আদমই আল্লাহ! বাউল মতবাদ! পর্ব—৫
আদমই আল্লাহ! বাউল মতবাদ! পর্ব—৫
আদম আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার এক স্পেশাল সৃষ্টি। তবে তিনি খালেক নন, বরং একজন মাখলুক এবং আল্লাহ তাআলার নির্বাচিত বান্দা।
বাউল ধর্মে কী বলে?
বাউল সম্রাট লালন ফকির বলেছে—
আপনি আল্লাহ আপনি নবী আপনি হন আদম সফি
অনন্তরূপ করে ধারণ কে বোঝে শাঁইর লীলার করণ
নিরাকারে শাঁই নিরঞ্জন মোর্শেদরূপ হয় ভজনপথে। —অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৯২
ইসলাম কী বলে?
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো—আল্লাহ তাআলা স্রষ্টা, বাকি সবই তাঁর সৃষ্টি। ঠিক তেমনিভাবে আদম আ. নিজেও মহান আল্লাহর সৃষ্টি। এ সম্পর্কে হাদিস শরীফে এসেছে, হযরত আবু মুসা আল-আশ’আরী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى خَلَقَ آدَمَ مِنْ قَبْضَةٍ قَبَضَهَا مِنْ جَمِيعِ الأَرْضِ فَجَاءَ بَنُو آدَمَ عَلَى قَدْرِ الأَرْضِ فَجَاءَ مِنْهُمُ الأَحْمَرُ وَالأَبْيَضُ وَالأَسْوَدُ وَبَيْنَ ذَلِكَ وَالسَّهْلُ وَالْحَزْنُ وَالْخَبِيثُ وَالطَّيِّبُ
“আল্লাহ তা’আলা পৃথিবীর সর্বত্র হতে এক মুঠো মাটি নিয়ে আদম আ.-কে সৃষ্টি করেছেন। তাই আদম-সন্তানরা মাটির বৈশিষ্ট্য প্রাপ্ত হয়েছে। যেমন, তাদের কেউ লাল, কেউ সাদা, কেউ কালো বর্ণের আবার কেউ বা এসবের মাঝামাঝি, কেউ বা নরম ও কোমল প্রকৃতির। আবার কেউ কঠোর প্রকৃতির, কেউ মন্দ স্বভাবের, আবার কেউ বা ভালো চরিত্রের।” —জামে তিরমিযি, হাদিস নং : ২৯৫৫
এই হাদিস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ হলো—আদম আ. নিজেই আল্লাহ নন, বরং আল্লাহ কর্তৃক সৃষ্ট একজন মহামানব। তাছাড়া, আদম আ. যদি আল্লাহ হতেন, তাহলে তাঁর স্ত্রী থাকার কথা ছিলো না। অথচ আদম আ. এর স্ত্রী ছিলো, যা কুরআনে কারীমেই বর্ণিত। মহান আল্লাহ বলেন,
وَيَا آدَمُ اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ
“এবং হে আদম, তুমি ও তোমার স্ত্রী উভয়ে জান্নাতে বাস করো।” —সুরা আরাফ : ১৯
বুঝতে পারলাম—আদম আ.-এর স্ত্রী ছিলো এবং সন্তানও ছিলো। সুতরাং আদম আ. যদি নিজেই আল্লাহ হতেন, তাহলে তাঁর স্ত্রী-সন্তান ছিলো কেন? আল্লাহর তো কোনো স্ত্রী-সন্তান নেই। মহান রব্ব বলেন,
مَا اتَّخَذَ صَاحِبَةً وَلَا وَلَدًا
“তিনি (আল্লাহ) কোনো স্ত্রী গ্রহণ করেননি এবং কোনো সন্তানও নয়।” —সুরা জ্বিন : ৩
সুতরাং ‘আদম আ. নিজেই আল্লাহ’ এমন দাবি করা নিছক মূর্খতা ও কুফরী বক্তব্য। তাছাড়া আদম আ.-কে আল্লাহর মতো বলাও কুরআন বিরোধি বক্তব্য। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ۖ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
“কোনো জিনিস নয় তার অনুরূপ। তিনিই সব কথা শোনেন, সবকিছু দেখেন।” —(সুরা আশ-শুরা : ১১)
সুতরাং, আল্লাহকে কোনো সৃষ্টির সাথে তুলনা করা এই দুই আয়াতের সুস্পষ্ট বিরোধিতা। তবে আদম আ.-কে আল্লাহ হিসেবে আখ্যায়িত করার পেছনে লালনের দলীল হলো—
আপন সুরতে আদম গঠলেন দয়াময়,
তা নইলে কি ফেরেশতারে সেজদা দিতে কয়।
আদমে আল্লাহ না হইলে পাপ হইত সেজদা দিলে,
শেরেকি পাপ যারে বলে এ দীন দুনিয়ায়। —অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৩৪৪
এই গানে ‘আদম আ.-ই আল্লাহ’ প্রমাণের জন্য দুটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে—
ক. আল্লাহ আদমকে তাঁর নিজস্ব সুরে সৃষ্টি করেছেন।
খ. আল্লাহ আদমকে সিজদা দিতে ফেরেশতাদের নির্দেশ দিয়েছেন।
এক. আদম আ.-কে কী আল্লাহর আকৃতিতে সৃষ্টি করা হয়েছে?
মূলত, আদম আ.-এর অকৃতিকে আল্লাহ তাআলার অকৃতির সাথে তুলনা করার পেছনে একটি হাদিসের ভুল অনুবাদ ও বিকৃত ব্যাখ্যা ভূমিকা রেখেছে। হাদিসটি হলো—হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِذَا قَاتَلَ أَحَدُكُمْ أَخَاهُ فَلْيَجْتَنِبِ الْوَجْهَ فَإِنَّ اللَّهَ خَلَقَ آدَمَ عَلَى صُورَتِهِ
“তোমাদের মধ্যে কেউ যখন তার ভাইকে প্রহার করে, তখন সে যেন তার চেহারা আঘাত করা থেকে বিরত থাকে। কেননা, আল্লাহ তাআলা আদম (আলাইহিস সালাম) কে তার নিজ আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন।” —সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৬১২
এক. এই হাদিসে “তার নিজ আকৃতি” বাক্যের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী রহি. বলেন,
وأن المراد أنه خلق في أول نشأته على صورته التي كان عليها في الأرض, وتوفي عليها, وهي: طوله ستون ذراعًا, ولم ينتقل أطوارًا كذريته, وكانت صورته في الجنة هي صورته في الأرض لم تتغير
“আল্লাহ তাআলা তাঁকে তার সৃষ্টির সূচনাতেই আপন আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। যেই আকৃতিতে তিনি দুনিয়াতে ছিলেন এবং ইন্তেকাল করেছেন। তার উচ্চতা ছিল ষাট হাত। এবং তিনি তার বংশধরদের মত পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত হননি, এবং জান্নাতে তার আকৃতি তাই ছিলো, যা পৃথিবীতে আগমনের পরও ছিলো। যাতে কোনো পরিবর্তিত হয়নি। —শরহুল মুসলিম লিন নববী, খ. ১৭ পৃ. ১৪৭
এটা হাদিস শরীফে এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
خَلَقَ اللَّهُ آدَمَ عَلَى صُورَتِهِ، طُولُهُ سِتُّونَ ذِرَاعًا
আল্লাহ তাআলা আদম আলাইহিস সালাম-কে তার যথাযথ আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন, তার উচ্চতা ছিল ষাট হাত।” —সহিহ বুখারী, হাদিস নং : ৬২২৭
দুই. তাছাড়া আল্লাহ তাআলার একটি সিফাত বা গুণবাচক নাম হলো—بَدِيْعٌ (বাদীউন) অর্থাৎ যিনি নমুনাহীন সৃষ্টি করেন। এ অর্থেই আল্লাহ তাআলা বলেন,
بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
“তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের (নমুনাহীন) অস্তিত্বদাতা।” —সুরা বাকারা : ১১৭
অর্থাৎ, তিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের স্রষ্টা, নমুনাহীন স্রষ্টা। যেখানে আল্লাহ তাআলা সমগ্র পৃথিবীর সকল মাখলুককে নমুনাহীনভাবে সৃষ্টি করেছেন, সেখানে আদম আ.-কে সৃষ্টি করার জন্য তিনি তাঁর নিজের নমুনা অনুসরণের মুখাপেক্ষী হবেন—এটি যুক্তিসঙ্গত নয়।
তিন. এরপরও যদি ধরা হয় যে এখানে “তাঁর নিজ অকৃতি” বলতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিজের আকৃতি বুঝিয়েছেন, তবুও এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে—
ক. এর দ্বারা আল্লাহ তাআলা তাঁর ক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন, যেমনভাবে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন।
قَالَ يَا إِبْلِيسُ مَا مَنَعَكَ أَن تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ ۖ أَسْتَكْبَرْتَ أَمْ كُنتَ مِنَ الْعَالِينَ
“আল্লাহ বললেন—হে ইবলিস, আমি যাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছি, তাকে সিজদা করতে কোন্ জিনিস তোমাকে বাধা দিলো? তুমি কি অহংকার করলে, নাকি তুমি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন কিছু?” —সুরা ছোয়াদ : ৭৫
এখানে আল্লাহ তাআলা “নিজ হাতে” শব্দ বলে তার সীমাহীন কুদরত বা শক্তির কথা বুঝিয়েছেন। কারণ, আল্লাহর শারিরিক কোনো গঠন নেই। ‘শরহু কিতাবিল ফিকহিল আকবার’ গ্রন্থে উল্লেখ্য আছে—আল্লাহর কোনো শারীরিক গঠন নেই।
لان الجسم متركب و متحيز و ذلك إمارة الحدوث
“কারণ, দেহ হলো, যৌগিক ও পক্ষপাতদুষ্ট। আর এটি নিঃশেষ হওয়ার লক্ষণ। (কিন্তু আল্লাহ তাআলা তো ধ্বংসশীল নন।)” —শরহু কিতাবিল ফিকহিল আকবার, পৃ. ৬৫
সুতরাং ‘আল্লাহর হাত’ মানে যেমন আল্লাহর শক্তি, তেমনি আল্লাহর আকৃতি মানেও আল্লাহর ক্ষমতার বর্হিপ্রকাশ।
খ. তাছাড়া কোনো কিছুর সাথে তুলনা করার অর্থ এটা নয় যে, তুলনাকৃত বিষয়টা তুলনীয় বিষয়ের মত হুবহু হতে হবে। যেমন, হাদিস শরীফে এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
إِنَّ أَوَّلَ زُمْرَةٍ تَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَلَى صُورَةِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ وَالَّتِي تَلِيهَا عَلَى أَضْوَإِ كَوْكَبٍ دُرِّيٍّ فِي السَّمَاءِ
“যে দলটি জান্নাতে প্রথমে প্রবেশ করবে তাদের মুখাবয়ব পূর্ণিমার চাদের মতো হবে। তাদের পর যারা জান্নাতে যাবে তাদের চেহারা হবে উদ্ধাকাশের আলোকিত নক্ষত্রের মতো।” —সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৮৩৪
এ হাদিসে যে জান্নাতীদের চেহারা চাঁদ বা নক্ষত্রের সাথে তুলনা করা হয়েছে, এর অর্থ কি যে জান্নাতীদের চেহারা হুবহু চাঁদ বা তারকার মতো হবে? নিশ্চয়ই নয়। কারণ হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
فَكُلُّ مَنْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَلَى صُورَةِ آدَمَ
“যারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তারা আদম (আলাইহিস সালাম) এর আকৃতি বিশিষ্ট হবে।” —সহিহ বুখারী, হাদিস নং : ৬২২৭
সুতরাং, বোঝা গেল—‘জান্নাতীদের চেহারা চাঁদ’ বা ‘তারকার মতো’ বলা মানে, ‘উজ্জ্বলতার দিক থেকে সেই রূপের প্রকাশ’। ঠিক তেমনি আল্লাহ তাআলা কোনো বিষয়কে নিজস্বতার সঙ্গে উল্লেখ্য করলে তা সংশ্লিষ্ট বিষয়টির সম্মান ও গুরুত্ব বোঝায়। যেমন, ইমাম কুরতুবী রহি. বলেন—
فَالرُّوحُ خَلْقٌ مِنْ خَلْقِهِ أَضَافَهُ إِلَى نَفْسِهِ تَشْرِيفًا وَتَكْرِيمًا كَقَوْلِهِ أَرْضِي وَسَمَائِي وَبَيْتِي وَنَاقَةُ اللَّهِ وَشَهْرُ اللَّهِ وَمِثْلُهُ
‘‘রুহ হলো আল্লাহর সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। মানুষের রুহকে আল্লাহ তাঁর নিজের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন, মানুষের সম্মানার্থে। যেমন- অন্যত্রে আল্লাহর বলা ‘আমার জমীন, আমার আসমান, আমার ঘর এবং আল্লাহর উটনী, আল্লাহর মাস ইত্যাদী।” —তাফসীরে কুরতুবী : খ. ৯ পৃ. ১৭
সুতরাং ‘আল্লাহ তাআলা আদম আ.-কে তাঁর নিজস্ব সুরতে সৃষ্টি করেছেন’—এতে প্রকাশ পায় আদম আ.-এর প্রতি তাঁর বিশেষ সম্মান। তবে, এসব ব্যাখ্যা না জেনে কেউ যদি সাহস করে আদম আ.-এর আকৃতিকে আল্লাহর আকৃতি বলে চালিয়ে দেয়, তখন সে সরাসরি কুফরীর পথে পা রাখে। ইমাম ত্বহাবী রহি. সতর্ক করে বলেন, আল্লাহ তাআলার উপর মানবীয় গুণ আরোপ করা কতটা ভয়াবহ ও অগ্রহণযোগ্য।
ومن وَصَفَ الله بمعنى من معاني البشر فقد كفر، فمن أبصر هذا اعتبر، وعن مثل قول الكفار انزجر، وعلم أنه بصفاته ليس كالبشر
“যারা আল্লাহ তাআলাকে মানবীয় কোনো বৈশিষ্ট্যে বিশেষিত করে তারা মূলত কুফরে লিপ্ত হয়। সুতরাং যারা এবিষয়টি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়, তারা সঠিক শিক্ষা লাভ করে, তারা কাফেরদের মতো কথা বলা থেকে বিরত থাকে এবং তারা বুঝতে পারে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর গুণাবলির ক্ষেত্রে মানুষের মতো নন।” —(শরহুল আকীদাতিত তহাবিয়্যাহ, পৃ. ১৫২)
সুতরাং, মনে রাখতে হবে—‘আল্লাহর আকৃতি আদমের মধ্যে রয়েছে’ এই আকিদা একেবারেই শিরক ও কুফরির পথের প্রতীক। এটি গ্রহণ করা মানে আল্লাহর অনন্যত্বকে অস্বীকার করা এবং ঈমানের মৌলিক সত্যকে বিকৃত করা।
দুই. আদম আ.-কে কেন সিজদা দিতে বলেছিলেন?
এর কারণ হিসেবে বিশিষ্ট তাবেয়ী কাতাদাহ রহি. বলেছেন—
كانت تحيتهم السجود
“তাদের অভিবাদনের পদ্ধতি ছিলো ‘সিজদা’’।” —আহকামুল কুরআন লিল-জাসসাস, খ. ১ পৃ. ৩৬
আর তাছাড়া, আল্লাহ তাআলা আদম আ.-কে সিজদা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। এ থেকেই স্পষ্ট হয়, আদম ও আল্লাহ আলাদা সত্তা—তাদের মধ্যে কোনো অখন্ড বা একরূপ সত্ত্বা নেই।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন