প্রবন্ধ
দাওয়াতের ময়দানে সাহাবায়ে কেরাম রাযি.
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
২৯৬
০
ভূমিকা
ইসলাম এমন একটি দ্বীন, যার শিক্ষা শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য নয়; বরং আল্লাহর বান্দাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। নবী-রাসূলগণের প্রধান দায়িত্বগুলোর অন্যতম ছিল মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পর তাঁর সাহাবায়ে কেরাম এ মহান দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ ۚ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।”—সূরা আলে ইমরান, ৩:১০৪
আর দাওয়াতের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
“তার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে, নিশ্চয়ই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।”—সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩৩
এই আয়াতের আলোকে বোঝা যায়, আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ। তবে সাহাবায়ে কেরামের কাছে দাওয়াত কোনো বক্তৃতা বা মঞ্চকেন্দ্রিক কাজ ছিল না; বরং তাঁদের সমগ্র জীবনই ছিল দাওয়াতের একটি জীবন্ত নমুনা।
১. সাহাবায়ে কেরাম প্রথমে নিজেরা ঈমান গ্রহণ করেছেন
সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তাঁরা মানুষকে যে বিষয়ের দিকে আহ্বান করতেন, প্রথমে নিজেরাই তার ওপর ঈমান আনতেন এবং আমল করতেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন নবুওয়াতের ঘোষণা দিলেন, তখন তাঁর সবচেয়ে নিকটবর্তী ও বিশ্বস্ত মানুষদের মধ্য থেকেই প্রথমে ঈমান গ্রহণকারীরা এগিয়ে আসেন।
নারীদের মধ্যে হযরত খাদিজা রাযি., প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি., কিশোরদের মধ্যে হযরত আলী রাযি. এবং মুক্তদাসদের মধ্যে হযরত যায়েদ ইবন হারিসা রাযি. প্রাথমিক ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
নবুওয়াতের শুরুতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন ব্যক্তিদের কাছে দাওয়াত পেশ করেছিলেন, যারা তাঁর দীর্ঘদিনের জীবন, চরিত্র ও আমানতদারি সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত ছিলেন। –আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া
২. হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.—একজন সাহাবি, একটি দাওয়াতি কাফেলা
হযরত আবু বকর রাযি. ইসলাম গ্রহণ করার পর নিজে বসে থাকেননি। বরং তাঁর পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ইসলামের দিকে আহ্বান করতে থাকেন।
তাঁর দাওয়াতের মাধ্যমে পরবর্তীতে ইসলামের ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ঈমান গ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন,
হযরত উসমান ইবন আফফান রাযি.
হযরত যুবাইর ইবন আওয়াম রাযি.
হযরত তালহা ইবন উবাইদুল্লাহ রাযি.
হযরত সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস রাযি.
হযরত আবদুর রহমান ইবন আওফ রাযি.
এখানে দাওয়াতের একটি বিরাট শিক্ষা রয়েছে।
একজন মানুষ নিজে হিদায়াত পাওয়ার পর যদি তার পরিবার, বন্ধু, আত্মীয় ও পরিচিতদের কাছে দ্বীনের কথা পৌঁছে দেয়, তাহলে একজনের দাওয়াত বহু মানুষের হিদায়াতের কারণ হতে পারে।
সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতের এই ব্যক্তিগত পদ্ধতিটি পরবর্তীতে ইসলামের বিস্তারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।–আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া
৩. দাওয়াতের প্রথম ময়দান—পরিচিত মানুষ
মক্কী যুগে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে ব্যক্তিগতভাবে দাওয়াত পৌঁছানোর পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দাওয়াতি নীতি। —উসদুল গাবাহ, আবদুল্লাহ ইবনু উসমান—আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর জীবনী, ৩/২০৬।
দাওয়াত মানেই বড় সমাবেশ নয়। একজন মানুষকে আলাদাভাবে বসিয়ে তার সঙ্গে কথা বলা, তার সমস্যা বোঝা, তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং তাকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করাও অত্যন্ত কার্যকর দাওয়াতি পদ্ধতি।
৪. গোপন দাওয়াতের সময় সাহাবায়ে কেরামের ভূমিকা
মক্কার প্রথম যুগ ছিল অত্যন্ত কঠিন। মুসলমানদের সংখ্যা অল্প, আর চারদিকে ছিল শিরক ও কুফরের প্রবল প্রতিরোধ।
এই সময় মুসলমানরা গোপনে কুরআন শিখতেন এবং নিজেদের ঈমান ও আমলকে শক্তিশালী করতেন।
অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম সাধারণত গোপনেই কুরআন শিক্ষা করতেন; কিন্তু মক্কার কাফিরদের নির্যাতন সত্ত্বেও আবু বকর, খাব্বাব ইবনুল আরাত, মুসআব ইবন উমাইরসহ অন্যান্য সাহাবি কুরআনের শিক্ষা ও প্রচারে নিয়োজিত ছিলেন। —উসদুল গাবাহ, আবদুল্লাহ ইবনু উসমান—আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর জীবনী, ৩/২০৬।
৫. কুরআন ছিল সাহাবায়ে কেরামের প্রধান দাওয়াতি মাধ্যম
সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল—তাঁরা নিজেদের কথা দিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চাননি; বরং আল্লাহর কালাম মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
বিশেষ করে হযরত মুসআব ইবন উমাইর রাযি.-এর মদিনার দাওয়াত এ ক্ষেত্রে অনন্য উদাহরণ।
আকাবার প্রথম বাইআতের পর মদিনাবাসী রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে একজন শিক্ষক ও দাঈ চাইলেন। তাঁরা বলেছিলেন—
ابْعَثْ إِلَيْنَا رَجُلًا يُفَقِّهْنَا فِي الدِّينِ وَيُقْرِئْنَا الْقُرْآنَ
“আমাদের কাছে এমন একজন ব্যক্তিকে পাঠিয়ে দিন, যিনি আমাদের দ্বীনের জ্ঞান শিক্ষা দেবেন এবং কুরআন পড়াবেন।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদের সঙ্গে মুসআব ইবন উমাইর রাযি.-কে পাঠালেন। তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে ইবন ইসহাকের বর্ণনায় এসেছে—
فَلَمَّا انْصَرَفَ عَنْهُ الْقَوْمُ، بَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مَعَهُمْ مُصْعَبَ بْنَ عُمَيْرٍ، وَأَمَرَهُ أَنْ يُقْرِئَهُمُ الْقُرْآنَ، وَيُعَلِّمَهُمُ الْإِسْلَامَ، وَيُفَقِّهَهُمْ فِي الدِّينِ
“লোকেরা ফিরে গেলে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদের সঙ্গে মুসআব ইবন উমাইরকে পাঠালেন এবং তাঁকে নির্দেশ দিলেন—তিনি যেন তাদের কুরআন পড়ান, ইসলাম শিক্ষা দেন এবং দ্বীনের গভীর বুঝ দান করেন।” —আত তাবকাতুল কুবরা, পৃ: ৮৭
এখানে দাওয়াতের তিনটি মৌলিক ভিত্তি পাওয়া যায়—
কুরআন শিক্ষা দেওয়া।
ইসলাম শিক্ষা দেওয়া।
দ্বীনের সঠিক বুঝ তৈরি করা।
অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াত শুধু আবেগ জাগানো ছিল না; বরং মানুষের ঈমান, ইলম ও বুঝ তৈরি করাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য।
৬. মুসআব রাযি.—দাওয়াতের জন্য মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া
মদিনায় গিয়ে মুসআব রাযি. বসে বসে অপেক্ষা করেননি যে মানুষ তাঁর কাছে আসবে।
তিনি ইসলামের দাওয়াত নিয়ে নিজেই মদিনার বিভিন্ন গোত্রের বাড়িঘরে গিয়ে মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতেন এবং তাদের কুরআন শিক্ষা দিতেন।—আস সীরাতুন নবওয়্যিাহ
এটাই সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতি চরিত্রের একটি বড় বৈশিষ্ট্য।
তাঁরা মানুষের কাছে পৌঁছেছেন।
মানুষকে নিজেদের কাছে আসার অপেক্ষায় বসে থাকেননি।
আজকের দাওয়াতের ক্ষেত্রেও এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৭. দাওয়াতের পথে সাহাবায়ে কেরামের মূলনীতি
সাহাবায়ে কেরামের প্রাথমিক দাওয়াতি জীবন থেকে আমরা কয়েকটি মৌলিক নীতি পাই—
১. প্রথমে নিজের ঈমান ও আমল সংশোধন করা।
২. নিকটবর্তী মানুষদের কাছে দাওয়াত পৌঁছানো।
৩. ব্যক্তিগত সম্পর্ককে দাওয়াতের কাজে ব্যবহার করা।
৪. কুরআনকে দাওয়াতের প্রধান মাধ্যম বানানো।
৫. মানুষকে শুধু আবেগ নয়, দ্বীনের সঠিক বুঝ দেওয়া।
৬. মানুষের কাছে নিজে পৌঁছে যাওয়া।
৭. দাওয়াতের কাজে ইখলাস বজায় রাখা।
৮. প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দাওয়াতের কাজ অব্যাহত রাখা।
দাওয়াতের পথে ত্যাগ, নির্যাতন ও হিজরত
১. দাওয়াতের পথে নির্যাতন—তবুও অটল সাহাবায়ে কেরাম
মক্কায় ইসলাম গ্রহণকারীদের ওপর যখন নির্যাতন শুরু হলো, তখন সাহাবায়ে কেরামের কেউই ঈমান থেকে পিছিয়ে যাননি।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ
“মানুষ কি মনে করে যে, তারা শুধু ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই ছেড়ে দেওয়া হবে এবং তাদের পরীক্ষা করা হবে না?”—সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:২
প্রথম যুগের সাহাবায়ে কেরামের জীবন ছিল এই আয়াতের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
তাঁদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে, সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়েছে, ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে; কিন্তু তাঁরা আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত থেকে সরে যাননি।
২. হযরত আবু যর গিফারি রাযি.—প্রকাশ্যে তাওহীদের ঘোষণা
হযরত আবু যর গিফারি রাযি. ইসলামের সংবাদ পেয়ে মক্কায় আসেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে ঈমান গ্রহণের পর তিনি নিজের ঈমান গোপন রাখার পরিবর্তে প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
সহীহ মুসলিমে তাঁর দীর্ঘ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন—
ثُمَّ قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَاذَا تَأْمُرُنِي؟ قَالَ: تَرْجِعُ إِلَى قَوْمِكَ فَتَكْتُمُ أَمْرَنَا حَتَّى يَبْلُغَكَ أَمْرُنَا
“আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে কী নির্দেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেন: তুমি তোমার সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে যাও এবং আমাদের বিষয় গোপন রাখো, যতক্ষণ না আমার পক্ষ থেকে তোমার কাছে কোনো নির্দেশ আসে।”
কিন্তু আবু যর রাযি. বললেন—
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَأَصْرُخَنَّ بِهَا بَيْنَ ظَهْرَانَيْهِمْ
“যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! আমি অবশ্যই তাদের মাঝে প্রকাশ্যে এ কথা ঘোষণা করব।”
এরপর তিনি কাবার কাছে গিয়ে উচ্চস্বরে বললেন—
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ
মুশরিকরা তাঁকে ঘিরে ধরে প্রচণ্ড মারধর করল।
পরদিনও তিনি একইভাবে কাবার কাছে গিয়ে তাওহীদের ঘোষণা করলেন। আবারও তাঁকে মারধর করা হলো।
এই ঘটনা সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতি দৃঢ়তার অসাধারণ দৃষ্টান্ত।
৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাযি.—কাবার পাশে কুরআনের দাওয়াত
হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাযি. ছিলেন সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কুরআনের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি।
মক্কার এমন সময়, যখন মুসলমানরা প্রকাশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করতে ভয় পেতেন, তিনি কাবার কাছে গিয়ে প্রকাশ্যে আল্লাহর কালাম তিলাওয়াত করার উদ্যোগ নেন।
তাঁর তিলাওয়াতের ফলে কুরাইশরা তাঁকে মারধর করে।
কিন্তু তিনি দাওয়াতের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি।
এ ঘটনা দেখিয়ে দেয়—সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতের প্রধান শক্তি ছিল কুরআন।
তাঁরা নিজেদের বক্তব্যকে কুরআনের বিকল্প বানাননি; বরং মানুষের সামনে আল্লাহর কালাম পৌঁছে দিয়েছেন।—আস সীরাতুন নবউয়্যিাহ
৪. নির্যাতনের কারণে হিজরত—দাওয়াত বন্ধ হয়নি
মক্কায় নির্যাতন যখন অসহনীয় হয়ে উঠল, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে হাবশায় হিজরত করার অনুমতি দেন।
তিনি বলেন—
لَوْ خَرَجْتُمْ إِلَى أَرْضِ الْحَبَشَةِ، فَإِنَّ بِهَا مَلِكًا لَا يُظْلَمُ عِنْدَهُ أَحَدٌ
“তোমরা যদি হাবশার ভূমিতে চলে যেতে, তাহলে ভালো হতো; সেখানে এমন একজন বাদশাহ আছেন, যার কাছে কারও ওপর জুলুম করা হয় না।”
মক্কী যুগের এই হিজরতকে শুধু নির্যাতন থেকে আত্মরক্ষার ঘটনা হিসেবে নয়, বরং দাওয়াতের নতুন ক্ষেত্র তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমে অল্পসংখ্যক সাহাবি হিজরত করেন এবং পরে দ্বিতীয়বার আরও বৃহৎ সংখ্যায় সাহাবায়ে কেরাম হাবশায় যান।
সর্বপ্রথম এগারোজন পুরুষ ও চারজন নারী হিজরতের সৌভাগ্য অর্জন করেন। পুরুষদের মধ্যে ছিলেন—হযরত উসমান ইবন আফফান রাযি., যুবাইর ইবন আওয়াম রাযি., মুস‘আব ইবন উমাইর রাযি., আবদুর রহমান ইবন আওফ রাযি., আবু সালামাহ ইবন আবদুল আসাদ রাযি., উসমান ইবন মাজউন রাযি., আমির ইবন রাবী‘আহ রাযি., আবু সাবরাহ ইবন আবি রুহম অথবা আবু হাতিব ইবন আমর রাযি., সুহাইল ইবন বায়দা রাযি., আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাযি. এবং আবু হুযাইফাহ ইবন উতবাহ রাযি.।
আর চারজন নারী হলেন—রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কন্যা এবং হযরত উসমান ইবন আফফান রাযি.-এর স্ত্রী রুকাইয়াহ রাযি.; হযরত আবু হুযাইফাহ রাযি.-এর স্ত্রী সাহলাহ বিনতে সুহাইল রাযি.; হযরত আবু সালামাহ রাযি.-এর স্ত্রী সালামাহ বিনতে আবি উমাইয়াহ রাযি. এবং হযরত আমির ইবন রাবী‘আহ রাযি.-এর স্ত্রী লায়লা বিনতে হাশমাহ রাযি.।—ইবন হিশাম, “হাবশার দেশে প্রথম হিজরত”-এর আলোচনা, ১/৩৫৮; যাদুল মা‘আদ, ৩/২৩; সীরাতুন নবী ﷺ, ১/১৪৯–১৫০।
৫. হাবশায় হিজরত—দাওয়াতের নতুন অধ্যায়
হাবশায় গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম নিরাপদ পরিবেশ পেলেন।
কিন্তু তাঁরা শুধু নিরাপদ জীবনযাপন করেই থেমে থাকেননি। ইসলামের পরিচয় ও শিক্ষা মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন।
এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হযরত জাফর ইবন আবি তালিব রাযি.-এর নাজাশীর দরবারের ঐতিহাসিক বক্তব্য।
কুরাইশের প্রতিনিধিরা নাজাশীকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করার চেষ্টা করলে নাজাশী মুসলমানদের ডেকে তাঁদের ধর্ম সম্পর্কে জানতে চান।
সাহাবায়ে কেরাম পরামর্শ করে হযরত জাফর রাযি.-কে তাঁদের পক্ষ থেকে কথা বলার দায়িত্ব দেন।
নাজাশীর দরবারে হযরত জাফর রাযি.-এর ঐতিহাসিক দাওয়াত
হযরত জাফর রাযি. নাজাশীর সামনে ইসলামের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জীবনের পার্থক্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন—
أَيُّهَا الْمَلِكُ، كُنَّا قَوْمًا أَهْلَ جَاهِلِيَّةٍ، نَعْبُدُ الْأَصْنَامَ، وَنَأْكُلُ الْمَيْتَةَ، وَنَأْتِي الْفَوَاحِشَ، وَنَقْطَعُ الْأَرْحَامَ، وَنُسِيءُ الْجِوَارَ، وَيَأْكُلُ الْقَوِيُّ مِنَّا الضَّعِيفَ
“হে বাদশাহ! আমরা ছিলাম জাহেলিয়াতের জাতি। আমরা মূর্তিপূজা করতাম, মৃত প্রাণী খেতাম, অশ্লীল কাজে লিপ্ত হতাম, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীর সঙ্গে খারাপ আচরণ করতাম এবং আমাদের শক্তিশালী ব্যক্তি দুর্বলকে গ্রাস করত।”
এরপর তিনি বলেন—
فَكُنَّا عَلَى ذَلِكَ حَتَّى بَعَثَ اللَّهُ إِلَيْنَا رَسُولًا مِنَّا نَعْرِفُ نَسَبَهُ وَصِدْقَهُ وَأَمَانَتَهُ وَعَفَافَهُ
“আমরা এই অবস্থাতেই ছিলাম। অবশেষে আল্লাহ আমাদের মধ্য থেকে এমন একজন রাসূল পাঠালেন, যার বংশ, সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও পবিত্রতা সম্পর্কে আমরা জানতাম।”
তারপর তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দাওয়াতের মূল বিষয়গুলো তুলে ধরেন—
فَدَعَانَا إِلَى اللَّهِ لِنُوَحِّدَهُ وَنَعْبُدَهُ، وَنَخْلَعَ مَا كُنَّا نَعْبُدُ نَحْنُ وَآبَاؤُنَا مِنَ الْحِجَارَةِ وَالْأَوْثَانِ
“তিনি আমাদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করলেন—যেন আমরা তাঁকে এক বলে মানি, তাঁর ইবাদত করি এবং আমরা ও আমাদের পূর্বপুরুষেরা যেসব পাথর ও মূর্তির ইবাদত করতাম তা পরিত্যাগ করি।”
এরপর তিনি ইসলামের নৈতিক শিক্ষা উল্লেখ করেন—
وَأَمَرَنَا بِصِدْقِ الْحَدِيثِ، وَأَدَاءِ الْأَمَانَةِ، وَصِلَةِ الرَّحِمِ، وَحُسْنِ الْجِوَارِ، وَالْكَفِّ عَنِ الْمَحَارِمِ وَالدِّمَاءِ
“তিনি আমাদের সত্য কথা বলতে, আমানত আদায় করতে, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে, প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো আচরণ করতে এবং হারাম ও রক্তপাত থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন।”
এই বক্তব্যের মধ্যে সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতের অসাধারণ একটি পদ্ধতি ফুটে ওঠে।
তাঁরা শুধু আকীদা বলেননি; ইসলামের নৈতিক ও সামাজিক সৌন্দর্যও তুলে ধরেছেন।
সত্যের ব্যাপারে কোনো আপস নয়
এরপর নাজাশী জানতে চাইলেন, ঈসা আ.-এর ব্যাপারে মুসলমানদের আকীদা কী।
পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ নাজাশী ছিলেন খ্রিস্টান বাদশাহ।
কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম সত্য গোপন করেননি।
জাফর রাযি. বললেন—
هُوَ عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ وَرُوحُهُ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَى مَرْيَمَ الْعَذْرَاءِ الْبَتُولِ
“তিনি আল্লাহর বান্দা, তাঁর রাসূল, তাঁর পক্ষ থেকে প্রেরিত রূহ এবং তাঁর সেই কালিমা, যা তিনি পবিত্র কুমারী মারইয়ামের প্রতি প্রেরণ করেছেন।”
দাওয়াতের ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
হিকমত মানে সত্যকে পরিবর্তন করা নয়।
সাহাবায়ে কেরাম শ্রোতার মর্যাদা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করেছেন, কিন্তু আকীদার মৌলিক বিষয়ে কোনো আপস করেননি।
কুরআনের দাওয়াত—হৃদয় জয় করার শক্তি
নাজাশী বললেন, তোমাদের নবীর ওপর যে কিতাব নাজিল হয়েছে, তা থেকে কিছু পাঠ করো।
হযরত জাফর রাযি. সূরা মারইয়ামের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করলেন।
বর্ণনায় এসেছে—
فَبَكَى النَّجَاشِيُّ حَتَّى اخْضَلَّتْ لِحْيَتُهُ بِالدُّمُوعِ
“নাজাশী কাঁদতে লাগলেন, এমনকি তাঁর দাড়ি অশ্রুতে ভিজে গেল।”
এখানে আবার সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়—তাঁরা মানুষের হৃদয়ের সামনে আল্লাহর কালাম উপস্থাপন করতেন।—ইমাম আহমদ, হাদীস নং ১৭৪০; ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ তাঁর মুসনাদ-এ ১৮৩৫; আবু নু‘আইম হিলইয়াতুল আওলিয়া-তে ১/১১৫; বায়হাকী ১৮৪৭১
হাবশার দাওয়াত থেকে যে শিক্ষা
হাবশার ঘটনা বিশ্লেষণ করলে সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতি পদ্ধতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পাওয়া যায়—
প্রথমত, তাঁরা পরিস্থিতি বুঝে উপযুক্ত ব্যক্তিকে কথা বলার দায়িত্ব দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, শ্রোতার মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করেছেন।
তৃতীয়ত, নিজেদের অতীত ও ইসলামের মাধ্যমে অর্জিত পরিবর্তন তুলে ধরেছেন।
চতুর্থত, তাওহীদ ও রিসালাতকে দাওয়াতের কেন্দ্রবিন্দু করেছেন।
পঞ্চমত, ইসলামের নৈতিক ও সামাজিক সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন।
ষষ্ঠত, কুরআনকে দাওয়াতের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
সপ্তমত, আকীদার বিষয়ে কোনো আপস করেননি।
অষ্টমত, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও শান্ত, যুক্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করেছেন।
৬. দাওয়াতের জন্য হিজরত—শুধু স্থান পরিবর্তন নয়
সাহাবায়ে কেরামের হিজরত আমাদের সামনে দাওয়াতের একটি গভীর শিক্ষা তুলে ধরে।
তাঁরা দাওয়াতের জন্য ঘর ছেড়েছেন, সম্পদ ছেড়েছেন, আত্মীয়-স্বজন ছেড়েছেন। কিন্তু দ্বীন ছাড়েননি।
আল্লাহ তাআলা তাঁদের সম্পর্কে বলেন—
لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا وَيَنْصُرُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ
“এ সম্পদ সেই দরিদ্র মুহাজিরদের জন্য, যারা নিজেদের ঘরবাড়ি ও সম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে; তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। তারাই সত্যবাদী।”—সূরা আল-হাশর, ৫৯:৮
তাঁদের জীবন প্রমাণ করে—দাওয়াতের দাবি শুধু কথা বলা নয়; প্রয়োজনে দাওয়াতের জন্য নিজের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত।
মুসআব ইবন উমাইর রাযি. ও মদিনায় দাওয়াতের বিপ্লব
মক্কার কঠিন পরিবেশে সাহাবায়ে কেরাম যেমন নির্যাতন সহ্য করে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে গেছেন, তেমনি ইসলাম যখন মদিনায় নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিল, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একজন যোগ্য সাহাবিকে মদিনায় পাঠালেন।
তিনি ছিলেন মুসআব ইবন উমাইর রাযি.।
মদিনার ইতিহাসে তাঁর আগমন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি সেখানে শুধু ইসলাম প্রচার করেননি; বরং কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষের আকীদা ও আমল সংশোধন করেছেন এবং এমন একটি ঈমানি পরিবেশ তৈরি করেছেন, যার ফলেই পরবর্তীতে মদিনা ইসলামী রাষ্ট্রের কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয়।
১. বিলাসী যুবক থেকে মহান দাঈ
ইসলাম গ্রহণের আগে মুসআব রাযি. মক্কার অত্যন্ত বিলাসী ও সচ্ছল যুবকদের একজন ছিলেন। তাঁর পোশাক, সুগন্ধি ও জীবনযাত্রা ছিল মক্কার মানুষের কাছে পরিচিত।
কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর জীবন সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে যায়।
দুনিয়ার আরাম-আয়েশের পরিবর্তে তিনি বেছে নিলেন ঈমান, কুরআন ও দাওয়াতের পথ।
পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে মদিনার মানুষের কাছে পাঠান।
২. মদিনায় কেন পাঠানো হলো?
আকাবার প্রথম বাইআতের পর মদিনার কয়েকজন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে অনুরোধ করলেন, তাঁদের কাছে এমন একজনকে পাঠানো হোক, যিনি তাঁদের কুরআন ও দ্বীন শিক্ষা দেবেন।
হাদীসের বর্ণনায় এসেছে—
فَلَمَّا انْصَرَفَ عَنْهُ الْقَوْمُ بَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مَعَهُمْ مُصْعَبَ بْنَ عُمَيْرٍ، وَأَمَرَهُ أَنْ يُقْرِئَهُمُ الْقُرْآنَ، وَيُعَلِّمَهُمُ الْإِسْلَامَ، وَيُفَقِّهَهُمْ فِي الدِّينِ
“তাঁরা ফিরে গেলে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদের সঙ্গে মুসআব ইবন উমাইর রাযি.-কে পাঠালেন এবং তাঁকে নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন তাদের কুরআন পড়ান, ইসলাম শিক্ষা দেন এবং দ্বীনের জ্ঞান দান করেন।”
এখানে মুসআব রাযি.-এর দায়িত্বের তিনটি দিক স্পষ্ট—
কুরআন শিক্ষা দেওয়া।
ইসলাম শিক্ষা দেওয়া।
দ্বীনের গভীর বুঝ তৈরি করা।
অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াত শুধু মানুষকে মুসলমান বানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং মুসলমান হওয়ার পর তাকে দ্বীনের জ্ঞান ও সঠিক বুঝ দেওয়াও দাওয়াতের অংশ ছিল।
৩. মদিনার মানুষের কাছে নিজে পৌঁছে যাওয়া
মুসআব রাযি. মদিনায় গিয়ে কোনো একটি স্থানে বসে থাকেননি।
মুসআব ইবন উমাইর রাযি. ইসলামের দাওয়াত নিয়ে নিজেই মহল্লায় মহল্লায় ও অলিগলিতে মানুষের কাছে যেতেন।
৪. দাওয়াতের প্রথম লক্ষ্য—প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছানো
মদিনায় তখন আওস ও খাজরাজের বিভিন্ন গোত্রের নিজস্ব নেতা ছিলেন।
মুসআব রাযি. বুঝতে পেরেছিলেন, সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা ইসলাম গ্রহণ করলে তাঁদের মাধ্যমে বহু মানুষ ইসলামের দিকে আসতে পারে।
তাই তিনি সাধারণ মানুষের পাশাপাশি গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের কাছেও দাওয়াত পৌঁছাতে থাকেন।
একদিন তিনি আস‘আদ ইবন যুরারাহ রাযি.-এর সঙ্গে সাদ ইবন মু‘আয রাযি. ও উসাইদ ইবন হুদাইর রাযি.-এর গোত্রের এলাকায় যান।
সেখানে তাঁদের দেখে সাদ ইবন মু‘আয রাযি. উসাইদকে বললেন—
اذْهَبْ إِلَى هَذَيْنِ الرَّجُلَيْنِ فَازْجُرْهُمَا عَنَّا
“তুমি ওই দুজনের কাছে যাও এবং তাদের আমাদের কাছ থেকে চলে যেতে বলো।”
উসাইদ রাযি. হাতে বর্শা নিয়ে তাঁদের কাছে গেলেন।
কিন্তু মুসআব রাযি. উত্তেজিত হলেন না।
তিনি বললেন—
أَوَ تَجْلِسُ فَتَسْمَعُ؟ فَإِنْ رَضِيتَ أَمْرَنَا قَبِلْتَهُ، وَإِنْ كَرِهْتَهُ كَفَفْنَا عَنْكَ مَا تَكْرَهُ
“আপনি কি বসে কিছু শুনবেন? যদি আমাদের কথা আপনার পছন্দ হয়, তাহলে গ্রহণ করবেন; আর যদি অপছন্দ করেন, তাহলে আমরা আপনার অপছন্দের বিষয় থেকে বিরত থাকব।”
এখানে মুসআব রাযি.-এর অসাধারণ হিকমত লক্ষণীয়।—আস সীরাতুন নবউয়্যিাহ; আস সীরাতুল হালবিয়া
৫. উসাইদ ইবন হুদাইর রাযি.-এর হৃদয় পরিবর্তন
উসাইদ রাযি. বসে মুসআব রাযি.-এর কথা শুনলেন।
মুসআব রাযি. তাঁকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনালেন।
বর্ণনায় এসেছে—
فَقَرَأَ عَلَيْهِ ص وَالْقُرْآنِ ذِي الذِّكْرِ
তিনি তাঁর সামনে কুরআন তিলাওয়াত করলেন।
কুরআনের আয়াত শুনে উসাইদ রাযি.-এর অন্তর পরিবর্তিত হয়ে গেল।
তিনি বললেন—
مَا أَحْسَنَ هَذَا الْكَلَامَ وَأَجْمَلَهُ
“কী সুন্দর ও চমৎকার এই কথা!”
এরপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।—আস সীরাতুন নবউয়্যিাহ
এখানে আবার দেখা গেল—মুসআব রাযি. নিজের ব্যক্তিগত যুক্তি দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করতে চাননি; বরং আল্লাহর কালামকে মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছেন।
৬. উসাইদ রাযি. থেকে সাদ ইবন মু‘আয রাযি.-এর কাছে
উসাইদ রাযি. যখন ইসলাম গ্রহণ করে সাদ ইবন মু‘আয রাযি.-এর কাছে ফিরে এলেন, তখন সাদ রাযি. বুঝতে পারলেন তাঁর আচরণে পরিবর্তন এসেছে।
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—
مَا فَعَلْتَ؟
“তুমি কী করেছ?”
উসাইদ রাযি. বললেন—
مَا رَأَيْتُ بِالْقَوْمِ بَأْسًا
“আমি তাদের মধ্যে কোনো মন্দ কিছু দেখিনি।”
তারপর তিনি সাদ রাযি.-কে মুসআব রাযি.-এর কাছে যেতে বললেন।
সাদ ইবন মু‘আয রাযি. গেলেন।
মুসআব রাযি. তাঁর সঙ্গেও একইভাবে কথা বললেন—আগে শুনুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন।
এরপর তিনি কুরআন তিলাওয়াত করলেন।
সাদ রাযি.-এর অন্তরেও পরিবর্তন এলো।
তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন।—আস সীরাতুন নবউয়্যিাহ
৭. একজন নেতার ইসলাম গ্রহণে গোটা গোত্রের পরিবর্তন
সাদ ইবন মু‘আয রাযি. ইসলাম গ্রহণ করার পর তিনি নিজের গোত্রের কাছে ফিরে গেলেন।
তিনি বললেন—
يَا بَنِي عَبْدِ الْأَشْهَلِ، كَيْفَ تَعْلَمُونَ أَمْرِي فِيكُمْ؟
“হে বনী আবদুল আশহাল! তোমরা আমার অবস্থান তোমাদের মধ্যে কেমন জানো?”
তাঁরা বলল—
سَيِّدُنَا وَأَفْضَلُنَا رَأْيًا وَأَيْمَنُنَا نَقِيبَةً
“আপনি আমাদের নেতা, আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মতের অধিকারী এবং সর্বোত্তম চরিত্রের মানুষ।”
তখন তিনি বললেন—
فَإِنَّ كَلَامَ رِجَالِكُمْ وَنِسَائِكُمْ عَلَيَّ حَرَامٌ حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ
অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান না আনা পর্যন্ত তোমাদের পুরুষ ও নারীদের সঙ্গে আমার কথা বলা বৈধ হবে না।”
বর্ণনাকারী বলেন—
فَوَاللَّهِ مَا أَمْسَى فِي دَارِ بَنِي عَبْدِ الْأَشْهَلِ رَجُلٌ وَلَا امْرَأَةٌ إِلَّا مُسْلِمًا وَمُسْلِمَةً
“আল্লাহর কসম! সেদিন সন্ধ্যা হওয়ার আগেই বনী আবদুল আশহালের কোনো ঘরে এমন কোনো পুরুষ বা নারী অবশিষ্ট ছিল না, যে মুসলমান হয়নি।” —সিয়ারু আলামীন নুবালা
এটি মুসআব রাযি.-এর দাওয়াতের ফলাফলের একটি অসাধারণ উদাহরণ।
একজন দাঈ একজন ব্যক্তিকে দাওয়াত দিলেন।
সে ব্যক্তি নেতা ছিল।
নেতা ইসলাম গ্রহণ করলেন।
তারপর তাঁর মাধ্যমে গোটা গোত্রের মানুষের মধ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ল।
মুসআব রাযি.-এর দাওয়াতি পদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে আসে।
প্রথমত: তিনি কুরআনকে কেন্দ্র করেছেন। তিনি মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ বিতর্কে লিপ্ত হননি। মানুষের সামনে কুরআন পেশ করেছেন।
দ্বিতীয়ত: তিনি শ্রোতাকে সম্মান করেছেন
উসাইদ রাযি. রাগ নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু মুসআব রাযি. তাঁর রাগের জবাব রাগ দিয়ে দেননি।
বরং বলেছেন—فَتَسْمَعُ “আপনি আগে শুনুন।”
তৃতীয়ত: তিনি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি, তিনি বলেছিলেন—فَإِنْ رَضِيتَ أَمْرَنَا قَبِلْتَهُ، وَإِنْ كَرِهْتَهُ كَفَفْنَا عَنْكَ “আপনার ভালো লাগলে গ্রহণ করবেন; অপছন্দ হলে আমরা আপনার কাছ থেকে সরে যাব।”এতে শ্রোতার মনে নিরাপত্তা তৈরি হয়েছিল।
চতুর্থত: তিনি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছেছেন
সাদ ইবন মু‘আয ও উসাইদ ইবন হুদাইর রাযি.-এর মতো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের দাওয়াত দেওয়ার ফলে অল্প সময়ে বহু মানুষ ইসলামের ছায়ায় আসে।
পঞ্চমত: তিনি দাওয়াতের সঙ্গে শিক্ষা যুক্ত করেছেন
তিনি শুধু “মুসলমান হয়ে যাও” বলেননি; বরং কুরআন পড়িয়েছেন এবং দ্বীন শিখিয়েছেন।
এ কারণে মদিনায় ইসলাম শুধু কিছু ব্যক্তির ধর্মান্তর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং একটি শিক্ষিত ও ঈমানদার সমাজ গড়ে উঠতে শুরু করে।
৮. মদিনা কেন হিজরতের উপযোগী হয়ে উঠল?
