আল্লাহর ইচ্ছায় নিজের ইচ্ছা: পরিপূর্ণ বান্দা হওয়ার পথ
আল্লাহর ইচ্ছায় নিজের ইচ্ছা: পরিপূর্ণ বান্দা হওয়ার পথ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত]
স্থান: বারিধারা ডি.ও.এইচ.এস.
সময়: মাগরিবের পর
:১০/০৬/২০০৬ তারিখ
أعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ، بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ، مَنۡ عَمِلَ صَالِحًا مِّنۡ ذَکَرٍ اَوۡ اُنۡثٰی وَہُوَ مُؤۡمِنٌ فَلَنُحۡیِیَنَّہٗ حَیٰوۃً طَیِّبَۃً ۚ وَلَنَجۡزِیَنَّہُمۡ اَجۡرَہُمۡ بِاَحۡسَنِ مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ
وَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : يَا أَيُّهَا النَّاسُ، قُوْلُوْا لَا إلهَ إِلاَّ اللهُ تفْلِحُوْ، أَوْ كَمَا قَالَ عَلَيْهِ الصَّلاَةُ وَالسَّلَامُ
অনেক দিন আগের কথা। আমাদের জামাত ছিল অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন শহরে। রাতে বেশ কিছু দেরি করে গাশত ইত্যাদি করার পর মসজিদে ফিরেছি। মসজিদের বাতি নিভানো ছিল। একজন স্থানীয় সাথী আবদুর রশীদ, তার নাম। মূল অস্ট্রেলিয়ান, কিছুদিন আগে মুসলমান হয়েছেন। তিনি মসজিদে একা একা বসে ছিলেন; চুপচাপ বসে কাঁদছিলেন একা নির্জনে। অন্ধকার যেহেতু ছিল, আমি বুঝতে পারিনি। তার কাছে বসে আমি কথা বলতে লেগেছি। যদি জানতাম যে বসে কাঁদছেন, তাহলে হয়তো কথা বলতাম না। যাই হোক, রাতে কথাবার্তা বললাম। তিনি কাঁদছিলেন। কান্নার ঘটনার কারণ হলো, আবদুর রশীদের খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু মারা গেছে, আত্মহত্যা করেছে। সে মুসলমান ছিল না। দুজনই যুবক। সে সময়কার কথা বলছি, এখন তো বয়স হয়ে গেছে। আবদুর রশীদ আর তার যে বন্ধু আত্মহত্যা করেছে, এরা দুজনই একটা ক্লাবে কারাতের প্রশিক্ষণ দিত। কারাতে যে খালি হাতে যুদ্ধ করা, আর এগুলো এ জন্যই শেখা হয় যে, হঠাৎ করে যদি কোনো শত্রু আক্রমণ করে অপ্রস্তুত অবস্থায়, তো মানুষ অস্ত্র নিয়ে চলে না, খালি হাতে যাতে মোকাবিলা করতে পারে, সে জন্য এসব জিনিস শেখে। এবং যারা এ ব্যাপারে দক্ষ, ঠিক খালি হাতে ভালো মোকাবিলা করতে পারে; এমনকি খালি হাতে মানুষকে মেরেও ফেলতে পারে। তাদের মধ্যে এ দক্ষতা আছে। আবদুর রশীদ যে মুসলমান এবং তার যে বন্ধু যে আত্মহত্যা করেছে, এরা দুজনই একটা ক্লাবে এই কারাতে শেখাত।
আবদুর রশীদের সাথে আমি কথা বলছিলাম এবং কথা প্রসঙ্গে বললাম যে, "তোমার বন্ধু অনেক মেহনত করে অনেক সাধনা করে অন্যের আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচানো শিখেছে; কিন্তু খোদ নিজের আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচার পদ্ধতি শিখতে পারল না।" তো যুদ্ধও শিখলাম, শত্রু যদি না চিনি তাহলে ওই যুদ্ধ শিখে আমার কী লাভ হবে। যুদ্ধ তো ভালো করে শিখেছে, কিন্তু শত্রু তো বাইরে না; শত্রু তো তার ভেতরে। বাইরের কেউ আক্রমণ তাকে করলই না, আর মারা গেল নিজের আক্রমণে আত্মহত্যা করে।
মানুষ মেহনত করে ঠিকই, কিন্তু মেহনতটা কোথায় করা দরকার, এটা যদি সে ঠিক করতে না পারে তাহলে সব শ্রম বেকার যায়।
দুজন রোগী, অসুস্থ হবার কারণে তাদের খাবারে রুচি নেই। একজন জ্ঞানী বুদ্ধিমান, সে বোঝে যে আমি অসুস্থ, খাবারের দোষ নয়। আমার রুচি যে পাচ্ছি না, এটা জিনিস খারাপ বলে নয়। জিনিস ভালো, রান্না ভালো, সবই ভালো, ঠিক আছে; কিন্তু আমি খেতে পারছি না, আমার রুচি না থাকার কারণে, আমি অসুস্থ বলে। যে এ কথা বোঝে, সে তো বাড়ির কাউকে গালাগালি করে না, বকাবকি করে না, রাগারাগি করে না, কেন ভালো জিনিস দিল না, কেন ভালো করে রান্না করল না। তাদেরকে কোনো দোষ দেয় না, বরং নিজে ডাক্তারের কাছে গিয়ে চিকিৎসা করায় যে, "বাড়ির সবাই আমাকে ভালো ভালো জিনিস রান্না করে দেয়, আমি খেতে মজা পাই না। তো ডাক্তার সাহেব আমার চিকিৎসা করুন।" যে অবুঝ, সে বোঝে না যে, সমস্যা তার নিজের। আর বাড়ির সবার ওপর রাগারাগি করে। যে বাজার করেছে তাকে বলে, "খারাপ জিনিস বাজার থেকে এনেছ।" যে রান্না করেছে তাকেও বলে, "খারাপ রান্না করেছ।" বুঝতে পারছে না যে, সমস্যা তার নিজের।
খাওয়ার ব্যাপারে যেরকম তার নিজের চিকিৎসা করা দরকার, পুরো দুনিয়াতে সারা জীবনে সুখ-শান্তি পাওয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালামদেরকে পাঠিয়েছেন যে, "আমার নিজের চিকিৎসা করা দরকার, যাতে আমার জীবনের পথচলা আমি শুদ্ধভাবে চলতে পারি।"
আল্লাহ তায়ালার শরীয়তের আহকামের সাথে নিজেকে মিলাই। এই মেলানোর কাজটা যদি আমার ঠিকমতো করতে পারি, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তায়ালা আমার দিলকেও তাকদিরের সাথে মিলিয়ে দেবেন। রাস্তা বড় সহজ, শরীয়তের হুকুমের সাথে নিজেকে মিলাই, ইনশাআল্লাহ ভেতরে যে আমার ইচ্ছা, ওটা আল্লাহ তায়ালা তাকদিরের সাথে মিলিয়ে দেবেন। আমার কাজ শরীয়তের হুকুমের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নেওয়া। এ জন্য আল্লাহর পথে বের হয়ে আল্লাহর হুকুমের সাথে শরীয়তের আহকামের সাথে নিজের বাহ্যিক আমলগুলো মেলাবার চেষ্টা করি; যদি আমার বাহ্যিক আমলকে আল্লাহর হুকুমের সাথে মেলাতে পারি, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তায়ালা মেহেরবানি করে আমার দিলকে আমার তাকদিরের সাথে মিলিয়ে দেবেন।
গ্রামে একজনের বাড়ি যাওয়ার রাস্তা আঁকাবাঁকা, সাইকেলে যায়। সাইকেল যে ভালো করে চালাতে পারে না, আর ভালো করে সাইকেল চালাতে না পারার কারণে সে এদিক-ওদিক কখনো গিয়ে নর্দমায় পড়ে যায়, ব্যথা পায়, জামাকাপড়ও ময়লা হয়। রাস্তার বাঁকের সাথে নিজেকে ঘোরাতে পারে না। সে অবুঝ হওয়ার কারণে সে মনে করে যে, "রাস্তা যদি সোজা হতো তাহলে আমি সহজে পৌঁছাতে পারতাম।" তাহলে কী করতে হবে, পাহাড় কেটে আর বিলের মাঝখানা দিয়ে সোজা রাস্তা বানাতে হবে। পাহাড় কাটাও তার জন্য সম্ভব নয়, আর বিলের মাঝখান দিয়ে রাস্তা বানানোও তার জন্য সম্ভব নয়। সে তো হায় হায় করতে করতে তার জীবন শেষ করে দেবে।
যার জ্ঞানবুদ্ধি আছে সে বলবে যে, "রাস্তা ঠিকই আছে। পাহাড়ের জায়গায় পাহাড় ঘুরে গেছে, পাহাড় কাটার প্রয়োজন নেই। বিল যেখানে ছিল, বিলের পাশ দিয়ে রাস্তা চলে গেছে, আমি আমার হাত পাকা করে নিই, এই আঁকাবাঁকা রাস্তায়ই সুন্দরভাবে যেতে পারব।" যে তার হাতকে পাকা করে নেয়, আঁকাবাঁকা রাস্তায় সুন্দরভাবে যেতে পারে।
সুন্দর অঞ্চল যেগুলো, মানুষ যে বেড়াতে যায়, ওগুলো খুব সুন্দর জায়গা। আমাদের দেশের ওই খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার ইত্যাদি সুন্দর অঞ্চল আছে। সুন্দর অঞ্চল মানেই হলো যেই রাস্তাগুলো সোজা নয়। যে খাগড়াছড়ি আর রাঙামাটি বেড়াতে গেছে, সে গিয়ে সোজা জমির সোজা রাস্তা পাবে না। আর যদি একেবারে চ্যাপটা জমির সোজা রাস্তাই হতো, তাহলে ওই অঞ্চল সুন্দরই হতো না। সুন্দর মানেই হলো যে কখনো পাহাড়, কখনো হ্রদ, কখনো নদী, আঁকাবাঁকা, কখনো ওঠা, কখনো নামা। সুন্দর অঞ্চল যেরকম তার মধ্যে অনেক বৈচিত্র্য থাকে, কখনো চড়া কখনো নামা, আঁকাবাঁকা থাকে।
আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তার জীবনের একটা সুন্দর পথ দিয়েছেন, ওটাও সোজা পথ নয়। সোজা পথ কখনো সুন্দর হতে পারে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করতেন যে, "হে আল্লাহ, আমাকে এক বেলা খাবার দাও, যেন শোকর আদায় করতে পারি; এক বেলা উপবাস দাও যেন সবর করতে পারি।" যে উপবাস পায়নি, সে খাবারের স্বাদও পাবে না। তার জীবন সুন্দর হবে না, একঘেয়ে জীবন হয়ে যাবে।
আজ দুনিয়াতে বেশুমার মানুষ আত্মহত্যা করে। আমাদের দেশে তো অত বেশি নয়। যেসব দেশগুলোকে মানে বলা হয় উন্নত দেশ, অভাব-অনটন নেই, সচ্ছল, তাদের কোনো সমস্যা নেই আমাদের দৃষ্টিতে, তারাই আত্মহত্যা করছে বেশি। খোঁজ করলে দেখা যাবে, এর প্রধান কারণ হচ্ছে যে, এমনি, বলে ভালো লাগে না, একঘেয়েমি। কোনো স্বাদ পাচ্ছে না।
অনেক দিন আগের কথা, একটা ছেলে আমেরিকায় জেল থেকে বের হয়েছে। বয়স যাদের কম থাকে, আঠারো বছরের নিচে, তাদের আইনগত তাদেরকে জেলে দেওয়া যায় না। মানুষের বানানো বুদ্ধি তো, মানুষ বড় অবুঝ যে, সে তার অবুঝ বুদ্ধি দিয়ে আইনকানুন বানায়। আল্লাহর কাছ থেকে নেয়নি, নিজেই বানাবার চেষ্টা করে। বোকা মানুষ বোকার মতো আইন বানায়। আঠারো বছরের নিচে তাদের দৃষ্টিতে সে অবুঝ সে শিশু। তার কোনো দোষ নেই, তাকে জেলে দেওয়া যাবে না। অথচ রীতিমতো মার্ডার-টার্ডার সবকিছু পরিকল্পিতভাবে করছে।
আল্লাহ তায়ালা শরীয়তের হুকুম বানিয়েছেন, যখন থেকে সে সাবালক হয়ে গেল, তখন থেকে সে সবকিছু বোঝে; সে দায়ী। ওরা বানিয়েছে ১৮ বছর। ১৪, ১৫, ১৬, ১৭ এসব বয়সে বেশুমার মার্ডার করে। কিন্তু এটাকে আইন ধরতে পারে না, বলে শিশু। তো ওরকম শিশু ধরা পড়েছে কোনো অপরাধে। নিজেই আইন বানিয়েছে আবার নিজেই সেই আইনের বিপরীত কিছু ফাঁক-ও বের করে। এদেরকে আইনগতভাবে যেহেতু জেলে দেওয়া যাবে না, কিন্তু তাদেরকে শিক্ষার জন্য স্কুলে দেওয়া যায়। এদের জন্য স্পেশাল জেল বানিয়েছে, যেগুলো আসলে জেল কিন্তু নাম দিয়েছে স্কুল, যাতে আইনগতভাবে দেওয়া যায়। ওই জেলে দিয়েছে কিন্তু ওটার নাম হলো স্কুল, সংশোধনী স্কুল বলে, কারেকশন স্কুল বলে। জিনিস হলো জেলই।
তো জেল থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, যখন বাড়িতে যাচ্ছে, বাসে যাচ্ছিল, তার পাশেই একজন বয়স্ক লোক ছিলেন, তার সাথে আলাপ পরিচয় হলো, তার কথা বলল। তার কোনো সন্তান ছিল না, আর এই ছেলের কথাবার্তা শুনে তার প্রতি একটু মায়া হলো। তিনি ছেলেটিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। তিনি বিরাট ধনী লোক, তার কোনো সন্তানও ছিল না। একে রেখেছেন, তার প্রতি একটু মায়া হয়েছে, আরামে ওখানে খাওয়া-দাওয়া করছে, তার খরচের জন্য টাকা-পয়সাও দেন।
কিছুদিন পরে আবার সে টাকা-পয়সা কিছু চুরি করে ওখান থেকে পালিয়ে গেল। আবার পুলিশ তাকে ধরল। তো পুলিশ তাকে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করল। জিজ্ঞেস করে বলল, তুমি যেখানে ছিলে ওখানে কী অসুবিধা ছিল? কোনো অসুবিধা নেই। তুমি টাকা-পয়সা পেতে না? না, যা চাইতাম তাই দিত। তুমি আরামে খাচ্ছ, টাকা-পয়সা যা চাও তা-ই তোমাকে দেয়, তাহলে তোমার অসুবিধাটা কী? তুমি কেন চুরি করলে?
তো বলল, যা চায় তাই দিয়ে দেয়, এটা একটা জীবন হলো। সে একটা জীবন চায়, সে জন্য, আনন্দে ফুর্তি পাওয়ার জন্য। সে দিয়ে দেয় এটা তার ভালো লাগে না। সে চুরি করল, ওখান থেকে চুরি করে পালাল।
তো শুনতে যদিও হাসি লাগবে, কিন্তু একঘেয়ে জিনিসটা ঠিক একটা মুসিবত। আল্লাহওয়ালাদের জীবন কখনো একঘেয়ে জীবন ছিল না। যে-কোনো জমানার অলি-আল্লাহদের জীবন যদি দেখা যায়, জীবনে এত বেশি বৈচিত্র্য পাওয়া যায় যে, সাধারণ মানুষের জীবনে এত বেশি বৈচিত্র্য পাওয়া যাবে না।
অলি-আল্লাহদের জীবনে বাদশাহীও পাওয়া যেত, ফকিরিও পাওয়া যাবে। এখান-ওখানে খামাখা মার খাচ্ছে তাও পাওয়া যাবে, রাজা-বাদশারা এসে পায়ে পড়ছে তাও পাওয়া যাবে। বাদশাহী খানা খাচ্ছে তাও পাওয়া যাবে, উপবাস করছেন তাও পাওয়া যাবে। অলি-আল্লাহদের জীবনে এগুলো খুব পাওয়া যাবে।
আল্লাহ তায়ালা অলি-আল্লাহদেরকে ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন। আর ভালো জীবনের এটা একটা অবদান যে, তার মধ্যে বৈচিত্র্য থাকতে হবে। একঘেয়ে জীবন কখনো ভালো জীবন হতে পারে না। হোক না রাজবাড়ির জীবন, ভালো লাগবে না।
আজ অত দূরে যাওয়ার দরকার নেই। আমাদের এই ঢাকা শহরের বিত্তবান পরিবারের সন্তানগুলো জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই একেবারে বঞ্চিত। না তারা খাওয়ার স্বাদ পায়, না পড়ার স্বাদ পায়। বহুদিন আগের কথা। চের্নোবিল অঞ্চলে পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটে। এই দুর্ঘটনার কারণে সেখান থেকে যেই টিনজাত দুধ আসত, সেগুলোকে বিপজ্জনক মনে করে অনেকে বাদ দিয়ে দিল।
তো আমার এক পরিচিত ব্যক্তির পরিবারের কথা বলছি। তিনি ঘরের সন্তানদের নিয়মিত দুধ খাওয়াতেন। শিশুরা দুধ খেতে চাইত না। জোর করে মাধার করে দুধ খাওয়ানো হতো। শিশুরা ভাবত যে, কেন আমাদের উপর জুলুম করা হচ্ছে। ঘরে তো আরও অনেক মানুষ আছে। তাদেরকে তো আমাদের মতো মেরে-পিটিয়ে দুধ খাওয়ানো হয় না। এজন্য তারা দুধ খাওয়া নিয়ে মন খারাপ করত।
ওই ভদ্রলোক চের্নোবিল দুর্ঘটনার পর ঘরে ঘোষণা করলেন যে, এখন থেকে আর তোমাদেরকে দুধ খাওয়ানো হবে না। এই সংবাদ শুনে শিশুদের মনে মহানন্দ। আপদ গেল। এখন থেকে আর অনিচ্ছায় দুধ খেতে হবে না। অবাক কাণ্ড হলো, সেই খুশিতে তাদের সবার স্বাস্থ্য ভালো হয়ে যায়। কারণ, তাদের কাছে দুধ ডালভাত হয়ে গিয়েছিল। পেলে খেতো বটে; কিন্তু কখনোই আনন্দ করে খেতো না।
এজন্য বলছিলাম যে, ধনী লোকেরা কখনোই ভালো জামা-কাপড় পরার স্বাদ পায় না। অথচ গরিবের সন্তান যদি ঈদের দিনে একটা জামা পায়, কত খুশি লাগে তার। কিন্তু ধনীদের এতে কোনো খুশি নেই। কিছুতে স্বাদ পায় না।
সুন্দর একটা অঞ্চলে যেরকম আঁকাবাঁকা রাস্তা হয়, সুন্দর জীবনও ওরকম আঁকাবাঁকা হয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একঘেয়ে জীবনের দোয়া করেননি; বরং বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনের দোয়া করেছেন। এক বেলা যেন খেতে পারি আর শোকর আদায় করতে পারি, আর এক বেলা যেন উপবাস করি আর সবর করতে পারি।
আমাদের এই বাংলাদেশের বেশিরভাগ লোকই পানি খাওয়ার স্বাদ কী জানে না। মরুভূমির লোকে জানে। পিপাসার পরে যখন পানি পেয়েছে, তো ওই পানিতে যে কী স্বাদ আছে ওটা তারা জানে।
মাসনুন দোয়ার মধ্যে এক জায়গায় আছে মহব্বত সম্বন্ধে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমি ঠাণ্ডা পানির চেয়েও বেশি ভালোবাসি। আমাদের কাছে এই কথার অর্থ ধরা পড়বে না, আমরা বুঝি না যে এই কথার অর্থ কী? গরম মরু অঞ্চলে যারা চলেছে, তারা জানে ঠাণ্ডা পানির চেয়ে বেশি ভালোবাসার কথাটা কী বোঝায়। আমাদের কাছে অর্থহীন, যেহেতু হামেশা ঠাণ্ডা পানি পাচ্ছি।
তো আল্লাহ তায়ালা ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন, ভালো জীবনের মধ্যে বৈচিত্র্য থাকে। ওঠানামা সব ধরনের থাকে। আমি যদি আমার পথচলা না জানি, তো প্রতেক বাঁকে গিয়ে ধাক্কা খাব। যে সাইকেল চালাতে পারে না আর গিয়েছে সুন্দর অঞ্চলে বেড়াতে, সুন্দর অঞ্চল মানেই যে সোজা রাস্তা নয়। কখনো পাহাড়, কখনো সমুদ্র, ওই সব অঞ্চলই সুন্দর হয়। একদিকে খাড়া উঁচু পাহাড় আর অন্যদিকে গভীর সমুদ্র, তার মাঝখান দিয়ে রাস্তা, ওই সব অঞ্চলই সুন্দর হয়। ক্যালেন্ডার-টেলেন্ডারে যে ছবি-টবি থাকে সুন্দর অঞ্চলের, কখনো সোজা রাস্তার ছবি পাওয়া যাবে না।
তো যে ওরকম সুন্দর অঞ্চলে গেছে, আর যদি সে সাইকেল চালানো না জানে, তাহলে প্রতেক বাঁকেই সে ধাক্কা খাবে। আর যে চালাতে পারে, প্রতেক জায়গায় সে ঠিকমতো ঘুরে চলে যাবে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এই যে সুন্দর জীবন দিয়েছেন, এই জীবনে কখনো সুস্থতা আসবে, কখনো অসুস্থতা হানা দেবে; কখনো অভাব আসবে, কখনো প্রাচুর্য দেখা দেবে; কখনো ভালোবাসা, কখনো নির্যাতন। অর্থাৎ অল্প দিনের এই হায়াতের মধ্যে সব আছে।
রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করছেন, আর মক্কার লোক প্রস্তুত হয়ে রাতে পাহারা দিচ্ছে যে, রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নাউজুবিল্লাহ কতল করবে। আর মদিনায় যখন পৌঁছাচ্ছেন, মদিনার বাচ্চারা পর্যন্ত কেউ বাইরে এসে কেউ ছাদ থেকে সবাই সংবর্ধনার জন্য রাস্তায় এসে অপেক্ষা করছে। ওই একদিন-দুই দিনের মধ্যে পার্থক্য। এ জায়গায় কতলের জন্য পরিকল্পনা করছে আর অন্য জায়গায় গোটা শহর বাচ্চারা পর্যন্ত তার ইস্তেকবালের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। আল্লাহওয়ালাদের জীবন এভাবেই হয়।
তো আল্লাহ তায়ালা বড় মেহেরবানি করে আমাদেরকে ভালো জীবন দিয়েছেন, কিন্তু শর্ত হলো যে, আমি এই ভালো জীবনে যেন চলা জানি। যখন যে অবস্থা আসে ওটার উপরে যেন আমি শোকর আদায় করতে পারি। আর যদি সে নিজেই একটা চিন্তা করে রাখে, সোজাভাবে একটা চিন্তা করে রেখেছে, আর ওই চিন্তামতো যদি সে চলতে চায়, আর আল্লাহ তায়ালা যে রাস্তা দিয়েছেন সে রাস্তায় সে ঘুরতে না পারে, তাহলে প্রতেক জায়গায় গিয়ে ধাক্কা খাবে আর ব্যথা পাবে।
কিন্তু আল্লাহ তায়ালা ওভাবে দেননি। আল্লাহওয়ালারা তাদের জীবনের বড় মেহনত হলো, আল্লাহর দেওয়া যে আমার জীবনের পথ আছে, আমি যেন সেই পথে চলতে পারি।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য তাকদীরের একটা রাস্তা দিয়েছেন, আর মানুষ নিজেই কিছু করে। সে নিজে যেগুলো চিন্তা পরিকল্পনা করে, সেটা যদি তাকদীরের সাথে না মিলে, তাহলে সে ব্যথা পায়। আমাদের দেশের পুরোনো শহরের এবং গ্রামের পুরোনো গল্প আছে যে, একজন গরিব মানুষ মাথায় ঝুড়িতে করে এক হালি ডিম নিয়ে যাচ্ছে, আর সেই ডিম মাথায় রেখেই সে কল্পনা করছে, এই ডিম ফুটবে তো বাচ্চা হবে, তারপর মুরগি বড় হবে তো আরও ডিম দেবে, তারপর আরও বিক্রি করবে তো আরও ধনী হবে, তারপর ছাগল কিনবে, তারপর গরু কিনবে ইত্যাদি ইত্যাদি, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সে কল্পনার মধ্যে বিরাট ধনী হয়ে গেল। এতক্ষণে হোঁচট খেয়ে পড়েছে আর তার ডিমগুলো ভেঙে গেল, তো মনে বড় ব্যথা পায়। এই ব্যথার কারণটা কী, বাস্তবতা এক জিনিস আর তার কল্পনা আরেক জিনিস। বাস্তবতার সাথে যদি কল্পনা মিলে যায় তাহলে ব্যথা হয় না। আর যদি কল্পনা ভিন্ন আর বাস্তবতা ভিন্ন হয়, তখনই ব্যথা পায়।
