লালন বা গুরুই উদ্ধারকর্তা! বাউল মতবাদ। পর্ব—৩৫
লালন বা গুরুই উদ্ধারকর্তা! বাউল মতবাদ। পর্ব—৩৫
সকল মাখলুকের একচ্ছত্র উদ্ধারকর্তা মহান আল্লাহ তাআলা। এটাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনীত ইসলামের আকিদা।
বাউল ধর্মে কী বলে?
তাদের বিশ্বাস হলো—গুরু বা লালন ফকির উদ্ধারকর্তা রূপে দুনিয়াতে আগমন করেছে। দেখুন, তারা কী লিখেছে—
গুরু তুমি পতিত পাবন পরম ঈশ্বর
অখণ্ড মন্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেনো চরাচর।
আমি লালন এক শিরে,
ভাই বন্ধু নাই আমার জোড়ে
ভুগেছিলাম পত্রুজ্বরে,
মলম শাহ করেন উদ্ধার। —মহাত্মা লালন, পৃ. ২৬
দয়াল রবরূপে আপন গুরুই তাকে উদ্ধার করে পূর্ণতা দান করেন এবং তার নফসের অভিব্যক্তিগুলো নিজ হাতে গ্রহণ করেন। এরপর তিনি যে কাজই করুন না কেন তা তার গুরুর ইচ্ছের সাথে সম্মিলিত থাকে। তখন কর্মগুলো মানবীয় অঙ্গপ্রতঙ্গ থেকে প্রকাশ পায় বটে কিন্তু তা আর তার কর্ম থাকে না। নবী ও মহামানবগণের হাল এমনই হয়ে থাকে। ফকির লালন শাহ তাই জগতবাসীর উদ্ধারকর্তা সম্যক গুরুরূপে অবতীর্ণ হন মানুষের সকল দ্বীনের উপর সত্যদ্বীন তথা দ্বীনে এলাহি প্রকাশ করতে।—(অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৬২)
নারীদেহে সাধনার সময় শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে পুরো
সাধনপদ্ধতিই বৃথা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে মুর্শিদ সঠিক নির্দেশনা দিতে পারে । সেই ঘোর বিপদ' থেকে উদ্ধারে ত্রাণকর্তা কিংবা কাণ্ডারি হিসেবে মুর্শিদের নাম-স্মরণ বা জপ করাই শিষ্যের জন্য উত্তম। —(বাউলসাধনা, পৃ. ৮০
লালন শাহ ছিলেন বাউলদের গুরু। তিনি বাউলদের জীবন-মরণের সহায়। —বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ২১
অর্থাৎ তাদের বিশ্বাস হলো—লালন বা স্বীয় গুরু তাদের উদ্ধারকর্তা।
ইসলাম কী বলে?
পতিতপাবন অর্থ হলো—পাপীর ত্রাণকর্তা। —বাংলা একাডেমি, পৃ. ৭৭৪
অর্থাৎ পাপীর বিপদে যিনি উদ্ধার করেন।
এটা মূলত খ্রিস্টানদের শিরকি আকিদা। তারা মনে করে—ঈসা মাসিহই একমাত্র উদ্ধারকর্তা। —যোহন ৩:১৬
অথচ মহান আল্লাহই একমাত্র বিপদগ্রস্তদের উদ্ধারকারী। তিনি ছাড়া কোনো সাহায্যকারী নেই। নিন্মে কয়েকটা আয়াত পেশ করা হলো—মহান আল্লাহ বলেন—
بَلِ اللَّهُ مَوْلَاكُمْ ۖ وَهُوَ خَيْرُ النَّاصِرِينَ
“(তারা তোমাদের কল্যাণকামী নয়) বরং আল্লাহই তোমাদের অভিভাবক এবং তিনি শ্রেষ্ঠতম সাহায্যকারী।” —(সুরা আল-ইমরান : ১৫০)
أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۗ وَمَا لَكُم مِّن دُونِ اللَّهِ مِن وَلِيٍّ وَلَا نَصِيرٍ
“তুমি কি জানো না আল্লাহ তাআলা এমন সত্তা যে, আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব কেবল তাঁরই এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনও অভিভাবক নেই এবং সাহায্যকারীও নেই?” —(সুরা বাকারা : ১০৭)
وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِأَعْدَائِكُمْ ۚ وَكَفَىٰ بِاللَّهِ وَلِيًّا وَكَفَىٰ بِاللَّهِ نَصِيرًا
“আল্লাহ তোমাদের শত্রুদেরকে ভালো করেই জানেন। অভিভাবকরূপেও আল্লাহই যথেষ্ট এবং সাহায্যকারী হিসেবেও আল্লাহই যথেষ্ট।” —(সুরা নিসা : ৪৫)
أَمِ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ ۖ فَاللَّهُ هُوَ الْوَلِيُّ وَهُوَ يُحْيِي الْمَوْتَىٰ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
“তারা কি তাঁকে ছেড়ে অন্য অভিভাবক গ্রহণ করেছে? প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই তো অভিভাবক। তিনিই মৃতদেরকে জীবিত করেন এবং তিনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান।” —(সুরা আশ শুরা : ৯)
أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاءَ الْأَرْضِ ۗ أَإِلَٰهٌ مَّعَ اللَّهِ ۚ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ
“তবে কে তিনি, যিনি কোন আর্ত যখন তাকে ডাকে, তার ডাকে সাড়া দেন ও তার কষ্ট দূর করে দেন এবং যিনি তোমাদেরকে পৃথিবীর খলীফা বানান? (তবুও কি তোমরা বলছো) আল্লাহর সঙ্গে অন্য প্রভু আছেন? তোমরা অতি অল্পই উপদেশ গ্রহণ করো।” —(সুরা নামল : ৬২)
এছাড়া হাদিস শরীফে আরো সুস্পষ্টভাবে এসেছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كُنْتُ خَلْفَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمًا فَقَالَ " يَا غُلاَمُ إِنِّي أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ احْفَظِ اللَّهَ يَحْفَظْكَ احْفَظِ اللَّهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللَّهَ وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَاعْلَمْ أَنَّ الأُمَّةَ لَوِ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلاَّ بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ لَكَ وَلَوِ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلاَّ بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَيْكَ رُفِعَتِ الأَقْلاَمُ وَجَفَّتِ الصُّحُفُ
“কোন এক সময় আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পিছনে ছিলাম। তিনি বললেন—হে তরুণ, আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দিচ্ছি- তুমি আল্লাহ্ তা’আলার (বিধি-নিষেধের) রক্ষা করবে, আল্লাহ তাআলা তোমাকে রক্ষা করবেন। তুমি আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখবে, আল্লাহ্ তাআলাকে তুমি কাছে পাবে। তোমার কোনো কিছু চাওয়ার প্রয়োজন হলে, আল্লাহ তাআলার নিকট চাও, আর সাহায্য প্রার্থনা করতে হলে, আল্লাহ তাআলার নিকটেই করো। আর জেনে রাখো, যদি সকল উন্মাতও তোমার কোনো উপকারের উদ্দেশে ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে ততটুকু উপকারই করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তাআলা তোমার জন্যে লিখে রেখেছেন। অপরদিকে যদি তোমার ক্ষতি করতে সকলে একত্রিত হয়, তবে ততটুকু ক্ষতিই করতে সক্ষম হবে, যতটুকু আল্লাহ্ তা’আলা তোমার তাকদিরে লিখে রেখেছেন। কলম তুলে নেয়া হয়েছে এবং লিখিত কাগজসমূহও শুকিয়ে গেছে।” —(জামে তিরমিযি, হাদিস নং : ২৫১৬)
এতো এতো সুস্পষ্ট আয়াত হাদিস থাকার পরও যারা আল্লাহ ছাড়া ভিন্ন কাউকে উদ্ধারকর্তা মনে করে—তারা ক্লিন মুশরিক।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কুরআনের তাফসীর পড়া যাবে না! হেযবুত তওহীদ পর্ব–১৭
যদি কেউ বড় শিক্ষিত হয়, তবে তার বক্তব্য বুঝতে হলে নিশ্চয় জ্ঞানী হতে হয়, অথবা জ্ঞানীদের থেকে বুঝে নিতে...
মুফতী রিজওয়ান রফিকী
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
৪৩৯৭