প্রত্যেক রোগের জন্য ওষুধ আছে : হাদিসের ব্যাখ্যা ও শিক্ষা
প্রশ্নঃ ১৫১৩৮৭. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমি একজন নতুন ১ম বর্ষের মেডিকেল শিক্ষার্থী। আমি একটি হাদিসের ব্যাখা জানতে খুব আগ্রহী। হাদিসটি হলো
- إن الله عز وجل لم ينزل داءاً إلا وقد أنزل معه دواءاً جهله منكم من جهله وعلمه منكم من علمه (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৪৭; বিভিন্ন বর্ণনায় হাদিসটি বিভিন্ন শব্দে এসেছে) আমি এই হাদিসের বিস্তারিত ব্যাখা এবং মুহাদ্দিসিনে কেরাম এর ব্যাপারে কী কী মন্তব্য করেছেন—সেগুলো জানতে চাচ্ছি। এই হাদিসটি কি চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করে দুরারোধ্য ব্যধির ঔষধ আবিষ্কার করতে অনুপ্রাণিত করে? একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট হিসেবে আমি এখান থেকে কী কী শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি? আমি আমার পেশাজীবনের এই যাত্রাকে ইসলামের আলোয় অনুধাবন করতে চাচ্ছি। জাযাকাল্লাহ খাইরান।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ যে, আপনি একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছেন। আপনি নিজেও উল্লেখ করেছেন যে, হাদিসটি বিভিন্ন শব্দে বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। বিষয়টি তাই। মানবজীবনে রোগ-ব্যাধি যেমন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পরীক্ষা, তেমনি এর প্রতিকারও তাঁরই অশেষ রহমতের অংশ। রাসূল ﷺ উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন যে পৃথিবীতে এমন কোনো রোগ নেই, যার চিকিৎসা আল্লাহ নির্ধারণ করেননি। তাই একজন মুমিনের কর্তব্য হলো আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রেখে ধৈর্য ধারণ করা এবং বৈধ চিকিৎসা গ্রহণে সচেষ্ট হওয়া। নিচে আমরা প্রসিদ্ধ কয়েকজন মুহাদ্দিস থেকে হাদিসটি ব্যাখ্যা তুলে ধরছি।
১. পৃথিবীর বিখ্যাত মুহাদ্দিস, হাদিস ব্যাখ্যাতা, হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ فتح الباري شرح صحيح البخاري-এ এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন —
قَوْلُهُ: «مَا أَنْزَلَ اللَّهُ دَاءً إِلَّا أَنْزَلَ لَهُ شِفَاءً» فِيهِ إِثْبَاتُ التَّدَاوِي، وَإِشَارَةٌ إِلَى أَنَّ ذَلِكَ لَا يُنَافِي التَّوَكُّلَ، كَمَا لَا يُنَافِي دَفْعُ الْجُوعِ وَالْعَطَشِ بِالطَّعَامِ وَالشَّرَابِ التَّوَكُّلَ.
“এই হাদিসে চিকিৎসা গ্রহণের বৈধতা প্রমাণিত হয় এবং এ কথার দিকনির্দেশনা রয়েছে যে চিকিৎসা গ্রহণ তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; যেমন খাদ্য ও পানীয় দ্বারা ক্ষুধা-তৃষ্ণা দূর করা তাওয়াক্কুলের বিরোধী নয়।”
তিনি আরও বলেন—
وَقَدْ تَكَلَّمَ الْعُلَمَاءُ فِي التَّدَاوِي: هَلْ هُوَ أَفْضَلُ أَوْ تَرْكُهُ؟ وَالَّذِي عَلَيْهِ الْجُمْهُورُ أَنَّهُ مُبَاحٌ، وَقَدْ يَكُونُ مُسْتَحَبًّا، بَلْ يَجِبُ فِي بَعْضِ الْأَحْوَالِ.
“আলেমগণ চিকিৎসা গ্রহণ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন—এটি উত্তম, নাকি তা পরিত্যাগ করা উত্তম? অধিকাংশ আলেমের মতে চিকিৎসা গ্রহণ বৈধ; কখনো তা মুস্তাহাব হয়, বরং কিছু অবস্থায় তা ওয়াজিবও হতে পারে।”
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ—
وَفِي الْحَدِيثِ الْحَثُّ عَلَى التَّفَتُّشِ عَلَى الدَّوَاءِ، وَالتَّنْقِيبِ عَنْهُ بِالتَّجْرِبَةِ، لِأَنَّ الشِّفَاءَ مُعَلَّقٌ بِإِصَابَةِ الدَّوَاءِ لِلدَّاءِ.
“এ হাদিসে চিকিৎসা অনুসন্ধান ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ওষুধ আবিষ্কারের প্রতি উৎসাহ রয়েছে। কারণ রোগমুক্তি নির্ভর করে রোগের উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়ার উপর।”
— ফাতহুল বারী , খণ্ড: ১০ পৃষ্ঠা: ১৩৪–১৩৬, দারুল হাদিস কায়রো, মিশর।
সারমর্ম:ইসলাম মানুষকে চিকিৎসা ও গবেষণার দিকে উৎসাহ দেয়।
২. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী রহ. شرح صحيح مسلم- এ বলেন—
قَوْلُهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاءٌ، فَإِذَا أُصِيبَ دَوَاءُ الدَّاءِ بَرَأَ بِإِذْنِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ»
فِي هَذَا الْحَدِيثِ إِشَارَةٌ إِلَى اسْتِحْبَابِ التَّدَاوِي، وَأَنَّهُ لَا يُنَافِي التَّوَكُّلَ، كَمَا لَا يُدَافِعُ دَفْعُ دَاءِ الْجُوعِ وَالْعَطَشِ وَالْحَرِّ وَالْبَرْدِ بِأَضْدَادِهَا، بَلْ لَا تَتِمُّ حَقِيقَةُ التَّوْحِيدِ إِلَّا بِمُبَاشَرَةِ الْأَسْبَابِ الَّتِي نَصَبَهَا اللَّهُ تَعَالَى مُقْتَضَيَاتٍ لِمُسَبَّبَاتِهَا قَدَرًا وَشَرْعًا.
وَفِي الْحَدِيثِ تَقْوِيَةٌ لِنَفْسِ الْمَرِيضِ وَالطَّبِيبِ، وَحَثٌّ عَلَى طَلَبِ ذَلِكَ الدَّوَاءِ وَالتَّفَتُّشِ عَلَيْهِ.
ভাবার্থ: এই হাদিসে চিকিৎসা গ্রহণের উৎসাহ রয়েছে এবং এটি তাওয়াক্কুলের বিরোধী নয়। যেমন ক্ষুধা, তৃষ্ণা, গরম ও ঠাণ্ডা দূর করার জন্য উপায় গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের বিরুদ্ধে নয়। বরং আল্লাহ যেসব কারণকে ফলাফলের মাধ্যম বানিয়েছেন, সেগুলো গ্রহণ করাই প্রকৃত তাওহীদের অংশ। হাদিসটি রোগী ও চিকিৎসক—উভয়ের মনোবল বাড়ায় এবং চিকিৎসা অনুসন্ধানে উৎসাহ দেয়।
কিতাব: المنهاج شرح صحيح مسلم
খণ্ড: ১৪
পৃষ্ঠা: ১৮৪–১৮৫
“এই হাদিসে চিকিৎসা গ্রহণ মুস্তাহাব হওয়ার প্রমাণ রয়েছে। এবং এতে রোগের কারণে নিরাশ না হওয়ার দিকনির্দেশনা আছে।”
৩. আল্লামা শাব্বীর আহমদ উসমানী রহ. তার বিখ্যাত গ্রন্থ فتح الملهم بشرح صحيح مسلم-এ এই হাদিসের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন,
باب: لكل داء دواء واستحباب التداوي
“প্রত্যেক রোগের চিকিৎসা আছে এবং চিকিৎসা গ্রহণ মুস্তাহাব।”
وفي الحديث دليل على مشروعية التداوي، وأن الأمراض ليست خارجة عن سنن الأسباب والمسببات، بل جعل الله لكل داء دواء.
অর্থ: “এই হাদিসে চিকিৎসা গ্রহণের বৈধতার প্রমাণ রয়েছে। রোগ-ব্যাধি কারণ ও ফলাফলের নিয়মের বাইরে নয়; বরং আল্লাহ প্রত্যেক রোগের জন্য চিকিৎসা নির্ধারণ করেছেন।”
তিনি আরও বলেন—
وليس في التداوي ما ينافي التوكل، لأن التوكل لا ينافي تعاطي الأسباب.
অর্থ: “চিকিৎসা গ্রহণ তাওয়াক্কুলের বিরোধী নয়। কারণ তাওয়াক্কুল উপায়-উপকরণ গ্রহণের বিপরীত নয়।”
আরও একটি সুন্দর অংশ—
وفيه حث للأطباء على البحث والتنقيب عن خواص الأدوية والعقاقير.
“এতে চিকিৎসকদের জন্য ওষুধ ও ঔষধি উপাদানের গুণাগুণ অনুসন্ধানের প্রতি উৎসাহ রয়েছে।”
ফতহুল মুলহিম শরহু সহিহিল মুসলিম, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা: ৩৯০–৩৯২
৪.যাদুল মাআদ গ্রন্থে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল যাওজিয়্যাহ রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় চিকিৎসা, তাওয়াক্কুল এবং الأسباب (উপায় গ্রহণ)-এর সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি বলেন—
فِي الْأَحَادِيثِ الصَّحِيحَةِ الْأَمْرُ بِالتَّدَاوِي، وَأَنَّهُ لَا يُنَافِي التَّوَكُّلَ، كَمَا لَا يُنَافِي دَفْعُ دَاءِ الْجُوعِ وَالْعَطَشِ وَالْحَرِّ وَالْبَرْدِ بِأَضْدَادِهَا التَّوَكُّلَ.
“সহীহ হাদিসসমূহে চিকিৎসা গ্রহণের নির্দেশ এসেছে। আর এটি তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; যেমন ক্ষুধা, তৃষ্ণা, গরম ও ঠাণ্ডা দূর করার জন্য উপায় গ্রহণ তাওয়াক্কুলের বিরোধী নয়।”
তিনি আরও বলেন—
بَلْ لَا تَتِمُّ حَقِيقَةُ التَّوْحِيدِ إِلَّا بِمُبَاشَرَةِ الْأَسْبَابِ الَّتِي نَصَبَهَا اللَّهُ مُقْتَضِيَاتٍ لِمُسَبَّبَاتِهَا قَدَرًا وَشَرْعًا.
“বরং আল্লাহ যেসব কারণকে ফলাফলের মাধ্যম বানিয়েছেন, সেগুলো গ্রহণ করা ছাড়া প্রকৃত তাওহীদের পূর্ণতা অর্জিত হয় না।”
আরও একটি বিখ্যাত অংশ—
لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاءٌ، فَإِذَا وُضِعَ دَوَاءُ الدَّاءِ عَلَيْهِ بَرَأَ بِإِذْنِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ.
“প্রত্যেক রোগের ওষুধ রয়েছে। যখন রোগের উপযুক্ত ওষুধ প্রয়োগ করা হয়, তখন আল্লাহর ইচ্ছায় রোগমুক্তি আসে।”
শামেলা ভার্সন: https://shamela.ws/book/197/2270#p1
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
উপরিউক্ত রেফারেন্সগুলোর আলোকে হাদিসটির অর্থ একেবারে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। এর থেকে হালাল বস্তু দিয়ে চিকৎসা জায়েজ হওয়ার সাথে সাথে চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা এবং অনুসন্ধান সম্পর্কেও উৎসাহিত করার প্রমাণ পাওয়া যায়।
করণীয়: হালাল বস্তু দিয়ে চিকিৎসা গ্রহনের বিষয়টি যেহেতু প্রমাণিত তাই চিকিৎসা শিক্ষায়/পেশায় সম্পৃক্ত লোকদের এখান থেকে শিক্ষা হলো, যে তারা চিকিৎসার আধুনিকায়নের জন্য শরীয়তের সীমার মধ্যে থেকে চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। (যেমনটি ইবনে হাজার আসকালানী রহ. উল্লেখ করেছেন) যতক্ষণ পর্যন্ত তাতে শরীয়ত পরিপন্থি কোনো কাজ পাওয়া না যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত এটা সাওয়াব লাভের উপায় হিসেবে বিবেচিত হবে।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
সাম্প্রতিক প্রশ্নোত্তর
বড় বোনকে নাম ধরে ডাকা, এটা কি শরিয়তসম্মত?
কম্পিউটার ল্যাপটপ ডেক্সটপ প্রিন্টার সেল ও সার্ভিস এর পার্টনারশিপ ব্যবসা
কোনো ব্যক্তি নারীদের পোশাক, অলংকার ও বিভিন্ন সরঞ্জামাদি বিক্রি করলে, কোনো বেপর্দা নারী তা ক্রয় করে পরিধান করলে বা এসব উপহার হিসেবে কোনো বেপর্দা নারীকে দিলে, সে ব্যক্তি কি গুনাহের ভাগীদার হবে?
উত্তম ঋণ পরিশোধকারী
মান্নতের গরু বিক্রি করার হুকুম