তো দুনিয়ার মানুষ যে সর্বদা বিভিন্ন সময় মনে ব্যথা পায় তার কারণ হলো যে, তার মনের কল্পনা আর আল্লাহ তায়ালার ফয়সালা মিলেনি। আল্লাহ তায়ালা তাকে যে ঘটনাগুলো দিয়েছেন, সেগুলোর সাথে তার কল্পনাগুলো মিলছে না। ধারণা করে কিছু, আর হয় অন্য কিছু। যেটা হওয়ার সেটাই যদি ধারণা করে তাহলে তার কোনো কষ্ট নেই।
অনেক অলি-আল্লাহদের জীবনীতে পাওয়া যাবে যে, তার স্ত্রী বড় বদমেজাজি, আল্লাহ তায়ালা অনেক সময় তাদের তরবিয়তের জন্য অনেক সময় কাছের লোকদের, সব নবীদের কখনো বাপ শত্রু, কখনো ছেলে শত্রু, কখনো স্ত্রী শত্রু, কখনো মুসা আলাইহিস সালামের মতো যার বাড়িতে লালনপালন হয়েছেন সেই বাড়ির সেই মালিক শত্রু। তো ভেতর থেকে, কাছ থেকে, যে সর্বদা কাছে আছে, তাকে দিয়ে অনেক সময় তরবিয়ত করা হয়। নূহ আলাইহিস সালাম, লূত আলাইহিস সালাম, তাদের নিজেদের বিবিরা তাদের বিরুদ্ধে অন্য লোকের সাথে ষড়যন্ত্র করে। তো যেরকম নবীদের হয়েছে সেরকম পরবর্তীকালে অলি-আল্লাহদেরও হয়। অনেকে ষড়যন্ত্র করে আর এর ভেতর দিয়ে তারা চলে, কিন্তু এই যে তার স্ত্রী তার বিরুদ্ধে। এজন্য আপনি কখনোই কোনো আল্লাহওয়ালাদেরকে অস্থির হতে দেখবেন না। আমাদের কেউ পেরেশান হয়ে আত্মহত্যা করে। কেউ অন্যকে হত্যা করে। এগুলো আল্লাহওয়ালাদের জীবনে নেই। এমনকি তাদের জীবনে সাধারণত বউ তালাকের মতো ঘটনাও ঘটে না।
অন্য কেউ বললো যে, হুজুর, আমরা তো দেখছি যে, বউ আপনাকে কীরকম জ্বালায়, আপনি তালাক দিয়ে দেন না কেন? উনি বললেন যে ভাই, আমি তো অভ্যস্ত হয়ে গেছি, আমার কোনো কষ্ট হচ্ছে না। তালাক দেব আর কার কাছে যাবে আর কাকে জ্বালাবে, এখানেই থাকুক, আমার কোনো কষ্ট হচ্ছে না। আসলে বুঝতে পারছি যে আল্লাহ তায়ালা আমার কাছে রেখেছে আমার তরবিয়তের জন্য, আর যেহেতু আমার তরবিয়তের জন্য, আর ঘুরেফিরে আমারই মঙ্গল, তো শোকর আদায় করি। তো যে আল্লাহর তাকদীরের সাথে চলতে পারবে, বিভিন্ন ঘটনা আসবে আর সব অবস্থায় সে আল্লাহর শোকর আদায় করবে। আর যে তাকদীরের সাথে চলতে না পারে, সে সর্বদা হায় হায় করবে, পেরেশান হবে। তো আল্লাহ তায়ালা বড় মেহেরবানি করে আমাদেরকে দীন দিয়েছেন।
দীনের মেহেনতের মানে এটা নয় যে, সেরকম বলছিলাম যে পাহাড় কেটে সোজা রাস্তা বানাবে, যেন সহজে বাড়ি যেতে পারি; বরং রাস্তা তো যেরকম আঁকাবাঁকা আছে সেরকম আঁকাবাঁকাই থাকে, আমি যেন আমার পথচলাকে সংশোধন করতে পারি। যেন এই বাঁকের সাথে সাথে আমি চলতে পারি, আমার যাওয়া বড় আরামে বড় সুন্দরভাবে হয়ে যাবে। যেরকম ওই ভ্রমণকারীরা যায়, পাহাড়ে গায়ে চলছে সাইকেলেই হোক আর গাড়িই হোক, আঁকাবাঁকা রাস্তা, কিন্তু সে বড় আনন্দের সাথে চলে। ডানেও তাকায় বামেও তাকায়, তার খুশি লাগে, সুন্দর লাগে, যেহেতু চালাতে পারে সেহেতু গাড়ি পড়েও যাচ্ছে না আর পাহাড়ের সাথে ধাক্কাও খাচ্ছে না। তো জীবন যদি আমার পথ চলতে পারে, পড়বেও না আর ধাক্কাও খাবে না, আর সব অবস্থায় সে শোকর আদায় করতে পারবে। বড় আনায়াসে চলতে পারবে। তো আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দীন দিয়েছেন যে, আল্লাহর দেওয়া ওই পথে যেন আমরা আনায়াসে চলতে পারি। আল্লাহর দেওয়া তাকদীরের সাথে যেন চলতে পারি। যে তাকদীরের সাথে চলতে পারে, হরেক অবস্থায় সে দেখবে যে, তার ইচ্ছা আল্লাহ তায়ালার ফয়সালার সাথে মিলে গেছে। কোথাও কোনো বিরোধ নেই।
তো মশহুর কথা বাহলুল্লাকে কেউ জিজ্ঞাসা করলেন যে, বাহলুল, কেমন আছ? বাহলুল বললেন যে, তার কথা কী জিজ্ঞাসা কর, যার ইচ্ছায় জগৎ চলে। তিনি বললেন, তুমি কি রুবুবিয়াত দাবি করছ না-কি, তুমি কি রব হয়ে গেছ যে তোমার কথায় জগৎ চলে। তো তিনি বললেন, না, আমি রুবুবিয়াত দাবি করছি না; আমি আবদিয়াত দাবি করছি। আমি আল্লাহর বান্দা হয়ে গেছি। সম্পূর্ণ বাধ্য অনুগত বান্দা হয়ে গেছি। আল্লাহ যা চায় আমি তাই চাই। কখনো ভিন্ন কিছু চাই না। আর যেহেতু সম্পূর্ণ জগৎ আল্লাহর ইচ্ছামতোই চলে আর আমারও ওই একই ইচ্ছা, তো সম্পূর্ণ জগৎ আমার ইচ্ছামতোই চলে। আল্লাহ তায়ালা আমাকে বাদশাহি দিয়ে দিয়েছেন। বিভিন্ন যুগে আল্লাহ তায়ালা এভাবে রাজত্বও দিয়ে থাকেন, যেন বান্দা সর্বাবস্থায় শুকরিয়া আদায় করে।
সা'আদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু শেষ জীবনে অন্ধ হয়ে গেলেন। মুস্তাজাবুদ দাওয়াত ছিলেন; তাঁর দোয়া কবুল হতো। সে জন্য অনেকে তাঁর কাছে দোয়া চাইতে আসত। অনেকের জন্য দোয়া করতেন, তাদের কাজও হয়ে যেত। কেউ তাঁকে একবার বললো, অন্যদের জন্য দোয়া করেন আর তাদের কাজ হয়ে যায়, আপনি একবার আপনার নিজের দৃষ্টির জন্য দোয়া করেন না কেন, যাতে আপনার অন্ধত্ব দূর হয়ে যায়, দৃষ্টি পেয়ে যান? তিনি বললেন যে, আল্লাহ তায়ালা আমাকে যে নেয়ামত দিয়েছেন, আমার নিজের চেয়ে নেওয়া জিনিসের চেয়ে সেটা ভালো। দোয়া করতেই রাজি না। আল্লাহ তায়ালা আমাকে পছন্দ করে আমাকে একটা নেয়ামত দিয়েছেন, আমি সেটাই উপভোগ করি, সেখান থেকেই ফায়দা নিই, দোয়া করে আমি ভিন্ন জিনিস চাইব কেন? আমার চাওয়া সেটা আল্লাহর চাওয়ার তুলনায় অনেক নিম্নমানের, আল্লাহর দান অনেক উন্নতমানের, আমি ভিন্ন চাইব না। তো দোয়া করতে রাজি হলেন না।
আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু আনহু, বহুত নামকরা সাহাবি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে কদর করতেন, বিভিন্ন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনার বাইরে গেছেন এই আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু আনহুকে মদিনার আমির বানিয়ে। কয়েকবার এরকম হয়েছে। তিনি অন্ধ ছিলেন, সম্পূর্ণ জীবনে একবার এ কথা পাওয়া যায় না যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন বা নিজেই দোয়া করলেন যে, আমি যেন দৃষ্টি পেয়ে যাই। ওই অন্ধই থাকলেন। অন্ধ থাকা অবস্থায় বিভিন্ন জিনিস চেয়েছেন, আল্লাহ তায়ালা তা দিয়েছেন, মদিনার আমির তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই বানালেন, সেটা তো তিনি চাননি। শেষ জীবনে তাঁর শখ হলো যে তিনি জিহাদেও যাবেন, শহীদও হবেন। অথচ অন্ধ, দুনিয়ার কোনো বাহিনীতে কোনো অন্ধ ব্যক্তিকে কেউ সিপাহি হিসেবে গ্রহণ করবে না। কিন্তু তাঁর ইচ্ছা। উমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে বললেন যে, আমি জিহাদে যাব, কিন্তু যেহেতু আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু আনহু বহুত নামকরা সাহাবি, উমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তাঁর ইচ্ছাকে কবুল করলেন। ঠিক আছে, পাঠালেন, আপত্তি করলেন না। কারণ, তাঁর খুব কদর ছিল। তিনি চেয়েছেন তো নিশ্চয়ই জিহাদে যাবেন, বাধা দিলেন না। আর এই কথা বললেন না যে, তুমি জিহাদে গেলে তুমিও কিছু করতে পারবে না, আর বাকি মানুষের জন্য ঝামেলা হবে। তোমাকে কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে, অন্ধ মানুষকে নিয়ে চলাফেরা করা তো মুশকিল। তাঁকে জিহাদে পাঠালেন। আর যেহেতু তিনি কোনো তুচ্ছ ব্যক্তি না, আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু আনহু, উমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তাঁকে একটা অংশের সেনাপতি বানিয়ে পাঠালেন। কাদেসিয়ার যুদ্ধে প্রধান সেনাপতি নয়, প্রধান সেনাপতি ছিলেন সা'আদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু, একটা অংশের তিনি সেনাপতি ছিলেন। আর তাঁর হাতে পতাকা ছিল, আর পতাকা থাকা মানে হলো তিনি পরিচালনা করবেন যে বাহিনী কোন দিকে চলবে। তো সম্পূর্ণ বাহিনীকে পথ দেখাচ্ছেন যিনি তিনি নিজে অন্ধ। আল্লাহ তায়ালা তাঁর হাতে ফাতাহও দিলেন, আর তাঁকে শাহাদাতও দিলেন। তো বান্দা যদি চলতে জানে, তো বাঁকের সাথেই চলতে পারবে আর বহুত উপরে পৌঁছে যাবে।
দুনিয়াতে আমরা দেখি কিছু কিছু বড় পাখি আছে, ওই ঈগল ইত্যাদি, বহুত উপরে যায়। এই পাখিগুলো কিন্তু তারা ফড়িংয়ের মতো দ্রুত ডানা চালায় না। অপর দিকে ফড়িংয়ের মতো চড়–ইয়ের মতো কিছু পাখি আছে, খুব দ্রুত ডানা চালায়, এরা বেশি উপরে আর যেতে পারে না। আর ওই বড় পাখিগুলো আনায়াসে ডানা মেলে দিয়ে বাতাসের মধ্যে যেন শুয়ে থাকে আর বহুত উপরে চলে যায়। তাদের জ্ঞান হচ্ছে যে বাতাসে কিছু স্রোত আছে, ওই স্রোতের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নেয়, নিজেকে কোনো পরিশ্রম করতে হয় না, ওই স্রোতই তাকে বহুত উপরে নিয়ে যায়। তো পাখিগুলোকে যেরকম তার স্রোত উপরে নিয়ে যায়, প্রত্যেক বান্দা যদি আল্লাহর তাকদীরের স্রোতের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নেয়, তাহলে বান্দাকে কোনো পরিশ্রম করতে হবে না। আল্লাহর তাকদীরই তাকে বহুত উপরে নিয়ে যাবে। বান্দা শুধু সঠিক নিয়তে, হালাল উপায়ে চলবে, আল্লাহর তাকদীরের সাথে চলবে, বান্দা বহুত উপরে পৌঁছে যাবে।
প্রতিদিন আমরা নিয়ত করি ইনশাআল্লাহ যে, এক তো হলো আল্লাহর মেহেরবানি, প্রতিদিন তো ৫ ওয়াক্ত নামাজ তো পড়িই। যাদের অনেক সময় নামাজের মধ্যে, নামাজ তো পড়ি কিন্তু অনেক সময় জামাতে ছুটে যায়, আবার নতুন করে পাকা করে নিয়ত করি জামাত যেন না ছুটে। জামাতে নামাজ পড়ব ইনশাআল্লাহ।
আর প্রতিদিন কিছু না কিছু সময় দেব দাওয়াতের কাজে, যত অল্পই হোক। ব্যস্ততার সময় হয়তো কম সময় দিলাম, কিন্তু একেবারে যেন বাদ না পড়ে যায়।
যেরকম ব্যস্ততার সময় একজন নামাজি লোক, অন্য সময় তো লম্বা সূরা দিয়ে নামাজ পড়বে, ব্যস্ততার সময় ছোট সূরা দিয়ে নামাজ পড়ুক, সফরের সময় ছোট সূরা দিয়ে নামাজ পড়বে, জামাত ছাড়বে তো না।
ওইরকমই কোনো কারণে ছাত্রদের পরীক্ষা থাকতে পারে বা অন্য কোনো অসুবিধা থাকতে পারে, যে অসুবিধার কারণে সময় হাতে নেই, বেশি সময় গাশত করতে পারছি না, কিন্তু অল্প সময় দেব।
আল্লাহ তায়ালা সবাইকে তাওফিক নসিব করুন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
দুআ কবুল না হওয়ার কারণ: আমরা কি ভুল চাইছি?
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] أعوذ بالله من الشيطان الرجيم. بسم الله الرحمن الرحيم مَنۡ عَمِلَ صَالِح...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
০
ত্যাগের বিনিময়ে সম্পর্ক: উম্মতের মহব্বতের বুনিয়াদ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] স্থান: গাউসনগর জামে মসজিদ, ইস্কাটন রোড, ঢাকা তারিখ: ৯ জুন ২০০৬,বেলা:৩.৩...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
৭০
দ্বীন ও দুনিয়া
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] দুনিয়ার সব মানুষের কাজকর্ম ও চেষ্টা-পরিশ্রমকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—এক...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
৯৩
কুরআন জীবিত হয় মুমিনের দিলে
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] আলেমদের মজমা তারিখ: ১১ অক্টোবর ২০১০ | স্থান: রংপুর | بِسْمِ اللهِ الرَّ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
৮৪
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন