বাউল ধর্মে গান-বাজনা! বাউল মতবাদ। পর্ব—৫৩
বাউল ধর্মে গান-বাজনা! বাউল মতবাদ। পর্ব—৫৩
গান-বাজনা বাউল ধর্মের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা তাদের কুফরি মতবাদগুলো গানে গানে প্রচার করে। গান-বাজনা তাদের কাছে এতটাই প্রিয় যে—লালন ফকির তার মৃত্যুর দিন ভোর ৫ টা পর্যন্ত গান-বাজনা করেছিলো। —(উইকিপিডিয়া)
এছাড়াও লালন একাডেমির সাবেক পরিচালক ডক্টর আনোয়ারুল করীম লিখেছেন—
কোনো সময় গ্রামে কোনো মহামারী দেখা দিলে অথবা ব্যক্তিগতভাবে কেউ অসুখে আক্রান্ত হলে দলীয় কিংবা এককভাবে গ্রামে গানের আসর বসে। তিনদিন তিনরাত এই গান হয়ে থাকে। গ্রামবাসী মনে করে যে, এতে রোগ-বালাই দূর হবে। আমি এমন অনেককে দেখেছি যে অসুখে-বিসুখে তারা বাউলগানের জন্য মানত করে থাকে। —বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৪১০
ইসলাম কী বলে?
গান : যে গান মানুষের দ্বীনি দায়িত্ব বা আল্লাহ পাকের স্বরণ থেকে গাফেল করে দেয় অথবা যে গানে শিরক-কুফরে সয়লাব থাকে, তা কোনোভাবেই জায়েয হতে পারে না। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন,
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّـهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا ۚ أُولَـٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ
“কতক মানুষ এমন, যারা অজ্ঞতাবশত আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিচ্যুত করার জন্য খরিদ করে এমন সব কথা, যা আল্লাহ সম্পর্কে উদাসীন করে দেয় এবং তারা আল্লাহর পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। তাদের জন্য আছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি।” —(সুরা লুকমান : ৬)
আল্লামা ত্বাকী উসমানী দা.বা. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন—‘কুরআন মাজীদের দুর্বার আকর্ষণের কারণে, তখনও যারা ঈমান আনেনি, তারা পর্যন্ত লুকিয়ে লুকিয়ে তাঁর (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর) তিলাওয়াত শুনতো এবং এর ফলশ্রুতিতে অনেকে ইসলামও গ্রহণ করতো। কাফেরগণ এ পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে বিপজ্জনক মনে করতো। তাই তারা কুরআন মাজীদের বিপরীতে এমন কোনো আকর্ষণীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চাচ্ছিলো, যাতে মানুষ কুরআন মাজীদ শোনা বন্ধ করে দেয়। সেই চেষ্টার অংশ হিসেবেই মক্কা মুকাররমার ব্যবসায়ী নাযর ইবনে হারিছ, যে বাণিজ্য ব্যাপদেশে দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করতো, ইরান থেকে সেখানকার রাজা-বাদশাহদের কাহিনী সম্বলিত বই-পুস্তক কিনে আনলো। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, সে ইরান থেকে ভালো গাইতে জানে এমন একজন দাসীও কিনে এনেছিলো। দেশে ফিরে এসে সে মানুষকে বললো, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদেরকে আদ ও ছামুদ জাতির কাহিনী শোনায়। আমি তোমাদেরকে আরও বেশি আকর্ষণীয় কাহিনী শোনাবো এবং শোনাবো চমৎকার গান। এতে কিছু সাড়া পাওয়া গেলো। লোকজন তার আসরে উপস্থিত হতে শুরু করলো। আয়াতের ইশারা এ ঘটনারই দিকে। এতে মূলনীতি বলে দেওয়া হয়েছে যে, মানুষের চিত্তবিনোদনের জন্য এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ জায়েয নয়, যা মানুষকে তাদের দীনি দায়িত্ব পালন থেকে গাফেল করে তোলে’। এ প্রসঙ্গেই আয়াতটি নাযিল হয়েছে। ইবনে কায়্যিম জাওযী রহি. একি তাফসীর বয়ান করেছেন। —(বাদায়িউত তাফসীর, খ. ২ পৃ. ৩১৬)
তাছাড়া হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত আছে, উল্লেখিত আয়াতে ‘লাহওয়াল হাদীস’ বলতে গানকে বোঝানো হয়েছে এবং তিনি রীতিমত তিনবার শপথ করে এ কথা বলেছেন। —(তাফসীরে ইবনে কাসীর, খ. ১১ পৃ. ৪৬)
উক্ত আয়াত সম্পর্কে সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
هُوَ الرَّجُلُ يَشْتَرِي الَجْارِيَةَ تُغَنِّيهِ لِيْلًا ونهارًا
“(আয়াতটি) ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে নাযিল করা হয়েছে, যে একজন গায়িকা ক্রয় করেছিলো, যে তাকে দিন-রাত গান শোনাতো।” —(বাদায়িউত তাফসীর, খ. ২ পৃ. ৩১৬)
অথচ, বাউলরা নারী শিল্পীসহ বাউল আসর তৈরি করে থাকে। যার নাম দেয়া হয়, ‘মারেফতি’ গানের আসর। এই গানের আসর বসালে রোগ এবং মহামারী দূর হয় বলে বাউলদের বিশ্বাস। এ বিষয়ে লালন একাডেমির সাবেক পরিচালক ডক্টর আনোয়ারুল করীম লিখেছেন—
বাউলদের সকল বিশ্বাস গুরুকে কেন্দ্র করে। গুরুই তাঁর সমগ্র জীবনের নিয়ন্তা। গুরুর প্রতি তাই ভক্তির চেয়ে ভয়ই কাজ করে। বাউলদের বাইরের জগতে বিশেষ করে পাড়াগাঁয়ে সাধারণ মানুষ বাউলদের একটি বিশেষ দৃষ্টিতে দেখে থাকে। কোনো সময় গ্রামে কোনো মহামারী দেখা দিলে অথবা ব্যক্তিগতভাবে কেউ অসুখে আক্রান্ত হলে দলীয় কিংবা এককভাবে গ্রামে গানের আসর বসে। তিনদিন তিনরাত এই গান হয়ে থাকে। গ্রামবাসী মনে করে যে, এতে রোগ-বালাই দূর হবে। আমি এমন অনেককে দেখেছি যে অসুখে-বিসুখে তারা বাউলগানের জন্য মানত করে থাকে। —বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৪১০
অথচ হযরত আনাস বিন মালেক রা. কর্তৃক বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
صَوْتَانِ مَلْعُونَانِ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ : مِزْمَارٌ عِنْدَ نِعْمَةٍ وَرَنَّةٌ عِنْدَ مُصِيبَةٍ
“ইহ-পরকালে দুটি সুর অভিশপ্ত; সুখ ও খুশীর সময় বাঁশীর শব্দ এবং মসীবত-শোক ও কষ্টের সময় হা-হুতাশ ধ্বনি।” —(মুসনাদে বাযযার, হাদিস নং : ৭৫১৩)
অপর আয়াতে মহান রব বলেন,
أَفَمِنْ هَذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ وَتَضْحَكُونَ وَلَا تَبْكُونَ وَأَنتُمْ سَامِدُونَ
“তবে কি তোমরা এ কথায়ই বিস্ময়বোধ করছো? এবং (একে উপহাসের বিষয় বানিয়ে) হাসি-ঠাট্টা করছো এবং কান্নাকাটি করছো না; এবং তোমরা স্পর্ধিত ঔদাসিন্যে লিপ্ত রয়েছ?” —(সুরা নাজম : ৫৯-৬১)
উক্ত আয়াতের তাফসীরে হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
عَنِ ابْنِ عَبّاسٍ في قَوْلِهِ: ﴿وأنْتُمْ سامِدُونَ﴾ قالَ: الغِناءُ بِاليَمانِيَّةِ، كانُوا إذا سَمِعُوا القُرْآنَ تَغَنَّوْا ولَعِبُوا
“এর অর্থ সঙ্গীত বা গান-বাজনা, যখন কাফেররা কুরআন শরীফ শ্রবণ করতো, তখন সঙ্গীত বা গান-বাজনা করতো ও ক্রীড়া কৌতুকে লিপ্ত হতো, এটা ইয়ামেনবাসীদের ভাষা।” —(তাফসীরে দুররে মানছুর, খ. ৬ পৃ. ১৭৩)
উপরন্তু হাদিস শরীফে এসেছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الغناء ينبت النفاق فى القلب كما ينبت الماء الزرع
“পানি যেরূপ জমীনে ঘাস উৎপন্ন করে, গান তদ্রুপ অন্তরে মুনাফেকী পয়দা করে।” —(ফয়যুল কাদীর, হাদিস নং : ৫৮১০)
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন,
استماع الملاهى معصية و الجلوس عليها فسق و التلذذ بها كفر
“গান শোনা গুনাহের কাজ, গানের মজলিসে বসা ফাসেকী এবং গানের স্বাদ গ্রহণ করা কুফরী।” —(রদ্দুল মুহতার, খ. ৯ পৃ. ৫০৪)
সুতরাং, স্পষ্টভাবে বোঝা গেলো—যে গান মানুষের দ্বীনি দায়িত্ব থেকে বা আল্লাহ পাকের স্মরণ ও ঈমান থেকে মনকে বিচ্যুত করে, তা কখনোই জায়েয হতে পারে না।
বাউল গানে নর্তকী : এছাড়াও বাউল গানে নারী শিল্পী বা নর্তকী রাখা তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অথচ প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে বা প্রাপ্ত বয়স্ক হবার নিকটবর্তী মেয়েদের পরপরুষের সামনে ইসলামি সঙ্গীত গাওয়া যেমন জায়েজ নেই, তেমনই গায়রে মাহরাম কারো জন্য এসব মেয়েদের সঙ্গীত শোনাও জায়েজ নয়। মহান রব্ব বলেছেন—
يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ ۚ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا
“হে নবী পত্নীগণ, তোমরা সাধারণ নারীদের মত নও যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর। সুতরাং তোমরা কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, পাছে অন্তরে ব্যাধি আছে এমন ব্যক্তি লালায়িত হয়ে পড়ে। আর তোমরা বলো ন্যায়সঙ্গত কথা।” —(সুরা আহযাব : ৩২)
এছাড়াও হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
من جلسَ إلى قيّنَةٍ يسمعُ منها صبّ اللهُ في أُذنيهِ الآنِكَ يومَ القيامةِ.
“যে ব্যক্তি গায়িকার পাশে বসে তার গান শুনবে, কিয়ামতের দিন তার কানে শিশা ঢেলে দেওয়া হবে।” —(লিসানুল মিযান লি ইবনে হাজার, খ. ৭ পৃ. ৪৫৩)
বাজনা :
বাদ্যযন্ত্র ইসলামে পরিস্কার হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। চলুন, বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে ইসলাম কী বলে দেখে নেওয়া যাক। মহান আল্লাহ বলেন,
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ
“কতক মানুষ এমন, যারা অজ্ঞতাবশত আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিচ্যুত করার জন্য খরিদ করে এমন সব কথা, যা আল্লাহ সম্পর্কে উদাসীন করে দেয় এবং তারা আল্লাহর পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। তাদের জন্য আছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি।” —(সুরা লুকমান : ৬)
উক্ত আয়াতে لهو الحديث বা ’এমন সব কথা’ এর ব্যাখ্যায় বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত মুজাহিদ রহি. বলেন,
اللهو الطبل
অর্থাৎ لهو الحديث ‘এমন সব কথা’ হলো, ঢোল-তবলা। —(তাফসীরে তাবারী, খ. ২০ পৃ. ১৩০)
বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত হাসান বসরী রহি. বলেন,
أُنْزِلَتْ هذه الآية ‘وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْم’ فِي الْغِنَاءِ وَالْمَزَامِيرِ
“এই আয়াতটি নাযিল হয়েছে গান এবং বাঁশির ব্যাপারে।” —(তাফসীরে ইবনে কাসীর, খ. ১১ পৃ. ৪৬)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ عَلَيَّ أَوْ حُرِّمَ الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْكُوبَةُ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উপর হারাম করেছেন অথবা হারাম করা হয়েছে মদ, জুয়া এবং বাদ্যযন্ত্র।” —(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং : ৩৬৯৬)
হযরত আবু মালেক আশআরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ
“আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে।” —(সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ৫৫৯০)
হযরত আবু মালেক আশআরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো ইরশাদ করেন,
ليشربَنَّ أُناسٌ من أمَّتي الخَمرَ يسمُّونَها بغيرِ اسمِها ويُضرَبُ على رءوسِهِمُ المعازِفُ والمغنِّياتُ يخسفُ اللَّهُ بِهِمُ الأرضَ ويَجعلُ منهمُ القردةَ والخَنازيرَ
“আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার উপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা রমনীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জমীনে ধ্বসিয়ে দেবেন।” —(সুনানে বায়হাকী, খ. ১০ পৃ. ২২১)
হযরত সাহল ইবনে সা’দ আস সায়েদী রা. থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
سيكونُ في آخرِ الزَّمانِ خسفٌ وقذفٌ ومسخٌ قيل ومتى ذلك يا رسولَ اللهِ قال إذا ظهَرَتِ المعازفُ والقَيْناتُ واستُحِلَّتِ الخمرُ
“অদূর ভবিষ্যতে শেষ যামানায় মানুষের চেহারা বিকৃতি,ভূমিধ্বস হবে।
সাহাবী বললেন—হে রাসুল, সেটা কখন হবে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যখন বাদ্যযন্ত্র, নর্তকী বেশি বেড়ে যাবে এবং মদকে হালাল মনে করা হবে।” —(মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদিস নং : ১২৫৮৯
হযরত আবু উমামা বাহিলী রা. থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إنَّ اللهَ بَعَثَني رَحمةً للعالمينَ وهُدًى للعالمينَ وأمَرَني ربِّي بمَحقِ المَعازفِ والمَزاميرِ والأَوْثانِ والصُّلُبِ وأمْرِ الجاهليَّةِ
“মহান আল্লাহ আমাকে বিশ্ববাসির জন্য রহমত এবং পথপ্রদর্শক হিসেবে পাঠিয়েছেন এবং আমাকে আদেশ করেছেন যেন আমি বাদ্যযন্ত্র এবং মূর্তি,ক্রুশ এবং জাহিলী যুগের কর্ম ধংস করে দিই।” —(নাইলুল আওতার, খ. ৮ পৃ. ২৬২
বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত নাফি রহি. বলেন,
سَمِعَ ابْنُ عُمَرَ، مِزْمَارًا قَالَ: فَوَضَعَ إِصْبَعَيْهِ عَلَى أُذُنَيْهِ، وَنَأَى عَنِ الطَّرِيقِ، وَقَالَ لِي: يَا نَافِعُ هَلْ تَسْمَعُ شَيْئًا؟ قَالَ: فَقُلْتُ: لَا، قَالَ: فَرَفَعَ إِصْبَعَيْهِ مِنْ أُذُنَيْهِ، وَقَالَ: كُنْتُ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَمِعَ مِثْلَ هَذَا فَصَنَعَ مِثْلَ هَذَا
“একদা হযরত ইবনু উমার রা. বাদ্যযন্ত্রের শব্দ শুনতে পেয়ে উভয় কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে রাস্তা থেকে সরে গিয়ে আমাকে বললেন, হে নাফি‘! তুমি কি কিছু শুনতে পাচ্ছো? বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম, না। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তিনি কান থেকে হাত তুলে বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ছিলাম। তখন তিনি এ ধরণের শব্দ শুনে এরূপ করেছিলেন।” —(মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং : ৪৫৩৫)
প্রিয় পাঠক, যদি আমরা ধারাবাহিকভাবে প্রমাণ উপস্থাপন করি, তাহলে বাদ্যযন্ত্র হারাম হওয়ার বিষয়টি কুরআন ও হাদিস থেকে প্রাচুর্য্যে প্রমাণ করা সম্ভব। অতএব, স্পষ্টভাবে বলা যায়—মারেফতি গানের আসর নামে যে কার্যক্রম বাউলরা চালায়, তা ইসলামে সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম। পাশাপাশি এই হারামকে হালাল মনে করা কুফরি।
দাউদ আ. গান-বাজনা করতেন?
লালন ধর্মের গুরু জনাব ফরহাদ মাজহার তাদের মনগড়া ইসলামবিরোধী মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একজন গুরুত্বপূর্ণ নবীর শানে চরম মিথ্যাচার করেছেন। হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে কখনো গান করেছেন—এমন কোনো বিষয় কুরআন, বিশুদ্ধ হাদিস বা গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক গ্রন্থে প্রমাণিত নয়। বরং এটি একটি মিথ্যা অপবাদ, যা লালন ধর্মের অনুসারী ও বাউলরা প্রচলিত করেছে। এর কোনো বৈধ ভিত্তি নেই। মূলত তারা সহিহ বুখারীর একটি হাদিসকে অপব্যাখ্যা করে এ ধরনের বক্তব্য আবিষ্কার করেছে। চলুন, আগে হাদিসটি দেখে নেওয়া যাক।
عَنْ أَبِيْ مُوْسَى عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ لَهُ يَا أَبَا مُوْسَى لَقَدْ أُوْتِيْتَ مِزْمَارًا مِنْ مَزَامِيْرِ آلِ دَاوُدَ
“হযরত আবু মুসা রা. হতে বর্ণিত, নাবীজি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে বললেন—হে আবু মুসা, তোমাকে দাঊদ আ.-এর সুমধুর কন্ঠ দান করা হয়েছে।” —(সহীহ বুখারী, হাদীস নং : ৫০৪৮)
মূলত এই হাদিসে 'মিযমার' শব্দটি দিয়ে তারা বুঝাতে চায় 'মিযমার' মানে বাঁশি। আর সেই বাঁশির কথা রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর সাহাবীকে বলেছেন। তাহলে বুঝা গেলো, দাউদ আ.-এর বাঁশি ছিলো, যা তিনি বাজাতেন। তারা আরও বুঝাতে চায়, নবী দাউদ আ. যেহেতু বাঁশি বাজাতেন, সেহেতু আলেমরা বাদ্যযন্ত্রকে হারাম বলতে পারেন না।
নাউযুবিল্লাহ! একজন বুদ্ধিজিবি যখন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধি হয়, তখন তাকে কার বুঝানোর সাধ্যে আছে? এখানে যদি ধরেও নেওয়া হয়— দাউদ আ. এর বাঁশি ছিলো, তাহলে সে বাঁশি আবু মুসা রা. কীভাবে পেলেন? সে বাঁশি কী কয়েকশত বছর পরে পাওয়া সম্ভব? এটা কী বাস্তবতা বিবর্জিত কথা নয়? মূলত এখানে ‘সিযমার’ শব্দের অর্থ বাঁশি নয়; বরং লক্ষ্য হলো ‘সুন্দর কণ্ঠ’। যেহেতু বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে কণ্ঠের গানকে শ্রুতিমধুর ও আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করা হয়, এ কারণে উক্ত শব্দটি হাদিসে সুন্দর কণ্ঠকে তাশবীহ বা সাদৃশ্যায়ন করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু সাদৃশ্য দেওয়া মানেই কি উক্ত বস্তু হুবহু প্রমাণিত হয়ে গেছে? এটা অজ্ঞতা ছাড়া আর কী বলা যায়? উদাহরণস্বরূপ, হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-কে সাইফুল্লাহ, অর্থাৎ আল্লাহর তরবারী বলা হয়। তবে তার মানে কি তিনি নিজেই তরবারী হয়ে গেছেন? এমনটা মনে করা কী বোকামি নয়?
হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের কণ্ঠস্বর অত্যন্ত সুন্দর ছিল। তিনি চমৎকার সুরে তাঁর উপর নাজিলকৃত যবুর কিতাব পাঠ করতেন। তেমনি, আবু মুসা রা. সুন্দর কণ্ঠে কুরআনের তিলাওয়াত করতেন। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—“তোমার কণ্ঠ তো দাউদ আ.-এর কণ্ঠের মতো চমৎকার।”
এ হাদীসে 'মিযমার' শব্দের অর্থ যে 'সুন্দর কণ্ঠ' এটা আমার দাবি নয়, বরং মুহাদ্দিসিনে কেরামের ব্যাখ্যা। দেখুন আল্লামা ইরাকী রহি. পরিস্কার করে ব্যাখ্যা করেছেন:
وَالْمُرَادُ بِالْمِزْمَارِ هُنَا الصَّوْتُ الْحَسَنُ وَأَصْلُهُ الْآلَةُ الَّتِي يُزَمَّرُ بِهَا شَبَّهَ حُسْنَ صَوْتِهِ وَحَلَاوَةَ نَغْمَتِهِ بِصَوْتِ الْمِزْمَار
“মিযমার’ দ্বারা এখানে উদ্দেশ্য হলো: সুন্দর কণ্ঠ। যদিও তার আসল অর্থ হলো বাঁশি যা দিয়ে বাজানো হয়। সুমধুর কণ্ঠ এবং সুরের মাধুর্যতাকে তাশবীহ তথা সাদৃশ্যায়ন করা হয়েছে বাঁশির আওয়াজের সাথে।” —(তরহুত তাছরীব, খ. ৩ পৃ. ১০৫)
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহি. ব্যাখ্যায় বলেছেন,
وَالْمُرَادُ بِالْمِزْمَارِ الصَّوْتُ الْحَسَنُ وَأَصْلُهُ الْآلَةُ أُطْلِقَ اسْمُهُ عَلَى الصَّوْتِ لِلْمُشَابَهَةِ
“মিযমার’ দ্বারা এখানে উদ্দেশ্য হলো, সুন্দর কণ্ঠ। যদিও তার আসল অর্থ হলো যন্ত্র বা বাঁশি। সুমধুর কণ্ঠ এবং সুরের মাধুর্যতাকে তাশবীহ তথা সাদৃশ্যায়ন করা হয়েছে বাঁশির আওয়াজের সাথে।” —(ফাতহুল বারী, খ. ১১ পৃ ২৯৭)
ইমাম নববী রহি. এ হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন,
قوله فِي أَبِي مُوسَى الْأَشْعَرِيِّ أُعْطِيَ مِزْمَارًا مِنْ مَزَامِيرِ آلِ دَاوُدَ قَالَ الْعُلَمَاءُ الْمُرَادُ بِالْمِزْمَارِ هُنَا الصَّوْتُ الْحَسَنُ وَأَصْلُ الزَّمْرِ الْغِنَاءُ وَآلُ دَاوُدَ هُوَ دَاوُدُ نَفْسُهُ وَآلُ فُلَانٍ قَدْ يُطْلَقُ عَلَى نَفْسِهِ وَكَانَ دَاوُدُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَسَنَ الصَّوْتِ جِدًّا قَوْلُهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَبِي مُوسَى لَوْ رَأَيْتَنِي وَأَنَا أَسْمَعُ قِرَاءَتَكَ الْبَارِحَةَ لَقَدْ أُوتِيتَ مِزْمَارًا مِنْ مَزَامِيرِ آلِ دَاوُدَ
“রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. ব্যাপারে যে, “তাঁকে দাউদ আলাইহিস সালামের মতো সমধুর কণ্ঠস্বর দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে উলামায়ে কেরামগণ বলেন যে, এখানে ‘মিযমার’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ‘সুন্দর কণ্ঠ’। যদিও ‘যমর’ এর আসল অর্থ গান। আর ‘وَآلُ دَاوُدَ দ্বারা উদ্দেশ্য খোদ দাউদ আলাইহিস সালাম। ‘وَآلُ فُلَانٍ’ শব্দ দ্বারা কখনো নিজেকেই বুঝায়। আর হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম ছিলেন সুমধুর কণ্ঠের অধিকারী। হযরত আবু মুসা আশআরী রা. কে বলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম-এর কথা—গতরাতে আমি যখন তোমার কুরআন পাঠ শুনছিলাম, তখন যদি তুমি আমাকে দেখতে! তোমাকে দাউদ আলাইহিস সালাম-এর সুমধুর কণ্ঠস্বর দেয়া হয়েছে।” —(শরহে মুসলিম, খ. ৬ পৃ. ৮০)
বোঝা গেলো—আবু মুসা আশআরী রা.-এর সুমধুর কণ্ঠে কুরআনের তিলাওয়াতকে হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম-এর কণ্ঠের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। সুতরাং এটি স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, এখানে গান বা বাদ্যযন্ত্রের উদ্দেশ্য নয়, বরং লক্ষ্য হলো সুন্দর কণ্ঠ। অতএব, ‘হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম গান-বাজনা করতেন এবং তিনি গান-বাজনা করেই নবী হয়েছেন’—এমন দাবি করা চরম মূর্খতা এবং একজন গুরুত্বপূর্ণ নবীর উপর মিথ্যা অপবাদ, যা কুফরী।