَّنْ يَعْتَقِدُ الْأُلُوهِيَّةَ فِي عَلِيٍّ، أَوْ أَنَّ جِبْرِيلَ غَلِطَ فِي الْوَحْيِ، أَوْ كَانَ يُنْكِرُ صُحْبَةَ الصِّدِّيقِ، أَوْ يَقْذِفُ السَّيِّدَةَ الصِّدِّيقَةَ فَهُوَ كَافِرٌ لِمُخَالَفَتِهِ الْقَوَاطِعَ الْمَعْلُومَةَ مِنْ الدِّينِ بِالضَّرُورَةِ،»
অর্থ : আর এর দ্বারাই স্পষ্ট হলো যে, রাফেজি (শিয়াদের একটি দল) যদি এমন হয় যে, সে আলী (রা.)-এর মধ্যে উলুহিয়্যাত (ঐশ্বরিক সত্তা) বিশ্বাস করে, অথবা জিবরাঈল (আ.) ওহী নিয়ে আসার ক্ষেত্রে ভুল করেছিলেন বলে মনে করে, অথবা (আবু বকর) সিদ্দীক (রা.)-এর সাহাবি হওয়া অস্বীকার করে, কিংবা সায়্যিদা সিদ্দীকা (আয়েশা রা.)-এর প্রতি অপবাদ (ব্যভিচারের তোহমত) আরোপ করে, তবে সে কাফের। কারণ সে দ্বীনের সুনিশ্চিত ও স্বতঃসিদ্ধ প্রমাণিত বিষয়সমূহের (জরুরিয়াতে দ্বীন) বিরোধিতা করেছে।" [ফাতাওয়া শামী, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৪৬]
২. যেসব শিয়ার জানাজা পড়ার অবকাশ আছে:
শিয়াদের মধ্যে এমন কিছু ব্যক্তি বা দল (যেমন যায়দিয়া শিয়াদের কেউ কেউ) আছে, যারা উপরের চরমপন্থী কুফরি আকিদাগুলো পোষণ করে না। তারা কেবল হযরত আলী (রা.)-কে হযরত আবু বকর ও উমর (রা.)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে।
ইসলামের পরিভাষায় এদের কাফের বলা হয় না; তবে এদের আকিদা ভ্রষ্ট বা বিদআতী (ফাসেক বা আহলে বিদআত)।
«وَأَمَّا الرَّافِضِيُّ سَابُّ الشَّيْخَيْنِ بِدُونِ قَذْفٍ لِلسَّيِّدَةِ عَائِشَةَ وَلَا إنْكَارٍ لِصُحْبَةِ الصِّدِّيقِ وَنَحْوِ ذَلِكَ فَلَيْسَ بِكُفْرٍ فَضْلًا عَنْ عَدَمِ قَبُولِ التَّوْبَةِ بَلْ هُوَ ضَلَالٌ وَبِدْعَةٌ»
অর্থ : "আর যে রাফেজি (শিয়া) হযরত আয়েশা (রা.)-এর প্রতি অপবাদ আরোপ করা এবং আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর সাহাবি হওয়া অস্বীকার করা ইত্যাদি (কুফরি কাজ) ছাড়াই কেবল হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর রা.-কে গালিগালাজ করে—তবে তা কুফর নয়, এবং তার তাওবা কবুল হবে না এমন নয়। বরং এটি একটি পথভ্রষ্টতা (দ্বীন থেকে বিচ্যুতি) এবং বিদআত।" [ফাতাওয়া শামী, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: 262]
এই ধরনের আকিদার কোনো শিয়া মারা গেলে সাধারণ হানাফি বা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অনুসারীদের জন্য (বিশেষ প্রয়োজনে) তাদের জানাজায় শরিক হওয়ার অবকাশ আছে। কিন্তু তা থেকে বিরত থাকাই উত্তম।
তবে সমাজের আলেম, খতিব বা দ্বীনি ব্যক্তিত্বদের জন্য তাদের জানাজা পড়া বা শরিক হওয়া কোনোভাবেই উচিত হবে না। কারণ, এতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়তে পারে এবং তাদের ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাসকে সঠিক মনে করে নিতে পারে।
সারকথা:
সাধারণ মানুষের পক্ষে একজন শিয়া ব্যক্তির ভেতরের আসল আকিদা বা বিশ্বাস নিখুঁতভাবে জানা সম্ভব নয়। বর্তমান যুগে অধিকাংশ শিয়া সম্প্রদায়ের আকিদাই হানাফি তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের দৃষ্টিতে কুফরি কিংবা চরম বিদআতের পর্যায়ভুক্ত। তাই সতর্কতা এবং ঈমান রক্ষার দাবি হলো, একজন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অনুসারী হিসেবে শিয়াদের জানাজার নামাজ ও তাদের দাফন-কাফনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে চলা। এতে নিজের ঈমান-আকিদা নিরাপদ থাকে এবং কোনো বাতিল বা ভ্রষ্ট মতবাদের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন প্রদর্শন করা হয় না।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী আবু সাঈদ
উস্তাজ, ইদারাতুত্ তাখাসসুস ফিল উলূমিল ইসলামিয়া, আজিমপুর
উস্তাজ, ইদারাতুত্ তাখাসসুস ফিল উলূমিল ইসলামিয়া, আজিমপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১