কুরআন বা দুয়ার অনুবাদ পড়ার বিধান
প্রশ্নঃ ১৫০৮৬৫. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, কুরআন শরীফ বাংলা উচ্চারণ দেখে পড়লে গুনাহ হতে পারে,,আপনাদের বিভিন্ন দোয়া ও সূরা গুলোর বাংলা উচ্চারণ সহ দেয়া আছে বাংলা উচ্চারণ পড়া কি যায়েজ হবে?
২৯ এপ্রিল, ২০২৬
ঢাকা
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
এক. যদি বাংলায় কুরআন পড়ার অর্থ হয় বাংলা লিপিতে পবিত্র কুরআন পড়া, যেমন: ‘اَلْحَمْدُ ‘আলহামদু’ হিসেবে লেখা দেখে সেই অনুযায়ী পড়া, তাহলে এটা জানা উচিত যে, মহান আল্লাহ তায়ালা যেই কুরআন অবতীর্ণ করেছেন তা আরবি ভাষায় এবং কুরআনের বিভিন্ন স্থানে কুরআনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে; সুতরাং, বাংলা বা আরবি ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় লেখা কুরআন আল্লাহ তায়ালার নাযিলকৃত কুরআনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে না; বরং, তা মূল কুরআনের একটি অসম্পূর্ণ বর্ণনা হবে; কারণ পৃথিবীর কোনো ভাষাই তার নিজস্ব বর্ণ ছাড়া অন্য বর্ণে তার ভাব প্রকাশ করতে পারে না।
আরবি ভাষার ক্ষেত্রেও তাই। ভাষার অন্য কোনো বর্ণ আরবি ভাষার সমস্ত অপরিহার্য ও প্রয়োজনীয় গুণাবলী, বৈশিষ্ট্য এবং সূক্ষ্মতা ধারণ করতে পারে না; সুতরাং, আরবি ছাড়া বাংলা বা অন্য কোনো লিপির কুরআন পড়া উম্মাহর ঐকমত্য দ্বারা নিষিদ্ধ। এটা জায়েজ হবে না।
দেখুন- ফতোয়া দারুল উলুম দেওবন্দ:
https://www.darulifta-deoband.com/home/ur/The-Holy-Quran/146710
কাজেই আরবী লিপি ছাড়া অন্য লিপির কুরআন না পড়ে কোনো ভালো হাফেজ বা ক্বারীর কাছে হাতে কলমে নুরানী কায়েদা এবং কুরআনের সহিহ তেলাওয়াত শিখে নিন ইনশাআল্লাহ, আপনি সহজেই আরবি কুরআন পড়তে পারবেন। কেননা এটা খুব কঠিন কোনো কাজ নয়। কিছুটা গুরুত্ব দিলেই এটা সম্ভব।
দুই: আর যদি বাংলায় কুরআন পড়ার অর্থ হয়: শুধুমাত্র পবিত্র কুরআনের অনুবাদ পড়া, তবে সেই অনুবাদ যেকোনো ভাষাতেই পড়া যেতে পারে; শুধু অনুবাদ পড়লে কোনো গুনাহ হবে না। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা স্মরণ রাখতে হবে। সেটা হলো,
কুরআননের অনুবাদ কিছুতেই কুরআনের নিজস্ব বিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়; সুতরাং, শুধু অনুবাদ পড়লেই পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের সওয়াব পাওয়া যাবে না; তাই অনুবাদ পড়ার পাশাপাশি আরবিতে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতেরও যত্ন নেওয়া উচিত। কেননা, কুরআনের অনুবাদ পড়ার দ্বারা কুরআন তিলাওয়াতের হাদীসে বর্ণিত প্রতি হরফে দশ নেকীসহ অন্যান্য সওয়াব পাওয়া যাবে না। তেমনি নামাযে অনুবাদ পড়া জায়েজ নয়। অনুবাদ দিয়ে নামাজ পড়লে নামাজ ভেঙ্গে যাবে।
এছাড়াও শুধু অনুবাদ নির্ভরতার কারণে অনেকগুলো মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি হবে:
এক. মূল কুরআন অপরিবর্তনীয়। কিন্তু অনুবাদ অনুবাদকের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অনুপাতে পরিবর্তিত হয়ে থাকে।
দুই. অনুবাদ অনেক ক্ষেত্রেই কুরআনের মূল স্পিরিট ও অর্থ প্রকাশ নাও করতে পারে।
তিন. অজ্ঞ কিংবা বিধর্মী পাঠক এটাকেই মূল কুরআন মনে করে বসতে পারে।
চার. অনুবাদকের ভিন্নতার কারণে অনুবাদের ভাব প্রকাশে তারতম্য স্বাভাবিক। ফলে বিকৃত তাওরাত, জবুর, ইঞ্জিলের মত কুরআনও বিকৃত বলার মত দুঃসাহস দেখাতে পারে ইসলাম বিদ্বেষীরা।
পাঁচ. পূর্ববর্তী আসমানী গ্রন্থগুলো নাজিলকৃত মূল ভাষা বাদ দিয়ে শুধুমাত্র অনুবাদ নির্ভর হতে হতেই চরম বিকৃতির শিখরে পৌঁছেছে।
ছয়: অন্যান্য বাংলা বইয়ের মতই কুরআনের অনুবাদও তখন যেখানে সেখানে রাখা হবে। ক্রয়বিক্রয় করা হবে। যা কুরআনের অসম্মান।
সাত. শুধু অনুবাদ প্রকাশ করলে, সেই অনুবাদ দেখে আরো কেউ তার থেকে নিজের মত করে অনুবাদ শুরু করে দিতে পারে। যা চরম বিকৃতি ঘটাবে মূল কুরআনের অর্থকে।
ইত্যাদি নানাভিদ কারণে মূল আরবী কুরআনের ইবারত বাদে শুধু অনুবাদ প্রকাশ করা জায়েজ নয়।
যদি সাথে আরবী মূল ইবারত থাকে, তাহলে সাথে অনুবাদ প্রকাশ করতে সমস্যা নেই। [ফাতাওয়া কাসিমিয়া-৪/৭১-৭২, খাইরুল ফাতাওয়া-১/২১৪, ফাতাওয়া দারুল উলুম করাচি-১/৩৪৮]
وهو إنما نزل باللسان العربى كما هو مصرح به فى الآيات المتعددة، وإنما كان تبلغه والدعوة إلى الإسلام والإنذار به كما أنزل الله تعالى، ولم يترجمه النبى صلى الله عليه وسلم، ولا أذن بترجمته، ولم يفعل ذلك الصحابة، ولا خلفاء المسلمين، وملوكهم ولو كتب النبى صلى الله عليه وسلم كتبه إلى قيصر وكسرى ومقوقس بلغاتهم لصح التعليل الذى علل به (حاشية المغنى لابن قدامة-1\289)
ذكر الشيخ الإمام شمس الأئمة السرخسى فى شرح الجامع الصغير: وإن كتب القرآن وتفسير كل حرف وترجمته تحته، روى عن الشيخ الفقيه أبى جعفر: أنه لا بأس به فى ديارنا (الفتاوى التاتارخانية، كتاب الصلاة، الفصل الثانى فى الفرائض-2\52، رقم-1218)
فإن كتب القرآن والتفسير كل حرف وترجمته جاز (رد المحتار، كتاب الصلاة، باب صفة الصلاة-2\178، فتح القدير، كتاب الصلاة، باب صفة الصلاة، زكريا-1\291، كوئته-1\248، دار الفكر-1\286)
কাজেই কুরআনুল কারিমের ক্ষেত্রে হোক বা অন্য কোনো মাসনুন দোয়ার ক্ষেত্রেই হোক মূল পাঠ ছাড়া শুধু ছাড়া উচ্চারণ পড়া জায়েজ হবে না। এবং তার দ্বারা মূল আরবি পাঠের যেই ফজিলত এবং সাওয়াব সেটাও লাভ হবে না।
তবে অনুবাদ পড়া না জায়েজ হবে না।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
সাইদুজ্জামান কাসেমি
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১