দ্বীনের মূল লক্ষ্য: মাহবুবিয়্যাত অর্জন
দ্বীনের মূল লক্ষ্য: মাহবুবিয়্যাত অর্জন
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত]
اَلحَمْدُ للهِ نَسْتَعِيْنُهُ وَنَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَن يَّهْدِهِ اللهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُّضْلِلْهُ فَلَا هَادِيَ لَهُ. وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إلهَ إلَّا الله وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ
فَأعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ، بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيْمِ، قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللهَ فَاطَّبِعُوْانِيْ يُحْبِبْكُمُ اللهُ
আল্লাহ তাআলা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন পাঠালেন পুরো দুনিয়ার হেদায়েতের জন্য। যে অঞ্চলে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরীফ রাখলেন, আরব দেশে, তার চারপাশে বড় বড় উন্নত ও সভ্যতাগুলো ছিল। উত্তরে রোম, দক্ষিণে ইয়ামান, পূর্বে পারস্য, পশ্চিমে ইউনান—সবগুলোই উন্নত জাতি, উন্নত সভ্যতা। যাদের কাছেই দুনিয়ার সব ধনদৌলত, ঐশ্বর্য। এই সভ্য জাতিগুলোর কাছে দুনিয়ার ধনদৌলত ছিল, ঐশ্বর্য ছিল, সম্পদ ছিল আর জাগতিক জ্ঞানও ছিল। আল্লাহ তাআলা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমন এক কওমের নিকট পাঠিয়েছেন, তাদের কাছে না জিনিসের সম্পদ ছিল, না তাদের কাছে পার্থিব কোনো জ্ঞানের সম্পদ ছিল। আরব জাতি আর মুসলমান উম্মত, তাদের সম্পর্কে রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বলেছেন:
إنّا أمَّةٌ أُمِّيَّةٌ لَا نَكْتُبُ وَلَا نَحْسبُ.
'আমরা নিরক্ষর উম্মত, আমরা লিখিও না, গণনাও করি না।'
পড়ালেখা জানতেন না। আর তাদের কাছেই এই যে উন্নত জাতিগুলোর কথা বললাম যথা রোম, পারস্য, ইউনান, ইয়ামান—এদের কাছে ছিল ধন, দৌলত, সম্পদ, ঐশ্বর্য আর দুনিয়ার সব পাণ্ডিত্য। দর্শন, গণিতশাস্ত্র—সবকিছুই তাদের কাছে ছিল। আর এ সবকিছুই তো উন্নত জাতির মানদণ্ড। তারা উন্নত জাতিগুলোর মধ্যে ছিল। আল্লাহ তাআলা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাঠিয়েছেন এ সবগুলোকে মিটিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে নতুন দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করতে, যে দ্বীনকে নিয়ে একটি উম্মত গড়ে উঠবে। এরকম নয় যে, আশেপাশে যে উন্নত জাতি আছে, যে উন্নত সভ্যতা আছে, সেটা তো বহাল থাকবে, সাথে সাথে এটাকে আরেকটু ভালো করা হবে অথবা উন্নত করা হবে। না, ওইটা বহাল রেখে বা উন্নত করার জন্য নয়, বরং ওইটাকে মিটিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে নতুন বুনিয়াদের উপর দ্বীন গড়বে। ওখানে কিছুই বাকি রাখা হবে না। ইরশাদ হয়েছে:
هُوَ الَّذِيْ أَرْسَلَ رَسُوْلَهُ بِالْهُدَى وَدِيْنِ الْحَقِّ، لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّيْنِ كُلِّهِ.
বাকি সবকিছুর উপর এটাকে গালিব করে দেওয়া হবে। পূর্বের কিছুই রাখবে না।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ইহুদিদের কাছ থেকে কিছু কথা লিখে এনেছিলেন। যে কথাগুলো তাঁর দৃষ্টিতে খুব সুন্দর ও ভালো কথা ছিল। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দেখলেন তখন খুব অসন্তুষ্ট হলেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন নতুন করে যেন আবার মুসলমান হলেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বললেন, 'যদি মূসা আলাইহিস সালামও জীবিত হতেন, তবে মুহাম্মাদের অনুসরণ ছাড়া কোনো পথ থাকত না, কোনো গত্যান্তর থাকত না।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশপাশ থেকে কিছুই নেননি; নিতে উৎসাহও দেননি।
পারস্য সাম্রাজ্যের পতন হল। গনিমতের মালের মধ্যে বড় দামি একটি কালীন (কার্পেট) ছিল, যা স্বর্ণের সুতোয় হীরা-জহর দিয়ে নকশা করা ছিল। বহু মূল্যবান ছিল, যার মূল্যমান কল্পনাও করা মুশকিল। গনিমতের মালের সাথে মদিনায় আনা হল। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন পরামর্শ করছিলেন, তখন এই কালীন সম্পর্কে বিশেষভাবে আলোচনা করলেন। বড় বিশেষ ধরনের সম্পদ হওয়ার কারণে জানতে চাইলেন যে, কী করা যায়? অনেক সাহাবা পরামর্শ দিলেন যে, এটা থাকুক, পরবর্তী কালে যারা আসবে, তারা দেখবে যে, আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে কী মহা বিজয় দান করেছিলেন। আর কী দামি দামি গনিমত হস্তগত হয়েছিল।
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু রায় দিলেন, ইসলাম এসেছে তার আগের সবকিছু নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য। অতএব, এটাকেও নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হোক। এর চিহ্নটুকুও বাকি রাখার দরকার নেই। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এ রায়ই গ্রহণ করলেন। ওই কালীনটাকে টুকরো টুকরো করে গনিমতের মালের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। ওইটার ছোট ছোট টুকরাও মূল্যবান সম্পদ ছিল। কারণ সোনার সুতো দিয়ে বানানো; হীরা-জহর দিয়ে নকশা করা। তো ওইটার ছোট ছোট টুকরাও মূল্যবান সম্পদ ছিল; তবুও নিশ্চিহ্ন করে দিলেন।
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু যেমনটি বলেছিলেন যে, ইসলাম নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য এসেছে, বাকি সভ্যতাগুলোকে বহাল রেখে আরেকটু উন্নত করার জন্য নয়; বরং নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে নতুনভাবে গড়ার জন্য এসেছে। তো ওই জাতিগুলো ছিল, সভ্যতা ছিল, উন্নত জীবন ছিল—এগুলোর মধ্যে আর আল্লাহ তাআলা যে দ্বীন দিয়েছেন, এ উভয়ের মাঝে প্রধান পার্থক্যটি কোথায় যে, একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে! রাখাই যাবে না? উত্তর হল, বড় মৌলিক ও বুনিয়াদি পার্থক্য রয়েছে। সভ্যতাগুলো স্বনির্ভর জীবন গড়ে তোলে তার দক্ষতা দিয়ে আর আল্লাহ তাআলা দ্বীন পাঠিয়েছেন মানুষকে সম্পর্ক গড়া শেখানোর জন্য যে, যেন সে মাহবুব হয়।
এক রাজবাড়িতে প্রহরী নিযুক্ত আছে, প্রহরীর কাজ পাহারা দেওয়া; বাবুর্চি আছে, তার কাজ রান্না করা; ধোপা আছে, তার কাজ কাপড় ধোয়া করা। এরকম বিভিন্ন মানুষ আছে, আর তাদের কাজও নির্দিষ্ট। তো এই রাজবাড়িতে রানি আছে, রানির কাজ কী? প্রহরীর কাজ পাহারা দেওয়া, পাহারা দেওয়া রানির তো কাজ নয়। বাবুর্চির কাজ রান্না করা, রান্না করা রানির কাজ তো নয়। রানির কাজ তাহলে কী? —রানির কোনো কাজই নেই। যদিও এই কাজটিকে রানির কাজ বলা যাবে না, কিন্তু রানির কাছ থেকে একটি জিনিসই প্রত্যাশা করা হয় যে, সে সুন্দর হবে; সে সবার প্রিয় হবে। অর্থাৎ, রানির কোনো কাজ নেই, রানির কাজ সুন্দর হওয়া; জাহেরিভাবে এবং বাতেনিভাবে। রানিকে দেখলেই যেন রাজার ভালো লাগে, মনে শান্তি পাওয়া যায়, তৃপ্তি পাওয়া যায়। রানি যদি স্বভাবে সুন্দর হতে পারে তাহলে তার অজান্তে ও অনিচ্ছায় গোটা রাজ্যের উপর প্রভাব থাকবে ও বড় উপকার হবে। উপকারিতা কিভাবে হবে? রাজা কারো উপর রাগ করেছে। এখন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেবে। এমন সময় রানিকে দেখল আর রানিকে দেখেই তার মন ভালো হয়ে গেল, মন ভরে গেল বা রানির কথা তার মনে পড়ে গেল, আর মনে পড়াতে তার মনে আনন্দ সৃষ্টি হল, তৃপ্তি অনুভূত হল। অর্থাৎ, রানি এমন একটি চরিত্রের যে, রাজা যখনই তার কথা ভাবে, তাকে দেখে, রাজার মনে আনন্দ আসে। আর মানুষ যখনই মনের ভেতর আনন্দ অনুভব করে, তখন মনে মনে সে নরম হয়ে যায়, তার রাগ নিভে যায়। তার ক্ষমা ও বদান্যতা বেড়ে যায়। অতএব, রাজা যাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, রানির কথা একবার ভাবার কারণে বা কোনো কারণে রানির কথা তার মনে পড়ে যাওয়াতে বা রানির কথা মনে আসতেই তার মনে একটি তৃপ্তি এসে গেল। আর এই তৃপ্তির কারণেই তার রাগ দমে গেল আর সে ওই ব্যক্তিকে সে মাফ করে দিল। অথচ রানি জানেই না যে, এরকম একজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অতঃপর তাকে মাফও করে দিয়েছে। অর্থাৎ, কিছুই জানে না। অর্থাৎ তার উপস্থিতি, তার সৌন্দর্য গোটা রাজ্যকে শান্তিতে রেখেছে; নিরাপদে রেখেছে; দয়ার মধ্যে রেখেছে। রানির কোনো কাজই নেই, বরং রানির কাজই হলো যে, তার অস্তিত্বই এমন হবে, যা শান্তি দেবে। রান্না করে নয়, কাপড় ধুয়ে নয়, অন্য কোনো কাজ করে নয়, বরং তার জাহেরি-বাতেনি সৌন্দর্য দিয়ে। তার চেহারা দেখলে সুন্দর লাগে, তার কথা শুনলে সুন্দর লাগে, তার আচরণ ভালো লাগে, তার কথা ভাবলে মনে আনন্দ লাগে।
দুই ধরনের জীবন: ১. দক্ষতা নির্ভর অর্থাৎ কাজের মধ্যে কে কতটা দক্ষ। আর অপর জীবন হল, ২. গুণ নির্ভর। মানুষ লাভবান হবে তার কাজের দক্ষতানুযায়ী। বাবুর্চি... তার সফলতা ও পূর্ণতা হল, তার কাজের দক্ষতার উপরে যে, সে বড় ভালো রান্না করতে পারে। সে বাবুর্চি সুন্দর-কী অসুন্দর, এটি কোনো বিবেচনার বিষয় নয়। বিবেচনার বিষয় হচ্ছে, সে তার কাজে দক্ষ কিনা। ধোপা যে কাপড় ধোয়ে করে, সে সুন্দর নাকি অসুন্দর, তার কণ্ঠস্বর ভালো কিনা, তার কথা শুনতে ভালো লাগে কিনা—কোনোটিই বিবেচ্য নয়; বরং একটিই লক্ষ্যণীয় যে, তার কাজে সে দক্ষ কিনা। এর মোকাবেলায় রানির তো কোনো কাজই নেই, দক্ষতার কোনো প্রশ্নই আসে না। তার নিকট একমাত্র দাবিই হল যে, সে যেন গুণী হয়। যে গুণের কারণে তার চর্চা হয়, তার কথা ভালো লাগে।
প্রথমত রাজা রানির গুণের কারণে মনে শান্তি অনুভব করবে। রাজা যদি নিজের মনে শান্তি অনুভব করে তবে এর প্রভাবে প্রজাদের উপর দয়া করবে, নিষ্ঠুর হবে না, জালিম হবে না। ধীরে ধীরে রানির এই উপকারিতা ও প্রভাব গোটা রাজ্যে ছড়িয়ে যাবে। অথচ রানি এটা জানবেও না। ঠিক এভাবে একটি রাজ্যে অনেক লোক থাকে। কৃষকরা কৃষিকাজ করে, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করে, যোদ্ধারা যুদ্ধ করে।
এমনিভাবে অনেক পরিবার, অনেক গোষ্ঠী বিভিন্ন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। দেশে রাজা আছে, রাজা কী করে? রাজা কিছুই করে না। তার কোনো কাজ নেই। না কৃষি কাজ, না ব্যবসা, না যুদ্ধ। রাজার কোনো কাজ নেই। রাজার কাজ ওই একটাই, সুন্দর হওয়া। রাজার কথা ভাবতেই প্রজার জন্য ভালো লাগে, যেন মনে শান্তি আসে। তো রাজার কাজ গোটা রাজ্যের মধ্যে শান্তি রক্ষা করা। শান্তি রক্ষা কী দিয়ে করবে? তার নিজ গুণ দিয়ে করবে। সে জন্য ইতিহাসে যখন কোনো রাজা সম্বন্ধে আলোচনা হয় যে, রাজা বড় গুণী রাজা ছিলেন, তখন সেখানে কোনো দক্ষতার আলোচনা হয় না; বরং রাজার জন্য তার স্বার্থকতা হলো, তিনি খুব জনপ্রিয় রাজা কিনা। ইতিহাস এভাবেই বলে যে, 'তিনি খুব জনপ্রিয় রাজা ছিলেন; প্রজাদের কাছে অনেক মাহবুব ছিলেন।' তো রাজার কাজ হলো সে একই যে, রানির যেমন কোনো কাজ নেই, বরং একটাই কাজ যে, রাজার প্রিয় হওয়া, ঠিক তেমনিভাবে গোটা রাজ্যে রাজারও কোনো কাজ নেই—প্রজারা বিভিন্ন দক্ষতামূলক কাজ তো করেই—রাজার কাজ বা গুণ হলো, প্রজার নিকট মাহবুব হওয়া যে, রাজা গোটা রাজ্যে মাহবুব ছিলেন।
মাহবুব কী দিয়ে হয়? মাহবুব হয় সৌন্দর্য দিয়ে। সৌন্দর্য শব্দটিকে একটু ব্যাপকভাবে ব্যবহার করুন: তার চেহারার সৌন্দর্য, তার মনের সৌন্দর্য, তার ব্যবহারের সৌন্দর্য। সবকিছুর মধ্যে যেন এমন সৌন্দর্য থাকে যে, ওটা ছড়িয়ে পড়ে আর ভালো লাগে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে দীন দিয়েছেন যেন সে সুন্দর হয়। ওই দক্ষতা দিয়ে কোনো কাজ হবে না। মানুষের কামাল ওই দক্ষতার মধ্যে নয়; মানুষের কামাল সৌন্দর্যের মধ্যে, যেরকম রাজার কামাল বা রানির কামাল কোনো কাজের দক্ষতার মধ্যে নয়, বরং সৌন্দর্যের মধ্যে। সে যেন মাহবুব হয়। দক্ষতা... এটা মানুষের কামালের জিনিস নয়, এটি জীবজগতের কামালের জিনিস। জীবজগতে প্রতেকটি জীব তার স্বীয় দক্ষতার উপর টিকে থাকে। বাঘ শিকারে খুব দক্ষ। যদি বাঘ শিকারে দক্ষ না হয় তাহলে বাঘ বাঁচতেই পারবে না। কারণ বাঘ নিজ জীবন ওই দক্ষতার উপর নির্ভর। তার নিজ দক্ষতা দিয়ে শিকার করবে আর খাবে। রাজার জীবন তা নয়। রাজার নিজের শিকার করার দরকার নেই, চাষাবাদ করার দরকার নেই, বীজ বোপন করার দরকার নেই, কোনো কাজই করার দরকার নেই। রাজা যদি প্রিয় হয়, তাহলে প্রজারা তার খাবারের বন্দোবস্ত করবে। এর মোকাবেলায় রাজা যদি বড় দক্ষও হয় শিকারে বা অন্য কোনো কাজে, কিন্তু যদি সে প্রিয় না হয় স্বীয় গুণের কারণে, তাহলে ওই দেশের প্রজারা বিদ্রোহ করবে এবং তাকে হত্যা করবে। অতএব, রাজার অস্তিত্ব দক্ষতা নির্ভর নয় বা সে দক্ষতা দিয়ে টিকে থাকে না, বরং সে তো টিকে থাকবে তার সৌন্দর্য দিয়ে মাহবুব হয়ে।
ওই যে আরবের আশপাশে সভ্য জাতিগুলো ছিল, সভ্য জাতির বৈশিষ্ট্য বা সভ্যতার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বনির্ভর জীবন গড়তে চাওয়া স্বীয় দক্ষতা দিয়ে। সব জামানায়... বর্তমানেও তাই। এটি ব্যক্তির কামাল, সমাজের কামাল, জাতির কামাল যে, দক্ষতা দিয়ে স্বনির্ভর জীবন গড়া। দক্ষতাও জীবজন্তুর বৈশিষ্ট্য, স্বনির্ভর জীবনও জীবজন্তুর বৈশিষ্ট্য। বাঘ সে নিজ দক্ষতার উপর টিকে আছে। সে নিজ দক্ষতা দিয়ে শিকার করে আর খায়; অতএব সে স্বনির্ভর। অন্য কেউ তাকে শিকার করে খাওয়ায় না। যেদিন তার দক্ষতা থাকবে না, শিকার করতে পারবে না, তখন সে উপবাসে-অনাহারে মারা যাবে। যদিও তাকে বনের রাজা বলা হয়, কিন্তু সব বনের রাজা মারা যায় উপবাসে। এজন্য যখন বাঘ শিকার করতে পারবে না, দুর্বল হয়ে যাবে, তখন সে শিকার করতে না পারার কারণে উপবাসে-অনাহারে মারা যাবে আর তাকে কেউ খাওয়াবেও না। কারণ তার কোনো সম্পর্কই ছিল না। তারই জায়গায় তারই ছেলে রাজা হয়ে যাবে। যদিও সে রাজা তার ছেলে, কিন্তু সে ছেলে শিকার করে পিতা বাঘকে একটি অংশও দেবে না। কারণ জীবজন্তুর বৈশিষ্ট্যই এমন নয় যে, সম্পর্ক দিয়ে টিকে থাকবে। তাদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দক্ষতা দিয়ে। এজন্য আল্লাহ তাআলা জীবজগতে নানাধরনের দক্ষতা রেখেছেন, যেগুলো মানুষ দেখে অবাক হয়ে যায়, যা তাকে সৃষ্টিগতভাবে দেওয়া হয়েছে।
বাবুই পাখি এমন বাসা বানাতে পারে, যা মানুষ কখনই পারবে না। তো দক্ষতা জীবজগতের জিনিস। প্রতেক জীব তার দক্ষতা দিয়ে টিকে আছে। আর সভ্য জাতিরা জীবনকে উন্নত করতে চায় দক্ষতা দিয়ে। তারা দক্ষতা দিয়ে যতবেশি জীবনকে উন্নত করবে, যতবেশি স্বনির্ভর হবে, ততবেশি সম্পর্ক হারাতে থাকবে, বিচ্ছিন্ন হতে থাকবে। মাহবুবিয়াত ও দক্ষতা প্রায় পরস্পরবিরোধী জিনিস। আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন দুনিয়ার মানুষকে দাওয়াত দেওয়ার জন্য, সে যেন সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলে। মানুষের জীবন দক্ষতা নির্ভর নয়, স্বনির্ভর নয়, মানুষের জীবন সম্পর্ক নির্ভর। এটিই মানবীয় বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবন এভাবেই দিয়েছেন।
একটি মানবশিশু প্রায় দশ বছর বয়স পর্যন্ত নিজে চেষ্টা করেও পারবে না। আর জন্মের অনেকদিন পর্যন্ত তো সে নিজে কিছুই করতে পারে না। তার মা এসে তাকে খাওয়ায়। এমনকি প্রায় ৮-১০ বছর বয়স হয়ে যায়, অথচ নিজে ভালো করে খেতে পারে না, গোসল করতে পারে না, কিছুই ঠিকমতো করতে পারে না; বরং অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন হয়। আবার যখন বয়স হয়ে যায়, বৃদ্ধ হয়ে যায়, তখনও আবার বহু বছর অন্যের উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। অথচ জীবজগতে এটা নেই। যে বাড়িতে একটি ছেলের জন্ম হলো, ঠিক ওই মুহূর্তে ওই বাড়িতেই একটি গরু বাচ্চা দিলো। গরুর বাচ্চা কিছুক্ষণের মধ্যে দাঁড়িয়ে যায়, আর নিজে নিজেই খুঁজে বের করে তার খাবার দুধ কোথায়; মা এসে বাচ্চাকে দুধ দেয় না। সে গিয়ে মায়ের দুধ খুঁজে খুঁজে খায়। আর কিছুক্ষণের মধ্যে দৌড়াদৌড়িও শুরু করে দেয়। আর যতদিনে সে গরুর বাছুরের সাথে জন্ম নেওয়া মানবশিশুটি বাচ্চা হিসেবে থাকে, ততদিনে সে গরুর বাচ্চাটি বড় হয়ে যাওয়ার পর গরুর আরেকটি বাচ্চা প্রসব করে ফেলে। গরুর বাচ্চা অতি দ্রুত বড় হয় আর প্রথম দিন থেকে সে নিজের প্রয়োজন নিজে পূরণ করতে পারে। নিজেই গিয়ে দুধ খুঁজে বের করতে পারে। আর আরেকটু বড় হয়ে যাওয়ার পরে বাইরে গিয়ে সে ঘাসও বের করে খেতে পারে। খাওয়ার মধ্যেও গরুর বাচ্চা আর ছাগলের বাচ্চা তার খাদ্য ও খাদ্যের বাছবিচার সে নিজেই করতে পারে। ওই পশুরা বিষযুক্ত পাতা খাবে না; তামাক খাবে না; বরং তার প্রকৃত খাদ্য খুঁজে বের করে খাবে। আর মানবশিশু তো এমনই যে, হামাগুড়ি দেওয়া অবস্থায় হাতের কাছে যা পাবে তাই খাবে। মোম, পাথর, কাগজ... যা পায় তাই খায়। স্যান্ডেল একটা কোথাও খুঁজে পেল আর অমনি সেটি মুখে তুলে চোষা আরম্ভ করে দেয়। ছাগলের বদনাম যে, ছাগলে কী না খায়, অথচ ছাগল তার অখাদ্য খায় না; কিন্তু মানুষই খায়। এমনকি মানুষ বড় হয়ে যাওয়ার পরেও অখাদ্য খেয়ে থাকে। কারণ, মানুষের জীবনই এরকম যে, অন্যের সাহায্য তার প্রয়োজন। ছোট বাচ্চা কী খাবে না-খাবে, অন্যরা তা দেখিয়ে দেবে। সে যদি মুখের ভেতর ঢুকিয়েও দেয়, অন্যরা তা মুখের ভেতর থেকে বের করতে হবে। বড় হয়ে যাওয়াও তার প্রয়োজন।
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন, ওই ইলম দিয়ে, ওই হেদায়াত আর পথ দিয়ে, যে পথে সে মাহবুবিয়াত অর্জন করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللهَ فَاتَّبِعُوْنِي يُحْبِبْكُمُ اللهُ
তো মানুষের কামাল মাহবুব হওয়ার মধ্যে, মানুষের কামাল দক্ষ হওয়ার মধ্যে নয়।
সব সভ্যতাগুলো দক্ষতানির্ভর সমাজের দিকে গিয়ে মারাত্মক ভুল করছে। মনে করে, দক্ষতার মধ্যে তার কামাল রয়েছে। আর এটি ঠিক যে, সে সামগ্রিক ধাঁধার মধ্যে রয়েছে যে, মনে হয় আমি অনেক বড় দক্ষতা অর্জন করেছি; কিন্তু সম্পর্ক না থাকার কারণে এই দুনিয়াতেই সে লাঞ্ছিত জীবন ভোগ করতে থাকে। আমাদের দেশেও এর আঁচ কিছু কিছু আসা শুরু করেছে; কিন্তু অন্যান্য দেশ এতে গভীরভাবে ডুবে যাচ্ছে।
বৃদ্ধ নিবাস... ঢাকার ধানমন্ডিতে এক রিটায়ার্ড অফিসার বৃদ্ধ নিবাস বানানোর জন্য খুব উদ্যোগী ছিলেন। উনি ছিলেন রিটায়ার্ড ডাক্তার। এক সময় আমি যে মসজিদে নামাজ পড়তাম, তিনিও সে মসজিদে নামাজ পড়তেন। ডাক্তারি জীবনে তিনি অনেক এমন অনেক দেখেছেন যে, মানুষ যখন বৃদ্ধ হয়ে যায়, তখন তাদের যত্নের বড়ই অভাব হয়। যদি একটি বৃদ্ধনিবাস থাকে, তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে বা কোনো সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যত্নের বন্দোবস্ত থাকবে আর বৃদ্ধরা সেখানে গিয়ে আশ্রয় নেবে। ইউরোপ-আমেরিকাতে যেমনটা হয়ে থাকে, আমাদের দেশেও যেন সেটি হয়—উনি এর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সম্ভবত তার বানানো বৃদ্ধনিবাসটি প্রতিষ্ঠিতও হয়েছিল।
আমি সুযোগ পেলে উনাকে বাধা দিতাম যে, এই বৃদ্ধনিবাস... এটি মুসলমান সমাজের জিনিস নয়, এটি তো অন্য সমাজের জিনিস। মুসলমান সমাজে তো বৃদ্ধনিবাস নামে কিছুই থাকবে না, বরং বৃদ্ধরা তার আপনজনদের নিকটই থাকবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। মুসলমানদের এই সমাজের ভেতরেই মুসলমান আর অমুসলমানদের মধ্যে পার্থক্য আছে। মুসলমান শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার ঘরে থাকবে, তার বিছানায় থাকবে, যত্নে থাকবে, তার মুখে পানি দেওয়া হবে, যত্ন দেওয়া হবে সাধ্যানুযায়ী। আর অন্য সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে মৃত্যু বেশি ঘনিয়ে আসলে ঘর থেকে বের করে এনে তুলশী তলায় রাখবে যে, ওখানে গিয়ে মরো। বর্তমান আধুনিক সভ্যতায় তুলশীনিবাসের সভ্যরূপ হলো এই বৃদ্ধনিবাস। বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে তুলশী নিবাসে রেখে বলবে, এখন তুমি এখানে মরো। সারা বছরেও কেউ একটি বার তার খোঁজটি পর্যন্ত করবে না। এ এক বড় অবহেলার জীবন। যে এই বৃদ্ধ নিবাসে এত চূড়ান্ত পর্যায়ের অবহেলার মধ্যে আছে, একসময় যখন তার দক্ষতা ছিল, তার বড় কদর ছিল। হয়তো বড় নাম করা সার্জন বা ইঞ্জিনিয়ার ছিল। অর্থাৎ নামকরা যেকোনো কিছু ছিল, আর খুব দক্ষ ছিল; কিন্তু এখন তার দক্ষতা নেই আর জীবন সম্পর্ক নির্ভরও নয়। দক্ষতা নেই, এখন সে অবহেলিত। ওই বাঘের মতোই, যখন তার দক্ষতা ছিল গোটা বনে তার দাপট ছিল; আর যখন দক্ষতা নেই, এখন সে অবহেলিত আর উপবাসে মরে। তো মানুষ যদি সম্পর্ক সুন্দর না করে আর দক্ষতানির্ভর জীবনকে গড়ে তোলে, তাহলে দক্ষতা একসময় থাকবে না। ওই যে বললাম, যতবড় সার্জনই হোক না কেন, যদি বয়স বেশি হয়ে যায় তবে হাত কাঁপবে আর সে অপারেশন করতে পারবে না। যতবড় উকিলই হোক না কেন, যখন বয়স হয়ে যাবে আর তার বুদ্ধি তেমন তীক্ষ্ণভাবে কাজ করবে না আর বিবাদের জেরাও করতে পারবে না। তো সবার কাজ ও দক্ষতা একসময় বিলীন হয়েই যাবে, কিন্তু যদি সম্পর্ক নির্ভর জীবন হয়, তার কদর কমবে না; বরং বাড়বে। আর যদি তার দীন থাকে, তবে দেখা যাবে যে, যখন তার দাপট ছিল, তখন ছেলেরা তত উনাকে মানেনি, কিন্তু যখন উনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন ছেলেরা বহুত বেশি মানে। এমনকি দীনী জীবন থাকা অবস্থায় যতটুকু মানতো, বার্ধক্যে উপনীত হওয়া বা অসুস্থ হওয়ার কারণে তাকে তার চেয়েও অনেক বেশি মানে, আদর করে। আর মৃত্যুর পর তো আরও বেশি মেনে থাকে। দুনিয়াতে একটি কথা বলেছিল, ছেলেরা মানেনি; কিন্তু মৃত্যুর পর ছেলেরা বলে, 'না, বাবা এ কথা বলে গিয়েছিল।' অথচ বাবা হায়াতে থাকাবস্থায় তারা তা মানেনি। কারণ, সম্পর্ক থাকার কারণে তিনি যতো দূরে চলে যাবেন, তার কথার কদর ততবেশি বাড়বে, তার কদরও ততবেশি বাড়বে। কিন্তু এর বিপরীতে যদি দীন না থাকে আর স্বনির্ভর জীবন গড়তে চায়; আর স্বনির্ভর জীবনে যখন তার দক্ষতা থাকবে না, জঙ্গলের বাঘের মতো হবে। বড় অবহেলায় তার জীবন শেষ হবে।
তো আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন পুরো দুনিয়ার মানুষকে মাহবুবিয়্যাতের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম এসেছেন, শিক্ষাও দিয়েছেন।
নবীদের দেওয়া শিক্ষা, যার অনুকরণ এই মাদরাসাগুলোতে করার চেষ্টা করা হয়। সভ্য জগতের শিক্ষার এবং এই দীনী শিক্ষার মৌলিক পার্থক্য এটাই যে, দীনী শিক্ষার লক্ষ্য তাকে মাহবুব বানানো। সেজন্য দীনী শিক্ষার মধ্যে বা দীনী শিক্ষার সিলেবাসে কোনো ধরনের উপার্জন বা জীবিকার দক্ষতা শেখানো হয় না। কোনো কাজে লাগার মতো, যা সমাজে কাজে লাগবে যে, কৃষিকাজ কেমন করে করে, সেটা শেখানো বা মুরগী কেমন করে পালবে, সেটা শেখানো, দরজি কাজ তথা দুনিয়াবী জীবিকা অর্জনের দক্ষতাস্বরূপ কোনো কাজ শেখানো হয় না, বরং দীনী শিক্ষার পরিপূর্ণ লক্ষ্যই হচ্ছে তাকে মাহবুব বানানো। প্রথমত আল্লাহর কাছে মাহবুব হওয়া, এরপর নিজের কাছেও পরস্পরে যেন মাহবুব হয়। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন মেহনত করে গিয়েছেন, যে মেহনতে সবাই আল্লাহর কাছে মাহবুব হয়। এ কারণে নিজেদের মধ্যে মাহবুব হওয়ার বড়ই গুরুত্বারোপ করেছেন। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর সাহাবাদের মধ্যে এই ভাবনাটা ছিল বা এই চিন্তার মধ্যে প্রায় মগ্ন থাকতেন।
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বসে বসে ভাবছেন, চিন্তায় ডুবে আছেন। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু এলেন, সালাম করলেন; কিন্তু উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু সালামের খেয়াল করলেন না। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু এই অবস্থা দেখে চলে গেলেন। আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গিয়ে নালিশ করলেন যে, আমি উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সালাম করলাম, কিন্তু তিনি সালামের উত্তর দিলেন না। আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু এসে বললেন, এরকম কী ঘটেছে? উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, না, আমি তো কোনো সালামই শুনিনি। তখন ভাবলেন, হয়তো আমি কোনো চিন্তায় মগ্ন ছিলাম। এরপরে আলোচনা হলো। কোনো সভ্য জাতি, হোক আমাদের দেশে বা দুনিয়ার অন্য কোথাও—একজন গিয়ে যদি অন্যজনকে সালাম করে, হোক তা তার নিজ ভাষায় বা নিজ সমাজের নিয়মানুযায়ী, আমাদের এখানে সালাম বলবে, অন্যরা হয়তো নমস্কার বলবে বা তাদের নিজ নীতি অনুযায়ী অভিবাদন করবে, আর যদি সে সালামের উত্তর না দেয় তাহলে সে কি হাইকোর্টে গিয়ে কেস করবে? আর যদি কেউ কেস করেই, তাহলে সে কেসকে কেউ কি গুরুত্ব দেবে? উকিল! মোক্তার! জজ! আর সেজন্য কি স্বয়ং প্রেসিডেন্ট চলে আসবে বিচার করবার জন্য? কিন্তু আল্লাহ তাআলা এমন এক উম্মত গড়েছেন, যেখানে সম্পর্কের গুরুত্ব এতবেশি এতবেশি যে, উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু সালাম দিলেন কিন্তু উত্তর দেওয়া হলো না, উনি গিয়ে বললেন কাকে? খলিফাকে। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর দায়িত্বে তখন সম্পূর্ণ খেলাফত। তো ওই সময় উনাকে সালামের বিষয়ে বললেন আর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এ কথা বললেন না যে, আরে কি ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে আমার কাছে আসো? আমার কত কি দায়িত্ব আছে না! বরং এত গুরুত্ব দিলেন যে, নিজে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন আর এ ব্যাপারে আলোচনা করলেন। কারণ, এটাই তো নবুওয়াতের প্রধান বিষয়। দেশের কোথায় সম্পদ নষ্ট হলো বা কিছু ভেঙে গেল, এর কোনো গুরুত্ব নেই। গুরুত্বের বিষয় হচ্ছে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া; আর এটিই সম্পদ। সেজন্য গোটা উম্মতকে সম্পর্কনির্ভর জীবন শিখিয়েছেন। এটাই আল্লাহ তাআলা দীন হিসেবে পাঠিয়েছেন পুরো দুনিয়াকে জানানোর জন্য যে, তোমরা আল্লাহর নিকট মাহবুব হও। আল্লাহর নিকট যখন মাহবুব হবে তখন আল্লাহ তাআলা তোমাদের পরস্পরকে মাহবুব বানিয়ে দেবেন। আর মাহবুব হয় কি দিয়ে? মাহবুব হয় গুণ দিয়ে, দক্ষতা দিয়ে নয়। দক্ষতা দিয়ে স্বনির্ভর হয় আর মাহবুব হয় গুণ দিয়ে, গুণী হয়ে।
আল্লাহ তাআলার নিজের সিফাতের কারণে মাহবুব মাখলুকের কাছে। ঈমান এই মহব্বতের নাম। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّهِ
'ঈমানদাররা আল্লাহকে বেশি ভালোবাসে।'
আল্লাহওয়ালারা বলে থাকেন, আল্লাহর ভালোবাসা বাড়ানোর জন্যই আল্লাহ তাআলার সিফাতের আলোচনা করা, আল্লাহ তাআলার সিফাতের দিকে ধ্যান করার মাধ্যমে অন্তরে আল্লাহর মহব্বত সৃষ্টি হবে। তো এই সিফাতের কারণে মহব্বত হয়। আল্লাহ তাআলা সিফাতওয়ালাকে ভালোবাসেন। সুন্দর... যত ধরনের সুন্দর হতে পারে। আল্লাহ তাআলা নিজেই সুন্দর, সুন্দরকে আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ
'আল্লাহ নিজেই সুন্দর, সুন্দরকে ভালোবাসেন।'
এজন্য আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন মানুষকে সুন্দর বানাতে, যেন আল্লাহ তাআলা নিজে তাকে ভালোবাসেন। আর যাকে আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন, আল্লাহ তাআলা তার জন্য মাহবুবিয়্যাতকে ঢেলে দেন। যাকে আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন, জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে ডেকে বলেন, 'অমুককে আমি ভালোবাসি, তুমিও ভালোবাসবে।' জিবরাঈল আলাইহিস সালাম ফেরেশতাদেরকে ডেকে বলেন, 'অমুককে আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন, আমিও ভালোবাসি, তোমরা ভালোবাসবে।' তখন গোটা মাখলুকের মধ্যে তার ভালোবাসাকে ঢেলে দেওয়া হয়। তো দীনের কামাল মাহবুব হওয়া। এজন্য যদি আল্লাহ ওয়ালাদের জীবন পর্যালোচনা করা হয়, একদম নবী থেকে নিয়ে পরবর্তী যেকোনো যমানা পর্যন্ত, তো আল্লাহওয়ালারা যে এত মাহবুব হয়েছেন, হাজারো-লাখো বছর ধরে তাদের সম্মান-কদর করা হচ্ছে, কোনো দক্ষতার কারণে নয় যে, অমুক ওলীআল্লাহ এ কাজে খুব দক্ষ ছিলেন। তাদের জীবনে কোনো দক্ষতাই পাওয়া যাবে না; বরং তাদের মধ্যে পাওয়া যাবে শুধু জামাআত (গুণের সমাবেশ)। বিভিন্ন ধরনের সিফাত, যে সিফাতের কারণে তারা মাহবুব।
হিন্দুস্তানের বড় একজন আল্লাহওয়ালা হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে একটি উক্তি করেছিলেন যে, এই লোক যে আল্লাহওয়ালা, আমার একটি কথাতেই একীন হয়ে গিয়েছে। কী কথা সেটি? চিন্তা করে দেখলাম, তিনি কোনো কাজেরই নন। তাঁকে কোনো কাজে লাগানো যাবে, এমন একটি কাজও পাওয়া যায় না যে, হযরত সে কাজটি করতে পারবেন। যেকোনো কাজেই লাগানো হলে তিনি পারবেন না। আল্লাহওয়ালাদের এটা একটি সিফাত, তারা কোনো কাজের হয় না, তারা মাহবুব হন। আর মাহবুবিয়্যাত কোনো কাজের জিনিস নয়।
ফুলকে বড়ই ভালোবাসে; ফুল দিয়ে কী কাজ হয়? কোনো কাজই হয় না। কাজ হয় কী দিয়ে? গোবর দিয়ে কাজ হয়। গোবর দাম দিয়ে কেনা হয়, কারণ বড় কাজের জিনিস। গোবর দিলে ফল ভালো হয়, ফুল ভালো হয়। ফুলের দাম কেন? ফুলের দাম কোনো কাজের কারণে নয়, বরং মাহবুবিয়্যাতের কারণে। সুন্দর-মাহবুব, এজন্য। তো উপকৃত হওয়া, এটি গোবরীয় বৈশিষ্ট্য; আর সুন্দর হওয়া, এটি ফুলেল বৈশিষ্ট্য। আর ফুল কোনো কাজের জিনিস নয়; তবে কদর ওই ফুলকেই করা হয়। ডাক্তার উপকারী, এজন্য বড় বেতন দিয়ে, যত্ন করে, আলাদা কামরা করে কেবিন দিয়ে চব্বিশ ঘণ্টার জন্য রেখে দেয়। কারণ, তার মা অসুস্থ। মায়ের সেবা-যত্নের প্রয়োজন। এজন্য চব্বিশ ঘণ্টার জন্য ডাক্তার নিয়োজিত করেছে যে, কখন যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে, কখন যদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয় আর ডাক্তার কোথাও পাওয়া যাবে না। যেহেতু ধনী লোক, তাই যত বেতনই প্রয়োজন হোক, বড় অঙ্কের বেতন দিয়ে, ডাক্তার সাহেবকে একটি কামরা দিয়ে, যত্নের সাথে একজন ডাক্তারকে নিয়োজিত করেছে চব্বিশ ঘণ্টার জন্য যে, মা বিছানায়। ডাক্তার সাহেবকে কেন রেখেছেন? মা অসুস্থ, চিকিৎসার প্রয়োজন। অর্থাৎ, বড় উপকারী। আচ্ছা, মাকে কেন এত যত্ন করে রাখছেন, মা দ্বারা কী উপকার হয়? মা তো কোনো উপকারের জন্য নয়; বরং মায়ের ব্যাপারে 'উপকারী কী-অনুপকারী'—এ প্রশ্নই অবান্তর। কোনো ভদ্রলোকই এ প্রশ্নই করবে না। এ কথা জিজ্ঞেস করা যে, তোমার মায়ের দ্বারা কী উপকার হয়—এ প্রশ্নই করবে না। যে প্রশ্ন করবে, উত্তর তো পরবর্তী কথা, এ প্রশ্নের কারণে সে বেইজ্জত হবে যে, এই লোকের কোনো জ্ঞান-বুদ্ধিই নেই! এই লোক মায়ের বিষয়ে বলছে যে, মা দ্বারা কী উপকারিতা! আরে নির্বোধ! মা কী উপকারিতা আর অনুপকারিতার জিনিস? তো ফুল চাষ—এর দ্বারা কোনো উপকারিতাই নেই, কিন্তু এটি মাহবুব। আল্লাহ তাআলা চান, এই উম্মতের প্রতিটি ব্যক্তি আল্লাহর নিকট মাহবুব হবেন আর নিজেদের কাছেও মাহবুব হবেন। কী দিয়ে? তার ওই সিফাত দ্বারা। ওই সিফাতের জন্য আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন। তারা এসে মেহনত করেছেন। মানুষকে দেখিয়েছেন যে, কোন পথে মেহনত করলে তারা সিফাতওয়ালা হবে, গুণী হবে। তাঁদের মেহনতই ছিল, যেন মানুষ মাহবুব হয়।
আমরা যেটাকে দুনিয়ার শিক্ষা বলি, ওইটা হলো, মেহনত করে তাকে দক্ষ বানাবে, তাকে গুণী বানাবে না। আর গুণী বানানো তার লক্ষ্যও নয়। কেউ যদি গুণী হয়ে যায় তবে সেটি ঘটনাক্রমে, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার এটি লক্ষ্যবস্তু নয়। বরং শিক্ষাব্যবস্থা তাকে দক্ষ বানাবে। আর আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন মানুষকে মাহবুবিয়্যাতের পথ দেখানোর জন্য। আল্লাহ তাকে ভালোবাসবেন; আর আল্লাহ যাকে ভালোবাসবেন, তার আর কীই-বা বাকি থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাকে নিজ থেকেই গোটা পৃথিবীর মধ্যে মাহবুব বানাবেন। এজন্য ভাই, আমরা আল্লাহর পথে বের হয়ে মাহবুবিয়্যাতের পথ অবলম্বন করি।
দক্ষতার জন্য আল্লাহ তাআলা নিম্ন মানের জীবকে সৃষ্টি করেছেন। নিজ নিজ কাজে বড় দক্ষ হবে, ওটা জীব-জন্তুর বৈশিষ্ট্য; মানুষের বৈশিষ্ট্য গুণী হওয়া, মাহবুব হওয়া। নবীগণ এজন্য আমাদেরকে দীন শিখিয়েছেন, আর সম্পূর্ণ দীন আমাদেরকে ওই সিফাত শেখায় যার দ্বারা সে মাহবুব হবে। কুরআন শরীফের মধ্যে, হাদীস শরীফের মধ্যে এমন কোনো অংশ নেই যার দ্বারা কোনো দক্ষতা শেখানো হয়; বরং সম্পূর্ণ দীনি তালিমের মধ্যে—হোক, দীনি মেহনতের মধ্যে, বা দীনি তরিকা হোক, তাবলীগী হোক আর যে জামায়াতের মধ্যে হোক, গুণ বানানোর মেহনত চলে। যেন গুণী হয়ে মাহবুব হয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক দান করুন যে, আমরা এই মাহবুবিয়্যাতের পথের পথিক হব। এজন্য আমরা আল্লাহর পথে বের হয়ে ওইসব সিফাত নিজের মধ্যে অর্জন করি, যেসব সিফাতের কারণে আল্লাহ তাকে ভালোবাসবেন, যেসব সিফাতের কারণে মাখলুকের কাছে মাহবুব বানিয়ে দেবেন। সবাই তৈরি আছেন না ইনশাআল্লাহ? এজন্য আমরা যারা ছাত্র আছি, ফারেগ হয়ে গেলে এক বছর সময় দিয়ে তারপর অন্য কাজে হাত দেব। ঠিক আছে না ইনশাআল্লাহ।
গতকালই অনেকে নাম দিয়ে দিয়েছেন, তারপরও আজকে নতুন অনেকেই থাকতে পারেন, এজন্য যারা গতকালও নাম দিয়েছেন, তাদেরকে বলব যে, তারা আবার দাঁড়িয়ে পড়েন ইনশাআল্লাহ যে, পড়া শেষ হয়ে গেলে এক বছর আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে তারপর অন্য কোনো কাজে হাত দেবেন। ইনশাআল্লাহ এজন্য বিসমিল্লাহ পড়ে নিয়ত করে দাঁড়ান। জাযাকুমুল্লাহ।
سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ سُبْحَانَكَ اللهم نَشْهَدُ اَن لَّا إلهَ إِلَّا أَنْتَ نَسْتَغْفِرُكَ وَنَتُوْبُ إِلَيْكَ.
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
দুআ কবুল না হওয়ার কারণ: আমরা কি ভুল চাইছি?
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] أعوذ بالله من الشيطان الرجيم. بسم الله الرحمن الرحيم مَنۡ عَمِلَ صَالِح...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
৪১১
আদরের ভাইটিকে বলছি
( দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের আলোকিত পরশে দ্বীন পাওয়া প্রতিটি কলেজ বা ভার্সিটির জেনারেল শিক্ষিত ছাত্র ...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১০৬৩৯
নিভৃতচারী আল্লাহওয়ালাদের খোঁজে
হজরতের গড়া ছোট্ট, অথচ সুন্দর মাদ্রাসা। মাদ্রাসা থেকে এক ছাত্রকে রাহবার হিসেবে সাথে নিয়ে যখন হজরতের ব...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
৯০৩৪
দ্বীন ও দুনিয়া
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] দুনিয়ার সব মানুষের কাজকর্ম ও চেষ্টা-পরিশ্রমকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—এক...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৯৭
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন