বাউল ধর্মে গুরু-ভজনই মুখ্য! বাউল মতবাদ। পর্ব—২৭
বাউল ধর্মে গুরু-ভজনই মুখ্য! বাউল মতবাদ। পর্ব—২৭
এ বিষয়ে আলোচনায় প্রবেশের আগে ‘ভজা’ বা ‘ভজন’ শব্দের অর্থ জানা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমি থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হলো—ভজনা : ১. আরাধনা, উপাসনা, বন্দনা। যেমন—ভজনালয় অর্থ উপাসনাগৃহ বা উপাসনালয়। —(বাংলা একাডেমি, পৃ. ১০৩৩)
অতএব, ‘ভজন’ শব্দের অর্থ হলো—উপাসনা; যাকে আরবি পরিভাষায় ‘ইবাদত’ বলা হয়।
এখন দেখা যাক, এ বিষয়ে বাউল সম্প্রদায়ের বক্তব্য কী। বাউলদের মূল দাবি হলো—আল্লাহকে পেতে হলে প্রথমে গুরুর ইবাদত করতে হবে। সেজন্য বাউলসম্রাট লালন ফকির লিখেছেন—
“মোর্শেদের মেহের হলে খোদার মেহের তারে বলে,
হেন মোর্শেদ না ভজিলে তার কি আর আছে উপায়। —(অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৫৭)
আরও লিখেছে—
“যে রূপ মোর্শেদ সেই রূপ রসুল যে ভজে সে হয় মকবুল।
সিরাজ শাঁই কয় লালন কি কুল পাবি মোর্শেদ না ভজিলে। —(অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৯৫)
এই গানের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লালনভক্ত আবদেল মান্নান লিখেছে—
‘আগে গুরুভজন, তারপর আত্মদর্শন।’ (অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৫৭)
ফকির লালনের মতবাদ এমন এক দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক গুরুবাদী পথ, যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জাত-পাত-গোত্র ও বর্ণের সামান্যতম ভেদাভেদ নেই। এই মতে শুধু প্রেম ও ভালোবাসা এবং গুরু-ভজনই মূল সাধনা। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ৩৩)
আরও বলা হয়েছে—সুফিদের মতে মানুষের হৃদয়ই মহান আল্লাহর, অর্থাৎ পরমাত্মার ঘর। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ৩৫)
অর্থাৎ বাউলদের মূল সাধনাই হলো—গুরুর ইবাদত করা।
ইসলাম কী বলে?
ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধারণা সুস্পষ্টভাবে হিন্দুদের বিশ্বাসের একটি নতুন রূপ। কারণ, হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী তাদের মূর্তি ও দেবতার পূজা তাদের ভগবানের নৈকট্য অর্জনের ওসিলা হিসেবে বিবেচিত হয়। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্টভাবে জেনে রাখা জরুরি—‘মানুষের মাঝে আল্লাহ বসবাস করেন’—এমন বিশ্বাস করা শিরক। যা পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে। অতএব, মানুষের মধ্যে আল্লাহ তাআলা বসবাস করেন—এমন আকিদা পোষণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তদুপরি, যদি যুক্তির খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় যে, সকল মানুষের মধ্যেই আল্লাহ বসবাস করেন, তবে প্রত্যেক মানুষেরই নিজেকে নিজে পূজা করা উচিত—কারণ সেও একজন জীব, তার মধ্যেও তো আল্লাহ বসবাস করছেন। এর অর্থ দাঁড়ায়, বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৮০০ কোটি মানুষ থাকলে, উপাস্য বা মাবুদের সংখ্যাও হবে ৮০০ কোটি। নাউযুবিল্লাহ। অথচ ইসলামের আকিদা অত্যন্ত সুস্পষ্ট—আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ বা উপাস্য নেই।
এরপরও যদি তারা বলে, না—সবার পূজা করা যাবে না, শুধু গুরুর পূজা করতে হবে—তাহলে প্রশ্ন আসে, আল্লাহ কি শুধু গুরুর মধ্যেই অবস্থান করেন? যদি তারা হ্যাঁ বলে, তাহলে তারা প্রমাণ পেশ করুক। এমন কোনো প্রমাণ তারা কখনই পেশ করতে সক্ষম হবে না। তাছাড়া তারা নিজেরাই দাবি করেছে—
এই জীবাত্মার ভেতরেই সেই পরম সুন্দর, মহামহিম পরমাত্মার বসবাস। পরমকে পেতে হলে আগে জীবাত্মাকে সাধন করতে হয়। (মহাত্মা লালন, পৃ. ৩৬)
তারা আরও লিখেছে—
মানুষ ভজনার মধ্য দিয়ে আল্লাহকে রসুলকে সেই অধরা মনের মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ৩৫)
একদিকে তাদের দাবি—সকল মানুষের পূজা করা; আবার অন্যদিকে তারা বলছে শুধুমাত্র গুরুর পূজা করতে হবে। মূলত, এরা যেমন অশিক্ষিত, তেমনি সরলপ্রাণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করে ঈমানহীন করে তুলছে এবং যুগের নব্য ফিরআউন সেজে বসে আছে। তাছাড়া, যদি সকল গুরুর ইবাদত করা হয়, তাহলে ধরুন বাংলাদেশে গুরুর সংখ্যা ১০ হাজার, তখন উপাস্যের সংখ্যাও হবে ১০ হাজার। অথচ ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস হলো—লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই)। এই বিষয়টি স্পষ্ট করতে কয়েকটি কোরআনিক দলীল পেশ করা হলো—
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ
“আমি তোমার পূর্বে কোনো রাসুল পাঠাইনি, যার প্রতি আমি এই ওহী নাযিল করি নাই যে, “আমি ছাড়া অন্য কোনো মাবুদ নেই। সুতরাং শুধুমাত্র আমারই ইবাদত করো।” (সুরা আম্বিয়া : ২৫)
وَإِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ ۖ لَّا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمَٰنُ الرَّحِيمُ
“তোমাদের মাবুদ একই মাবুদ, তিনি ছাড়া অন্য কোনও মাবুদ নেই। তিনি সকলের প্রতি দয়াবান, পরম দয়ালু।” —(সুরা বাকারা : ১৬৩)
لَّقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ ثَالِثُ ثَلَاثَةٍ ۘ وَمَا مِنْ إِلَٰهٍ إِلَّا إِلَٰهٌ وَاحِدٌ ۚ وَإِن لَّمْ يَنتَهُوا عَمَّا يَقُولُونَ لَيَمَسَّنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
“এবং তারাও নিশ্চয় কাফির হয়ে গিয়েছে, যারা বলে, ‘আল্লাহ তিনজনের মধ্যে তৃতীয় জন।’ অথচ এক উপাস্য ব্যতীত কোনও মাবুদ নেই। তারা যদি তাদের এ কথা থেকে বিরত না হয়, তবে তাদের মধ্যে যারা কুফরীতে লিপ্ত হয়েছে, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি স্পর্শ করবে।” —(সুরা মায়িদা : ৭৩)
সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ
“আমি লোকদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য নির্দেশিত হয়েছি, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোনও উপাস্য নেই ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল।” –(সহিহ বুখারী, হাদিস নং : ২৫)
এ বিষয়ে আরও বহু আয়াত ও হাদিস পেশ করা যেতে পারে; তবে কিতাবটি দীর্ঘ না করার জন্য এখানে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো। সুতরাং প্রমাণ হলো—গুরু ভজনা বা মানব ভজনা সুস্পষ্ট শিরকি আকিদা।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কুরআনের তাফসীর পড়া যাবে না! হেযবুত তওহীদ পর্ব–১৭
যদি কেউ বড় শিক্ষিত হয়, তবে তার বক্তব্য বুঝতে হলে নিশ্চয় জ্ঞানী হতে হয়, অথবা জ্ঞানীদের থেকে বুঝে নিতে...
মুফতী রিজওয়ান রফিকী
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
৪৪৬৯
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন