মুহাম্মাদ সা.-ই আল্লাহ! বাউল মতবাদ! পর্ব—১৩
মুহাম্মাদ সা.-ই আল্লাহ! বাউল মতবাদ! পর্ব—১৩
মহান আল্লাহ এমন এক সত্তা, যিনি সবকিছুর তুলনায় সর্বোচ্চভাবে পবিত্র। তিনি জন্মদানের ক্ষেত্রে যেমন পবিত্র, তেমনি জন্মগ্রহণের ক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ পবিত্র।
বাউল ধর্মে কী বলে?
তাদের দাবি হলো—আব্দুল্লাহর ঔরসে যে মুহাম্মাদ নামক সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তিনিই মূলত আল্লাহ। লালন ফকির লিখেছে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই স্বয়ং আল্লাহ। দেখুন, সে কী লিখেছে-
কীর্তিকর্মার খেলা কে বুঝতে পারে,
যে নিরঞ্জন সে-ই নূরনবি নামটি ধরে।
চারেতে নাম আহমদ হয় এক হরফ তাঁর নফি কেন কয়,
সে কথাটি জানবো কোথায় নিশ্চিত করে।
গঠিতে শাঁই সয়াল সংসার একদেহে দুইদেহ হয় তাঁর,
আহাদে আহমদ নাম যাঁর দেখো বিচারে।
এই কথা যাহারে শুধাই ফ্যাসাদ ঝগড়া বাঁধায় সবাই,
লালন বলে স্থূল ভুলে যাই তার তোড়ে। —(অখণ্ড লালনসঙ্গীত : পৃ. ১২৬)
আহাদে আহমদ এসে নবি নাম কে জানালে,
নবী যে তনে করিল সৃষ্টি সে তন কোথায় রাখিলে।
আহাদ মানে পরওয়ার আহমদরূপে সে এবার
জন্মমৃত্যু হয় যদি তাঁর শরার আইন কই চলে।
নবি যাঁরে মানিতে হয় উচিত বটে তাই জেনে লয়,
পুরুষ কি সে প্রকৃতিকায় সৃষ্টির সৃজনকালে।
আহাদ নামে কেন রে ভাই মানবলীলা করিলেন শাঁই,
লালন তবে কেন যায় অদেখা ভাবুক দলে। —অখণ্ড লালনসঙ্গীত : পৃ. ১২৫
আব্দুল্লাহর ঘরেতে বলো সেই নবীর জন্ম হলো,
মূলদেহ তাঁর কোথায় ছিলো কারে বা শুধাই। —অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ১৩৩
অর্থাৎ, বাউল সম্রাট লালন ফকির বোঝাতে চায়—আব্দুল্লাহর ঘরে যে নবীর জন্ম হয়েছিল, তিনি মূলত আল্লাহই ছিলেন। এ কারণে তারা প্রশ্ন আকারে জিজ্ঞাসা করলো, “মূল দেহ তাঁর কোথায় ছিল?” অর্থাৎ সেই মূলদেহটাই ‘আল্লাহ’।
ইসলাম কী বলে?
মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে খোদ আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তিনি রাসুল এবং তাঁর বান্দা। তাঁকে আল্লাহর দেহরূপ বলে প্রচার করা সম্পূর্ণ জুলুম ও বিভ্রান্তি। মূলত খ্রিস্টানরা ঈসা আ.-কে আল্লাহর দেহরূপ বলে বিশ্বাস করে। উদাহরণস্বরূপ, তারা লিখেছে:
“যীশু হচ্ছেন মাংসে আগত ঈশ্বর, মানুষের দেহে ঈশ্বর।” — (যোহন ১:১, ১৪)
এই বাউলরাও ঠিক খ্রিস্টানদের মতো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তাআলার দেহরূপ বলে বিশ্বাস করে। অথচ মহান আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেন:
مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا
“(হে মুমিনগণ,) মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন, কিন্তু সে আল্লাহর রাসুল এবং নবীদের মধ্যে সর্বশেষ। আল্লাহ সর্ববিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞাত।” —(সুরা আহযাব : ৪০)
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلاَّ رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ
“আর মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন রাসুল বৈ তো নন! তাঁর পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছে।” —(সুরা আলে ইমরান : ১৪৪)
এই আয়াতদ্বয় থেকে আমরা জানতে পারি—মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর দেহরূপ নন, বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং শেষ নবী। অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেন:
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى
“পবিত্র সেই সত্তা, যিনি নিজ বান্দাকে রাতারাতি মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে যান।” —(সুরা বনী ইসরাঈল : ১)
এই আয়াত থেকে আমরা জানতে পারি—মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা। কিন্তু বাউলরা এসব আয়াত বিশ্বাস না করেই দাবি করেছে যে, আল্লাহ তাআলা নিজেই আব্দুল্লাহর ঘরে জন্ম নিয়েছেন। এটি নিছক মিথ্যাচার এবং সুস্পষ্ট শিরক। মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ
“বলে দাও—আল্লাহ সর্বদা এক এবং অদ্বিতীয়। আল্লাহ এমন এক সত্তা, যাঁর প্রতি সকলে মুখাপেক্ষী, কিন্তু তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। তাঁর কোনো সন্তান নেই, এবং তিনিও কারও সন্তান নন। কেউ তাঁর সমকক্ষ নয়।” —(সুরা ইখলাস : ১-৪)
সুতরাং কুরআনের উপরিউক্ত আয়াত মোতাবেক লালনের এসকল গান কুরআন বিরুদ্ধ ও শিরকি।
পবিত্র কুরআনে কী এমন কথা আছে?
লালনের এই কথা কুরআনে আছে বলে যে দাবী করা হয়, তার প্রমাণস্বরুপ লালনভক্ত আবদেল মান্নান তার বইয়ে লিখেছে,
যারা আল্লাহ ও রসুলের মধ্যে পার্থক্য করে তারা চরম কাফের। -আল কোরান। সুরা নেসা। বাক্য :১৫০-১৫১। —(অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ১৪৩)
জবাব :
আল্লাহ ও রাসুল যে একই জন এমন কথা পবিত্র কুরআনের কোথাও নেই, বরং তারা যে দলিল পেশ করেছে, চলুন সে আয়াতটি আগে দেখা যাক। মহান রব্ব বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَن يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَن يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَٰلِكَ سَبِيلًا أُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا ۚ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا
“যারা আল্লাহ ও তার রাসূলগণকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের মধ্যে পার্থক্য করতে চায় ও বলে, আমরা কতক (রাসুল)-এর প্রতি তো ঈমান রাখি এবং কতককে অস্বীকার করি, আর (এভাবে) তারা (কুফর ও ঈমানের মাঝখানে) মাঝামাঝি একটি পথ অবলম্বন করতে চায়। এরূপ লোকই সত্যিকারের কাফির। আর আমি কাফিরদের জন্য লাঞ্ছনাকর শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।” —সুরা নিসা : ১৫০-১৫১
উক্ত আয়াতে মূলত ঐ সকল মানুষদেরকে কাফের বলা হয়েছে, যারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং কতিপয় নবীদেরকে অস্বীকার করতো। দেখুন, তাফসীরে কুরতুবীতে এসেছে—
لَمَّا ذَكَرَ الْمُشْرِكِينَ وَالْمُنَافِقِينَ ذَكَرَ الْكُفَّارَ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ، الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى، إِذْ كَفَرُوا بِمُحَمَّدٍ ﷺ، وَبَيَّنَ أَنَّ الْكُفْرَ بِهِ كُفْرٌ بِالْكُلِّ، لِأَنَّهُ مَا مِنْ نَبِيٍّ إِلَّا وَقَدْ أَمَرَ قومه بالايمان بحمد ﷺ وَبِجَمِيعِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ
“মহান আল্লাহ মুশরিক ও মুনাফিকদের কথা উল্লেখ্য করার পর আহলে কিতাবদের মধ্যে কাফের ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কথা উল্লেখ্য করেছেন। কারণ, তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে অস্বীকার করেছিলো। এজন্য তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি অবিশ্বাস মানেই সকল নবীদের প্রতিই অবিশ্বাস। কারণ, এমন কোনো নবী নেই, যিনি তাঁর সম্প্রদায়কে মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া রহমতুল্লাহ এবং সমস্ত নবীদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের নির্দেশ দেননি।” —তাফসীরে কুরতুবী, খ. ৫ পৃ. ৫
অর্থাৎ, উক্ত আয়াতটি ভালোভাবে পড়লে বুঝবেন যে, এখানে বলা হয়েছে—সকল নবীদের মাধ্যমে প্রেরিত বিধানাবলী সব আল্লাহরই দেওয়া। সুতরাং কিছু নবীর কতক বিধান মান্য করা, আর কিছু নবীকে অস্বীকার করে তাঁদের বিধানকে অস্বীকার করা মানেই আল্লাহ ও রাসুলগণের মাঝে পার্থক্য করার নামান্তর। সুতরাং যারা নিজেদেরকে ঈমানদার দাবী করতো, কিন্তু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে নবী বলে বিশ্বাস করতো না, তাদেরকে বলা হয়েছে কাফের। কারণ, তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে অস্বীকার করে মূলত আল্লাহকেই অস্বীকার করেছে৷ কিন্তু ‘আল্লাহ ও রাসুলের মাঝে পার্থক্য করা’ মানে এটা নয় যে, আল্লাহ ও নবী একজনই। সুতরাং আল্লাহর নাযিলকৃত সকল আসমানী কিতাব ও নবীদের প্রতি ঈমান আনা ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ একটি আকিদা। অবশ্য বিধান পালন করার ক্ষেত্রে আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিধান পালন করতে হবে। এ বিষয়ে আরো আলোচনা ‘দীনে এলাহী’ পর্বে রয়েছে।
যাইহোক, লালন মতবাদের দাবী ‘আল্লাহ এবং রাসুল একজনই’ এটা নিছক একটি ভ্রান্তি ও শিরকি আকিদা। এতো সুস্পষ্ট বিষয়টা না বুঝে লালন তার নিজের বানানো এই কুফরি উক্তিটাকে কুরআনের বাণী বলে চালানোর অপচেষ্টা করেছে। এটা করে কী লালন গুরুতর অন্যায় করেনি? আল্লাহপাকের নামে অপবাদ দেয়নি? যারা রব্বের নামে মিথ্যা অপবাদ দেয়, তাদের ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহপাকই ঘোষণা দিয়েছেন,
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَىٰ عَلَى اللَّهِ كَذِبًا ۚ أُولَٰئِكَ يُعْرَضُونَ عَلَىٰ رَبِّهِمْ وَيَقُولُ الْأَشْهَادُ هَٰؤُلَاءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَىٰ رَبِّهِمْ ۚ أَلَا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ
“সেই ব্যক্তি অপেক্ষা বড় জালেম আর কে হতে পারে, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেয়? এরূপ লোকদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত করা হবে এবং সাক্ষ্যদাতাগণ বলবে, এরাই তারা, যারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি মিথ্যা আরোপ করত। সকলে শুনে নিক, ওই জালেমদের উপর আল্লাহর লা'নত।” —সুরা হুদ : ১৮
পরিশেষে বলতে চাই, লালন ফকির তার এই ‘মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আল্লাহ একসত্তা’ বক্তব্য দিয়ে সরাসরি রব্বের সাথে শিরক করেছে এবং তার ভক্তকুলকেও শিরকের দরিয়ায় ডুবিয়ে মেরেছে। মহান রব্ব আমাদেরকে লালন ও বাউলদের এসকল শিরকি আক্বীদা থেকে আমাদের ঈমানকে হিফাযত করেন। আমীন!
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন