আল্লাহর আকৃতি মানুষের মতো! বাউল মতবাদ! পর্ব—৪
আল্লাহর আকৃতি মানুষের মতো! বাউল মতবাদ! পর্ব—৪
আল্লাহ মহান। আমাদের চিন্তা, উপলব্ধি ও গবেষণার সীমার বাইরে তাঁর শান। আমরা ঠিক জানতে পারি না, তিনি কেমন—এটি আমাদের জন্য সম্ভবও নয়। এ জন্যই হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, তিনি বলেন—
تفَكَّروا في كلِّ شيءٍ ولا تفَكِّروا في ذاتِ اللَّهِ
“তোমরা সব কিছু নিয়ে গবেষণা করো, কিন্তু আল্লাহর সত্তা নিয়ে গবেষণা করো না।” —(ফায়জুল কাদীর, হাদিস নং : ৩৩৪৫)
সুতরাং, আল্লাহর সত্তা আকার না সাকার, তা নিয়ে অনুমান বা আলোচনা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। অথচ সমাজের বহু বাতিল সম্প্রদায় এই বিষয়ে একেবারেই উদাসীন। তারা কুফরীশক্তি মুশাব্বিহা এবং মুজাসসিমাদের এই নাপাক ধারণা বিশ্বাস করে কোনো দ্বিধাবোধ ছাড়াই আল্লাহর সত্তাকে আকারভিত্তিকভাবে স্থাপন করার চেষ্টা করছে।
বাউল ধর্মে কী বলে?
তারা দাবি করে—আল্লাহর আকার মানুষের মতোই। দেখুন, ফকির লালন লিখেছে—
নবী মেরাজ হতে এলেন ঘুরে,
বলেন না ভেদ কারও তরে।
শুনে আলী কহিছেন তখন, দেখে এলেন আল্লাহ্ কেমন
নবী কন ঠিক তোমার মতোন, করো আমল আমি বলো যারে
এসে আবু বকর সিদ্দিক বলে, আল্লাহ্ কেমন দেখে এলে
রূপটি কেমন দেবে বলে, নবী বলেন তুমি দেখো তোমারে ॥
তারপর কহিছে ওমর, কেমন আল্লাহর আকারপ্রকার
নবী কন ঠিক তোমার আকার, আইনাল হক তাই কোরান ফুকারে ৷
পরে জিজ্ঞাসে ওসমান গনি, আল্লাহ কেমন বলো শুনি
নবী কন যেমন তুমি তেমন ঠিক পরওয়ারে ॥
নবী মেরাজে গিয়ে যে ভেদ এলেন নিয়ে
চারজনা চারমতে প'লো লালন প’লো মহাফেরে।’ —(অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ১৩২)
এ ছাড়াও তারা লিখেছে—
বাউলেরা ঈশ্বর কিংবা সৃষ্টিকর্তাকে ‘নিরাকার' কোনো ব্যক্তি হিসেবে মানতে নারাজ । তাঁর অস্তিত্বকে বাউলেরা ‘সাকার' হিসেবে বিশ্বাস করেন।’ —-(বাউলসাধনা, পৃ. ৩০)
অর্থাৎ, বাউল সম্প্রদায় দাবি করে যে—আল্লাহ তাআলা হুবহু মানুষের মতো দেখতে। নাউযুবিল্লাহ, এটি সম্পূর্ণ কুফরী ও বিপথগামী বিশ্বাস।
ইসলাম কী বলে?
‘মহান আল্লাহর মানুষের মতো আকার আছে’—এমন দাবি সুস্পষ্ট শিরক। কারণ, আল্লাহর সাথে কোনো তুলনা করা যায় না। এ সম্পর্কে নীচে কয়েকটি আয়াত পেশ করা হলো, যেখানে মহান রব্ব স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন:
هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا
“তোমার জানা মতে তাঁর সমগুণসম্পন্ন কেউ আছে কি?” —(সুরা মারইয়াম : ৬৫)
وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ
“এবং তার সমকক্ষ নয় কেউ।” —(সুরা ইখলাস : ৪)
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ۖ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
“কোনও জিনিস নয় তার অনুরূপ। তিনিই সব কথা শোনেন, সবকিছু দেখেন।” —(সুরা আশ-শুরা : ১১)
فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَندَادًا وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ
“সুতরাং তোমরা আল্লাহর কোনও শরীক স্থির করো না- যখন তোমরা (এসব বিষয়) জানো।” —(সুরা বাকারা : ২২)
এজন্য ইমাম তহাবী রহি. আল্লাহ তাআলার উপর মানবীয় গুণ আরোপের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন—
ومن وَصَفَ الله بمعنى من معاني البشر فقد كفر، فمن أبصر هذا اعتبر، وعن مثل قول الكفار انزجر، وعلم أنه بصفاته ليس كالبشر
“যারা আল্লাহ তাআলাকে মানবীয় কোনো বৈশিষ্ট্যে বিশেষিত করে, তারা মূলত কুফরে লিপ্ত হয়। সুতরাং, যারা এবিষয়টি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়, তারা সঠিক শিক্ষা লাভ করে, তারা কাফেরদের মতো কথা বলা থেকে বিরত থাকে এবং তারা বুঝতে পারে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর গুণাবলির ক্ষেত্রে মানুষের মতো নন।” —(শরহুল আকীদাতিত তহাবিয়্যাহ, পৃ. ১৫২)
বি. দ্র. যে সকল আয়াত ও হাদিসে আল্লাহর অঙ্গপ্রতঙ্গ বা সিফাতের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলিতে অবশ্যই ঈমান আনতে হবে। পাশাপাশি, এই সকল সিফাত ও আল্লাহর গুণাবলীতেও পূর্ণ বিশ্বাস রাখা আবশ্যক। তবে এই সিফাতগুলোর প্রকৃতি বা ধরণ কী, তা কোনো সৃষ্টির পক্ষে জানা সম্ভব নয়। কারণ, আল্লাহ আমাদের জ্ঞানের সীমার বাইরে, এবং তিনি আমাদের ধারণার সঙ্গে কোনোভাবে মিলিত নন। তিনি তাঁর মহিমা ও শান অনুযায়ী অস্তিত্ববান। অতএব, আল্লাহকে মানুষ বা কোনো সৃষ্টির মতো কল্পনা করা সুস্পষ্ট শিরক ও কুফর।