আলী রা. নবী এবং রাসুল ছিলেন! বাউল মতবাদ! পর্ব—১৬
আলী রা. নবী এবং রাসুল ছিলেন! বাউল মতবাদ! পর্ব—১৬
হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু কোনো নবী বা রাসুল ছিলেন না; তিনি ছিলেন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয় সাহাবি ও জামাতা। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম–এর পর আর কোনো নবী বা রাসুল আসবেন না। কারণ, তিনিই সর্বশেষ নবী ও রাসুল—খাতামুন নবিয়্যিন।
বাউল ধর্মে কী বলা হয়?
তাদের দাবি হলো—রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম–এর পর হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুই নবী বা রাসুল হওয়ার সবচেয়ে বড় অধিকারী ছিলেন। দেখুন, তারা নিজেরাই কী লিখেছে—মহানবীর উচ্চতর মহাজ্ঞানের দরজা, তাঁর নবুয়ত, বেলায়েত ও রেসালতের সুযোগ্য অধিকারী রসুল বা নিয়োজিত প্রতিনিধি মাওলা আলী (করমুল্লাহ)। কিন্তু ওমর, আবু বকর, ওসমান, আয়েশা, আবু সুফিয়ান, মাবিয়া গং গোত্রীয় চক্রান্তে রসুলতত্ত্ব তথা নবীর আদর্শিক মোকামের অধিবাসী বা আহলে বাইতের আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব ও কোরান জোর করে কেড়ে নেয়। এর মধ্য দিয়ে অবৈধ ক্ষমতালোভী কায়েমি স্বার্থের পূজারীরা মাওলা আলীকে চরমভাবে উপেক্ষা-অগ্রাহ্য-অমর্যাদা করায় ‘রেসালত' তথা রসুলতত্ত্ব বিষয়টিই ব্যাপক মুসলিম জনমন থেকে একপ্রকার নির্বাসিত করে দেয়া হয়েছে। —অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৯৩
অর্থাৎ বাউল সম্প্রদায় মূলত এই বার্তাই দিতে চায়—রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পর হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু নাকি নবী ও রাসুল হওয়ার অধিকারী ছিলেন। এই দাবির মধ্য দিয়েই তারা নবুয়তের চূড়ান্ত সত্যকে আড়াল করে, ঈমানের মৌলিক আকিদার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
ইসলাম কী বলে?
ইসলামের সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত আকিদা হলো—রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পর আর কোনো নবী বা রাসুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, তিনিই সর্বশেষ নবী; নবুয়তের দরজা তাঁর মাধ্যমেই চিরতরে বন্ধ হয়েছে। হযরত উকবাহ্ ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
لوكان بَعْدِي نَبِيٌّ لَكَانَ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ
“আমার পরে যদি কেউ নবী হতেন, তাহলে উমার ইবনুল খত্তাবই হতেন।”—(জামে তিরমিযী, হাদিস নং : ৩৬৮৬)
এছাড়া হযরত সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
وَإِنَّهُ سَيَكُونُ فِي أُمَّتِي ثَلاَثُونَ كَذَّابُونَ كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ نَبِيٌّ وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ لاَ نَبِيَّ بَعْدِي
“অচিরেই আমার উম্মতের মধ্যে ত্রিশজন ঘোর মিথ্যাবাদীর আবির্ভাব হবে। তারা প্রত্যেকেই নিজেকে নবী বলে দাবি করবে। অথচ আমিই শেষ নবী; আমার পরে আর কোনো নবী নেই।”—(জামে তিরমিযী, হাদিস নং : ২২১৯)
সুতরাং, “নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পর হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী বা রাসুল হওয়ার হকদার ছিলেন”—এমন মিথ্যা ও বানোয়াট দাবি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই বক্তব্য ইসলামের মৌলিক আকিদার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। বাস্তবতা হলো, এ ধরণের দাবি মূলত শিয়াদের একাংশ থেকেই উত্থাপিত হয়ে থাকে। তারা আজও নানা মিথ্যা কাহিনী ও ভিত্তিহীন রেওয়ায়েত আবিষ্কার করে সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম–এর বিরুদ্ধে সমালোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলছে।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইন্তেকালের মুহূর্তে সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম গভীর শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছিলেন। এমনকি হযরত উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রথমে এই সংবাদ বিশ্বাস করতেও প্রস্তুত ছিলেন না। তবে শোকের সেই ভারাক্রান্ত সময়েও উম্মাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে দায়িত্ববোধ এক মুহূর্তের জন্যও বিলুপ্ত হয়নি। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাফন ও দাফনের আগেই ইসলামী রাষ্ট্রের পরবর্তী উত্তরাধিকারী নির্ধারণ করা ছিল সময়ের একান্ত দাবি। কারণ, খলীফা ছাড়া বৈরী আক্রমণ প্রতিরোধ করবে কে? অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা সামাল দেবে কে? আর উম্মাহর সম্মিলিত জানাজার ব্যবস্থাপনাই বা কে নিশ্চিত করবে? এই বাস্তবতার কারণেই খলীফা নির্বাচন অপরিহার্য হয়ে ওঠে। শুরুতেই হযরত উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু–সহ উপস্থিত অসংখ্য সাহাবির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু খলীফা নির্বাচিত হন। খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি মসজিদের মিম্বারে বসে এক নীতি-নির্ধারণী ও প্রেরণাদায়ক ভাষণ প্রদান করেন। সেই সময় হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহু সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। পরবর্তীতে তাঁদের দুজনকে ডেকে বায়আতের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তাঁরা বলেছিলেন—
لا تثريب يا خليفة رسول الله ، فبايعاه
“হে আল্লাহর রাসুলের খলীফা! আপনার বিরুদ্ধে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই।”
অতঃপর তাঁরা উভয়েই তাঁর নিকট বায়আত করেন।—(সুনানে কুবরা, বাইহাকী; হাদিস নং : ১৬৯৭৯)
সুতরাং, সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম–এর পবিত্রতা ও মর্যাদাকে কলঙ্কিত করার সকল মিথ্যাচার ইতিহাসের দরবারে চিরতরে ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে; আজও তা ভেঙে চুরমার হচ্ছে, আর ভবিষ্যতেও হবে। ইনশাআল্লাহ!
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কুরআনের তাফসীর পড়া যাবে না! হেযবুত তওহীদ পর্ব–১৭
যদি কেউ বড় শিক্ষিত হয়, তবে তার বক্তব্য বুঝতে হলে নিশ্চয় জ্ঞানী হতে হয়, অথবা জ্ঞানীদের থেকে বুঝে নিতে...
মুফতী রিজওয়ান রফিকী
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
৪৪৬৯
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন