নারীর জন্য কি পুরুষ হওয়ার দোয়া করা জায়েজ?
প্রশ্নঃ ১৫২৮৩০. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, স্যার আমি খুব হতাশা নিয়ে আপনার সামনে দাড়িয়েছি আমার এমন একটি অবস্থান যে অবস্থানে আমি কোন দিশা খুঁজে না পেয়ে আপনার শরণাপন্ন হেয়েছি ডাক্তার দেখালাম তারাও কিছু সুখবর আমাকে দিতে পারলো না এদিকে আমার রবও আমাকে বারংবার হতাশ করছে।
তাহাজ্জুদ পড়লে না কি সব পায় কান্না করে সিজদা করলে নাকি সব পায় কিন্তু আমি ২ টা বছর টানা এমন করছি তাও রব আমার কোন ডাক শুনছেন না আমায় আপনি কি সাহায্য করতে পারেন একটা সমাধান কি দিবেন দয়া করে।
আমি একটা রোগে ভুগছি সেই জন্মের পর থেকে যখন থেকে বুঝতে চেষ্টা করলাম ঠিক তখন থেকেই। আমি মেয়ে হয়েও আমি যেন পরিপূর্ণ ছেলে রূপ নিয়ে ভেতর থেকে বাঁচতেসি। প্রতি মাসে মাসিক ঠিকভাবে হয় কিন্তু তাও ভেতর থেকে আমার আকষণ নারীর প্রতি। আমার পুরা ফিলিংস ছেলেদের মতো। সাদা স্রাবকে আমার বীর্য মনে হয়। আর উত্তেজনা বাড়লে আমার পেন্ট ভিজে যায়। স্বপ্নে কোন নারীর সাথে সহবাস করতে দেখলে শান্তি লাগে। আমার মন চায় কেন অন্ডকোষ হচ্ছে না! আমি প্রতিরাতে নামাজ পড়ে শুয়ে তাহাজ্জুদে বলি তুমি চাইলে তো সব পারো ইয়া রব তুমি আমাকে শারীরিক পরিবর্তন এনে দাও আমি উঠে যেন দেখি আমার অন্ডকোষ হয়েছে!!
কিন্তু রব আমার কথা ২০ বছরেও শুনলো না। ডাক্তারটাও কিছু বলে না। কিছু ডাক্তার বলে সার্জারি কর কিন্তু এত টাকা আমার নাই। আর কোন হুজুরকে বললে বলে ভালো মুফতি দেখাও। স্যার! আমি অসহায় কেমনে এ কথা কোন ভালো মুফতি কাছে গেলে পাবো জানি না তাই বলছি আপনি যতটুকু জানেন আর যদি আপনার জানা এরচেয়ে বড় মুফতি থাকে তাহলে আপনি নিজে তা জেনে আমায় একটু সাহায্য করুন হুজুর। আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো। কি আমল করলে রব আমার কথা শুনে আমায় ছেলে বানাবে একটু বলে দিয়েন দয়া করে। আর কি পদক্ষেপ নিতে হবে তা জানাবেন হুজুর।
আমার তো কোন দোষ নাই আমি তারই সৃষ্টি শুধু ভেতর থেকে যেমন তেমনটা নিয়ে বাকি জীবনটা কাটাতে চায় যতদিন বাঁচি। ধন্যবাদ হুজুর ভুল হলে মাফ করে দিবেন আমার প্রশ্নের উত্তরে আমায় আশা করি হতাশ করবেন না ইনশাআল্লাহ।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
১. "আপনার কষ্ট এবং দীর্ঘ ২০ বছরের মানসিক লড়াইয়ের কথা শুনে আমি গভীরভাবে ব্যথিত। আপনি যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই অত্যন্ত কঠিন। তবে মনে রাখবেন, আপনি কোনো পাপ বা অপরাধ করছেন না; এই অনুভূতিগুলো আপনার ইচ্ছাকৃত নয়, বরং এটি একটি পরীক্ষা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আপনার ভেতরের সমস্ত কান্না ও আকুলতা দেখছেন।"
২. "আল্লাহ তাআলা অবশ্যই সর্বশক্তিমান এবং তিনি সবকিছু করতে পারেন। তবে আল্লাহ তাআলা এই মহাবিশ্বকে কিছু তার নিয়ম এবং কারণের (سَبَب) অধীনে পরিচালনা করেন। শরীয়তের নিয়ম হলো, অলৌকিক কিছু বা প্রকৃতির নিয়ম বহির্ভূত কোনো কিছুর জন্য দোয়া করা (যেমন: রাতারাতি অঙ্গ পরিবর্তন হওয়া বা লিঙ্গ পরিবর্তন হওয়া) দোয়ার আদবের পরিপন্থী।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বান্দার দোয়া অবশ্যই কবুল হয়—হয়তো তা দুনিয়াতে দেওয়া হয়, নয়তো তার বিনিময়ে কোনো বিপদ দূর করা হয়, অথবা তা আখিরাতের জন্য জমা রাখা হয়। আপনার ২০ বছরের তাহাজ্জুদ ও কান্না মোটেও বৃথা যায়নি, আল্লাহ এর প্রতিটি সেকেন্ডের প্রতিদান আপনাকে আখিরাতে দেবেন, ইনশাআল্লাহ। তাই আল্লাহ তায়ালার প্রতি হতাশ হবেন না।"
প্রিয় বোন!
৩. আপনি যেই অবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই অবস্থাকে জেন্ডার ডিসফোরিয়া (Gender Dysphoria) বা হরমোনের চরম ভারসাম্যহীনতা বলা হয়, যেখানে শারীরিক গঠনের সাথে মানসিক পরিচয়ের অমিল তৈরি হয়।
করণীয়: তাই এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য দুয়ার পাশাপাশি আপনার জন্য করণীয় হলো, প্রথমে একজন ভালো এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট (Endocrinologist - হরমোন বিশেষজ্ঞ) এবং একজন অভিজ্ঞ সাইকিয়াট্রিস্ট (Psychiatrist - মনোরোগ বিশেষজ্ঞ) দেখানো। কেননা অনেক সময় শরীরে পুরুষ হরমোনের (Testosterone) আধিক্য থাকলে নারীদের মধ্যে এমন অনুভূতি তীব্র হতে পারে। হরমোন থেরাপির মাধ্যমে এই মানসিক ও শারীরিক উত্তেজনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
৪. শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গি:
হানাফী ফিকহ এবং সমকালীন ফিকহ একাডেমির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—যদি কোনো ব্যক্তি জন্মগতভাবে পুরুষ বা নারী হন (যেমন আপনার ক্ষেত্রে নিয়মিত মাসিক হচ্ছে এবং জরায়ু-ডিম্বাশয় ঠিক আছে), তবে কেবল মানসিক অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে অস্ত্রোপচার বা সার্জারি করে লিঙ্গ পরিবর্তন করা শরীয়তে সম্পূর্ণরূপে হারাম। এটি আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি সাধনের শামিল। কেননা, আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّهِ
অর্থ: "এবং আমি (শয়তান) তাদের অবশ্যই নির্দেশ দেব, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করবে।" (সূরা আন-নিসা: ১১৯)
হাদীস শরীফে রাসুলুল্লাহ (সা.) এই আয়াতকে সামনে রেখে প্রাকৃতিকভাবে সুস্থ শরীরে পরিবর্তনকারীদের ওপর লানত বা অভিশাপ দিয়েছেন:
لَعَنَ اللَّهُ الْمُتَشَبِّهِينَ مِنَ الرِّجَالِ بِالنِّسَاءِ، وَالمُتَشَبِّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ بِالرِّجَالِ
অর্থ: "আল্লাহ তাআলা নারীসুলভ আচরণকারী পুরুষদের এবং পুরুষালী আচরণকারী নারীদের ওপর লানত করেছেন।" (সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ৫৮৮৫)
ইসলামী ফিকহ একাডেমী, মক্কাতুল-মুকাররমা - ১১তম অধিবেশনের সিদ্ধান্ত:
"أما من كانت أعضاؤه التناسلية واضحة في ذكورته أو أنوثته، فلا يجوز شرعاً تحويله، وتحويله من ذكورة إلى أنوثة أو العكس جريمة، وهو من تغيير خلق الله الذي حرمه الله تعالى."
অর্থ: "যার প্রজনন অঙ্গ পুরুষ বা নারী হিসেবে সম্পূর্ণ স্পষ্ট, শরীয়তের দৃষ্টিতে তার লিঙ্গ পরিবর্তন করা জায়েয নেই। পুরুষ থেকে নারী বা নারী থেকে পুরুষে রূপান্তর করা একটি অপরাধ এবং এটি আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করার শামিল, যা আল্লাহ তাআলা হারাম করেছেন।" কাজেই সার্জারির মাধ্যমে আপনার ওই সমস্যা সমাধানের কোনো সুযোগ নেই।
৫. অসম্ভব বা অবাস্তব দোয়া করার নিষেধাজ্ঞা
সম্মানিত বোন! রাতে ঘুমানোর আগে/পরে বা তাহাজ্জুদে রাতারাতি শারীরিক অঙ্গ পরিবর্তনের যে দোয়া আপনি করছেন, ফিকহের পরিভাষায় একে الاعتداء في الدعاء 'আল-ই’তিদা ফিদ-দোয়া' (দোয়ায় সীমালঙ্ঘণ করা) বলা হয়। শরীয়তের নিয়ম হলো, আল্লাহ দুনিয়াকে যে প্রাকৃতিক নিয়মে সৃষ্টি করেছেন, তার বাইরে অলৌকিক কিছুর দোয়া করা সাধারণ মানুষের জন্য জায়েয নয়।
বিখ্যাত ফাতাওয়াগ্রন্থ الفتاوى الهندية “ফাতাওয়া হিন্দিয়া”-তে আছে
"وَأَنْ لَا يَسْأَلَ مَسْتَحِيلًا وَلَا مَا فِيهِ مَعْصِيَةٌ... وَكَذَا لَا يَدْعُو بِمَا لَمْ تَجْرِ الْعَادَةُ بِهِ كَأَنْ يَطْلُبَ نُزُولَ الْمَائِدَةِ أَوْ الْقُدْرَةَ عَلَى الطَّيَرَانِ فِي الْهَوَاءِ وَالمَشْيِ عَلَى المَاءِ"
অর্থ: "দোয়াকারী যেন কোনো অসম্ভব বিষয় কিংবা গুনাহের বিষয় প্রার্থনা না করে... অনুরূপভাবে এমন কিছুর জন্য দোয়া করবে না যা মানুষের স্বাভাবিক অভ্যাসের বাইরে (প্রাকৃতিক নিয়মের পরিপন্থী); যেমন আসমান থেকে খাবার অবতীর্ণ হওয়ার দোয়া করা, কিংবা বাতাসে ওড়ার ও পানির ওপর দিয়ে হাঁটার ক্ষমতা চাওয়া।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা-৩১৮)
প্রিয় দ্বীনি বোন!
৬. ভেতরের এই তীব্র পুরুষালী অনুভূতি বা 'জেন্ডার ডিসফোরিয়া' মূলত একটি মানসিক রোগ এবং হরমোনের তীব্র ভারসাম্যহীনতা । ইসলাম রোগ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই মর্মে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে-
تَدَاوَوْا عِبَادَ اللَّهِ، فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلاَّ وَضَعَ لَهُ شِفَاءً
অর্থ: "হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। কারণ, আল্লাহ তাআলা এমন কোনো রোগ তৈরি করেননি, যার প্রতিষেধক বা শিফা তিনি সৃষ্টি করেননি।" (জামে তিরমিযী, হাদীস নং ২০৩৮)
কাজেই আপনার জন্য আবশ্যক হলো, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পারজ্ঞম, অভিজ্ঞ, এমন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া।
পরিশেষে-
আচ্ছা, বলুনতো! যে ব্যক্তি জন্মগত অন্ধ বা পঙ্গু, সে যেমন হাজার দোয়া করলেও দুনিয়ার নিয়মে রাতারাতি তার নতুন হাত-পা গজাবে? নিশ্চয়ই না। বরং এটা তার জন্য একটি পরীক্ষা। এমন অসুস্থ ব্যক্তি যদি ধৈর্য ধারণ করেন তাহলে এই ধৈর্যের কারণে তিনি জান্নাতে অফুরন্ত নিয়ামত লাভ করবেন। আপনার মানসিক এই অবস্থাটাও আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আপনার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। এতে যদি আপনি হতাশ-বিচলিত না হয়ে ধৈর্যের সাথে চলেন, এটাকে রোগ হিসেবে নিয়ে চিকিৎসা করান তাহলে সার্জারি হারাম হলেও হরমোন বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে মেডিকেল ট্রিটমেন্ট বা হরমোন থেরাপি নিলে আশা করা যায় আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন। আপনার শারীরিক- মানসিক অবস্থার উন্নতি হবে ইনশাআল্লাহ।
আপনি যদি আর্থিক সংকটের কারণে ভালো ডাক্তার দেখাতে না পারেন, তবে কোনো দ্বীনি দাতব্য সংস্থা বা নির্ভরযোগ্য আলেমদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসার খরচের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করতে পারেন।
সাথে সাথে বেশি বেশি استغفار (ইস্তিগফার) এবং لاحول ولا قوة إلا بالله (লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ) পড়ুন। আর অন্তরের প্রশান্তির জন্য সুনির্দিষ্ট দোয়ার পরিবর্তে আল্লাহর কাছে এই দোয়া করুন: "ইয়া আল্লাহ, আমার মন ও শরীরকে আপনার সন্তুষ্টির ওপর স্থির রাখুন এবং আমাকে এই কঠিন পরীক্ষা থেকে উদ্ধার করুন।"
আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সুস্থ করুন। শরীয়তের নির্দেশনাগুলো পুরোপুরি পালন করার তাওফিক দান করুন। আমনি।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন