কুরআন জীবিত হয় মুমিনের দিলে
কুরআন জীবিত হয় মুমিনের দিলে
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত]
আলেমদের মজমা
তারিখ: ১১ অক্টোবর ২০১০ | স্থান: রংপুর |
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
إِنَّا سَنُلْقِي عَلَيْكَ قَوْلًا ثَقِيلًا
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قُولُوا لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ تُفْلِحُوا
মনে করুন, দুনিয়াবি পরিবেশে যেরকম হয়ে থাকে। খুব নামকরা গায়কের গানের অনুষ্ঠান। হাজার হাজার টাকা দামের টিকিট বিক্রি হয়েছে। সিট বুক করা হয়েছে। শ্রোতারা যখন এসেছে, তখন কোনো কারণে বলা হলো যে গায়ক অনুপস্থিত। কিন্তু কোনো অসুবিধা নেই। গানগুলোর যে কথা আছে, কাগজে ছাপা শিটে আছে। সেই শিট আপনাদের দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অতএব এতে কোনো অসুবিধা নেই।
হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কিনেছে গান শোনার জন্য। গানের বদলে যদি গানের কথাগুলো ছাপা কাগজের মধ্যে দিয়ে দেয়, তাহলে শ্রোতারা কি এতে সন্তুষ্ট হবে?
গানের কথার জন্য আসেনি, গানের জন্য এসেছে। গান আর গানের কথা এক জিনিস নয়। কথা আসলে গানের এক জিনিস তো নয়ই; বরং অংশ হিসেবে যদি বলা যায়, তাহলে শতভাগের বা হাজার ভাগের এক অংশ কিনা তা-ও সন্দেহ আছে।
গান হচ্ছে তার সুর। গায়ক যখন গায়, তার কণ্ঠ থেকে যে সুর বের হয়, যার মনের ওপর একটা প্রভাব পড়ে, ভালো লাগে। কখনো কখনো চোখেও হয়তো পানি আসে। তো সেটা কথার কারণে নয়। অনেক সময় কথাগুলো সে কিছুই বুঝে না, কখনো কখনো বিদেশি ভাষারও থাকে। আর অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ করে ভারতীয় সংগীতে, যেরকম প্রাচীন ভারতীয় ক্লাসিক্যাল সংগীতের মধ্যে কথা প্রায় একই। কখনো কখনো দুই-এক শব্দ উলটপালট করতে থাকে। আর কথাগুলো যে দুই-এক শব্দ, যেটা আছে একেবারে নগণ্য শব্দ।
তো গান আর কথা—এটা তো আমরা বুঝি। বুঝা খুব কঠিন কাজ নয়।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কুরআন শরীফকে বা হাদীস শরীফকে মনে করি যে, এই কথাই কুরআন আর হাদীসের এই কথাই হাদীস। গানের কথা যেরকম গানের নগণ্য অংশ, কুরআন শরীফের কথাও কুরআন শরীফের নগণ্য অংশ। হাদীসের কথা হাদীস শরীফের নগণ্য অংশ। এই কথায় কোনো আসর পড়ে না, এর কোনো ওজন নেই। আল্লাহ তাআলা যে কথা দিয়েছেন, সেটা বড় ভারি।
উতবা ইবনে রবিয়া কুরাইশের সরদার। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কিছু প্রস্তাব নিয়ে এলো কুরাইশের পক্ষ থেকে। "তুমি যদি এই দাওয়াত বন্ধ করো, আর বিনিময়ে তুমি যদি চাও—নারী দেব, সম্পদ দেব, ক্ষমতা দেব" ইত্যাদি।
তার কথা শেষ হওয়ার পর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমার কথা শেষ হয়েছে?"
বললেন, "হ্যাঁ।"
তো রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন। আর উত্তরে কুরআন শরীফের আয়াত তিলাওয়াত করলেন:
حم (১) تَنزِيلٌ مِّنَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (২) كِتَابٌ فُصِّلَتْ آيَاتُهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لِّقَوْمٍ يَعْلَمُونَ (৩)
পড়তে থাকলেন। যখন পৌঁছালেন এই আয়াতে:
فَإِنْ أَعْرَضُوا فَقُلْ أَنذَرْتُكُمْ صَاعِقَةً مِّثْلَ صَاعِقَةِ عَادٍ وَثَمُودَ
উতবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখের ওপর হাত দিয়ে চেপে ধরলো। বললো, "থামো!"
অস্থির হয়ে, পেরেশান হয়ে। "থামো, থামো, থামো!" আর সেখান থেকে চলে গেলো।
যখন ফিরে এসেছে, তখন কুরাইশের সরদাররা, যারা অপেক্ষা করছিল—তারা দূত হিসেবে পাঠিয়েছে, কী উত্তর নিয়ে আসে—তারা চেহারা দেখেই বুঝতে পেরেছে যে এ তো সেই উতবা নয় যে উতবা গিয়েছিল। তার চেহারা বদলে গেছে। ভীত, বিবর্ণ হয়ে গেছে।
জিজ্ঞেস করলো, "কী কথা নিয়ে এসেছো?"
উত্তর কিছুই দিতে পারলো না।
বললো, "আমি কী বলেছি, আমি কিছুই বুঝতে পারিনি।
আমার বড়ই ভয় লেগেছে। আর একটা শেষে বুঝতে পেরেছি যে আদ এবং সামুদ জাতির যে পরিণতি, সেই পরিণতির আমাকে ভয় দেখিয়েছে। তবে তার (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) কথা আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। আমার খুব ভয় লেগেছে।"
তারা উত্তরে বললো, "আরে, আরবীতে একজন তোমার সাথে কথা বললো আর তুমি কিছু বুঝলে না!"
উত্তরে উতবা বললেন, "হ্যাঁ, আরবীতে বলেছে। আমি কিছুই বুঝিনি। কিন্তু আমার বড় ভয় লেগেছে।"
কথা বুঝলো না কিছুই। ভয় লাগলো কিসের?
তার কথার মধ্যে নয়। এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বলার মধ্যে। পার্থক্য এটা যে, গায়ক গায় গলা দিয়ে, কণ্ঠ দিয়ে। আর দীনের কথাগুলো যেগুলো বের হয়, দিল থেকে। গলার সুর নয়; বলা যেতে পারে, এটা কলবের একটা সুর। আর সেটাই আসল।
গানের যেরকম কথা নগণ্য জিনিস, খুবই ছোট অংশ, তো কুরআন শরীফের কথাও সেরকম খুবই ছোট অংশ।
তার শক্তি তো আসলে যে পড়েছে, তার দিলের মধ্যে। গানের শক্তি যেমন গায়কের কণ্ঠে আর গলায়, এখানে যে বলছে তার দিলে। সেখানেই শক্তি।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের ঘটনা
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু যাচ্ছিলেন। জাজান নামের একজন নামকরা গায়ক, সে তার গানের কণ্ঠে গান গাচ্ছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন তার গলা শুনলেন—কী সুন্দর সুরে গান গাচ্ছে—বললেন, "এই গলা দিয়ে যদি আল্লাহর কিতাবের তিলাওয়াত করতো!" বা এরকম সংক্ষিপ্ত একটা উক্তি বলে, নিজের চেহারার ওপর চাদর ঢেলে চলে গেলেন।
এ কথা জাজানের কানে পড়লো। জিজ্ঞেস করলো, "ইনি কে?"
"উনি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ।"
ব্যস, এইটুকু।
তার অস্ত্রশস্ত্র ভেঙে, গানের সংগীতের যে সরঞ্জাম, যে যন্ত্র ছিল, ভেঙেটেঙে ফেলে দিয়ে তওবা করলো। আর মুহূর্তের মধ্যে জাজান অন্য ব্যক্তি। আগের জাজান আর নেই।
এটা কি তাঁর কথায়? এই কথা তো আমিও বলতে পারি: "এই গলা দিয়ে যদি গান না গেয়ে কুরআন শরীফ পড়তো।" কোনো গায়ককে শোনাই। তার তো কানেও পড়বে না।
এই কথার মধ্যে যে শক্তি, সেটা শব্দগুলোর মধ্যে না। এটা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের বলার মধ্যে। আর এটাও বলা যেতে পারে যে তাঁর নামের মধ্যেও। কারণ সে তো জিজ্ঞেস করেছে, "ইনি কে?" আর যখন শুনেছে "আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ", তো দিল কেঁপে গেছে। সেই নাম, সেই ব্যক্তি, তাঁর দিল থেকে যখন বের হবে, তার ওজনই আলাদা।
মালেক বিন দীনারের ঘটনা
মালেক বিন দীনার রহমাতুল্লাহি আলাইহি যাচ্ছিলেন। এক জায়গায় একজন যুবক বাড়ি বানাচ্ছিলেন। ধনী ব্যক্তি। বড়সড় ধরনের ধুমধামসহ বাড়ি বানাচ্ছেন। মালেক বিন দীনার রহমাতুল্লাহি আলাইহি দেখলেন। আর মনে বড় ব্যথা লাগলো যে, এরকম একটা জিনিসের পেছনে তার জীবন নষ্ট করে দিচ্ছে। তার কাছে গেলেন। আর গিয়ে বললেন, "তুমি এই বাড়ি বানানোর জন্য কত টাকা খরচ করবে?"
সে বললো, বড় একটা অঙ্ক, যেহেতু বড় বাড়ি।
মালেক বিন দীনার রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাকে প্রস্তাব দিলেন, "তোমার এই টাকা আমাকে দিয়ে দাও। আর বিনিময়ে আমি জান্নাতে একটা বাড়ি দেব, এর চেয়ে আরও ভালো। যার তলদেশ দিয়ে জান্নাতের নহর বয়ে যাচ্ছে।"
সে বললো, "আমি একটু ভেবে দেখি। আগামী দিন আপনার কাছে আমি আবার আসব।"
রাতে দোয়া করলেন। পরের দিন আবার গেলেন। সে জিজ্ঞেস করলো, "কথা কি পাকা?"
বললেন, "হ্যাঁ।"
কাগজ-কলম এনে দিলো। "লিখে নাও।"
লিখে দিলেন। সে তার সম্পূর্ণ টাকা দিয়ে দিলো।
এই দিনাজপুর-রংপুরে হয়তো অনেকে বাড়ি বানাচ্ছে। হুবহু এ কথাগুলো প্রস্তাব দিন যে, "আমাকে তোমার টাকাগুলো দিয়ে দাও। আর বিনিময়ে জান্নাতে বাড়ি দেব।" তো দেখো কী উত্তর দেয়। সব টাকা দিয়ে দেবে?
তো কথা তো সেটাই। পার্থক্য কী? সব টাকা দিয়ে দেবে? তো কথাই।
জিনিসটা কী? কথা, শব্দের মধ্যে নয়; সেই ব্যক্তির মধ্যে। সেটা মালেক বিন দীনার হতে হবে। তা না হলে হবে না। আর আমি যদি সেই আসর করতে চাই, তাহলে আমাকেও নিজেকে মালেক বিন দীনার বা সেই জাতীয় কিছু একটা বানাতে হবে। আমাকে হতে হবে। সেই শব্দ উচ্চারণ করলে হবে না।
কথাকে ইলম মনে করা বড় আফসোস
বড় আফসোস যে, বর্তমান দুনিয়ায় মানুষ এই কথাগুলোকেই ইলম মনে করে। বা এটাকেই মনে করে যে এটাই সব। "কুরআন শরীফের কথা শিখলাম, কুরআন শরীফ শিখে ফেলেছি। হাদীসের কথাগুলো শিখলাম, হাদীস শরীফ শিখে ফেলেছি।" হাদীসের তো কোনো ধারণাই তার কাছে নেই। কুরআন শরীফের তো কোনো ধারণাই তার কাছে নেই।
যেমন সে দাবি করছে, "আমি হাদীস জানি।"
তার প্রাণ তো সেই শক্তির মধ্যে, যা দিলকে কাঁপিয়ে দেয়।
বাঘ চেনার উদাহরণ
একটা বাঘকে জানার অনেকগুলো স্তর আছে।
বাঘের ওপর বই পড়েছে। একেবারে বড় বিস্তারিত তিন খণ্ড বই বাঘের ওপর। কিন্তু বাঘের একটা ছবিও সে দেখেনি। সে সম্পূর্ণ বই পড়ার পরেও বাঘ সম্পর্কে তার জ্ঞান খুবই অল্প।
আর একজন মাত্র একটা ছবি দেখেছে। কোনো বই পড়েনি। তার জ্ঞান তার চেয়ে বেশি। কারণ এটার সূরত, একটা ছবি দেখেছে।
আর একজন টেলিভিশনের স্ক্রিনের মধ্যে জঙ্গলে চলন্ত অবস্থায় বাঘকে দেখেছে। তার জ্ঞান আরও বেশি।
আর একজন চিড়িয়াখানার খাঁচার মধ্যে বাঘ দেখেছে। তার জ্ঞান আরও বেশি। বিভিন্ন স্তরে।
আর আরেকজন, সে বললো যে, "তোমরা কেউ আসল বাঘকে চেনো না। আমি চিনি। যে বই পড়েছে, তোমার জ্ঞানও বড় দুর্বল। যে ছবি দেখেছে, তারটাও বড় দুর্বল। যে স্ক্রিনে দেখেছে, তারটাও দুর্বল। যে চিড়িয়াখানায় বাস্তব বাঘকে খাঁচায় দেখেছে, তারটাও দুর্বল। আসল বাঘ আমি জানি।"
তো সে কী? সুন্দরবনে যখন সন্ধ্যা নামছিল, আর আমাদের নৌকাও ভাটার কারণে আটকে গেছে, আর অন্ধকার নেমে আসছে, সেই সময় যখন গর্জন শুনেছিলাম, তখন আমি জানি যে বাঘ কাকে বলে।
তো সে বাঘ সম্বন্ধে পড়েওনি, ছবিও দেখেনি, চিড়িয়াখানার বাঘও দেখেনি। আর সুন্দরবনে গিয়ে বাঘের গর্জন শুনেছে। বাঘের ছবি পর্যন্ত সে জীবনে কখনো দেখেনি, বাঘ তো দূরের কথা, চিড়িয়াখানায় বাঘ দেখেনি। আর বলছে, "আসল বাঘ কী, আমি জানি।" এবং তার কথা যথেষ্ট সত্য।
না দেখেও সে বাঘকে যা জানে, আর একজন চিড়িয়াখানায় জ্যান্ত বাঘ দেখেও তা জানে না। কারণ বাঘ তো এই আকৃতির নয়, চিড়িয়াখানায় খাঁচার মধ্যে দেখা যাচ্ছে। বাঘ তো সেই জিনিস যা দিলকে কাঁপায়। তো যদিও সে দেখেনি, কিন্তু তার দিল যখন কেঁপে উঠেছে, বাঘ সম্পর্কে তার বেশ কিছু জ্ঞান হয়ে গেছে।
তো কুরআন শরীফ এই কথাগুলো নয়, যেগুলো ছাপার মধ্যে আছে। আসল হলো সেটা, যে দিলকে কাঁপায়। আর সেটা হওয়ার জন্য সেই দিল তার হতে হবে, যে কাঁপাতে পারে।
কুরআন মুমিনদের দিলে রেখে গেছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত সব মানুষ কুরআন শরীফের, হাদীস শরীফের কথাগুলো জানে। আর মনে করে, "আমি কুরআন শরীফ জানি, হাদীস শরীফ জানি।" অথচ তার মধ্যে কিছুই নেই। খুবই অল্প।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন শরীফ রেখে গেছেন মুমিনদের দিলে। দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। কিতাবের আকারে নিজের তত্ত্বাবধানে এটা রেখে যাননি। আর এটাকে সংকলন করার জন্য কোনো আদেশও দেননি।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর জামানায় এই প্রস্তাব নিয়ে আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এলেন যে, কুরআন শরীফকে একসাথে সংকলন করা হোক। আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু এই উত্তর দিয়েছিলেন, "আমি কি সেই কাজ করব, যে কাজের আমাকে আদেশ দেওয়া হয়নি!"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কুরআন শরীফ মানুষের কাছে পৌঁছানো। এই জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে। যেটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রধান দায়িত্ব, যে জন্য দুনিয়ায় তাঁকে পাঠানো হয়েছে—সেই কুরআন শরীফ—তিনি নিজেও সংকলন করলেন না, আর সংকলন করার আদেশও দিলেন না। তো সারা জীবন করলেন কী? কুরআন শরীফই যদি এটা রক্ষণাবেক্ষণের কোনো ব্যবস্থায় কিছু দিলেন না, তাহলে করলেন কী?
তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পাতার মধ্যে কুরআন শরীফকে এভাবে জানতেনও না, এটাকে গুরুত্বও দেননি, আর এটাকে পাতার মধ্যে লিখে দেওয়ার কোনো আদেশও দেননি। যদি এটার বিশেষ এমন কোনো গুরুত্ব থাকতো, নিজেই করতেন, বা কমপক্ষে আদেশ তো দিতেন। কোনোটাই করেননি। কুরআন শরীফকে যেখানে লেখার, সেখানে লিখে দিয়ে গেছেন।
সাহাবাদের দিলের মধ্যে। আর সেটা দিল থেকে দিলের ভেতরে যাবে, তবেই সেটা কুরআন শরীফ হবে, আর না হলে হবে না। এটার কোনো প্রাণ নেই।
আব্দুল্লাহ ও কংকালের উদাহরণ
আব্দুল্লাহ নামের বড় বিখ্যাত, সুদর্শন কোনো এক ব্যক্তি। দূর দেশ থেকে নাম শুনেছে যে আব্দুল্লাহ বড়ই সুন্দর, আব্দুল্লাহকে দেখবে। ইতিমধ্যে আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করে ফেলেছে। লম্বা সফরের পরে যখন এসে পৌঁছালো, লোকে বললো, "আব্দুল্লাহর তো ইন্তেকাল হয়ে গেছে।"
"তো কোথায়?" "দাফন করা হয়েছে। কবরের ভেতরে।"
"তো আমি দেখবই। কারণ এত সুন্দর, এত নাম শুনেছি, দূর দেশ থেকে এসেছি। না দেখে আমি ফিরে যাচ্ছি না। কবর খুঁড়ে দেখব।"
তো কবর থেকে কঙ্কাল বের করলো আব্দুল্লাহর। আর কঙ্কাল বের করে হতাশ হলো। "আমি ভেবেছিলাম কতই না সুন্দর হবে। এই কঙ্কাল তো কিছুই না।"
তো আব্দুল্লাহ তো আর কঙ্কাল নয়। যে আব্দুল্লাহ সম্বন্ধে শুনেছে, সেই সুন্দর আব্দুল্লাহ তো সে দেখছে না। আর কঙ্কালকে যদি আব্দুল্লাহ মনে করে, তো বড় ভুল ভেবেছে।
তো শব্দগুলোকে যদি কুরআন শরীফ মনে করে, হাদীস শরীফের শব্দগুলোকে যদি হাদীস শরীফ মনে করে, তো সেরকমই হয়েছে। কারণ এটা নিষ্প্রাণ শব্দ। কঙ্কাল যেরকম একটা নিষ্প্রাণ জিনিস। আব্দুল্লাহ তো—তার রক্ত আছে, মাংস আছে, অনুভূতি আছে, প্রাণ আছে, কথা আছে। তো দীন সেই জিনিস।
আল্লাহ তাআলা বড় মেহেরবানি করে আমাদের দীন দিয়েছেন, দীনের কথা দিয়েছেন। এই কথাই—সেই দীনদার ব্যক্তিই যেটাই বলুক না কেন, সেটাই দীন।
মেহনত ও সোহবতের মাধ্যমে প্রাণ নিতে হবে
তো মেহনত করে তার কাছে প্রাণ নিতে হবে। আর এটা মেহনতের ভেতরে আর সোহবতের ভেতর দিয়ে আসে।
কুরআন শরীফ বুঝতে হলে কুরআন শরীফের মেহনত লাগবে।
মেহনত যখন করবে, আল্লাহ তাআলা সেটা দিলের ভেতর ঢেলে দেবেন। কুরআন শরীফওয়ালার সাথে যখন থাকবে, তো তার দিল থেকে দিলের ভেতর আসবে।
গান যেমন—সুর তুলে শুনতে চাই, তাহলে সুর শুনে সুর নিতে হবে। এটা কথা থেকে আসবে না।
কেউ যদি এটার মেহনত করে, তার নিজের ভেতর সেটা অর্জন করে, আর সেই ব্যক্তি যদি এসে যায়—সে যদি কুরআন শরীফ নাও পড়ে, কোনো কথা বলে—একজন যদি গায়ক হয়, আর তার যদি গানের বদলে এমনি কোনো একটা কথাকে সুর দিয়ে বলে, সেটাই গান হয়ে যায়। হয়তো সে গান গাওয়ার ইচ্ছাও করেনি।
কিন্তু যেহেতু তার গলায় সুর আছে, এমনি একটা তুচ্ছ কথাকে সে সুর দিয়ে বললো, সেটাই সুর হয়ে যায়, সেটাই গান হয়ে যায়।
গাঙ্গুহি রহমাতুল্লাহি আলাইহির তাবিজের ঘটনা
এ ধরনের কথা। গাঙ্গুহি রহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে এক ব্যক্তি গিয়েছে তাবিজ আনার জন্য। সে তার গ্রামে এক মহিলাকে বিয়ে করতে চায়। তার পরিবার আর মহিলার পরিবার—দুই পরিবারের মধ্যে বহুদিনের দ্বন্দ্ব। এ জন্য এই বিয়েতে কোনো পক্ষই রাজি নয়। নিজের পক্ষও রাজি নয়, মেয়ের পক্ষও রাজি নয়। আর সেও বিয়ে করবেই। কোনো উপায় না পেয়ে কে বুদ্ধি দিয়েছে, কোথায় কী জানি শুনেছে যে, "গাঙ্গুহি রহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে তাবিজ নিয়ে এসো, তাহলে বিয়ে হয়ে যাবে।"
তো তাঁর কাছে গিয়েছে। গিয়ে বলে, "আমাকে তাবিজ দেন এই বিয়ের জন্য।"
উনি বলেন, "বিয়ের কী আবার তাবিজ আছে? মুফতি মানুষ, ফতোয়া দিতে জানেন। বিয়ের আবার কোনো তাবিজ!"
অনেক চেষ্টা করলেন তাকে সরানোর। কিন্তু নাছোড়বান্দা, সে যাবেই না। সে তাবিজ নিয়েই যাবে। তো নিরুপায় হয়ে—জানেন তো, বাধা দেবেই—তাবিজ দিলেন।
তাবিজ নিয়ে এসেছে। গ্রামে যখন পৌঁছেছে, নিজের পক্ষ আর মেয়ের পক্ষ—দুই পক্ষকে একত্রিত করেছে বিয়ে দেওয়ার জন্য। বিয়ে হয়ে গেলো।
ঘটনা খুব চর্চা হলো গোটা অঞ্চলের মধ্যে। "কী সাংঘাতিক তাবিজ!" আরও যারা তাবিজ-টাবিজ দিয়ে থাকেন, এসব কিছু তো প্র্যাকটিস ইত্যাদি করেন, তাদের খুব আগ্রহ হলো যে, "এরকম পাওয়ারফুল তাবিজ, এটা জানা দরকার। আমরা প্রয়োজনমতো সেই তাবিজ দেব।"
তাকে তার কাছে জানতে চাইলো, তাবিজটা চাইলো যে, "এটা খুলে একটু দেখব, এর মধ্যে কী লেখা আছে।"
সে দিতে রাজি না। কারণ তার ভয় যে, "তাবিজ খুলে গেলে বিয়ে যদি খুলে যায়!" (মজলিসে হাসি)
শেষ পর্যন্ত কোনো একটা সুযোগমতো তাকে ধরে, জোর করে তার হাতের তাবিজ খুলে, তারপর তাবিজটা বের করেছে। কী লেখা?
দেখে সেখানে লেখা আছে: "মে কুছ জানতা নেহি, ও মুঝে ছোড়তা নেহি।" (মজলিসে হাসি)
এই কথা লেখা আছে। "আমি কিছু জানি না, আর সে আমাকে ছাড়ে না।" নিজের জান ছুটানোর জন্য লিখে দিয়েছে।
তো যাই বলুক, গাঙ্গুহি যদি লিখেছে, তো কাজ হয়েছে। কারণ গলায় সুর আছে। যাই বলুক না কেন, সুর আছে।
শায়খুল হিন্দ রহমাতুল্লাহি আলাইহির জিন তাড়ানোর ঘটনা
মাহমুদুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি—যাঁকে শায়খুল হিন্দ বলা হয়—তাঁর কাছে কেউ এসেছে। তার বাড়ির কেউ—ছেলে-মেয়ে, কেউ যেন—পরিবারের কেউ জিনে ধরা। অনেক চেষ্টা-তদবির করেছে, কিন্তু বড় কঠিন জিন, ছোটানো যায় না। আবার কিছু উপদ্রব করেছে।
তো সে তাঁর কাছে এসেছে। উনি বলছেন, "ভাই, আমি এগুলো তদবির জানি না। একটা বিশেষ ধরনের তদবির শিখতে হয়, জানতে হয়, কোনটায় কী হয়। আমি তো এগুলো জানি না।"
কিন্তু সে বারবার করে অনুরোধ করছে যে, "আমি বিপদে পড়েছি, আমাকে উদ্ধার করুন।"
তো কোনো উপায় না পেয়ে তাকে বললেন, "তাকে গিয়ে বলো যে মাহমুদ পাঠিয়েছে, বলেছে যে যেন ছেড়ে দেয়।"
তো সে—দেখো—আবার যখন তাকে জিনে ধরেছে, সে বললো যে, "মাহমুদুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, তাঁর নাম নিয়ে বলতে যে মাহমুদ পাঠিয়েছে, ছেড়ে দাও।"
যেমনি এ কথা বলেছে, সেই জিন "ওরে বাপরে বাপ" বলে পালিয়ে গেছে। "ছেড়ে দেব, আমি আর আসব না"—একেবারে ওয়াদা করে চলে গেছে, আর আসেনি।
তো যারা তাদের পদ্ধতিমতো এত চিকিৎসা করলো, সেই চিকিৎসামতো যায় জিন, কিন্তু আবার চলে আসে। আর তাঁর একটা নাম। কিন্তু সেই নামওয়ালা হতে হবে, পরিচিত ব্যক্তি।
দুনিয়ায়ও পরিচয় চলে
তো দুনিয়ার ময়দানেও পরিচয় চলে। "অমুক পাঠিয়েছে"—কাজ হয়ে যাবে। সুন্দর দরখাস্ত, দরখাস্তে চাকরি হয়নি, কোনো কাজই হয়নি। আর "অমুক পাঠিয়েছে"—তো দরখাস্ত-টাস্ত কিছুই লাগবে না।
বলে যে, "দরখাস্ত-টরখাস্ত, আইন-টাইন করতে হবে—এগুলো সব ভোকাস।" ইউনিভার্সিটির চাকরির জন্য অ্যাডভার্টাইজ করা হয়, অ্যাপ্লিকেশন দেয়। নতুন নতুন বেচারা জানে না, খুব যত্ন করে অ্যাডভার্টাইজের কপি-টপি—এগুলো সব ঠিকঠাক করে, ঠিকঠাক হওয়া চায়। "এগুলো সব বিলকুল ভোকাস।"
তো সেখানেও তার যে প্রধান, তা কোনো ব্যাপার না। কে বলছে—সেটা হলো আসল কথা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পড়েছেন উতবার মতো ব্যক্তি—বহুত নামকরা সরদার, কথা বলতে জানে, আর এরা সরদার, বড় সাহসী। কিছু কথা বুঝতে পারেনি, কিন্তু ভয়ে কাঁপছে। কী ভয় দেখালেন, তাও বুঝেনি। কিন্তু ভয়ে কাঁপছে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের যে দীন দিয়েছেন, সেই কথা তো তাঁর সুর দিয়ে বলতে হবে। কিন্তু এই সুর গলা থেকে আসে না। এই সুর তো দিল থেকে আসে। মেহনত করে সেটা শিখতে হবে।
এ জন্য ভাই, আল্লাহর পথে বের হয়। সেই সুর শিখতে হবে। ঠিক আছে না ইনশাআল্লাহ?
সবাই নিয়ত করি ইনশাআল্লাহ যে, মেহনত করে—আল্লাহ তাআলা যদি আমাদের তাওফিক নসিব করেন—আল্লাহ পাক, আল্লাহ তাআলার যে সুর, সেই সুর আমরা নিতে পারি। ঠিক আছে না ইনশাআল্লাহ?
আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক নসিব করুন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ত্যাগের বিনিময়ে সম্পর্ক: উম্মতের মহব্বতের বুনিয়াদ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] স্থান: গাউসনগর জামে মসজিদ, ইস্কাটন রোড, ঢাকা তারিখ: ৯ জুন ২০০৬,বেলা:৩.৩...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
৭০
দ্বীন ও দুনিয়া
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] দুনিয়ার সব মানুষের কাজকর্ম ও চেষ্টা-পরিশ্রমকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—এক...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
৯৩
আল্লাহর ইচ্ছায় নিজের ইচ্ছা: পরিপূর্ণ বান্দা হওয়ার পথ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] স্থান: বারিধারা ডি.ও.এইচ.এস. সময়: মাগরিবের পর :১০/০৬/২০০৬ তারিখ أعُوْذ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
৯২
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন