প্রবন্ধ
‘যুলকারনাইন দেখতে পেলেন, সূর্য একটি পঙ্কিল জলাশয়ে ডুবছে’: অমুসলিমদের আপত্তি ও এর বস্তুনিষ্ঠ জবাব
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
৩৮৮
০
পবিত্র কুরআনের সূরা কাহফে উল্লেখ রয়েছে যে, বাদশাহ যুলকারনাইন সূর্যকে একটি পঙ্কিল বা কর্দমাক্ত জলাশয়ে (আইন হামিআ) ডুবে যেতে দেখেছেন। নাস্তিক ও অমুসলিমদের আপত্তি হলো, এখানে কুরআনে রূপক কোনো দৃশ্য বোঝানো হয়নি, বরং বাস্তবে সূর্য পৃথিবীর কোনো একটি জলাশয়ে বা সমুদ্রে নিমজ্জিত হচ্ছিল বলেই দাবী করা হয়েছে।
আপত্তির খণ্ডন ও পর্যালোচনা
এই আয়াতের একমাত্র ব্যাখ্যা হলো, যুলকারনাইন পৃথিবীর এমন একটি প্রান্তে গেলেন যেখান থেকে শুধু পানি আর পানি। দৃষ্টির শেষ সীমানা পর্যন্ত অথৈ পানি। আর স্পষ্টতই. সমুদ্র বা মহাসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে পশ্চিম দিগন্তে তাকালে সবার কাছেই মনে হয় সূর্য যেন পানিতে ডুব দিচ্ছে। কেউ কখনোই এর উল্টোটা দেখবে না। কুরআন মাজিদে কেবল এই অনুপম দৃশ্যটিই চিত্রায়ণ করা হয়েছে। কুরআন মাজিদের সকল ব্যাখ্যাকার এটিই বুঝেছেন।
ইমাম ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন. ‘তিনি [যুলকারনাইন] তাঁর দৃষ্টিসীমানায় সূর্যকে মহাসাগরে অস্ত যেতে দেখেছেন। আর এটিই হলো এমন প্রতিটি ব্যক্তির অবস্থা. যিনি সমুদ্রের তীরে পৌঁছান। তাঁর কাছে মনে হয় যেন সূর্য সাগরেই ডুবে যাচ্ছে।’-তাফসিরে ইবনে কাসির: খণ্ড ৫. পৃষ্ঠা ১৮৯, প্রকাশনা: দার ইবনুল জাওযী।
অমুসলিমদের হঠকারিতাপূর্ণ দাবির অসারতা এবং এর বস্তুনিষ্ঠ জবাব
তারপরও যদি কোনো নাস্তিক বা অমুসলিম হঠকারিতাবশত দাবি করে যে. কুরআনে বাহ্যিক বা আক্ষরিক অর্থই বোঝানো হয়েছে, তবে আমরা বলবো. কুরআন মাজিদের সামগ্রিক বক্তব্যের আলোকে আপনাদের এই দাবি কোনোভাবেই টিকে না; বরং তা সম্পূর্ণরূপে বাতিল হয়ে যায়। এর কারণগুলো নিম্নরূপ:
১. আয়াতের পরবর্তী অংশের আলোকে উক্ত দাবির অসারতা
যদি অমুসলিমদের দাবী অনুযায়ী একে ‘বাস্তব রূপ’ বলে ধরে নেওয়া হয়, তবে আয়াতের পরবর্তী অংশটিই বিবেচনা করা যাক। কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে, ‘এরপর যুলকারনাইন সূর্যকে এমন এক জাতির ওপর উদিত হতে দেখেছেন, যাদের জন্য সূর্যের তাপ থেকে বাঁচার কোনো আড়াল ছিল না।’
সূর্য যদি বাস্তবে সরাসরি কোনো জাতির মাথার ওপর উদিত হতো, তবে সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপে তারা সঙ্গে সঙ্গে ভস্মীভূত হয়ে যেত। কিন্তু যুলকারনাইন সেখানে জীবিত মানুষকে অবস্থান করতে দেখেছেন। অতএব, যদি কোনো জাতির ওপর সূর্য উদিত হওয়া দ্বারা বাস্তবে পৃথিবীর বুকে সূর্য নেমে আসা উদ্দেশ্য না হয়, তবে জলাশয়ে সূর্য ডুবে যাওয়ার দ্বারাও বাস্তবে পানির ভেতরে সূর্য ডুবে যাওয়া উদ্দেশ্য হতে পারে না।
২. পৃথিবীর বসবাসযোগ্যতা ও বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা
কুরআন কারীমে পৃথিবীকে মানুষের জন্য ‘দোলনা’ (সূরা ত্বা-হা: ৫৩) এবং ‘বিছানা’ (সূরা আল-বাকারা: ২২) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো এটি বোঝানো যে, আল্লাহ তাআলা পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের জন্য উপযোগী ও নিরাপদ করে তৈরি করেছেন। আর সূর্যকে একটি ‘প্রদীপ্ত চেরাগ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে (সূরা নূহ, ৭১:১৬, সুরা নাবা, ৭৮: ১৩)।
সূর্যের মতো প্রকাণ্ড ও উত্তপ্ত অগ্নিকুণ্ডলী যদি পৃথিবীর কোনো জলাশয়ে এসে আছড়ে পড়ত, তবে পৃথিবী মানুষের জন্য বসবাসের উপযোগী থাকত না। মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণীর অস্তিত্বই তৈরি হতো না। কুরআন যেখানে পৃথিবীকে নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য বলছে, সেখানে পৃথিবীর জলাশয়ে সূর্য ডুবে যাওয়াকে ‘আক্ষরিক বাস্তবতা’ হিসেবে উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ অবান্তর।
৩. সূর্যের নিজস্ব কক্ষপথের ধারণা
কুরআনে স্পষ্ট উল্লেখ আছে: ‘এবং সূর্য তার জন্য নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে ধাবমান’ (সূরা ইয়াসীন: ৩৮) এবং ‘প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে ভেসে চলেছে’ (সূরা আল-আনবিয়া: ৩৩)।
কুরআনের এই আয়াতগুলো দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সূর্য মহাশূন্যে একটি নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত কক্ষপথে আবর্তন করে। পৃথিবীর কোনো জলাশয় কখনোই সূর্যের এই কক্ষপথের অংশ নয়। যেহেতু পৃথিবীর জলাশয় সূর্যের কক্ষপথে পড়ে না, তাই যুক্তি ও কুরআনের নিজস্ব বাণী অনুসারেই সূর্য সেই জলাশয়ে বাস্তবে পতিত হতে পারে না।
৪. চাঁদ ও সূর্যের দূরত্ব সংক্রান্ত কুরআনিক তথ্য
সূরা ইয়াসীনে বলা হয়েছে: ‘সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চাঁদের নাগাল পাওয়া’ (আয়াত: ৪০)। চাঁদ পৃথিবী থেকে বহুদূরে অবস্থিত, আর সূর্য অবস্থিত চাঁদ থেকেও বহু কোটি কিলোমিটার দূরে।
কুরআন মাজিদ যেখানে সূর্যকে চাঁদ ও পৃথিবী থেকে বহুদূরে নিজের স্বতন্ত্র কক্ষপথে আবর্তনশীল হিসেবে বর্ণনা করছে, সেখানে সেই সূর্য পৃথিবীর কোনো জলাশয়ে ডুবে যাচ্ছে—এমন কথা কুরআন বাস্তব অর্থে বলতে পারে না। যুলকারনাইনের ঘটনাটি কেবলই তাঁর সফরকালীন অভিজ্ঞতায় দিগন্তে সূর্য ডোবার দৃশ্যকে বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
অতএব. উপরিউক্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে এটি সুস্পষ্ট যে. পবিত্র কুরআনে বর্ণিত যুলকারনাইনের ঘটনাটি দিগন্ত বিস্তৃত জলাশয়ে সূর্য অস্ত যাওয়ার এক মানবিক অভিজ্ঞতার দৃশ্যরূপ মাত্র। কুরআনের নিজস্ব তাফসির নীতি. পূর্বাপর আয়াতের সামঞ্জস্যই প্রমাণ করে যে. এখানে আক্ষরিক অর্থে জলাশয়ে সূর্য ডুবে যাওয়া উদ্দেশ্য নয়। ফলে অমুসলিম ও নাস্তিকদের উত্থাপিত আপত্তিটি সম্পূর্ণ অসার ও ভিত্তিহীন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ঈমানের মূল ভিত্তি ইসলামী আকায়েদ
...
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মহান দুই মুখপাত্র
...
ইসলাম ও কাদিয়ানিয়াত দুটি আলাদা ধর্ম
...
সালাফের শ্রেষ্ঠত্ব
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন