ঋণের বিনিময়ে চুক্তিভিত্তিক অতিরিক্ত মুনাফা ভোগ করা সুস্পষ্ট সুদ
প্রশ্নঃ ১৪৯৬৭৫. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমার কাছে এক লক্ষ টাকা ছিলো। আমি সেটা একজন কৃষক কে দিলাম সে আমাকে কিছু পরিমাণ জমি দিলো,আমি আবার তাকে জমি দিয়ে দিলাম এবং চুক্তি হলো সে প্রতিবছর সে আমাকে ১০ হাজার টাকা দিবে। এটা কি সুদ?
২৬ এপ্রিল, ২০২৬
ঢাকা ১২৩০
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রশ্নোক্ত বিবরণ মোতাবেক সাধারণত যে ধরণের লেনদেন হয়ে থাকে এবং প্রশ্ন থেকে আমরা যা বুঝেছি সে হিসেবে উত্তর দিচ্ছি।
এ ধরণের চুক্তিতে সাধারণত নামমাত্র বন্ধকি চুক্তি করা হয়, আসলে তা বন্ধকি চুক্তি নয়। প্রশ্নোক্ত পদ্ধতিকে অবশ্য নামমাত্র বন্ধকি চুক্তিও বলা যায় না। কেননা এখানে জমি দিয়েছে আবার নিয়ে নিয়েছে, ফলে ঋণের বিনিময়ে অতিরিক্ত দশ হাজার টাকা দেওয়ার চুক্তি হয়েছে। তা স্পষ্টত ঋণের বিনিময়ে অতিরিক্ত মুনাফা ভোগ করার একটি অপকৌশল মাত্র। যা সুদ হওয়ার কারণে হারাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ مَنْفَعَةً فَهُوَ رِباً. (الجامع الصغير (سيوطي) : رقم الحديث 9728)
প্রত্যেক এমন ঋণ যার মধ্যে ঋণদাতার জন্য কোন (দুনিয়াবি) সুবিধা-উপকারিতা রয়েছে, তা-ই সুদ। -জামে সগীর সুয়ূতী, হাদীস নং ৯৭২৮
সুতরাং প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে এক লক্ষ টাকার বিনিময়ে প্রতি বছর অতিরিক্ত দশ হাজার টাকা দেওয়ার চুক্তি সম্পূর্ণ সুদি চুক্তি। যা কুরআন সুন্নাহর আলোকে স্পষ্ট হারাম। এমন চুক্তি অবিলম্বে ভঙ্গ করে উভয়কে এর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এর জন্য কৃষক তিনি এক লক্ষ টাকাই ফেরত দিবেন; অতিরিক্ত কিছু দিবেন না। এবং ঋণদাতাও অতিরিক্ত কিছু নিতে পারবেন না।
তবে প্রয়োজনে নিম্নোক্ত বৈধ বিকল্প পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে-
১. কর্যে হাসানা তথা নির্দিষ্ট মেয়াদে পরিশোধের চুক্তিতে সুদমুক্ত ঋণ প্রদান করা। এতে ঋণদাতা সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার ছাওয়াব ও প্রতিদান পাবে। চুক্তিভিত্তিক অতিরিক্ত টাকা বা কোন কিছুই নিতে পারবে না।
২. বাইয়ে সালাম বা সলম চুক্তি করা। এটি শরিয়তসম্মত একটি বৈধ চুক্তি। এর পদ্ধতি হলো, অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করে পণ্য/ফসল নির্ধারিত মেয়াদের পর গ্রহণ করা। এমন লেনদেন কিছু শর্ত সাপেক্ষে বৈধ। শর্তগুলো নিম্নরূপ-
২.১. চুক্তির সময়ই পূর্ণ মূল্য (এখানে এক লক্ষ টাকা) বিক্রেতাকে (এখানে কৃষককে) পরিশোধ করতে হবে।
২.২. নির্ধারিত পণ্য/ফসলের গুনগত মান স্পষ্ট হতে হবে এবং পরিমাণ নির্দিষ্ট হতে হবে ।
২.৩. পণ্য/ফসল হস্তান্তরের দিন-তারিখ ও স্থান নির্ধারিত হতে হবে ।
উল্লেখ্য, যে কোন প্রকার সুদি লেনদেন হারাম। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক করার জন্য, সুদ বা সুদি লেনদেনের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে আরও কিছু প্রমাণ পেশ করা হলো-
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
** وَاَحَلَّ اللّٰہُ الۡبَیۡعَ وَحَرَّمَ الرِّبٰوا ؕ
অথচ আল্লাহ বিক্রিকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। -সুরা বাকারা, আয়াত নং ২৭৫
প্রাসঙ্গিক গুরুত্বপূর্ণ আরও দু’টি আয়াত
** یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ وَذَرُوۡا مَا بَقِیَ مِنَ الرِّبٰۤوا اِنۡ کُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِیۡنَ * فَاِنۡ لَّمۡ تَفۡعَلُوۡا فَاۡذَنُوۡا بِحَرۡبٍ مِّنَ اللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖ ۚ وَاِنۡ تُبۡتُمۡ فَلَکُمۡ رُءُوۡسُ اَمۡوَالِکُمۡ ۚ لَا تَظۡلِمُوۡنَ وَلَا تُظۡلَمُوۡنَ.
হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমরা যদি প্রকৃত মুমিন হয়ে থাক, তবে সুদের যে অংশই (কারও কাছে) অবশিষ্ট রয়ে গেছে, তা ছেড়ে দাও।
তবুও যদি তোমরা (তা) না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও। আর তোমরা যদি (সুদ থেকে) তাওবা কর, তবে তোমাদের মূল পুঁজি তোমাদের প্রাপ্য। তোমরাও (কারও প্রতি) জুলুম করবে না এবং তোমাদের প্রতিও জুলুম করা হবে না। -সুরা বাকারা, আয়াত নং ২৭৮-২৭৯
সুদি লেনদেনের সরাসরি জড়িত সকলের উপরই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লা’নত করেছেন।
এ প্রসঙ্গে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
** عَنْ جَابِرٍ، قَالَ: لَعَنَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَكَلَ الربا، وموكله، وَكَاتِبَهُ، وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ.» (صحيح مسلم : رقم الحديث 1598)
হযরত জাবের রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লা’নত করেছেন- সুদখোর, যে সুদ দেয়, যে সুদ লেখে এবং এর (সুদি লেনদেনের) উভয় সাক্ষী- এদের উপর। -সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৫৯৮
المستندات الشرعية
** صحيح مسلم (2/57) رقم الحديث -4118 مكتبة الفتح
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ : قَدِمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ وَهُمْ يُسْلِفُونَ بِالتَّمْرِ السَّنَتَيْنِ وَالثَّلَاثَ ، فَقَالَ : مَنْ أَسْلَفَ فِي شَيْءٍ فَفِي كَيْلٍ مَعْلُومٍ ، وَوَزْنٍ مَعْلُومٍ ، إِلَى أَجَلٍ مَعْلُومٍ .
** «حجة الله البالغة» (2/ 164)
وكذلك الربا، وهو القرض على أن يؤدي إليه أكثر أو أفضل مما أخذ سحت باطل
** الدر المختار مع رد المحتار (5/ 166):
وفي الخلاصة القرض بالشرط حرام والشرط لغو بأن يقرض على أن يكتب به إلى بلد كذا ليوفي دينه.
وفي الأشباه كل قرض جر نفعا حرام فكره للمرتهن سكنى المرهونة بإذن الراهن.»
«(قوله كل قرض جر نفعا حرام) أي إذا كان مشروطا كما علم مما نقله عن البحر، وعن الخلاصة»
** «السنن الكبرى - البيهقي» (5/ 573 ط العلمية) 10933:
عَنْ فَضَالَةَ بْنِ عُبَيْدٍ صَاحِبِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ قَالَ: " كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ مَنْفَعَةً فَهُوَ وَجْهٌ مِنْ وُجُوهِ الرِّبَا " مَوْقُوفٌ»
** تكملة فتح الملهم : (1/359) دار القلم
أخرج الحارث ابن أبي أسامة في مسنده عن علي رضي الله موقوفا : كل قرض جر منفعة فهو ربا. ذكره السيوطي في الجامع الصغير. وضعفه المناوي في فيض القدير، ولكن جعله العزيزي في السراج المنير حسنا لغيره لتعدد طرقه.
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুহাম্মাদ আশরাফুল আলম
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
সাম্প্রতিক প্রশ্নোত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১