শিশুদের শিক্ষা ও শাসনের ক্ষেত্রে শরয়ী নীতিমালা
প্রশ্নঃ ১৪৯৪২৬. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমি নূরানী মোয়াল্লিম ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়া না হওয়ার কারণে অনেক সময় মারধর করি এবং আমার এই মারের মূল উদ্দেশ্য বাচ্চারা যাতে পড়া ভালোভাবে শিখে এবং পরে। আমি কি গুনাগার হবো এই মারধর করার জন্য পরকালে কি আমার হিসাব দেওয়া লাগবে
১৮ মে, ২০২৬
আলমডাঙ্গা
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত শিক্ষক সাহেব, দ্বীনী শিক্ষার এই মহান পেশায় নিয়োজিত থাকার জন্য আপনাকে মোবারকবাদ। কুরআন শিক্ষার কাজে আত্মনিয়োগ করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। তবে ছোট বাচ্চাদের শাসন করার ক্ষেত্রে শরিয়তের সুনির্দিষ্ট সীমা ও নীতিমালা রয়েছে। আপনার প্রশ্নের উত্তর কুরআন ও হাদিসের আলোকে নিচে দেওয়া হলো,
প্রথমত, শিক্ষককে শিশুদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের (তারবিয়াতের) ক্ষেত্রে কোমলতা ও মমতার পথ অবলম্বন করতে হবে। কারণ, অহেতুক মারধরের ফলে শিশুরা জেদি ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে; ফলে পরবর্তীকালে তাদের ওপর কোনো কথারই প্রভাব পড়ে না। অধিক মারধর ও কঠোরতা শিক্ষা-দীক্ষার জন্য উপকারী তো নয়ই, বরং অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর কারণগুলো হলো:
১. এতে শিশুর শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দুর্বল হয়ে যায়।
২. ভয়ে তারা অর্জিত বিদ্যা ভুলে যায়।
৩. যখন তারা মার খেতে খেতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন তারা নির্লজ্জ হয়ে পড়ে এবং মারের ভয় তাদের মন থেকে উঠে যায়।
এর বিপরীতে কোমলতা, ভালোবাসা এবং ক্ষেত্রবিশেষে উৎসাহ দেওয়ার জন্য পুরস্কার প্রদান পদ্ধতি অনেক বেশি ফলপ্রসূ।
তবে যদি প্রয়োজনে শাস্তি দেওয়ার উপক্রম হয়, তবে শিশুটি সাবালক হোক বা নাবালক—তাকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে শাসন করা যেতে পারে। বরং আদব ও শৃঙ্খলা শেখানোর জন্য শাসনের প্রমাণ শরীয়তেও রয়েছে। যেমন—নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন: "তোমাদের সন্তানদের বয়স যখন সাত বছর হয়, তখন তাদের নামাযের আদেশ দাও; আর যখন দশ বছর হয় (তখনও যদি না পড়ে), তবে তাদের প্রহার করো।" অনুরূপভাবে হাদিস শরীফে এসেছে: "ঘরে এমন জায়গায় বেত ঝুলিয়ে রাখো যেখানে বাড়ির লোকজন তা দেখতে পায়; কারণ এটি তাদের আদব বা শিষ্টাচার শেখানোর একটি মাধ্যম।"
অতএব, কোনো শিক্ষকের সামনে যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে শিশুকে শাস্তি দেওয়া অনিবার্য, তবে তিনি পর্যায়ক্রমে শাস্তি দেবেন। যেমন:
(১) তিরস্কার করা,
(২) ধমক দেওয়া,
(৩) সামান্য কান টানা,
(৪) হাত দিয়ে মারা ইত্যাদি।
শিক্ষা ও সংশোধনের উদ্দেশ্যে যদি কখনো শাস্তি দেওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে সেক্ষেত্রে নিম্নলিখিত শর্তাবলি মেনে চলা জরুরি:
১. শিশুর অভিভাবকদের থেকে এ বিষয়ে অনুমতি নেওয়া থাকতে হবে।
২. শাস্তির উদ্দেশ্য হতে হবে সংশোধন ও সতর্ক করা; রাগ বা প্রতিশোধ নেওয়ার স্পৃহা মেটানো নয়।
৩. এমন শাস্তি দেওয়া যাবে না যা শরীয়তে নিষিদ্ধ। (৯, ১০ ও ১১ নম্বর পয়েন্টে এর ব্যাখ্যা আসছে)।
৪. প্রচণ্ড রাগান্বিত অবস্থায় মারা যাবে না। বরং রাগ কমে যাওয়ার পর কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে শাসন করবে।
৫. শিশুর শারীরিক অবস্থা ও সহ্যক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে; অর্থাৎ সহ্যের অতীত কোনো শাস্তি দেওয়া যাবে না।
৬. মাদরাসা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষকদের এমন শাসনের অনুমতি থাকতে হবে।
৭. হাত দিয়ে মারবে; লাঠি, ডান্ডা বা চাবুক দিয়ে নয়। তবে শিশুটি যদি সাবালক হয়, তবে প্রয়োজনবোধে হালকা লাঠি দিয়ে মারতে পারে, যদি তা তার সহ্যক্ষমতার ভেতরে থাকে।
৮. এক সময়ে তিনটির বেশি আঘাত করা যাবে না এবং সব আঘাত একই স্থানে করা যাবে না, বরং শরীরের বিভিন্ন স্থানে ভাগ করে মারতে হবে।
৯. মাথা, মুখমণ্ডল এবং স্পর্শকাতর অঙ্গে মারা যাবে না।
১০. শিশুটি শাসনের যোগ্য হতে হবে। অতীব ছোট শিশু যে শাসনের উপযুক্ত নয়, তাকে মারা জায়েজ নেই।
১১. এমন শাস্তি দেওয়া শরীয়তে জায়েজ নেই যার ফলে হাড় ভেঙে যায়, চামড়া ফেটে যায়, শরীরে কালো দাগ পড়ে যায় কিংবা হৃদযন্ত্রে বা মনে তার বিরূপ প্রভাব পড়ে। (বিন্নুরি টাউন)
"مصنف ابن ابی شیبہؒ " :
"عن عمرو بن شعيب، عن أبيه، عن جده، قال: قال نبي الله صلى الله عليه وسلم: «مروا صبيانكم بالصلاة إذا بلغوا سبعا، واضربوهم عليها إذا بلغوا عشرا، وفرقوا بينهم في المضاجع» ."
(كتاب الصلوات، متى يؤمر الصبي بالصلاة، رقم الحديث:3482، ج:1، ص:304، ط:مكتبة العلوم والحكم)
"معجم کبیر للطبرانیؒ " :
"عن ابن عباس قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «علقوا السوط حيث يراه أهل البيت»."
(باب علي بن عبد الله بن عباس عن أبيه، رقم الحديث:10669، ج:10، ص:284، ط:مكتبة ابن تيمية)
"فتاوی شامی" :
"لا يجوز ضرب ولد الحر بأمر أبيه، أما المعلم فله ضربه؛ لأن المأمور يضربه نيابةً عن الأب لمصلحته، والمعلم يضربه بحكم الملك بتمليك أبيه لمصلحة التعليم، وقيده الطرسوسي بأن يكون بغير آلة جارحة، وبأن لايزيد على ثلاث ضربات، ورده الناظم بأنه لا وجه له، ويحتاج إلى نقل، وأقره الشارح، قال الشرنبلالي: والنقل في كتاب الصلاة يضرب الصغير باليد لا بالخشبة، ولايزيد على ثلاث ضربات."
( کتاب الحظر والإباحة، فصل في البيع، فروع، ج:6، ص:430، ط: سعید)
"الموسوعۃ الفقہیہ الکویتیہ" :
" للمعلم ضرب الصبي الذي يتعلم عنده للتأديب. وبتتبع عبارات الفقهاء يتبين أنهم يقيدون حق المعلم في ضرب الصبي المتعلم بقيود منها:
أ - أن يكون الضرب معتاداً للتعليم كمًّا وكيفاً ومحلاً، يعلم المعلم الأمن منه، ويكون ضربه باليد لا بالعصا، وليس له أن يجاوز الثلاث، روي أن النبي عليه الصلاة والسلام قال لمرداس المعلم رضي الله عنه: إياك أن تضرب فوق الثلاث، فإنك إذا ضربت فوق الثلاث اقتص الله منك.
ب - أن يكون الضرب بإذن الولي، لأن الضرب عند التعليم غير متعارف، وإنما الضرب عند سوء الأدب، فلا يكون ذلك من التعليم في شيء، وتسليم الولي صبيه إلى المعلم لتعليمه لايثبت الإذن في الضرب، فلهذا ليس له الضرب، إلا أن يأذن له فيه نصاً. ونقل عن بعض الشافعية قولهم: الإجماع الفعلي مطرد بجواز ذلك بدون إذن الولي.
ج - أن يكون الصبي يعقل التأديب، فليس للمعلم ضرب من لايعقل التأديب من الصبيان، قال الأثرم: سئل أحمد عن ضرب المعلم الصبيان، قال: على قدر ذنوبهم، ويتوقى بجهده الضرب وإذا كان صغيراً لايعقل فلايضربه."
(تعليم و تعلم، الضرب للتعليم، ج:13، ص:13، ط:دارالسلاسل)
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
জাওয়াদ তাহের
মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামিয়া বাবুস সালাম, বিমানবন্দর ঢাকা
মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামিয়া বাবুস সালাম, বিমানবন্দর ঢাকা
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১