মুসআব রাযি.-এর দাওয়াতি মেহনতের সবচেয়ে বড় ফলাফল ছিল—মদিনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইসলামের প্রতি অনুরক্ত হয়ে ওঠে।
আকাবার দ্বিতীয় বাইআতের সময় মদিনা থেকে বহু মানুষ মক্কায় এসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাতে বাইআত করেন।
এরপর মদিনা মুসলমানদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে মদিনায় হিজরত করার অনুমতি দেন।
এরপর নিজেও মদিনায় হিজরত করেন।
অর্থাৎ মুসআব রাযি.-এর দাওয়াত ছিল মদিনার ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পূর্বপ্রস্তুতি।
দাওয়াতের পদ্ধতি: হিকমত, কোমলতা ও মানুষের মানসিকতার প্রতি লক্ষ্য
দাওয়াতের কাজ শুধু সত্য কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নাম নয়; বরং কখন, কীভাবে, কতটুকু এবং কোন পদ্ধতিতে কথা বলতে হবে—এ বিষয়গুলোও দাওয়াতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম নবী ﷺ-এর কাছ থেকে দাওয়াতের এই প্রজ্ঞাপূর্ণ পদ্ধতি শিখেছিলেন এবং নিজেদের দাওয়াতি জীবনে তা বাস্তবায়ন করেছিলেন।
১. হিকমতের সঙ্গে দাওয়াত দেওয়া
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
“আপনার প্রতিপালকের পথে হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান করুন এবং তাদের সঙ্গে এমন পদ্ধতিতে বিতর্ক করুন, যা সর্বোত্তম।”—সূরা আন-নাহল, ১৬:১২৫
সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—তাঁরা মানুষের অবস্থা, মানসিকতা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে কথা বলতেন। তাঁরা শুধু সত্য বলাকেই যথেষ্ট মনে করতেন না; বরং সত্যকে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার উপযুক্ত পদ্ধতিও অবলম্বন করতেন।
২. সহজ করা, কঠিন না করা
নবী ﷺ যখন সাহাবায়ে কেরামকে দাওয়াত ও মানুষের সঙ্গে আচরণের দায়িত্ব দিতেন, তখন তিনি তাঁদের বলতেন—
يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا، وَبَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا
“তোমরা সহজ করো, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও, মানুষকে বিমুখ করো না।”—সহিহ বুখারি, ৬৯; সহিহ মুসলিম, ১৭৩৪।
এটি শুধু সাধারণ সামাজিক আচরণের নির্দেশ নয়; দাওয়াতের ক্ষেত্রেও এটি একটি মৌলিক নীতি। দাওয়াতের ভাষা এমন হওয়া উচিত, যা মানুষকে আল্লাহর দিকে এগিয়ে দেয়; এমন নয়, যা তাকে দ্বীন থেকে দূরে ঠেলে দেয়।
তবে সহজ করার অর্থ শরিয়তের বিধান পরিবর্তন করা নয়। বরং শরিয়তের সঠিক বিধানকে মানুষের সামনে প্রজ্ঞা, সুন্দর ভাষা ও উপযুক্ত পদ্ধতিতে তুলে ধরা।
৩. মানুষের মানসিকতার প্রতি লক্ষ্য রাখা
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু মানুষের কাছে নিয়মিত নসিহত করতেন। কিন্তু প্রতিদিন দীর্ঘ আলোচনা করতেন না। তিনি প্রতি বৃহস্পতিবার তাদের নসিহত করতেন। এক ব্যক্তি তাঁকে প্রতিদিন নসিহত করার অনুরোধ করলে তিনি বলেন—
أَمَا إِنَّهُ يَمْنَعُنِي مِنْ ذَلِكَ أَنِّي أَكْرَهُ أَنْ أُمِلَّكُمْ، وَإِنِّي أَتَخَوَّلُكُمْ بِالْمَوْعِظَةِ كَمَا كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَخَوَّلُنَا بِهَا، مَخَافَةَ السَّآمَةِ عَلَيْنَا
“আমি প্রতিদিন নসিহত করা থেকে বিরত থাকি এ কারণে যে, আমি চাই না তোমরা বিরক্ত হয়ে যাও। আমি তোমাদের অবস্থা বিবেচনা করে নসিহত করি, যেমন নবী ﷺ আমাদের নসিহত করতেন—যাতে আমরা বিরক্ত হয়ে না যাই।”—সহিহ বুখারি, ৭০; সহিহ মুসলিম, ২৮২১।
এখানে দাওয়াতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি পাওয়া যায়—দাঈকে শুধু নিজের কথা বলার আগ্রহের দিকে তাকালে চলবে না; শ্রোতার গ্রহণক্ষমতা ও মানসিক অবস্থার প্রতিও লক্ষ্য রাখতে হবে।
৪. প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা না বলা
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা দাওয়াত ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে সময় ও পরিবেশের প্রতি লক্ষ্য রাখার বিষয়ে বলেন—
حَدِّثِ النَّاسَ كُلَّ جُمُعَةٍ مَرَّةً، فَإِنْ أَبَيْتَ فَمَرَّتَيْنِ، فَإِنْ أَكْثَرْتَ فَثَلَاثَ مَرَارٍ، وَلَا تُمِلَّ النَّاسَ هَذَا الْقُرْآنَ، وَلَا أَلْفِيَنَّكَ تَأْتِي الْقَوْمَ وَهُمْ فِي حَدِيثٍ مِنْ حَدِيثِهِمْ فَتَقْصُّ عَلَيْهِمْ فَتَقْطَعُ عَلَيْهِمْ حَدِيثَهُمْ فَتُمِلَّهُمْ، وَلَكِنْ أَنْصِتْ، فَإِذَا أَمَرُوكَ فَحَدِّثْهُمْ وَهُمْ يَشْتَهُونَهُ
“মানুষকে প্রতি জুমায় একবার আলোচনা করো। যদি বেশি করতে চাও, তাহলে দুইবার; আর যদি আরও বেশি করো, তাহলে তিনবার। মানুষকে এই কুরআনের মাধ্যমে বিরক্ত করে তুলো না। এমন যেন না হয় যে, তারা কোনো আলোচনায় ব্যস্ত আছে আর তুমি এসে তাদের কথাবার্তা বন্ধ করে তাদের সামনে আলোচনা শুরু করলে; এতে তারা বিরক্ত হয়ে যাবে। বরং নীরব থাকো। যখন তারা তোমাকে আলোচনার জন্য বলবে, তখন তাদের আগ্রহ থাকা অবস্থায় তাদের সঙ্গে আলোচনা করো।”—সহিহ বুখারি, ৬৩৩৭।
এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, দাওয়াতের ক্ষেত্রে শ্রোতার আগ্রহ ও মানসিক প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবসময় কথা বলাই দাওয়াতের হিকমত নয়; কখন নীরব থাকতে হবে, সেটাও একজন দাঈর জানা প্রয়োজন।
৫. মানুষের প্রতি কঠোরতা নয়, হৃদয় জয় করা
সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল কোমলতা। তাঁরা মানুষের ভুল দেখলে সংশোধন করতেন, কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে অপমান করা নয়; বরং তাকে সত্যের দিকে ফিরিয়ে আনা।
দাওয়াতের ক্ষেত্রে কঠোর ভাষা, অপমান, তাচ্ছিল্য কিংবা ব্যক্তিকে হেয় করা অনেক সময় সত্য কথাকেও মানুষের কাছে অপছন্দনীয় করে তোলে। পক্ষান্তরে সুন্দর আচরণ, ধৈর্য ও কোমলতা মানুষের হৃদয়কে সত্য গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করে।
৬. পর্যায়ক্রমে দাওয়াত দেওয়া
সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল—প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া। মুআয ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়ামানে পাঠানোর সময় নবী ﷺ বলেছিলেন—
فَلْيَكُنْ أَوَّلَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ شَهَادَةُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
“সর্বপ্রথম তুমি তাদের যে বিষয়ের দিকে আহ্বান করবে, তা হবে—আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই—এই সাক্ষ্য।”
এরপর নামাজ, তারপর যাকাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।—সহিহ বুখারি, হাদীস : ১৪৯৬
অর্থাৎ দাওয়াতের ক্ষেত্রে কোন বিষয় আগে এবং কোন বিষয় পরে—এ ব্যাপারে অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। আকিদা ও ঈমানের ভিত্তি সুদৃঢ় করার পর ধীরে ধীরে অন্যান্য বিধান ও আমলের দিকে মানুষকে নিয়ে যেতে হয়।
মক্কার সীমানা পেরিয়ে বিশ্বময় দাওয়াতের বিস্তার
সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের দাওয়াতি জীবন শুধু মক্কা ও মদিনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের পর তাঁরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন এবং নিজেদের জীবন, জ্ঞান, চরিত্র ও দাওয়াতের মাধ্যমে ইসলামের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। এভাবেই সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে নববী দাওয়াত নতুন নতুন ভূখণ্ডে পৌঁছতে থাকে। আরব ও অনারব বিভিন্ন জাতির মধ্যে ইসলামের পরিচয় সৃষ্টি হয়।— দুওয়ারুস সাহাবাতি (রাযি) ফী তাবলীগির রিসালাতি ওয়াদ দাওয়াতি ইলাল্লাহ
১. দাওয়াতের দায়িত্বকে তাঁরা নিজেদের জীবনের মিশন বানিয়েছিলেন
আল্লাহ তাআলা বলেন—“তার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে, নিশ্চয়ই আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।”—সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩৩
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের পরও তাঁরা এই দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে যাননি। বরং নিজেদের ঘরবাড়ি, স্বদেশ ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে চলে গেছেন।— দুওয়ারুস সাহাবাতি (রাযি) ফী তাবলীগির রিসালাতি ওয়াদ দাওয়াতি ইলাল্লাহ
২. মদিনার বাইরে সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতি কেন্দ্র
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগেই সাহাবায়ে কেরামকে বিভিন্ন অঞ্চলে দাওয়াত ও শিক্ষা দেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছিল।
মুআয ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়ামানে পাঠানো হয়। আবু মূসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহুকেও ইয়ামানের বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁদের উদ্দেশে বলেছিলেন—
يَسِّرَا وَلَا تُعَسِّرَا، وَبَشِّرَا وَلَا تُنَفِّرَا، وَتَطَاوَعَا وَلَا تَخْتَلِفَا
“তোমরা উভয়ে সহজ করো, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও, মানুষকে বিমুখ করো না; পরস্পর সহযোগিতা করো এবং মতবিরোধে লিপ্ত হয়ো না।”—সহিহ বুখারি
অর্থাৎ দাওয়াতের জন্য সাহাবায়ে কেরামের কাছে শুধু জ্ঞান থাকা যথেষ্ট ছিল না; বরং মানুষের কাছে পৌঁছানোর যোগ্যতা, কোমলতা, সহযোগিতা ও বাস্তব প্রজ্ঞাও প্রয়োজন ছিল।
৩. বিভিন্ন জাতি ও ভূখণ্ডে সাহাবায়ে কেরামের আগমন
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশায়ও বিভিন্ন সাহাবিকে বিভিন্ন শাসক ও অঞ্চলের মানুষের কাছে পাঠানো হয়েছিল। যেমন দিহইয়া কালবি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে রোম সম্রাটের কাছে, হাতিব ইবনু আবি বালতাআ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে মিসরের শাসকের কাছে পাঠানো হয়েছিল। সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী ইসলামের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের পর এই কার্যক্রম আরও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়। খিলাফতে রাশেদার সময়ে সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন নতুন অঞ্চলে গিয়ে মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেন এবং সেখানে কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা প্রচার করেন। —দুওয়ারুস সাহাবাতি (রাযি) ফী তাবলীগির রিসালাতি ওয়াদ দাওয়াতি ইলাল্লাহ
৪. তাঁদের দাওয়াত ছিল শুধু বক্তব্যনির্ভর নয়
সাহাবায়ে কেরামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—তাঁরা মানুষকে শুধু কথার মাধ্যমে ইসলামের দিকে ডাকেননি; বরং নিজেদের জীবন দিয়ে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”—সূরা আল-আহযাব, ৩৩:২১
সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন সেই আদর্শের প্রত্যক্ষ অনুসারী। তাঁদের সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ইনসাফ, বিনয়, ইবাদত, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং পার্থিব লোভ থেকে মুক্ত জীবন—সবকিছুই ছিল নীরব দাওয়াত।
একজন মানুষ যখন কোনো সাহাবির জীবনযাপন দেখত, তখন সে শুধু ইসলাম সম্পর্কে কথা শুনত না; বরং ইসলামের বাস্তব রূপ প্রত্যক্ষ করত।
৫. দাওয়াতের জন্য ত্যাগ ও স্থানান্তর
সাহাবায়ে কেরাম দাওয়াতের স্বার্থে নিজেদের আরাম-আয়েশ ত্যাগ করেছেন। কেউ হাবশায় গেছেন, কেউ মদিনায় হিজরত করেছেন, আবার পরবর্তীতে অনেকে ইসলামের শিক্ষা ও দাওয়াত নিয়ে বিভিন্ন শহর ও জনপদে ছড়িয়ে পড়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ آوَوا وَنَصَرُوا أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا
“যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে সংগ্রাম করেছে এবং যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে—তারাই প্রকৃত মুমিন।”—সূরা আল-আনফাল, ৮:৭৪
তাঁদের হিজরত কেবল নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ছিল না; বরং ইসলামের বিস্তার ও দ্বীনের দায়িত্ব বহনের সঙ্গেও তা গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিল।
৬. দাওয়াতের বিস্তার এবং পরবর্তী প্রজন্ম
সাহাবায়ে কেরামের সবচেয়ে বড় সফলতা ছিল—তাঁরা নিজেদের পরবর্তী প্রজন্মকে দাওয়াত ও দ্বীনের শিক্ষা দিয়ে তৈরি করেছিলেন। ফলে তাঁদের ইন্তেকালের পর তাবেঈগণ সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে যে ইলমি ও দাওয়াতি ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তার ওপর পরবর্তীতে তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈগণ কাজ করেন। এভাবেই নববী দাওয়াত এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে এবং এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পৌঁছে যায়।
সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতি জীবন আমাদের সামনে এমন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, যেখানে ঈমানের দৃঢ়তা, ইলম, আমল, ত্যাগ, চরিত্র ও মানুষের কল্যাণকামিতা একত্রিত হয়েছিল। তাঁরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছ থেকে যে দাওয়াত গ্রহণ করেছিলেন, তা নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁদের এই মেহনতের ফলেই নববী দাওয়াত পরবর্তী প্রজন্মের হাতে পৌঁছেছে এবং উম্মতের মধ্যে দ্বীনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে।— দুওয়ারুস সাহাবাতি (রাযি) ফী তাবলীগির রিসালাতি ওয়াদ দাওয়াতি ইলাল্লাহ
সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতি মেহনত থেকে আমাদের শিক্ষা
সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতি জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁদের দাওয়াত কোনো নির্দিষ্ট সময়, স্থান কিংবা ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছ থেকে ঈমান, কুরআন ও সুন্নাহ গ্রহণ করে তা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন এবং এরপর মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
“তোমরা শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের বের করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও, অসৎকাজ থেকে নিষেধ কর এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখ।”—সূরা আলে ইমরান, ৩:১১০
এই আয়াতের বাস্তব প্রতিচ্ছবি সাহাবায়ে কেরামের জীবনেই সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে দেখা যায়।
১. নিজের সংশোধনের পর অন্যের সংশোধন
সাহাবায়ে কেরাম শুধু মানুষকে কথা শোনাতেন না; তাঁরা নিজেরাই দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁদের দাওয়াতের শক্তি ছিল তাঁদের আমল ও চরিত্র।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ
“হে মুমিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বল, যা তোমরা কর না? তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অসন্তোষজনক।”
—সূরা আস-সফ, ৬১:২-৩
তাই সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতের প্রথম বৈশিষ্ট্য ছিল—তাঁরা যে বিষয়ের দিকে মানুষকে ডাকতেন, নিজেরাও তার বাস্তব নমুনা ছিলেন।
২. দাওয়াতের পথে ত্যাগ স্বীকার
আবু বকর রাযি. নিজের সম্পদ ব্যয় করেছেন, বিলাল রাযি. নির্যাতন সহ্য করেছেন, মুসআব ইবনু উমাইর রাযি. বিলাসী জীবন ছেড়ে দাওয়াতের ময়দানে বের হয়েছেন, জাফর রাযি. হাবশার দরবারে ইসলামের পক্ষে কথা বলেছেন এবং অসংখ্য সাহাবি হিজরত ও ত্যাগের মাধ্যমে দ্বীনের মেহনত করেছেন।
তাঁদের জীবন প্রমাণ করে—দাওয়াত শুধু মুখের কথা নয়; প্রয়োজনে দাঈকে নিজের আরাম, সম্পদ, সময় এবং প্রিয় পরিবেশ ত্যাগ করতেও প্রস্তুত থাকতে হয়।
৩. দাওয়াতের উদ্দেশ্য ছিল মানুষের হেদায়াত
সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতে ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি বা নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ছিল না। তাঁদের লক্ষ্য ছিল মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে পরিচিত করা এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচানো।
রাসুলুল্লাহ ﷺ আলী রাযি.-কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন—
فَوَاللَّهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلًا وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ
“আল্লাহর কসম! তোমার মাধ্যমে যদি আল্লাহ একজন মানুষকেও হেদায়াত দান করেন, তবে তা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম।”—সহিহ বুখারি, ৩০০৯; সহিহ মুসলিম, ২৪০৬
এই হাদিস সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতি মানসিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি প্রকাশ করে—একজন মানুষের হেদায়াতও তাঁদের কাছে বিরাট সাফল্য ছিল।
৪. দাওয়াতের সঙ্গে ইলম ও তারবিয়াত
সাহাবায়ে কেরাম শুধু মানুষকে ইসলাম গ্রহণ করিয়ে দায়িত্ব শেষ মনে করেননি। তাঁরা কুরআন শেখাতেন, দ্বীনের বিধান শিক্ষা দিতেন এবং মানুষের ঈমান ও আমলকে গড়ে তুলতেন।
মদিনায় মুসআব ইবনু উমাইর রাযি.-এর দায়িত্ব ছিল—
يُقْرِئَهُمُ الْقُرْآنَ، وَيُعَلِّمَهُمُ الْإِسْلَامَ، وَيُفَقِّهَهُمْ فِي الدِّينِ
“তিনি তাদের কুরআন পড়াবেন, ইসলাম শিক্ষা দেবেন এবং দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করবেন।”—ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ
অতএব সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতের মধ্যে ছিল তিনটি বিষয়—দাওয়াত, শিক্ষা ও তারবিয়াত।
৫. একজন দাঈ থেকে একটি প্রজন্ম
মুসআব রাযি. মদিনায় গিয়ে কয়েকজন মানুষকে ইসলাম শেখালেন। সেই কয়েকজনের মাধ্যমে গোটা গোত্রে ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়ল। পরবর্তীতে মদিনা হয়ে উঠল ইসলামের প্রধান কেন্দ্র।
এ ঘটনা প্রমাণ করে, দাওয়াতের ক্ষেত্রে সংখ্যার চেয়ে নিষ্ঠা, জ্ঞান ও সঠিক পদ্ধতি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। একজন আন্তরিক ও যোগ্য দাঈও আল্লাহর ইচ্ছায় একটি সমাজে বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারেন।
শেষ কথা, সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতি জীবন মূলত নববী দাওয়াতের জীবন্ত ব্যাখ্যা। তাঁরা ঈমান গ্রহণ করেছেন, তা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন, এরপর ত্যাগ ও কুরবানির মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। মক্কার গোপন দাওয়াত থেকে শুরু করে প্রকাশ্য দাওয়াত, হাবশার হিজরত থেকে মদিনার দাওয়াতি বিপ্লব, মুসআব রাযি.-এর মেহনত থেকে ইয়ামান ও অন্যান্য অঞ্চলে সাহাবায়ে কেরামের গমন—সবকিছু মিলিয়ে তাঁদের জীবন একটি পূর্ণাঙ্গ দাওয়াতি মডেল।
তাঁদের দাওয়াতের শক্তি ছিল ঈমান, ইলম, আমল, ইখলাস, ধৈর্য, হিকমত ও ত্যাগে। তাই আজকের দাঈদের জন্য সাহাবায়ে কেরামের জীবন শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; বরং দাওয়াতের পথে চলার জন্য একটি জীবন্ত আদর্শ।
এখানেই “দাওয়াতের ময়দানে সাহাবায়ে কেরাম” ধারাবাহিকের সমাপ্তি করা যায়।
সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতি জীবন আমাদের জন্য ঈমান, ইখলাস, ত্যাগ, হিকমত ও উত্তম চরিত্রের এক অনন্য আদর্শ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের বহুমুখী ষড়যন্ত্র মুসলিম উম্মাহর করণীয়
কুরআন-হাদীসে ইয়াহুদী-খ্রিস্টানের পরিচয় ইয়াহুদী জাতি পৃথিবীর প্রাচীনতম জাতি। আল্লাহ তা'আলা হযরত নূহ আ...
ঈমান-আমল সুরক্ষিত রাখতে হক্কানী উলামায়ে কেরামের সঙ্গে থাকুন, অন্যদের সঙ্গ ছাড়ুন
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর... قال الله تعالى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتّ...
ইসলামই পৃথিবীর ভবিষ্যত
...
ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলাম : বিভ্রান্তি নিরসনে মুসলমানদের যা জানা দরকার
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন