প্রবন্ধ
বেদ: স্বরূপ পর্যালোচনা
৪ জুলাই, ২০২৬
৩১০
০
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, বেদ কোনো মানুষের রচনা নয়, বরং ঈশ্বরের মুখনিঃসৃত বাণী যা ঋষিরা কেবল ‘দর্শন’ করেছেন বা শ্রবণ করেছেন । কিন্তু যখন আমরা বেদের অভ্যন্তরীণ শ্লোক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করি, তখন এক ভিন্ন ও রূঢ় বাস্তবতা সামনে আসে। প্রচলিত বিশ্বাস এবং শাস্ত্রীয় প্রমাণের মধ্যে যে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করাই এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য।
আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ‘বেদ ঐশ্বরিক গ্রন্থ হওয়া’র বিশ্বাসকে নিম্নোক্ত প্রমাণসমূহের আলোকে যাচাই করে দেখব।
প্রথম প্রমাণ: কোনো গ্রন্থকে 'ঐশ্বরিক' বলে স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে মূলত দুটি মৌলিক ভিত্তি বা শর্ত কাজ করে:
• প্রথম শর্ত: গ্রন্থটির শব্দ ও মর্ম (অর্থ) উভয়ই সরাসরি ঈশ্বর কর্তৃক অবতীর্ণ হতে হবে। যদি কোনো গ্রন্থের অন্তর্নিহিত ভাব বা মর্ম ঈশ্বরের হয়, কিন্তু তার ভাষাগত রূপায়ন বা শব্দ চয়ন মানুষের হয়—তবে সেই ভাষাকে কোনোভাবেই ঐশ্বরিক বলা চলে না।
• দ্বিতীয় শর্ত: সংশ্লিষ্ট গ্রন্থে কিংবা যাঁর ওপর সেটি অবতীর্ণ হয়েছে তাঁর বাণীতে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে এই ঐশ্বরিকত্বের ঘোষণা থাকতে হবে। একই সাথে, এই দাবির সপক্ষে একটি অবিচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক পরম্পরা বা ঐতিহ্য সূত্র যুগ যুগ ধরে সমাজমানসে অবিকৃতভাবে প্রচলিত থাকতে হবে।
যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, এই অপরিহার্য শর্ত দুটি বেদের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। প্রথমত, বেদের কোনো সূক্ত বা মন্ত্রে কোনো ঋষিই এমন দাবি করেননি যে, তিনি এই বাণী সরাসরি ঈশ্বরের পক্ষ থেকে লাভ করেছেন বা এটি হুবহু ঈশ্বরের বাণী। দ্বিতীয়ত, আদি কাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কোনো অবিচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বর্ণনাসূত্র বা প্রামাণ্য দলিল নেই, যা বর্তমানের প্রচলিত বেদকে সরাসরি ঐশ্বরিক উৎসজাত বলে প্রমাণ করতে পারে এবং এই সীমাবদ্ধতার বিষয়টি গবেষক মহলেও স্বীকৃত।
অতএব, বস্তুনিষ্ঠ ও যৌক্তিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে বিচার করলে, বেদের সম্পূর্ণ ঐশ্বরিক বা অপৌরুষেয় হওয়ার প্রচলিত দাবিটি দৃঢ় কোনো তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তির ওপর দাঁড়ায় না।
দ্বিতীয় প্রমাণ: ঋষিরা কি কেবল ‘দ্রষ্টা’ নাকি সচেতন ‘রচয়িতা’?
প্রচলিত সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে বৈদিক ঋষিদের ‘দ্রষ্টা’ (যাঁরা মন্ত্র দর্শন বা শ্রবণ করেছেন) হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই তত্ত্বানুযায়ী, ঋষিরা মন্ত্রের স্রষ্টা নন, কেবল মাধ্যম মাত্র। তবে বেদের আদি শ্লোক বা সূক্তসমূহের অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণ এই ধারণাকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ঋগ্বেদের অসংখ্য স্থানে ঋষিরা অত্যন্ত স্পষ্ট ও সগর্বে উল্লেখ করেছেন যে, তাঁরা নিজেদের মেধা, প্রজ্ঞা ও সাধনা প্রয়োগ করে এই মন্ত্রগুলো স্বয়ং ‘রচনা’ করেছেন।
এর সপক্ষে ঋগ্বেদের কিছু উল্লেখযোগ্য অভ্যন্তরীণ প্রমাণ নিচে উপস্থাপন করা হলো:
• ঋগ্বেদ (১/৯/৪): ‘হে ইন্দ্র, আমি তোমার স্তুতি রচনা করিয়াছি।’
• ঋগ্বেদ (১/২০/১): ‘যে ঋভুগণ জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন সেই দেবগণের উদ্দেশ্যে মেধাবী ঋত্বিকগণ এই প্রভূত ধনপ্রদ স্তোত্র নিজ মুখে রচনা করিয়াছেন।’
• ঋগ্বেদ (১/৩১/১৮): ‘হে অগ্নি! এই মন্ত্র দ্বারা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হও, আমাদিগের শক্তি ও জ্ঞান অনুসারে আমরা ইহা রচনা করিয়াছিলাম।’
• ঋগ্বেদ (১/৬১/১৬): ‘হে অশ্বযুক্ত রথেশ্বর ইন্দ্র! গোতমগণ তোমাকে যজ্ঞে উপস্থিত করিবার জন্য স্তুতিরূপ মন্ত্রসমূহ রচনা করিয়াছে।’
• ঋগ্বেদ (১/৬২/১৩): ‘হে ইন্দ্র! গোতম ঋষির পুত্র নোধা আমাদের নিমিত্ত তোমার এই নূতন স্তোত্র রচনা করিয়াছেন।’
• ঋগ্বেদ (১/১৮৯/৮): ‘মানের পুত্র এই শত্রুনাশক অগ্নি সম্বন্ধে এই স্তোত্র বচনসমূহ রচনা করিয়াছেন।’
• ঋগ্বেদ (২/৩৯/৮): ‘হে অশ্বিদ্বয়! গৃৎসমদ ঋষি তোমাদের বৃদ্ধিসাধনার্থ এই সকল মন্ত্র ও স্তোত্র রচনা করিয়াছেন।’
• আরও স্পষ্ট বক্তব্য আাছে ঋগ্বেদ (১/৩০/৬): ‘সম্পদ প্রত্যাশী লোকেরা তোমার জন্য এই স্তুতি রচনা করেছে যেমন অভিজ্ঞ কারিগর রথ তৈরি করে।’
ঋষিদের এই দ্ব্যর্থহীন ও নিজস্ব বয়ান প্রমাণ করে যে, তাঁরা নিজেদের অলৌকিক বাণীর মাধ্যম ভাবেননি; বরং সচেতন সাহিত্যিক ও রচয়িতা হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেছেন। ফলে, ঋষিদের এই প্রত্যক্ষ স্বীকারোক্তির আলোকে পরবর্তীকালের আরোপিত ‘দ্রষ্টা’ তত্ত্বের কোনো সুদৃঢ় ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না।
তৃতীয় প্রমাণ: বেদের ঋষিদের মন্ত্রগুলো যে দৈববাণী নয়, তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ হলো বেদের পরবর্তী গ্রন্থাকারদের ক্রিয়াকলাপ। উদাহরণত, বেদের ঋষিদের ঈশ্বর বন্দনার ধরন ছিল যাগমার্গ । কিন্তু উপনিষদের ঋষিরা তা নির্ভুল মনে করেননি। তাই তাঁরা ঈশ্বর প্রাপ্তির পথ হিসেবে আবিষ্কার করেন জ্ঞানমার্গ, যাকে বলা হয় বেদান্ত দর্শন। এই যে বেদ দর্শন ও বেদান্ত দর্শন; এই দুটোই প্রমাণ বহন করছে যে, এই দর্শনের কোনোটাই ঐশ্বরিক নয়। কারণ বেদ ও বেদান্ত ঐশ্বরিক হলে বেদ ও বেদান্তের দর্শন এক হতো, কখনোই সাংঘর্ষিক ও বৈসাদৃশ্যপূর্ণ হতো না। উপনিষদের ঋষিদের কাছে মনে হলো, বেদের ঋষিরা সকাম কাজকর্ম করার কারণে তাঁরা পুরোপুরি মোক্ষলাভ করেননি। এটা কীভাবে সম্ভব যে, তাঁরা ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হবেন আর উপনিষদের লোকেরা এসে তা অসঠিক মনে করবে!
উপনিষদের ঋষিরা বৈদিক ঋষিদের বিরোধিতা করেছেন প্রধান দুটি বিশ্বাসে। এক: কর্মমার্গ, দুই: স্বর্গপ্রাপ্তি। উপনিষদের ঋষিরা বলতেন, কর্ম বা যাগমার্গ সঠিক নয়; বরং জ্ঞানমার্গই হলো শুদ্ধ ও সঠিক। তদুপরি স্বর্গপ্রাপ্তি মুখ্য নয়; মুক্তিপ্রাপ্তিই হলো মুখ্য। উপনিষদের ঋষিরা বৈদিক ঋষিদের মত ও চিন্তাকে অভ্রান্ত ও নির্ভুল মনে করতেন না বিধায় একথা বলা খুবই যৌক্তিক যে, উপনিষদের ঋষিদের চোখে বৈদিক ঋষিরা প্রত্যাদিষ্ট নন। তাঁদের চিন্তা ও বক্তব্য ঐশ্বরিক নয়।
শ্রীউমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য তাঁর ‘ভারতদর্শনসার’ গ্রন্থে (পৃ. ৪৭-৪৮) বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন:
‘কিন্তু তথাপি ইহাও স্বীকার করিতে হইবে যে, উপনিষদের ভিতরই কর্মের নিন্দা রহিয়াছে।... উপনিষদ বেদের কর্মের প্রতি উপেক্ষা, অবজ্ঞা, নিন্দা ক্রমশ প্রচার করিতেছিল। মুণ্ডক উপনিষৎ দুই প্রকার বিদ্যার কথা বলিয়াছে একটি অপরা-নিকৃষ্ট, আর একটি পরা বা শ্রেষ্ঠ। অপরা বিদ্যার নামান্তর ‘অবিদ্যা’; আর পরা বিদ্যাই প্রকৃত বিদ্যা। চারি বেদ ও ছয় বেদাঙ্গ (শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ ও জ্যোতিষ) অপরা বিদ্যার অন্তর্গত। আর পরা বিদ্যা? যাহা দ্বারা ব্রহ্মকে জানা যায় অর্থাৎ উপনিষৎ।’
একই গ্রন্থের ২৩৫ পৃষ্ঠায় আছে: ‘জৈমিনির মতে কর্মই শ্রেষ্ঠ এবং তাহার ফল স্বর্গই পরম পুরুষার্থ; বেদান্ত জ্ঞানকে বড়ো মনে করিয়াছে এবং স্বর্গ অপেক্ষাও বড়ো বস্তু মুক্তির কথা তুলিয়াছে। মীমাংসা সমগ্র বেদকে কর্মের বিধি-নিষেধ রূপে ভাবিতে চায়; আর বেদান্ত বাক্যের সাহায্যেই প্রমাণ করিতে চায় যে, কর্ম দ্বারা উপার্জিত লোক ভঙ্গুর ও অদৃঢ়; মুক্তি না হইলে স্বর্গবাসের পরও আবার জন্ম লইতে হইবে।’
চতুর্থ প্রমাণ: বেদ ঐশ্বরিক না হওয়ার আরেকটি বড় প্রমাণ হলো বিভিন্ন ঋষিদের পরস্পর শত্রুতা ও বিদ্বেষ। যেমন বিশ্বামিত্র ঋষি ও বশিষ্ঠ ঋষির মধ্যকার অনৈক্য ও বিবাদ। বিশ্বামিত্র ঋষি বশিষ্ঠ ঋষিকে অভিশাপ দিচ্ছেন, আর বশিষ্ঠও বিশ্বামিত্রকে অভিশাপ দিচ্ছেন।
ঋগ্বেদ ৩/৫৩/২৩; এই ঋকে বিশ্বামিত্র অভিশাপ দিচ্ছেন বশিষ্ঠকে:
‘২৩। প্রাজ্ঞ ব্যক্তি মূর্খ ব্যক্তিকে হাস্যাস্পদ করে না। অশ্বের সম্মুখে গর্দভকে নিয়ে যায় না। ২৪। হে ইন্দ্র! ভারতগণ বশিষ্ঠগণের সাথে পার্থক্যই জানে, একতা জানে না। সংগ্রামে তাদের প্রতি সহজ শত্রুর ন্যায় অশ্ব প্রেরণ করে ধনুক ধারণ করে।’
রমেশচন্দ্র দত্ত টীকায় বলেন, ‘অর্থাৎ বিদ্বান ব্যক্তি যেরূপ মূর্খ ব্যক্তির সঙ্গে বিবাদ করে না, সেরূপ বিশ্বামিত্রেরও বশিষ্ঠের সঙ্গে বিবাদ করা উচিত নয়। (সায়ণ)।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনুক্রমণিকায় আছে যে, এ শেষ ঋকগুলি বশিষ্ঠ বংশীয়গণের প্রতি অভিসম্পাত। আচার্য রোথ এবং মক্ষমুলার বলেন, ঋগ্বেদের অনেক হস্তলিপিতে এ ঋক একেবারে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’
আবার ঋগ্বেদ ৭/১০৪/১৩-১৬ ঋকসমূহে বশিষ্ঠ ঋষি অভিশাপ দিচ্ছেন বিশ্বামিত্রকে! একথা বলার জো নেই যে, বেদ মুনিঋষিদের ঠিক, কিন্তু তাঁরা ঋকগুলো লাভ করেছেন ঈশ্বরের কাছ থেকে। এটা অবাস্তব দাবি। বরং ঈশ্বরের সাথে তাঁদের কোনো সম্পর্ক ছিল না, যার বাস্তব প্রমাণ ঋষিদের এই পারস্পরিক কলহ-বিদ্বেষ। যেকোনো একজনের অভিশাপ অবশ্যই অন্যায় অমূলক! ঈশ্বরের কথা কখনোই অন্যায় অমূলক হয় না।
পঞ্চম প্রমাণ: বলা হয়ে থাকে বেদ ঐশ্বরিক বাণী। এক্ষেত্রে মূল শব্দ ছিল ‘অপৌরুষেয়’। বলা হতো, বেদ অপৌরুষেয়। ‘অপৌরুষেয়’ আর ‘ঐশ্বরিক’ সমার্থক নয়। যার প্রমাণ হলো, জৈমিনি প্রণীত পূর্ব মীমাংসায় বেদকে বলা হয়েছে অপৌরুষেয়।
এ প্রসঙ্গে শ্রীউমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য ‘ভারতদর্শনসার’ গ্রন্থে (পৃ:২২০) বলেন: ‘মীমাংসার শিক্ষা, বেদ বিশেষভাবে প্রামাণ্য; তাহার কারণ উহা অপৌরুষেয় (কোনো মানুষ ইহা রচনা করিয়াছে ইহার প্রমাণ নাই; বেদের কোন কর্তা বা রচয়িতার নাম কেহ করিতে পারে না। সুতরাং ইহা অপৌরুষেয়)।... মনে রাখা ভালো যে, মীমাংসা বেদকে অপৌরুষেয় অর্থাৎ অনাদি ও নিত্য বলে, ঈশ্বরের মুখনিঃসৃত বাণী মনে করে না; কারণ মীমাংসায় ঈশ্বর নাই।’
বেদ অপৌরুষেয় কেন? কোনো মানুষ কর্তৃক বেদ রচিত না হওয়ার দরুন, নাকি কোন সময় কোন মানুষ রচনা করেছে এটা না জানার দরুন বেদ হয়ে উঠেছে অপৌরুষেয়?
দুর্গাদাস লাহিড়ী ‘প্রাচীন ভারতের ইতিহাস’ গ্রন্থে (১/২৯) বলেন:
‘যখন বেদের রচয়িতাকে মনুষ্য-বুদ্ধির অনুসন্ধানে পাওয়া যায় না, বেদের রচনাকালেরও যখন সময়-নির্দেশ হয় না, বেদ অনাদি অপৌরুষেয় ব্রহ্মবাক্য ভিন্ন ইহাকে আর কি বলা যাইতে পারে?’ সুতরাং দেখা যাচ্ছে, 'অপৌরুষেয়' ধারণাটি কোনো ইতিবাচক প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং রচনাকাল ও রচয়িতা সম্পর্কে ঐতিহাসিক নিশ্চয়তার অভাব থেকেই এই ধারণার উৎপত্তি।
তিনি আরও বলেন (১/২৮) : ‘যাহাদের নামে বৈদিক মন্ত্রাদি প্রচলিত, তাহারা সেই সেই মন্ত্রের সংগ্রহকর্তা, পরন্তু রচয়িতা নহেন। সে মন্ত্র কোন পুরুষ, কোন কালে প্রথম উচ্চারণ করিয়াছিলেন—সন্ধান করিয়া পাওয়া যায় না বলিয়াই, বেদ এইরূপ বিশেষণে বিশেষিত হইয়া থাকে... মানুষ যখন সন্ধান করিয়া নির্ণয় করিতে পারে না, তখনই তাহা ‘দৈব’ নামে অভিহিত হয়।’
ষষ্ঠ প্রমাণ: বেদ অধ্যয়ন করলে জানা যায়, বেদমন্ত্রগুলো বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন ঋষিদের উচ্চারিত। এটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। মন্ত্রগুলো বংশ পরম্পরায় ও গুরুশিষ্য পরম্পরায় চলে আসছিল। প্রশ্ন হলো,
১. বিক্ষিপ্ত ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব মন্ত্র-শ্লোক ‘বেদ আকারে’ সংকলনকারীর পরিচয় কী?
২. সে মুনিঋষিদের নামে নিজের পক্ষ থেকে সংযোগ-বিয়োগ ঘটায়নি, এর প্রমাণ কী?
৩. যারা যথার্থ মুনিঋষি নয়, সে তাদের থেকে মন্ত্রশ্লোক নেয়নি, তার নিশ্চয়তা কোথায়?
শ্রীউমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য ‘ভারতদর্শনসার’ গ্রন্থে (পৃ:৩৬) লেখেন: ‘লিখন প্রচলনের পূর্ব পর্যন্ত অর্থাৎ বুদ্ধের আবির্ভাবের কাছাকাছি সময় পর্যন্ত এইভাবেই বেদ রক্ষিত হইয়াছে। তাহার পর কে কবে কোথায় এইসব গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করিতে আরম্ভ করিল, তাহা জানিবার কোন উপায় নাই।’
সপ্তম প্রমাণ: বেদকে ঐশ্বরিক গ্রন্থ বলার জন্য তো প্রথমে এই সিদ্ধান্তে স্থির হতে হবে যে, বেদের সব ঋষিরা কেবল সারা জাহানের সৃষ্টিকর্তা এক ও অদ্বিতীয় ‘ঈশ্বরে’ বিশ্বাস করত। যদি বলা হয় তারা সকলেই এক সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করত, তবে বেদে প্রকৃতি উপাসনা কেন? বেদের পাতায় পাতায় রয়েছে প্রাকৃতিক উপাদানের প্রার্থনা ও পূজা-অর্চনা। এর উত্তরে বলা হয়—এসব মহান ঈশ্বরের বিভিন্ন গুণাবলি।
একথাটি দু-এক জায়গায় প্রয়োগ করা সম্ভব হলেও সব জায়গায় এটা প্রয়োগ করা হবে ‘বেদ’কে ‘অবেদ’ বানানো। উদাহরণত, ঋগ্বেদের একটি উপাস্য ‘অগ্নি’র প্রসঙ্গ। ঋগ্বেদে ইন্দ্রের পর সবচেয়ে বেশি শ্লোক রয়েছে ‘অগ্নি’ সম্বন্ধে। অগ্নি দ্বারা ঋষিরা চেনাজানা আগুনই উদ্দেশ্য নিতেন।
• ঋগ্বেদ ১/১২/৩: ‘হে কাষ্ঠোৎপন্ন অগ্নি!’
• ঋগ্বেদ ১/৩১/৪: ‘হে অগ্নি! ...যখন তোমার পিতৃরূপ কাষ্ঠদ্বয়ের ঘর্ষণে উৎপন্ন হও।’
• ঋগ্বেদ ১/৬৮/২: ‘হে দেব অগ্নি! তুমি শুষ্ক কাষ্ঠ হইতে জ্বলন্ত হইয়া প্রাদুর্ভাব হইলে সকল যজমানগণ তোমার কর্ম অনুষ্ঠান করে।’
উল্লিখিত শ্লোকগুলো সুস্পষ্ট যে, আগুন দ্বারা আমাদের চেনা-পরিচিত আগুনই উদ্দেশ্য।
নিরানব্বই ভাগ গবেষক ও ঐতিহাসিক একমত যে, বৈদিক ঋষিরা প্রকৃতিপূজারী ছিল। ঈশ্বর-বন্দনা না শিখিয়ে ঈশ্বর শিখাবেন কীভাবে জড়-প্রকৃতির বন্দনা করতে হয়—এটা সম্ভব নয়। সুতরাং হয়তো ঐশ্বরিক বাণীকে জঘন্যতম বিকৃতির মাধ্যমে অ-ঐশ্বরিক বাণী বানানো হয়েছে অথবা অ-ঐশ্বরিক বাণীকে অপব্যাখ্যার মাধ্যমে ঐশ্বরিক বানানো হচ্ছে।
অষ্টম প্রমাণ: ঋগ্বেদের বিখ্যাত নাসদীয় সূক্তের শেষ শ্লোকটি (১০.১২৯.৭) বেদের ঐশ্বরিক দাবির বিরুদ্ধে একটি বড় প্রমাণ। সেখানে সৃষ্টির আদি রহস্য প্রসঙ্গে স্পষ্টাক্ষরে বলা হয়েছে:
‘যিনি এই মহাবিশ্বের পরম আকাশে এর সর্বাধিনায়ক বা অধ্যক্ষ হয়ে বসে আছেন, হয়তো তিনিই কেবল তা জানেন; অথবা তিনিও হয়তো তা জানেন না!’
যেকোনো ঐশ্বরিক গ্রন্থে স্রষ্টা নিজেকে সর্বজ্ঞ ও অভ্রান্ত দাবি করেন। কিন্তু এখানে ঋষি স্বয়ং ঈশ্বরের জ্ঞান নিয়েই চরম সংশয় প্রকাশ করেছেন যে, মহাবিশ্ব কীভাবে সৃষ্টি হলো, তা হয়তো আকাশের ঈশ্বরও জানেন না।
এই চরম অজ্ঞতার স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে, বেদ কোনো ঈশ্বরের বাণী নয়; বরং এটি সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনে প্রাচীন মানুষের এক দার্শনিক অনুসন্ধান মাত্র।
নবম প্রমাণ: সনাতন ধর্মীয় প্রথায় দাবি করা হয় যে, বেদের ঋষিরা যখন মন্ত্রগুলো পেয়েছিলেন, তখন তাঁরা জাগতিক কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে এক অলৌকিক ‘সমাধি’ বা ‘নির্গুণ ও চিন্তাশূন্য’ অবস্থায় আচ্ছন্ন ছিলেন। কোনো প্রকার মানবিক চেষ্টা বা বুদ্ধিবৃত্তি ছাড়াই মন্ত্রগুলো তাঁদের মনে আপসে আপ (স্বতঃস্ফূর্তভাবে) এসে ধরা দিয়েছিল এবং তাঁরা কেবল তা মুখে উচ্চারণ করেছিলেন। এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই বেদকে 'অপৌরুষেয়' বা মানুষের তৈরি নয় বলে দাবি করা হয়।
বেদের নিজস্ব পাঠ, ঋষিদের মানসিক অবস্থা এবং ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এই অলৌকিক দাবিকে খণ্ডন করে। এর সপক্ষে প্রধান যুক্তিসমূহ নিচে দেওয়া হলো:
মেধা ও বুদ্ধির সচেতন প্রয়োগ: একজন কাঠমিস্ত্রি যখন একটি রথ তৈরি করে, তখন সে কোনো অলৌকিক ঘোরে বা অচেতন অবস্থায় থাকে না; বরং তাকে অত্যন্ত সতর্কভাবে নিজের সম্পূর্ণ বুদ্ধি, মেধা ও নিখুঁত কারিগরি দক্ষতাকে কাজে লাগাতে হয়। ঋষিরা যখন বেদের মন্ত্রেই (যেমন—ঋগ্বেদ ১/১৩০/৬) নিজেদের রথ প্রস্তুতকারক কারিগরের সাথে তুলনা করছেন, তখন পরিষ্কার বোঝা যায় যে তাঁরা কোনো অবচেতন বা অলৌকিক শূন্যতায় বাণী পাননি। বরং তাঁরা তাঁদের তীব্র আবেগ, ভক্তি এবং ভাষা-ছন্দের প্রখর জ্ঞানকে সচেতনভাবে প্রয়োগ করে একেকটি সূক্ত নিজ হাতে তৈরি বা রচনা করেছিলেন।
বাস্তব পরিবেশ ও তাৎক্ষণিক স্বতঃস্ফূর্ততা: যজ্ঞের জ্বলন্ত আগুন আর প্রস্তুত সোমরসের সামনে দাঁড়িয়ে ঋষিরা যখন দেবতাকে বলেন—‘হে ইন্দ্র, এসো, এই সোমরস পান করো এবং আমাদের ধন-সম্পদ দাও,’ তখন তা প্রমাণ করে যে এই মন্ত্রগুলো কোনো নিস্তব্ধ বা অলৌকিক পরিবেশে বসে পাওয়া কোনো দৈববাণী নয়। এটি ছিল যজ্ঞের মাঠে উপস্থিত থেকে চারপাশের বাস্তব পরিবেশের সাথে যুক্ত এক সরাসরি ও জীবন্ত প্রার্থনা। ঋষিরা সেই পারিপার্শ্বিক চেতনাকে জাগ্রত রেখেই তৎক্ষণাৎ এই আহ্বানগুলো জানিয়েছিলেন। সেখানে কোনো অসাড় সমাধি বা অলৌকিক শূন্যতা ছিল না।
বেদের এই লৌকিক ও মানবিক রূপটি ভারতের প্রখ্যাত ভাষাবিদ ও সাহিত্যিকদের গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। ড. সুকুমার সেন তাঁর ‘ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাস’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা: ৮) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে লিখেছেন:
‘ঋগ্বেদের সব কবিতাই ধর্মঘটিত নয়।... দুই একটিকে তুকতাক মন্ত্রের মত নেওয়া যায়। কিন্তু বাকিগুলির সম্বন্ধে শুধু এই অনুমানই করা চলে যে কেবল প্রাচীনত্বের দাবিতেই এগুলির ঋগ্বেদ সংহিতায় স্থান হইয়াছিল।’
সবশেষে বলা যায়, বেদকে ‘ঈশ্বরের বাণী’ বলার প্রচলিত দাবির পক্ষে কোনো দৃঢ় প্রমাণ নেই। বরং বেদের ভেতরের প্রমাণই দেখায় যে, বেদ মূলত প্রাচীন ঋষিদের মানবিক রচনা—সচেতন কাব্যপ্রতিভা, ভক্তি ও দার্শনিক অনুসন্ধানের ফসল, ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশ নয়। ‘অপৌরুষেয়’ ধারণাটির উৎপত্তি রচয়িতা ও রচনাকাল সম্পর্কে ঐতিহাসিক অনিশ্চয়তা থেকে, ইতিবাচক কোনো প্রমাণ থেকে নয়।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
শান্তি সম্প্রীতি ও উদারতার ধর্ম ইসলাম
নামে যার শান্তির আশ্বাস তার ব্যাপারে আর যাই হোক, সন্ত্রাসের অপবাদ দেয়ার আগে তার স্বরূপ উদঘাটনে দু'দণ...
ঝাড়ফুঁক-তাবীয : একটি দালীলিক বিশ্লেষণ (৩য় পর্ব)
...
ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলাম : বিভ্রান্তি নিরসনে মুসলমানদের যা জানা দরকার
...
ঈমানের মেহনত : পরিচয় ও পদ্ধতি
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর.. মুহতারাম হাযেরীন! আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের জন্য চারট...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন