প্রবন্ধ
নেক কাজে পারস্পরিক সহযোগিতা
১৭ অক্টোবর, ২০২৬
৭৮
০
নাহমাদুহু ওয়ানুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারিম। আম্মা বাদ।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। ফলে মানুষ একা সব কাজ করতে পারে না। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—প্রতিটি স্তরেই মানুষের পরস্পরের সহযোগিতা প্রয়োজন। সময়, ক্ষেত্র, এবং চাহিদার তফাতে সহযোগিতারও তফাত রয়েছে। ইসলাম কোনো কিছুতেই মানুষকে নিয়ন্ত্রনহীন ছেড়ে দেয়নি। বরং মানুষের কাল্যাণার্থেই কিছু বিধিনিষেধ, কিছু নিয়ন্ত্রন রেখা দিয়েছেন। পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও মানুষ উন্মুক্ত নয়। এখানেও ইসলাম সীমারেখা টেনে দিয়েছে। ইসলামের শিক্ষা হলো, পারস্পরিক সহযোগিতা কেবল পার্থিব ও বৈষয়িক স্বার্থে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সহযোগিতার ভিত হবে তাকওয়া ও কল্যাণের পথে। ইসলাম এই পথে সহযোগিতা করতে আদেশ দিয়েছে। এবং বিকল্প পথ পরিহার করতে নির্দেশ দিয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা সুরাতুল মায়িদাহ এর ২ নং আয়াতে ইরশাদ করেন,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
“তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।”
সহিহুল বুখারীর ২৪৪৪ হাদিসে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত-রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন,
انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَذَا نَنْصُرُهُ مَظْلُومًا، فَكَيْفَ نَنْصُرُهُ ظَالِمًا؟ قَالَ: «تَأْخُذُ فَوْقَ يَدَيْهِ
তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে জালিম হোক অথবা মাযলুম। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মাযলুমকে সাহায্য করব, তা তো বুঝলাম; কিন্তু জালিমকে কি করে সাহায্য করব? তিনি বললেন, তুমি তার হাত ধরে তাকে (যুলুম করা থেকে) বিরত রাখবে। হাদিসের ব্যাখ্যা দেখতে ক্লিক করুন।
নেক কাজে সহযোগিতা বলতে কী বোঝায়?
ওপরের আয়াতে নেক কাজে সহযোগিতা করার কথা বর্ণিত হয়েছে। ‘নেক কাজ’ বলতে এমন সব কাজ বোঝায়, যা শরিয়তসম্মত এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির কারণ। আর ‘তাকওয়া’ হলো আল্লাহর ভয় ও সচেতনতা নিয়ে তাঁর আদেশ পালন করা এবং নিষেধ থেকে বেঁচে থাকা।
সুতরাং নেক কাজে সহযোগিতা শুধু কাউকে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করার নাম নয়। বরং কাউকে দ্বীনের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া, নামাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া, গুনাহের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করা, কোনো ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত করা, ইলমে দ্বীনি শেখানো, অসহায় ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণ করা, বিপদগ্রস্তকে সহযোগিতা করা, পথভোলা পথিককে রাস্তা দেখিয়ে দেওয় এসবই নেক কাজে সহযোগিত। এমনকি হাদিস শরীফে কোনো মুসলিমের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাত করাকেও নেকির কাজ (সদকা) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পারস্পরিক সহযোগিতায় কুরআনের শিক্ষা
মানুষ এজন্যই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি যে, সে পরহিতৈষণা। আদর্শ ও ইসলামি সমাজ শুধু নিজের কল্যাণ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে না; বরং অন্যের কল্যাণেও ভূমিকা রাখবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتُ بَعۡضُہُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ۘ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَیَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَیُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَیُؤۡتُوۡنَ الزَّکٰوۃَ وَیُطِیۡعُوۡنَ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ ؕ اُولٰٓئِکَ سَیَرۡحَمُہُمُ اللّٰہُ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ
অর্থঃ মুমিন নর ও মুমিন নারী পরস্পরে একে অন্যের সহযোগী। তারা সৎকাজের আদেশ করে, অসৎ কাজে বাধা দেয়, নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। তারা এমন লোক, যাদের প্রতি আল্লাহ নিজ রহমত বর্ষণ করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সূরা, আত তাওবাহ্ - আয়াত নং ৭১। তাফসীর সহ দেখতে ক্লিক করুন।
এখানে মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ককে সহযোগিতা ও কল্যাণের সম্পর্ক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। একজন মুমিন শুধু নিজে ভালো থাকবে না; বরং অন্যকেও ভালো থাকার পথে সাহায্য করবে।
পারস্পরিক সহযোগিতায় নবীজীর শিক্ষা
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
وَاللَّهُ فِي عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِي عَوْنِ أَخِيهِ
অর্থ “বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সহযোগিতায় থাকে, আল্লাহ ততক্ষণ তার সহযোগিতায় থাকেন।” —সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯, ব্যাখ্যা সহ দেখতে ক্লিক করুন।
এটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক একটি শিক্ষা। আমরা যখন কোনো মুসলিম ভাইয়ের বৈধ প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াই, তখন প্রকৃতপক্ষে আমরা নিজের জন্যও আল্লাহর সাহায্য লাভের একটি মাধ্যম তৈরি করি।
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ
কেউ যদি কোন ভাল কাজের পথ দেখায় তবে ঐ কাজ যে ব্যক্তি নিজে করল তার সমান সে সাওয়াব পাবে। —তিরমিজি, হাদিস নং ২৬৭১।
অর্থাৎ নিজে ভালো কাজ করার পাশাপাশি অন্যকে ভালো কাজের সুযোগ করে দেওয়াও বিরাট নেক আমল।
অর্থ দানই কি সহযোগিতা?
অনেকেই মনে করেন, সাহায্য করার জন্য অর্থ থাকা জরুরি। অথচ ইসলামে সহযোগিতার ধারণা কেবল অর্থ বা সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সম্পদ না থাকলেও শারীরিক শ্রম, সুন্দর আচরণ, পরামর্শ এবং সৎ কাজের আদেশের মাধ্যমেও সহযোগিতার সওয়াব লাভ করা যায়। তার কয়েকটি নযীর এখানে পেশ করা হলো:
এক. ভালো পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা।
নবী সা. ইরশাদ করেছেন-
كل معروف صدقة
প্রত্যেক সৎকাজই সাদ্কা। সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৬০২১
দুই. দ্বীনী ইলিম শিখিয়ে সহযোগিতা।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَمَنۡ اَحۡسَنُ قَوۡلًا مِّمَّنۡ دَعَاۤ اِلَی اللّٰہِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَّقَالَ اِنَّنِیۡ مِنَ الۡمُسۡلِمِیۡنَ
তার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে ডাকে, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি আনুগত্য স্বীকারকারীদের একজন। সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৩।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ القُرْآنَ وَعَلَّمَهُ
তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সর্বোত্তম যে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিখায়। বুখারী, হাদীস নং: ৫০২৭
তিন. অসুস্থ ব্যক্তির সেবা শুশ্রূষা করে সহযোগিতা।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর আযাদকৃত গোলাম সাওবান (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন রোগীকে দেখতে যায় সে প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত জান্নাতের ফলমূলের (বাগানে) অবস্থান করে। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৫৬৮
চার. পথহারা পথিককে পথ দেখানো এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানোর মাধ্যমে সহযোগিতা।
আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন যে, “প্রত্যেক দিন যাতে সূর্য উদিত হয়, তাতে মানুষের দেহের প্রতিটি জোড়া হতে একটি মানুষের প্রত্যেক জোড়ার প্রতি সাদ্কা রয়েছে। প্রতিদিন যাতে সূর্য উদিত হয়। দু’জন লোকের মধ্যে সুবিচার করাও সাদ্কা। কাউকে সাহায্য করে সাওয়ারীতে আরোহণ করিয়ে দেওয়া বা তার উপরে তার মালপত্র তুলে দেওয়াও সাদ্কা। ভাল কথাও সাদ্কা। নামায আদায়ের উদ্দেশ্যে পথ চলায় প্রতিটি কদমেও সাদ্কা। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও সাদ্কা। সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ২৯৮৯
পাঁচ. ঋণগ্রস্ত ও অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতা করা।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন মুমিনের পার্থিব কোন বিপদ-আপদ দূর করে দেবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনে তার থেকে বিপদ দূরীভূত করবেন। যে ব্যক্তি কোন অভাবগ্রস্ত লোকের জন্য সহজ ব্যবস্থা (দুর্দশা লাঘব) করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দুর্দশা মোচন করবেন। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৬৯৯
ছয়. মানুষের পারস্পরিক বিবাদ ও কোন্দল মীমাংসা করে সহযোগিতা করা।
প্রতিবেশী, আত্মীয় বা সমাজের দুটি পক্ষ বা ব্যক্তির মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হলে তা মিটিয়ে দেওয়া এবং তাদের মাঝে শান্তি ফিরিয়ে আনা সামাজিক সহযোগিতার অন্যতম সেরা রূপ। নবী সা. ইরশাদ করেছেন— দু’জন লোকের মধ্যে সুবিচার করাও সাদ্কা। সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ২৯৮৯
সাত. পরিবেশ রক্ষা এবং বৃক্ষরোপণ করা।
গাছ লাগানো, বনায়ন করা এবং প্রকৃতির যত্ন নেওয়া বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক ও সামাজিক সহযোগিতার ক্ষেত্র। এর মাধ্যমে মানুষ ও প্রাণীকুল ছায়া এবং অক্সিজেন পায়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকটময় সময়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা এক বিশাল সামাজিক দায়িত্ব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এবং প্রকৃতিকে রক্ষা করা কেবল নাগরিক দায়িত্বই নয়, বরং এটি একটি চলমান সওয়াব বা 'সদকায়ে জারিয়া'।
আনাস ইবনে মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, যে কোন মুসলমান ফলবান গাছ রোপণ করে কিংবা কোন ফসল ফলায় আর তা থেকে পাখি কিংবা মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু খায় তবে তা তার পক্ষ থেকে সাদ্কা বলে গণ্য হবে। সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ২৩২০
পরিবারিক কাজে সহযোগিতা
নেক কাজে সহযোগিতার প্রথম ক্ষেত্র হলো পরিবার। একজন স্বামী তার স্ত্রীকে দ্বীনি জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করতে পারেন। একজন স্ত্রী স্বামীকে নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য নেক আমলের ব্যাপারে উৎসাহ দিতে পারেন। বাবা-মা সন্তানকে সালাত, আদব-আখলাক ও ইসলামী শিক্ষায় গড়ে তুলতে পারেন। সন্তানও বাবা-মায়ের বৈধ কাজে সহযোগিতা করতে পারে।
পরিবারের সদস্যরা যদি একে অপরকে আল্লাহর আনুগত্যে সহযোগিতা করে, তাহলে সেই পরিবার শুধু বসবাসের স্থান থাকে না; বরং তা একটি দ্বীনি পরিবেশে পরিণত হয়।
সমাজে নেক কাজে সহযোগিতা
একটি আদর্শ সমাজে কেউ বিপদে পড়লে অন্যরা তাকে একা ছেড়ে দেয় না। অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ নেওয়া, দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানো, এতিমের দেখাশোনা করা, ঋণগ্রস্তকে সহযোগিতা করা, শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া এবং মানুষের বৈধ প্রয়োজন পূরণে সাহায্য করা—এসব সামাজিক দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাসুলুল্লাহ ﷺ মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ককে একটি দেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন—
مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِي تَوَادِّهِمْ وَتَرَاحُمِهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ مَثَلُ الْجَسَدِ
“পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতার ক্ষেত্রে মুমিনদের দৃষ্টান্ত একটি দেহের মতো।” —সহিহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৫৮৬
দেহের একটি অঙ্গ ব্যথিত হলে যেমন পুরো শরীর অস্বস্তি অনুভব করে, তেমনি একজন মুমিনের কষ্ট অন্য মুমিনদেরও ব্যথিত করবে—এটাই ইসলামী ভ্রাতৃত্বের সৌন্দর্য।
গুনাহের কাজে সহযোগিতা নয়
পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসলাম সহযোগিতার কথা বলেছে, কিন্তু যেকোনো কাজে সহযোগিতা করার অনুমতি দেয়নি। আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন—
وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।” —সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:২
অতএব, কেউ যদি অন্যায় কাজে সাহায্য চায়, সেখানে সহযোগিতা করা যাবে না। যেমন—হারাম ব্যবসায় সহযোগিতা করা, অন্যের অধিকার নষ্ট করতে সাহায্য করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, প্রতারণা বা জুলুমে সহযোগিতা করা কিংবা কোনো গুনাহের কাজে মানুষকে উৎসাহিত করা—এসব ইসলামের নির্দেশিত সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত নয়।
যে কাজে আল্লাহর আনুগত্য রয়েছে, সেখানে সহযোগিতা করা নেক আমল; আর যে কাজে আল্লাহর নাফরমানি রয়েছে, সেখানে সহযোগিতা করাও গুনাহের কারণ।
সহযোগিতায় গোপনীয়তা
নেক কাজে সহযোগিতার ক্ষেত্রে লোক দেখানো থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি মানুষের প্রশংসার জন্য সাহায্য করে, তাহলে তার আমলের উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই সম্ভব হলে এমনভাবে সাহায্য করা উচিত, যাতে মানুষের প্রশংসার চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিই উদ্দেশ্য থাকে।
কখনো একজন মানুষের সামান্য সহযোগিতা অন্যের জীবনে বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে। একটি ভালো পরামর্শ, একটি বই উপহার, একটি শিক্ষার সুযোগ, একটি বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো—এসবের প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
কীভাবে শুরু করবো?
নেক কাজে পারস্পরিক সহযোগিতা কোনো বড় প্রকল্প দিয়ে শুরু করতে হবে—এমন নয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজ থেকেই শুরু করা যায়।
আজ একজন মানুষকে একটি ভালো কথা বলুন।
কাউকে নামাজের কথা স্মরণ করিয়ে দিন।
কোনো অসহায় মানুষের প্রয়োজন পূরণ করুন।
কাউকে দ্বীনি জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করুন।
পরিবারের কাউকে ভালো কাজে সহযোগিতা করুন।
কোনো গুনাহের কাজে বন্ধুকে সহযোগিতা না করে সুন্দরভাবে তাকে বিরত রাখুন।
পরীক্ষায় নকল করা থেকে বিরত থাকুন।
অন্যকে আপনার উত্তর দেখাতেও বিরত থাকুন।
এভাবেই একজন মানুষ থেকে একটি পরিবার, একটি পরিবার থেকে একটি সমাজ এবং একটি সমাজ থেকে একটি বৃহৎ উম্মাহ কল্যাণের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
উপসংহার
ইসলাম মানুষকে স্বার্থপর হতে শেখায় না; বরং একে অপরের কল্যাণে এগিয়ে আসতে শিক্ষা দেয়। তবে ইসলামের সহযোগিতা অন্ধ সহযোগিতা নয়। সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে সহযোগিতা করতে হবে এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা থেকে বিরত থাকতে হবে।
আমরা যদি প্রত্যেকে এই একটি নীতি নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করি—“আমি শুধু নিজে ভালো থাকব না; অন্যকেও ভালো থাকার পথে সাহায্য করব”—তাহলে আমাদের পরিবার, সমাজ ও পারস্পরিক সম্পর্ক অনেক সুন্দর হয়ে উঠবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের নেক কাজে একে অপরের সহযোগী হওয়ার এবং গুনাহ ও অন্যায়ের কাজে সহযোগিতা থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
দ্বীন শেখার গুরুত্ব ও ফজীলত
...
মানবিক ও সুস্থ ধারার সমাজ গঠনে মসজিদের ভূমিকা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
মুসলিম সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দুর নাম মসজিদ। মসজিদ ছাড়া মুসলিম সমাজ কল্পনা করা যায় না। মসজিদ শিআরে ইসলাম...
মসজিদের সাথে সম্পর্ক বাড়ানো
মসজিদ আল্লাহ তাআলার ঘর এতে তাঁর যিকির ও ইবাদত হয়। তাঁর বড়ত্ব ও মহিমার বর্ণনা হয়। তাঁর তাওহীদ ও রু...
ما هي الديوبندية؟
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন