প্রবন্ধ
শারদীয় দুর্গাপূজা: ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলিমদের করণীয়
১৬ অক্টোবর, ২০২৬
১২৫
০
অমুসলিমদের আচার-আচরণ ও কালচার Vs ইসলামী সভ্যতার মূলনীতি। পর্ব ৮
মানুষের জীবনে ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য—প্রতিটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন মুমিনের কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে তার ঈমান ও আকিদার অবস্থান। তার চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ, ভালোবাসা-ভালো লাগা এবং জীবনযাপনের মানদণ্ড নির্ধারিত হবে আল্লাহ তাআলার নির্দেশনা ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শের আলোকে। অন্যের প্রতি সদাচরণ করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করা ইসলামের শিক্ষা; কিন্তু উদারতা ও সম্প্রীতির নামে নিজের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দেওয়া কিংবা ভিন্ন ধর্মের উপাসনা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়া কোনো মুমিনের কাম্য হতে পারে না। কারণ প্রকৃত সভ্যতা নিজের বিশ্বাসকে বিসর্জন দিয়ে অন্যের অনুকরণ করার নাম নয়; বরং নিজের আদর্শে অবিচল থেকে অন্যের সঙ্গে ন্যায়সংগত ও মানবিক আচরণ করার নাম।
পরিতাপের বিষয়, বর্তমান সময়ে মুসলিম সমাজের কোনো কোনো অংশে ভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবের প্রতি আগ্রহ বাড়তে দেখা যাচ্ছে। উদারতা, আধুনিকতা কিংবা সামাজিক সম্প্রীতির দোহাই দিয়ে কেউ কেউ গির্জা-মন্দিরে প্রবেশ করছেন, ধর্মীয় উৎসবের আয়োজনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছেন, পূজার প্রসাদ গ্রহণ করছেন, এমনকি তা নিজের ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন। কারও কারও ক্ষেত্রে বিষয়টি নিছক সামাজিক উপস্থিতি কিংবা সৌজন্যের সীমা অতিক্রম করে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততায় গড়াচ্ছে। আবার ধর্মীয় বিধান ও বৈবাহিক সম্পর্কের সীমারেখা সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে কেউ কেউ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী নারীকে বিয়ে করার মতো গুরুতর সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন। এ ধরনের প্রবণতা ঈমানি সচেতনতা, ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য ও শরিয়তের বিধান সম্পর্কে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে আসে। বিশেষত একজন মুসলিমের কাছে কোনো কাজ সামাজিকভাবে জনপ্রিয় হওয়া তার বৈধতার প্রমাণ নয়; বরং কাজটি আল্লাহর বিধান ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই মূল বিবেচ্য।
সামনে শারদীয় দুর্গাপূজা। এ উপলক্ষে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, মণ্ডপ, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও সামাজিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এ সময় মুসলিমদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়: অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সদাচরণ ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে গিয়ে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যের সীমারেখা কোথায় টানতে হবে? কোন আচরণ সাধারণ মানবিক সৌজন্য, আর কোনটি ধর্মীয় উপাসনা বা অন্য ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের পর্যায়ে পড়ে? পূজামণ্ডপে যাওয়া, পূজার প্রসাদ গ্রহণ, ধর্মীয় আয়োজনে অর্থ দেওয়া কিংবা অন্য ধর্মের উৎসবে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার বিধানই বা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর আবেগ, জনশ্রুতি কিংবা সামাজিক চাপের ভিত্তিতে নয়; বরং নির্ভরযোগ্য ইতিহাস, পবিত্র কুরআন, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সহিহ হাদীস এবং স্বীকৃত মুফাসসির ও ফকিহদের বিশ্লেষণের আলোকে জানা জরুরি।
এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য কোনো ধর্মাবলম্বীকে হেয় করা, কারও প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো কিংবা সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করা নয়। বরং দুর্গাপূজার ধর্মীয় পরিচয় ও ঐতিহাসিক বিকাশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা, ইসলামের তাওহীদ ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যের শিক্ষা ব্যাখ্যা করা এবং মুসলিমদের আচার-আচরণে উদ্ভূত বিভিন্ন প্রশ্নের শরয়ি মূল্যায়ন উপস্থাপন করাই এর লক্ষ্য। একজন মুসলিম যেমন অন্যের উপাসনাকে নিজের উপাসনা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন না, তেমনি নিজের ধর্মীয় অবস্থান রক্ষার অজুহাতে অন্যের প্রতি অন্যায়ও করতে পারেন না। অতএব, অমুসলিমদের ধর্মীয় আচার-আচরণের প্রভাব থেকে ঈমান ও আমলকে সুরক্ষিত রাখা এবং একই সঙ্গে ন্যায়বিচার, শালীনতা ও মানবিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখাই মুসলিমদের প্রকৃত সভ্যতার পরিচয়।
শারদীয় দুর্গাপূজা কি?
শারদীয় দুর্গাপূজা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এটি হিন্দু ধর্মের দেবী দুর্গার উদ্দেশ্যে আয়োজিত পূজা, যা সাধারণত হিন্দু পঞ্জিকার আশ্বিন মাসে, অর্থাৎ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সময়ে পালিত হয়। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, দেবী দুর্গার মহিষাসুর নামক অসুরকে বধ করার স্মরণে এ উৎসব উদ্যাপিত হয়। এ উপলক্ষে দুর্গার প্রতিমা স্থাপন, পূজা-অর্চনা, মন্ত্রপাঠ, আরতি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হয়। উৎসবের শেষ পর্যায়ে অনেক স্থানে বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।
তথ্যসূত্র: ভারত সরকারের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের “Utsav” পোর্টাল এবং দিল্লি পর্যটন বিভাগের দুর্গাপূজা-বিষয়ক পরিচিতি।
বিস্তারিত:
হিন্দু ধর্মীয় পৌরাণিক গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, দেবী দুর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধের কাহিনি সংক্ষেপে এ রকম:
মহিষাসুর ছিল এক অসুরের নাম১। হিন্দু পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী, দেবতা ও অসুরদের মধ্যে দীর্ঘ যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে মহিষাসুর দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গের কর্তৃত্ব দখল করে নেয়। দেবতারা তখন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের কাছে সাহায্য চান।
কাহিনি অনুসারে, দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। বিভিন্ন দেবতা তাঁকে নানা অস্ত্র দেন এবং হিমালয় তাঁকে সিংহ বাহন দেন।
এরপর দেবী দুর্গা মহিষাসুরের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। তাঁর সঙ্গে যুদ্ধে মহিষাসুরের অনেক সেনাপতি পরাজিত হয়। পরে মহিষাসুর নিজেই যুদ্ধে নামে। পুরাণের বর্ণনায়, সে কখনো মহিষ, কখনো সিংহ, কখনো হাতিসহ বিভিন্ন রূপ ধারণ করে দেবীকে পরাজিত করার চেষ্টা করে।
শেষ পর্যন্ত দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করেন। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে, এ ঘটনা অশুভ শক্তির ওপর শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। দুর্গাপূজার সঙ্গে এই কাহিনি বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
টিকা: ১. হিন্দু পুরাণে দেবতাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে যাদের বর্ণনা করা হয়, তাদের অনেককেই ‘অসুর’ বলা হয়। যেমন, মহিষাসুর হলো দেবী দুর্গার সঙ্গে যুদ্ধের কাহিনিতে বর্ণিত একজন অসুর।
দুর্গাপূজার উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিকাশ
হিন্দুশাস্ত্র, পুরাণ এবং ঐতিহাসিক বিভিন্ন গ্রন্থ ও গবেষণার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দুর্গাপূজার উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিকাশ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. বৈদিক ও পৌরাণিক উৎস (উৎপত্তির শেকড়)
বৈদিক সাহিত্য: বেদে সরাসরি বর্তমান রূপের দুর্গার উল্লেখ না থাকলেও, ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১২৫তম সূক্তে ‘দেবীসূক্ত’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া কৃষ্ণযজুর্বেদের তৈত্তিরীয় আরণ্যকে ‘দুর্গাসূক্ত’-এর উপস্থিতি রয়েছে, যেখানে দেবীর তেজ ও শক্তির বন্দনা করা হয়েছে। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে শরৎকালে ‘আম্বিকা’ বা দুর্গার পূজার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
মার্কণ্ডেয় পুরাণ বা শ্রীশ্রী চণ্ডী: দেবী দুর্গার মাহাত্ম্য এবং তাঁর রূপের সবচেয়ে বড় বিবরণ পাওয়া যায় মার্কণ্ডেয় পুরাণে (যাকে ‘শ্রীশ্রী চণ্ডী’ বলা হয়)। এতে মহিষাসুর বধ এবং দেবী দুর্গার অবতীর্ণ হওয়ার বিশদ বিবরণ রয়েছে। এছাড়া কালিকা পুরাণ, দেবীভাগবত পুরাণ এবং বৃহৎনন্দীকেশ্বর পুরাণেও দেবী উপাসনার মূল ভিত্তি রচিত হয়েছে।
২. অকালবোধন ও শারদীয় পূজার প্রচলন
রামায়ণ ও অকালবোধন: পৌরাণিক ও স্মার্ত্ত শাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী, শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন বিধায় এটি পূজার উপযুক্ত সময় নয়। কিন্তু লঙ্কা জয়ের উদ্দেশ্যে রামচন্দ্র শরৎকালে দেবীর কৃপা লাভের জন্য অকালে তাঁর আরাধনা করেছিলেন, যা ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত। কৃত্তিবাসী রামায়ণে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। কালিকা পুরাণ ও বৃহদ্ধর্ম পুরাণেও এই শরৎকালীন পূজার পৌরাণিক সমর্থন রয়েছে।
৩. মধ্যযুগ ও রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্গোৎসব
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা: ১১শ শতকে মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির ‘দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী’ গ্রন্থে দুর্গা বন্দনার দেখা মেলে। ১৫১০ সালে কুচবিহারের রাজা বিশ্ব সিংহর দুর্গোৎসব আয়োজনের ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়।
বাংলার জমিদারদের পূজা: ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে বাংলার বিভিন্ন রাজা ও জমিদারদের হাতে দুর্গাপূজা বড় পরিসরে দালানকোঠায় শুরু হয়। কারো মতে ১৫ শতকে সিলেটের রাজা গণেশ, আবার ১৬ শতকের শেষের দিকে রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ প্রথম ঘটা করে সার্বজনীন বা বড় পরিসরে শারদীয় দুর্গাপূজার প্রচলন করেন। এছাড়া কলকাতার বড়িশার রায়চৌধুরী পরিবার বা অন্যান্য জমিদার বাড়ির দুর্গাপূজাও সেসময় বেশ খ্যাতি লাভ করে। সে যুগে এই পূজা মূলত জমিদার ও বিত্তশালীদের অন্দরে বা নাটমন্দিরেই সীমাবদ্ধ ছিল।
৪. বারোয়ারি থেকে সার্বজনীন রূপান্তর
বারোয়ারি পূজা: ১৭৯০ সালের দিকে হুগলির গুপ্তিপাড়ার বারোজন ব্রাহ্মণ যুবকের যৌথ উদ্যোগে প্রথম চাঁদা তুলে ও যৌথ ব্যবস্থাপনায় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়, যা থেকে ‘বারোয়ারি’ (বারো ইয়ার বা বন্ধু মিলে) পূজার ধারণাটি দানা বাঁধে। পরবর্তীতে কলকাতার কাশিমবাজার রাজবাড়ির রাজা হরিনাথ রায়ের হাত ধরেও বারোয়ারি পূজার প্রসার ঘটে।
সার্বজনীন রূপ: বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এবং বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর জমিদারদের প্রতাপ কমতে শুরু করলে একক বা পারিবারিক পূজাগুলো ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। তখন সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও গণচাঁদার মাধ্যমে এই পূজা ‘বারোয়ারি’ থেকে রূপ নেয় আজকের ‘সর্বজনীন’ উৎসবে, যা পরবর্তীতে বাঙালির জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়।
৫. স্বাধিকার আন্দোলন ও আধুনিক বিকাশ
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘আনন্দময়ী’ ও শক্তির রূপ হিসেবে দেবী দুর্গা দেশপ্রেমিকদের মনে বিপ্লবের প্রতীক জুগিয়েছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ কিংবা কবি নজরুলের কবিতায় সেই শক্তির জাগরণ প্রকাশ পায়। আর একবিংশ শতাব্দীতে এসে ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গোৎসব ইউনেস্কোর (UNESCO) অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের (Intangible Cultural Heritage) বিশ্ব স্বীকৃতির গৌরব অর্জন করে।
বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গাপূজার প্রচলন কবে থেকে?
বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গাপূজার প্রচলন সম্পর্কে প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনায় রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। The Daily Star-এর ১২ অক্টোবর ২০০৮-এর একটি প্রতিবেদনে তাঁর দুর্গাপূজা আয়োজনের সাল ১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দ (বাংলা ৮৮৭ সাল) উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ সাল এবং তাঁকেই দুর্গাপূজার প্রথম প্রবর্তক হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত নয়।
অন্যদিকে, বাংলায় দুর্গাপূজার ধর্মীয় আচার আরও প্রাচীন। মধ্যযুগীয় বাংলার পূজাপদ্ধতি নিয়ে গবেষণায় চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর বিভিন্ন সংস্কৃত গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে জমিদার ও অভিজাত পরিবারগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্গাপূজা ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে।
তথ্যসূত্র: The Daily Star, ১২ অক্টোবর ২০০৮; Bihani Sarkar, “The Rite of Durgā in Medieval Bengal,” Journal of the Royal Asiatic Society, ২০১২।; রাজা কংসনারায়ণ ও শারদীয় দুর্গোৎসব, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পত্রিকা, ২০২২।
বাংলায় দুর্গাপূজার বিকাশ নিয়ে Adrija Roychowdhury-এর গবেষণাধর্মী প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, বাংলায় দেবী-উপাসনার শিকড় প্রাচীন আঞ্চলিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত; ত্রয়োদশ–চতুর্দশ শতকের মধ্যে দুর্গা ব্রাহ্মণ্য ধর্মীয় পরিমণ্ডলে প্রতিষ্ঠিত হন এবং পরবর্তী সময়ে পূজা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন রূপ লাভ করে। অষ্টাদশ শতকে জমিদার ও অভিজাত পরিবারগুলোর আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন দুর্গাপূজার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পারিবারিক পূজা থেকে সর্বজনীন উৎসবে যেভাবে পরিণত হয়ে গেলো?
বাংলার দুর্গাপূজা দীর্ঘদিন রাজপরিবার, জমিদার ও সচ্ছল পরিবারের ব্যক্তিগত আয়োজনে সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত অর্থায়নে বারোয়ারি পূজার প্রচলন ঘটে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সর্বজনীন পূজার প্রসার বাড়ে। এভাবে দুর্গাপূজা ধর্মীয় আচার থেকে বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনেও পরিণত হয়। তবে এর মূল পরিচয় দেবী দুর্গার উপাসনা ও ধর্মীয় আচারকেন্দ্রিক। তথ্য
সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, হিন্দুধর্মের দেবদেবীর পূজা ও এজাতীয় ধর্মীয় বিশ্বাস ইসলামের তাওহিদের আকিদার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহ তাআলা ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করা এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করা বাতিল। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَذَٰلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ هُوَ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ
“এটা এ কারণে যে, আল্লাহই সত্য; আর তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের ডাকে, সেগুলোই বাতিল।” (সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৬২)
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের উপাস্যদের ভিত্তিহীনতা তুলে ধরে ইরশাদ করেন—
إِنْ هِيَ إِلَّا أَسْمَاءٌ سَمَّيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلْطَانٍ إِنْ يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَمَا تَهْوَى الْأَنْفُسُ
“এগুলো তো কেবল কতগুলো নাম, যেগুলো তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষেরা রেখেছ। আল্লাহ এগুলোর পক্ষে কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। তারা কেবল ধারণা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করে।” (সূরা আন-নাজম, আয়াত: ২৩)
এ আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই কোনো উপাস্যকে গ্রহণ করা এবং ধারণা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো, ভিত্তিহীন বিশ্বাস ও বাতিল উপাসনা থেকে দূরে থেকে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করা।
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন—
إِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا
“নিশ্চয়ই ধারণা সত্যের মোকাবিলায় কোনো কাজে আসে না।” (সূরা ইউনুস, আয়াত: ৩৬-এর অংশ)
অর্থাৎ, কোনো বিষয় সম্পর্কে ধারণা বা প্রচলিত বিশ্বাস থাকা মানেই তা সত্য হয়ে যায় না। বরং সত্য নির্ণয়ের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও সঠিক জ্ঞান অপরিহার্য। বিশেষত আকিদা ও ইবাদতের ক্ষেত্রে কুসংস্কার, ভিত্তিহীন বিশ্বাস এবং মনগড়া উপাস্যকে অনুসরণ করা থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।
সুতরাং একজন মুসলমানের উচিত, আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের ওপর অবিচল থাকা, শিরক ও বাতিল আকিদা থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস বা আচারকে সত্য বলে গ্রহণ করার আগে তার যথার্থতা বিবেচনা করা। একই সঙ্গে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আলোচনা ও আচরণের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, শালীনতা ও প্রজ্ঞা বজায় রাখা জরুরি। কারণ ইসলামের দাওয়াত দিতে হয় সত্যের দলিল ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে, অন্যায় বা অবমাননার মাধ্যমে নয়।
দুনিয়ায় দেবদেবীর পূঁজা কবে থেকে শুরু হয়?
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا
অর্থ: “তারা বলেছিল, তোমরা কখনো তোমাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করো না এবং ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগূস, ইয়াঊক ও নাসরকেও পরিত্যাগ করো না।” —সূরা নূহ, আয়াত ২৩।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নূহ (আ.)-এর সম্প্রদায়ের কিছু নেককার ব্যক্তির নামে ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগূস, ইয়াঊক ও নাসর নামক মূর্তিগুলোর নামকরণ করা হয়েছিল। প্রথমে তাঁদের স্মরণে মূর্তি স্থাপন করা হলেও পরবর্তী প্রজন্মে জ্ঞান বিলুপ্ত হলে সেগুলোর পূজা শুরু হয়।—সূত্র: সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৯২০।
ইমাম ইবনু কাসীর (রহ.) সূরা নূহের ২৩ নম্বর আয়াতের তাফসীরে এই হাদীস উল্লেখ করে ব্যাখ্যা করেছেন যে, নূহ (আ.)-এর সম্প্রদায়ের মধ্যেই এসব মূর্তির পূজা প্রচলিত হয়েছিল।–তাফসীর ইবনু কাসীর—সূরা নূহ, আয়াত ২৩
সুতরাং, ইসলামী সূত্র অনুযায়ী, পৃথিবীতে শিরক ও মূর্তিপূজার সূচনা নূহ (আ.)-এর সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘটে।
দুর্গাপূজার ধর্মীয় তাৎপর্য ও ইসলামের তাওহীদের শিক্ষা
ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো বিশ্বাস বা ইবাদতের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হয় আল্লাহ তাআলার নির্দেশনা অনুযায়ী। কোনো ধর্মীয় আচার বহু শতাব্দী ধরে প্রচলিত থাকলেই তা ইসলামের দৃষ্টিতে সত্য বা গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। তবে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে দ্বিমত থাকার অর্থ সংশ্লিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের প্রতি অন্যায় আচরণের অনুমতি নয়।
১. ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَاعْبُدُوا اللّٰهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا
অর্থ: “তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করো না।”
—সূরা আন-নিসা, আয়াত ৩৬।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللّٰهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ
অর্থ: “তাদের তো এ ছাড়া কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁরই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করবে।”
—সূরা আল-বাইয়্যিনাহ, আয়াত ৫।
ইমাম ইবন কাসীর (রহ.) এ আয়াতের তাফসিরে আল্লাহর ইবাদতকে তাঁর জন্য একনিষ্ঠ করার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ, ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য হতে হবে; তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করা যাবে না।
দুর্গাপূজায় দেবী দুর্গার উদ্দেশ্যে প্রণাম, পূজা-অর্চনা, নিবেদন কিংবা অন্য কোনো উপাসনামূলক কাজ করা হয়। এসব কাজ দেবীর উদ্দেশ্যে ধর্মীয় উপাসনা হিসেবে সম্পাদিত হলে তা ইসলামের তাওহীদের পরিপন্থী। তাই একজন মুসলিমের জন্য এমন উপাসনায় অংশগ্রহণ করা বৈধ নয়। এখানে আপত্তির বিষয় কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী নয়; বরং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উদ্দেশ্যে উপাসনা করা।
২. শিরকের ভয়াবহতা
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللّٰهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না; এর চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।”
—সূরা আন-নিসা, আয়াত ৪৮।
ইমাম ইবন কাসীর (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন, যে ব্যক্তি শিরকের ওপর মৃত্যুবরণ করে, তার জন্য ক্ষমার প্রতিশ্রুতি নেই। আর শিরকের চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের অপরাধ আল্লাহর ইচ্ছাধীন।
৩. সূরা আল-কাফিরুনের শিক্ষা: আকিদায় আপস নয়
আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ وَلَا أَنْتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ
অর্থ: “বলুন, হে কাফিররা! তোমরা যাদের ইবাদত করো, আমি তাদের ইবাদত করি না। আর আমি যাঁর ইবাদত করি, তোমরাও তাঁর ইবাদতকারী নও। তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন, আর আমার জন্য আমার দ্বীন।”
—সূরা আল-কাফিরুন, আয়াত ১–৬।
ইমাম ইবন কাসীর (রহ.) এ সূরার তাফসিরে ব্যাখ্যা করেছেন, এর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ ﷺ মুশরিকদের উপাসনা থেকে নিজের সম্পূর্ণ স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করেছেন। মুসলিমের আকিদা ও ইবাদত অন্য ধর্মের উপাসনার সঙ্গে মিশিয়ে ফেলার সুযোগ নেই।
এ সূরার শিক্ষা দুর্গাপূজার প্রসঙ্গেও প্রাসঙ্গিক। একজন মুসলিম হিন্দু প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ করতে পারেন, তার বিপদে পাশে দাঁড়াতে পারেন এবং তার জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তিনি তার ধর্মীয় উপাসনাকে নিজের উপাসনা হিসেবে গ্রহণ করবেন।
অতএব, ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা এবং মানুষের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করা—দুটিই ইসলামের নির্দেশনার অংশ
অমুসলিমদের সঙ্গে সদাচরণ ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যের ভারসাম্য
দুর্গাপূজার সময় মুসলিমদের ধর্মীয় সতর্কতা যেন অমুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ, অপমান, অন্যায় কিংবা তাদের অধিকার নষ্ট করার কারণ না হয়।
১. অমুসলিমদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَا يَنْهَاكُمُ اللّٰهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ ۚ إِنَّ اللّٰهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
অর্থ: “যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ করতে ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন।”
—সূরা আল-মুমতাহিনাহ, আয়াত ৮।
ইমাম ইবন কাসীর (রহ.) এ আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করেছেন, যারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় কারণে যুদ্ধ করে না, তাদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করা নিষিদ্ধ নয়।
অতএব, দুর্গাপূজার সময় মুসলিমদের দায়িত্ব হলো নিজেদের আকিদা রক্ষা করার পাশাপাশি অমুসলিম প্রতিবেশীদের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করা। তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা, উপাসনালয়ে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর, গালাগাল কিংবা জোরপূর্বক ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তনের চেষ্টা ইসলামের ন্যায়বিচার ও সদাচরণের নীতির পরিপন্থী।
২. ধর্মীয় কাজে সহযোগিতা ও মানবিক সহযোগিতা এক নয়
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
অর্থ: “তোমরা নেককাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করো; পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করো না।”
—সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত ২।
ইমাম ইবন কাসীর (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় নেককাজে সহযোগিতা এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা না করার নির্দেশ উল্লেখ করেছেন।
দুর্গাপূজায় মুসলিমদের অংশগ্রহণের বিধান
১. পূজার ধর্মীয় আচার সম্পাদন
কোনো মুসলিম দেবী দুর্গার উদ্দেশ্যে প্রণাম, পূজা-অর্চনা, নিবেদন কিংবা অন্য কোনো উপাসনামূলক কাজ করলে তা ইসলামের তাওহীদের পরিপন্থী। এ ধরনের ধর্মীয় উপাসনায় অংশগ্রহণ মুসলিমের জন্য বৈধ নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلّٰهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ
অর্থ: “বলুন, নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই।”
—সূরা আল-আনআম, আয়াত ১৬২–১৬৩।
এ আয়াত ইবাদতকে একমাত্র আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করার শিক্ষা দেয়। তাই কোনো মুসলিমের জন্য অন্য দেবতা বা উপাস্যের উদ্দেশ্যে ধর্মীয় নিবেদন করা বৈধ নয়।
২. পূজার আয়োজন ও ধর্মীয় উপকরণে অর্থ দেওয়া
পূজামণ্ডপ, প্রতিমা, পূজার সামগ্রী কিংবা ধর্মীয় আচার সম্পাদনের জন্য নির্দিষ্টভাবে অর্থ দেওয়া সাধারণ দান-সদকার মতো নয়; বরং তা পূজার ধর্মীয় আয়োজনকে আর্থিকভাবে সহায়তা করার অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
অর্থ: “পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করো না।”
—সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত ২।
৩. পূজামণ্ডপে দর্শনার্থী হিসেবে যাওয়া
পূজার ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উপাসনামূলক আয়োজনে অংশগ্রহণ করা মুসলিমের জন্য বৈধ নয়। এমনকি শুধু দর্শক হিসেবে পূজার অনুষ্ঠান দেখতে যাওয়াও বৈধ নয়।। তাই পূজার ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠিত হচ্ছে—এমন স্থানে অপ্রয়োজনে যাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। তবে অমুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গে সাক্ষাৎ, অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো মানবিক প্রয়োজনে যোগাযোগ করাকে পূজার ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না। এ ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখতে হবে এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে।—দারুল উলুম দেওবন্দ: দশেরা বা পূজার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও চাঁদা দেওয়া তবে রাষ্ট্রিয় বাধ্যবাধকতার কারণে হলে (অসার কথা না বলসেটি ভিন্ন বিষয়।
৪. পূজার শুভেচ্ছা জানানো
খ্রিস্টমাস (বড়দিন) কিংবা অন্য কোন বিধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে কাফেরদের শুভেচ্ছা জানানো আলেমদের সর্বসম্মত মতানুযায়ী হারাম।
৫. পূজার সময় ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব
অমুসলিমদের মেলা যদি ধর্মীয় মেলা হয়, তাহলে তাতে অংশগ্রহণ করা বা দোকান বসানো জায়েয নয়। কারণ, এতে তাদের ধর্মীয় সমাবেশের লোকসংখ্যা ও জৌলুশ বৃদ্ধি পায়। তাই হিন্দুদের ধর্মীয় মেলায় দোকান দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
তবে মেলা যদি ধর্মীয় না হয়ে সাধারণ বাণিজ্যিক মেলা হয়, তাহলে সেখানে যাওয়া, দোকান দেওয়া এবং হালাল পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েয। তবে নাচ-গানসহ শরীয়তবিরোধী কাজে অংশগ্রহণ করা যাবে না। একইভাবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, বিজাতীয় সংস্কৃতি কিংবা হারাম কাজে ব্যবহৃত হয়—এমন পণ্য ক্রয়-বিক্রয় থেকেও বিরত থাকতে হবে।
৬. হিন্দুদের প্রসাদ খাওয়া
অমুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক ও হাদিয়া গ্রহণ
অমুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের হাদিয়া দেওয়া এবং গ্রহণ করা জায়েয। তবে হাদিয়ায় শরীয়তবিরোধী কোনো বিষয় থাকলে তা গ্রহণ করা যাবে না।
হিন্দুদের প্রসাদ গ্রহণ ও এর উপাদান
হিন্দুদের পূজা-উৎসবে বিতরণ করা প্রসাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। পঞ্চগব্য পাঁচটি উপাদানের মিশ্রণ: গোবর, গোমূত্র, দুধ, ঘি ও দই। এটি হিন্দুধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র বলে বিবেচিত।
তাদের প্রসাদ যদি প্রতিমা বা দেবতার নামে উৎসর্গ করা হয় কিংবা তাতে হারাম উপাদান থাকে, তাহলে তা খাওয়া জায়েয হবে না। তাই পূজার প্রসাদ, হালুয়া ও লাড্ডু গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।
বিস্তারিত জানুন
সন্তান, পরিবার ও মুসলিম সমাজের করণীয়
দুর্গাপূজার সময় মুসলিমদের সচেতন করার কার্যকর উপায় হলো সঠিক আকিদার শিক্ষা দেওয়া। শুধু নিষেধাজ্ঞা প্রচার নয়; বরং কেন একজন মুসলিম আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করতে পারেন না, কেন ধর্মীয় পরিচয় রক্ষা জরুরি এবং কীভাবে ভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়—এসব বিষয়ও বোঝানো প্রয়োজন।
অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের শেখানো যে, মুসলিমরা এক আল্লাহর ইবাদত করেন এবং অন্য ধর্মের উপাসনায় অংশ নেন না। একই সঙ্গে অন্য ধর্মের মানুষকে অপমান করা, তাদের ধর্মীয় প্রতীক নিয়ে বিদ্রূপ করা কিংবা তাদের প্রতি অন্যায় আচরণ করাও ইসলামের শিক্ষা নয়—এ বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি।
মসজিদের ইমাম, শিক্ষক, আলেম ও সামাজিক দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা প্রাসঙ্গিক কুরআনের আয়াত ও সহিহ হাদীসের আলোকে আলোচনা করতে পারেন। তবে এ বিষয়ে কোনো প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে যাচাইহীন ইতিহাস, ভিত্তিহীন গুজব ও উত্তেজনামূলক বক্তব্য পরিহার করা উচিত।
সুতরাং, দুর্গাপূজা বাংলার দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। এর ইতিহাস আলোচনায় ধর্মীয় গ্রন্থ, মধ্যযুগীয় পূজাপদ্ধতি এবং বাংলায় এ উৎসবের ক্রমবিকাশকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইসলামের দৃষ্টিতে তাওহীদ মুসলিম জীবনের মৌলিক ভিত্তি। তাই দেবী দুর্গার উপাসনা ও ধর্মীয় আচার সম্পাদন থেকে মুসলিমদের বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি অমুসলিমদের সঙ্গে ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও মানবিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার!
ইসলাম এমন জীবনব্যবস্থা , একমাত্র যার বিশ্ব সমাজ গড়ে তোলার মতো ঔদার্য আছে। এ ধর্ম মতে, একই রাষ্ট্রে ব...
বেদ: স্বরূপ পর্যালোচনা
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, বেদ কোনো মানুষের রচনা নয়, বরং ঈশ্বরের মুখনিঃসৃত বাণী ...
আদর্শ রাষ্ট্র গঠনে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ
ভূমিকা মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু রাষ্ট্রপ্রধান, সম্রাট, বিজেতা ও রাজনৈতিক নেতা আবির্ভূত হয়েছেন। কেউ স...
মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার
ইসলাম এমন জীবনব্যবস্থা, একমাত্র যার বিশ্ব সমাজ গড়ে তোলার মতো ঔদার্য আছে। এ ধর্ম মতে, একই রাষ্ট্রে বস...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন