রোযা না রাখার ক্ষতি
প্রশ্নঃ ১৪২৪৫৩. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, রোজা না রাখলে কী কী শাস্তি আছে
৯ মার্চ, ২০২৬
যশোর
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
রোযা ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফরয বিধান। এটি একটি মৌলিক ফরয বিধান। ইসলামের ভিত্তি যে সকল স্তম্ভের উপর তার অন্যতম রোযা। সুস্থ প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিম নারী পুরুষের উপর রোযা রাখা ফরয। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার। -সূরা বাকারা, আয়াত নং ১৮৩
অন্য আয়াতে ইরশাদ করেন-
فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ
সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই এ মাস পাবে, সে যেন অবশ্যই রোযা রাখে।- সূরা বাকারা, আয়াত নং ১৮৫
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: إِذَا رَأَيْتُمُ الْهِلَالَ فَصُومُوا. وَإِذَا رَأَيْتُمُوهُ فَأَفْطِرُوا. فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَصُومُوا ثَلَاثِينَ يَوْمًا.
যখন তোমরা (রমযানের) চাঁদ দেখবে, তখন থেকে রোযা রাখবে আর যখন (শাওয়ালের) চাঁদ দেখবে, তখন থেকে রোযা বন্ধ করবে। আকাশ যদি মেঘাচ্ছন্ন থাকে তবে ত্রিশ দিন রোযা রাখবে।-সহীহ বুখারী, হাদীস :১৮০১, ১৮১০; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১০৮১
উল্লিখিত আয়াত ও হাদীস দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণিত যে, রমযানের রোযা রাখা ফরয। রমযানে রোযা না রাখলে সর্ব প্রথম ক্ষতি হলো, একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরয বিধান লঙ্ঘন করা হয়। যা একজন ঈমানদার বান্দার সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয়।
শরিয়ত সমর্থন করে এমন কোন ওযর-কারণ ছাড়া রোযা না রাখার শাস্তি রয়েছে তা বলাই বাহুল্য। প্রথমত যে ইচ্ছাকৃত রমযানের রোযা ছেড়ে দিল সে, নিজের ঈমান ও ইসলামের ভিত্তি নষ্ট করে ফেলল। তার ঈমান ও ইসলাম অসম্পূর্ণ হয়ে গেল। তাছাড়া রোযা না রাখা বা রোযা ভেঙ্গে ফেলার কঠিন শাস্তির কথাও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
بَيْنَا أَنَا نَائِمٌ إِذْ أَتَانِي رَجُلَانِ، فَأَخَذَا بِضَبْعَيَّ، فَأَتَيَا بِي جَبَلًا وَعْرًا، فَقَالَا: اصْعَدْ، فَقُلْتُ: إِنِّي لَا أُطِيقُهُ، فَقَالَا: إِنَّا سَنُسَهِّلُهُ لَكَ، فَصَعِدْتُ حَتَّى إِذَا كُنْتُ فِي سَوَاءِ الْجَبَلِ إِذَا بِأَصْوَاتٍ شَدِيدَةٍ، قُلْتُ: مَا هَذِهِ الْأَصْوَاتُ؟ قَالُوا: هَذَا عُوَاءُ أَهْلِ النَّارِ، ثُمَّ انْطُلِقَ بِي، فَإِذَا أَنَا بِقَوْمٍ مُعَلَّقِينَ بِعَرَاقِيبِهِمْ، مُشَقَّقَةٍ أَشْدَاقُهُمْ، تَسِيلُ أَشْدَاقُهُمْ دَمًا قَالَ: قُلْتُ: مَنْ هَؤُلَاءِ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يُفْطِرُونَ قَبْلَ تَحِلَّةِ صَوْمِهِمْ،
(رواه الحاكم فى المستدرك وقال : هذا حديث صحيح على شرط مسلم، ولم يُخرجاه، وقد احتجَّ البخاري بجميع رُواته غير سُلَيم بن عامر، وقد احتجَّ به مسلم.)
একবার আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম আমার নিকট দুই ব্যক্তি আগমন করল। তারা আমার বাহুদ্বয় ধরে আমাকে এক দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে এল। তারপর আমাকে বলল, আপনি পাহাড়ের উপর উঠুন। আমি বললাম, আমি তো উঠতে পারব না। তারা বলল, আমরা আপনাকে সহজ করে দিব। আমি উপরে উঠলাম। যখন পাহাড়ের সমতলে পৌঁছালাম, হঠাৎ ভয়ঙ্কর আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি বললাম, এ সব কিসের আওয়াজ? তারা বলল, এটা জাহান্নামীদের আর্তনাদ। তারপর তারা আমাকে নিয়ে এগিয়ে চলল। হঠাৎ কিছু লোক দেখতে পেলাম, যাদেরকে তাদের পায়ের মাংসপেশী দ্বারা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এবং তাদের মুখের দুই প্রান্ত ছিড়ে ফেলা হয়েছে এবং তা থেকে রক্ত ঝরছে। আমি বললাম, এরা কারা? তারা বলল, যারা ইফতারের সময় হওয়ার আগেই রোযা ভেঙ্গে ফেলে।
-সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস নং ১৯৮৬; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস নং : ৩০১৯; সুনানে নাসায়ী কুবরা, হাদীস : ৩২৭৩; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ১৫৮৪, ২৮৭৩ (অনুবাদ : আলকাউসার)
প্রিয় পাঠক! ইফতারের সময় হওয়ার আগে রোযা ভাঙ্গার কারণে যদি এমন ভয়াবহ শাস্তি হয় তাহলে, রোযা না রাখার শাস্তি না জানি কী! আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। আমীন।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত-
قَالَ عَبْدُ اللَّهِ: مَنْ أَفْطَرَ يَوْمًا مِنْ رَمَضَانَ مُتَعَمِّدًا مِنْ غَيْرِ سَفَرٍ، وَلَا مَرَضٍ لَمْ يَقْضِهِ أَبَدًا، وَإِنْ صَامَ الدَّهْرَ كُلَّهُ.
وفي تعليق صحيح البخاري - بَاب (29) : إِذَا جَامَعَ فِي رَمَضَانَ.
وَيُذْكَرُ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَفَعَهُ: (مَنْ أَفْطَرَ يَوْمًا مِنْ رَمَضَانَ، مِنْ غَيْرِ عُذْرٍ وَلَا مَرَضٍ، لَمْ يَقْضِهِ صِيَامُ الدَّهْرِ وَإِنْ صَامَهُ). وَبِهِ قَالَ ابْنُ مَسْعُودٍ.
যে ব্যক্তি অসুস্থতা ও সফর ব্যতীত ইচ্ছাকৃতভাবে রমযানের একটি রোযাও ভঙ্গ করে, সে আজীবন রোযা রাখলেও ঐ রোযার হক আদায় হবে না। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৯৮০০; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস : ৭৪৭৬; সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৭২৩; সহীহ বুখারী ২/৬৮৩
রমযানের রোযা না রাখার আরও বড় ক্ষতি হলো, রোযার সীমাহীন ফযীলত, রহমত, বরকত ও প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হতে হয়। বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে শুধু শিরোনামগুলো দিয়ে দিচ্ছি- রোযা না রাখলে যে সকল বিষয় থেকে বঞ্চিত হতে হবে।
১. রোযার প্রতিদান আল্লাহ নিজেই দিবেন।
২. আল্লাহ রোযাদারকে পানি পান করাবেন।
৩. রোযা জান্নাত লাভের মাধ্যম।
৪. রোযাদারের জন্য রয়েছে জান্নাতের বিশেষ দরজা, নাম রাইয়ান।
৫. রোযা জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল ও দূর্গ।
৬. রোযা নাজাতের জন্য সুপারিশকারী।
৭. রোযাদারের সকল গুনাহ মাফ হয়ে যায়।
৮. রোযার দ্বারা গুনাহের কাফফারা হয়।
৯. রোযাদারের মুখের গন্ধ মেশকের চেয়েও সুগন্ধিযুক্ত।
১০. রোযাদারের জন্য রয়েছে বিশেষ আনন্দের মুহূর্ত।
১১. রোযাদারের দোয়া কবুল হয়।
১২. রোযার দ্বারা হিংসা বিদ্বেষ দূর হয়।
১৩. আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠতম উপায়।
উল্লেখ্য, উপরের প্রতিটি বিষয়ই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। ঈমানদার বান্দা শুধু শাস্তির ভয়ে নয় উপরোক্ত ফযীলত ও প্রভূত কল্যাণ অর্জন করার জন্য রোযা রাখবে।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুহাম্মাদ আশরাফুল আলম
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১