প্রবন্ধ
মালহামা থেকে মারহামা — একটি শব্দের বিপ্লব
৩০১
০
[আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা.-কে পাঠিয়েছেন সব ধর্মের উপর দীনে হককে প্রতিষ্ঠিত করতে। রাজা-বাদশাহরা অস্ত্র দিয়ে রাজ্য জয় করে, আর আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা.-কে দিয়েছেন সৌন্দর্য — যা সবচেয়ে বড় অস্ত্র। কুরআনে বলা হয়েছে: "তোমাদের জন্য রাসূলের মধ্যে আছে সুন্দর দৃষ্টান্ত।" আল্লাহর প্রতিটি নাম তাঁর একেক সৌন্দর্যের প্রকাশ, আর রাসূল সা. এসেছেন সেই সৌন্দর্যের অংশ নিয়ে।
মক্কা বিজয়ের সময় রাসূল সা. সাদ ইবনে ওবায়দা রা.-এর হাত থেকে পতাকা নিয়ে নিলেন শুধু একটি শব্দের কারণে — তিনি বলেছিলেন "মালহামা" (আক্রমণের দিন), রাসূল সা. বদলে বললেন "মারহামা" (আত্মীয়তার দিন)। দাঈর ভাষা সেনাপতির ভাষা হতে পারে না। ইয়ারমুকের যুদ্ধে পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণে একজন বৃদ্ধ খ্রিস্টান বললেন: মুসলমানরা রাত জেগে ইবাদত করে, ব্যভিচার করে না, ওয়াদা রক্ষা করে — এই আখলাকই তাদের বিজয়ের কারণ।
দজলার তীরে খালিদ রা. শত্রু সেনাপতির তিন প্রশ্নে সত্য উত্তর দিলেন — তলোয়ার আসমান থেকে নাজিল হয়নি; নতুন মুসলমান আমাদের চেয়েও উত্তম; কালিমায় মুসলমান হওয়া যায়। সেনাপতি তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করলেন। যুদ্ধের ময়দানে সত্য কথা বলার এই শক্তিই ছিল প্রকৃত বিজয়।
মহব্বতের যুদ্ধে কেউ পরাজিত হয় না — উভয়ই বিজয়ী। খাজা আজমেরি রহ. তলোয়ার ছাড়া, শুধু দারিদ্র্য ও আখলাক নিয়ে এই উপমহাদেশ জয় করেছেন। আমাদেরও এই দীন পৌঁছাতে হবে তলোয়ার দিয়ে নয়, রাসূল সা.-এর সুন্দর আখলাক ও ইবাদত দিয়ে।]
اَلحَمْدُ لِلهِ نَسْتَعِيْنُهُ وَنَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَّهْدِهِ اللهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُّضْلِلْهُ فَلَا هَادِيَ لَهُ. وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ.
আল্লাহ তায়ালা দীন দিয়েছেন। রাসূলে কারিম সা.-কে পাঠিয়েছেন এই দীনে হক দিয়ে, সত্য দিয়ে। যেন এটা অন্য সবকিছুর উপর, সব মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। সব মিথ্যা দীনকে মিটিয়ে দেবে আর এই দীনে হকই থাকবে। দুনিয়াতে রাজা-বাদশাহরা আসে, অন্যদের রাজ্য ধ্বংস করে নিজ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য আর তাদের শক্তি হলো অস্ত্র।
আল্লাহ তায়ালা রাসূলে কারিম সা.-কে এত বড় দায়িত্ব দিয়ে পাঠালেন যে, কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালার দীন প্রতিষ্ঠিত হবে, বাকি সব দীনকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলে। এর জন্য কত বড় অস্ত্রের প্রয়োজন? আল্লাহ তায়ালা এইজন্য দিলেন সৌন্দর্য। এটাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র, যা দিয়ে আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা.-কে পাঠালেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
'তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে আছে সুন্দর দৃষ্টান্ত।' (সূরা আহযাব: ২১)
হাসানাহ, অর্থ সুন্দর। হুসুন বহুবচন, এর অর্থ সৌন্দর্যসমূহ। রাসূল সা. ইরশাদ করেন:
إِنَّ اللهَ جَمِيْلٌ، يُحِبُّ الْجَمَالَ
'আল্লাহ তায়ালা সুন্দর, তিনি সুন্দরকে ভালোবাসেন।'
তো আল্লাহ তায়ালা রাসূলে কারিম সা.-কে সুন্দর আচরণ, সুন্দর চরিত্র ও সুন্দর বৈশিষ্ট্য দিয়ে পাঠিয়েছেন। আল্লাহর নামগুলোকে বলা হয় —
أَسْمَاءُ اللهِ الْحُسْنَى
'আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ।' একেকটি নাম আল্লাহ তায়ালার একেক সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে। রহমান, এক ধরনের সৌন্দর্য। রহিম, আরেক ধরনের সৌন্দর্য; করিম, আরেক ধরনের সৌন্দর্য। সৌন্দর্যের নানান ধরন আছে। ফুল যেমন কখনো লাল হয়, কখনো গোলাপি হয়, কখনো সাদা হয়, ঠিক এমনিভাবে সৌন্দর্যেরও নানান ধরন হয়। তো আল্লাহ তায়ালা সুন্দর আর সব সৌন্দর্যই তাঁর মাঝে পাওয়া যায়। সেই সৌন্দর্যের কিছু প্রকার সেই নামগুলোর মধ্যে আছে। রাসূল সা.-কে আল্লাহ তায়ালা পাঠিয়েছেন আল্লাহ তায়ালার সৌন্দর্যের কিছু অংশ দিয়ে। সুন্দর আচরণ এটা দুনিয়াতে সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠা করে। এই দীন এসেছে সৌন্দর্য নিয়ে সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আর দুনিয়াতে রাজা-বাদশাহরা নিজেদের দাপট দিয়ে, নিজেদের শক্তি দিয়ে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে।
বাহ্যিকভাবে এই দীন প্রতিষ্ঠার মধ্যেও এমন কিছুটা বাহ্যিক রূপ রয়েছে; কিন্তু হাকিকত সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফাতহে মক্কা তথা মক্কা বিজয়ের সময় রাসূলে কারিম সা. বিরাট জামাত নিয়ে মক্কায় যাচ্ছিলেন। রাসূল সা. যাদেরকে নিয়ে মক্কায় যাচ্ছিলেন, তাদেরকে বাহিনী বলা হতো না, জামাত বলা হতো। বাহিনীকে আরবিতে (جَيْشٌ) যাইশুন বলা হয়; কিন্তু সাহাবাদের বাহিনীকে বলা হতো জামাত। জামাত আর বাহিনী দুটো ভিন্ন জিনিস। মসজিদে দীনের জামাত এসেছে, তাবলিগের জামাত এসেছে।
একজন পথিক যিনি ব্যবসায়ী, সাথে অনেক নগদ টাকাও রয়েছে। এদিকে আবার জায়গাটিও নির্জন, এইজন্য তিনি ভয় পাচ্ছেন। কোথায় থাকবেন — বুঝতে পারছেন না। বিশেষ করে টাকা থাকায় অনেক বিপদ। কারণ, কেউ যদি টের পেয়ে যায় আর ছিনিয়ে নিয়ে যায়? ঠিক সেই মুহূর্তে যদি শুনেন যে, অমুক জায়গায় একটি ডাকাতের দল আছে বা বাহিনী আছে, তাহলে কি ওখানে গিয়ে আশ্রয় নেবেন? বরং যতদূর সম্ভব পালিয়ে যাবেন। আর যদি শুনেন যে, ওখানে তাবলিগের জামাত আছে তাহলে বলবেন, আলহামদুলিল্লাহ; ওখানে গিয়েই রাত কাটাবো। নিরাপদে রাত কাটাবে। তো দল বা বাহিনী আর জামাত — এই দুটোর শব্দও ভিন্ন আর তার অর্থও ভিন্ন।
রাসূল সা. মক্কায় যাচ্ছেন বিরাট জামাত নিয়ে। আব্বাস রা. আবু সুফিয়ান রা.-কে মক্কা থেকে এনে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন যেন এই জামাতকে দেখেন আর এই দলের বাহ্যিক অবস্থা দেখে যেন তিনি বুঝতে পারেন যে, এদের সাথে আর মোকাবেলা করার ক্ষমতা নেই। সুলাইমান আ.-ও যেমন দাওয়াত দেওয়ার জন্য বাহ্যিক সুরত অবলম্বন করেছিলেন যে, বিলকিস আ. দেখে বুঝে ফেললেন — সুলাইমান আ.-এর এই জামাতের মোকাবেলা করার ক্ষমতা আমার নেই।
সুলাইমান আ.-এর যদিও এটাকে বাহিনী বলা হয়, কিন্তু বিলকিস বুঝতে পেরেছে যে, তাঁর মোকাবেলা করার ক্ষমতা আমার নেই। অতএব প্রথমেই আত্মসমর্পণ। এটা হলো শক্তির দিক থেকে। সুলাইমান আ. যখন বিলকিস আ.-কে রাজমহলে নিয়ে গেছেন, তো সেটি ছিল কাঁচের শিশমহল। আমরা গল্প ইত্যাদিতে শিশমহল শব্দটা শুনেছি। শিশ বা শিশা হচ্ছে কাঁচের ঘর। তো সুলাইমান আ.-এর মহলে বিলকিস ঢুকে এটাও টের পেয়েছে যে, বাহ্যিক ঠাটবাটেও সুলাইমান আ.-এর সাথে মোকাবেলা করার মতো নয়। তো দুনিয়ার মানুষ বাহ্যিক শান-শওকতের দ্বারা ভয় বা প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করে থাকে।
রাবি ইবনে আমের রা. যখন রুস্তমের সাথে দেখা করতে গেলেন দীনের দাওয়াত নিয়ে, তো রুস্তম তার প্রাসাদকে খুব সুন্দর করে সাজাল। বিশাল রাজমহল, তার সামনে দরবারের আসন। আসন পর্যন্ত গালিচা বিছানো হলো, যাকে রেড কার্পেট বলা হয়। তো রুস্তমও এক বিশাল কার্পেট বিছাল আর কার্পেটের দুই পাশে তার বাহিনীকে মোতায়েন করল। রাবি ইবনে আমের রা.-এর ঘোড়া ছিল ছোট, যাকে টাট্টু ঘোড়া বলে। তার হাতে ছিল বর্শা। হতে পারে তিনি হয়তো গাধার উপরেও সওয়ার হয়ে থাকতে পারেন। তো সেই টাট্টু ঘোড়া বা গাধা নিয়ে তিনি সেই রেড কার্পেটের উপর দিয়ে চললেন। আবার তার হাতে যে বর্শা ছিল, ঘোড়াটি যেহেতু ছোট তাই তিনি সেই বর্শা দিয়ে নিচে আঘাত করে করে রেড কার্পেট অতিক্রম করছিলেন।
তিনি যখন বর্শা কার্পেটে ঠুকে ঠুকে গেলেন তো সম্পূর্ণ কার্পেট ছিদ্র হয়ে গেল। এত দামি কার্পেটগুলোতে বর্শা দিয়ে ঠুকে ঠুকে গেলেন যে, যেখানেই ভর দেন সেখানেই ছিদ্র হয়ে যায়। তো এভাবে লাখো-কোটি টাকার কার্পেট এমনিতেই শেষ। রুস্তম তার জন্য মজলিস সাজিয়েছে। ফুলদানি, তাকিয়া অর্থাৎ, রাজকীয় মজলিস। রাজকীয় মজলিস আয়োজন করতে যা কিছু লাগে, সবকিছুরই ব্যবস্থা করেছে। এরপর রুস্তম স্বীয় আসন গ্রহণ করল আর রাবি ইবনে আমের রা. তাঁর গাধাকে তাকিয়ার সাথে বেঁধে দিলেন আর নিজে মাটিতে বসে পড়লেন। অর্থাৎ, রুস্তমের যে মহা সাজ-সজ্জা, ওগুলো যেন চোখেই পড়ল না, যেন কোনো আছরই পড়ল না।
বিলকিস সুলাইমান আ.-এর ক্ষমতা, সুলাইমান আ.-এর এই সবকিছু দেখে বুঝতে পেরেছে যে, তাঁর সাথে মোকাবেলা করার ক্ষমতা আমার নেই। আব্বাস রা. আবু সুফিয়ান রা.-কে নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায়
দাঁড়িয়েছেন যেন মুসলমানদের জামাতকে দেখে যেভাবেই হোক বুঝতে পারেন যে, এদের সাথে আর মোকাবেলা করা যাবে না। জামাতে একেকটা গোত্র একেক সর্দারের অধীনে ছিল। আব্বাস রা. তখন আবু সুফিয়ান রা.-কে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন যে, অমুক গোত্র অমুকের অধীনে, অমুক গোত্র অমুকের অধীনে... যাকে আধুনিক পরিভাষায় রেজিমেন্ট ইত্যাদি বলে। পাকিস্তানের সময় যেমন ছিল, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট; ঠিক এইরকমই নাম থাকে যে, কখনো রেজিমেন্ট, কখনো ব্রিগেড... তো সেনাবাহিনীতে এই জাতীয় বিভিন্ন নাম থাকে। এগুলোর একেকটা একেক রকম মাপের হয়। তো ওইরকম একেকটা রেজিমেন্ট আবু সুফিয়ান রা.-এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
রেজিমেন্ট তো ছিল না, ওইটা গোত্র ছিল। অমুক গোত্র সাদ ইবনে আবু ওবায়দা রা.-এর অধীনে; অমুক গোত্র আউফের অধীনে। কয়েকটা গোত্রকে দেখা ও পরিচয় পাওয়ার পরে আবু সুফিয়ান রা. আব্বাস রা.-কে বললেন, তোমার ভাতিজার তো বিশাল রাজ্য! আব্বাস রা. সাথে সাথে প্রতিবাদ করে বললেন, রাজ্য নয়; এটা নবুওয়াত। কেন রাজ্য বললেন, বাহ্যিকভাবে একটু সামঞ্জস্য ছিল; কিন্তু প্রকৃত বিষয় ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। আর অনেক বিপরীত জিনিসের মধ্যেও সামঞ্জস্য থাকে। খালি গ্লাস আর ভরা গ্লাস — উভয়টি দেখতে একই রকম। একটা গ্লাস পানিতে টইটুম্বুর আর আরেকটা গ্লাস একেবারে খালি পাশাপাশি রাখা আছে। এই দুটোর কোনটা ভরা আর কোনটা খালি বোঝা মুশকিল। তবে মাঝখানে একটা আছে আধা গ্লাস, ওটা আবার চেনা যায়। কিন্তু ভরা গ্লাস বা খালি গ্লাস — এই দুটো পার্থক্য করা যায় না।
রাজ্য আর নবুওয়াত একেবারেই বিপরীত, তবে এই দুটোর মধ্যে বাহ্যিক কিছু সামঞ্জস্য আছে। সে হিসেবে আবু সুফিয়ান রা. আব্বাস রা.-কে বললেন, তোমার ভাতিজার — কারণ আব্বাস রা. রাসূল সা.-এর চাচা ছিলেন — তো বিশাল রাজ্য। আব্বাস রা. বললেন, এটা রাজ্য নয়; এটা নবুওয়াত। আভ্যন্তরীণ পার্থক্য বিরাট। রাজা-বাদশাহরা ধ্বংস নিয়ে আসে আর নবুওয়াত সৌন্দর্য নিয়ে আসে। সৌন্দর্য আর ধ্বংস একেবারেই বিপরীত জিনিস। শক্ত অস্ত্র লোহার হয়ে থাকে আবার হাতুড়িও লোহার হয়ে থাকে। শক্তের জন্য শক্তই; কিন্তু এর বিপরীতে ফুলদানি... দামি ফুলদানি, আল্লাহ জানেন এর সর্বোচ্চ কত মূল্য হতে পারে। বিশ হাজার-ত্রিশ হাজার টাকা দাম, কিন্তু নরম এত বেশি যে, একটু হাত থেকে পড়ে গেলেই সর্বনাশ। একেবারে ঝন করে ভাঙবে আর টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। যত বেশি বাহ্যিকভাবে সুন্দর হয়, ততবেশি সাধারণত নরম হয়। তো নরম ও সৌন্দর্য আর যাহেরি দুর্বলতা ও সৌন্দর্য প্রায় পাশাপাশি থাকে।
গোলাপ ফুলের মধ্যে সৌন্দর্য আছে, খুব সুন্দর; কিন্তু তার কাঁটার মধ্যে শক্তিও আছে। গোলাপ ফুলের কাঁটা আপনাদের কারো হাতে বিঁধেছে কিনা। খুবই শক্ত; ব্যথা লাগে প্রচুর। আর এর বিপরীতে ফুলটি খুবই নরম। বাচ্চাদের হাত তো হলো, যা কিছু পাবে, ধরবে। কিন্তু এই বাচ্চাটির যদি একবার ফুলের কাঁটা লেগে যায়, তারপর থেকে আর ধরবে না। আর কাছেও যাবে না। কিন্তু যদি ফুল পায় তবে মুহূর্তের মধ্যে এটাকে টুকরো টুকরো করে পিষে বিনাশ করে ছেড়ে দেবে। ইসলাম পুরো দুনিয়ার রাজমহলগুলোকে ফুলদানিতে পরিণত করেছে তার কাঁটার কঠোরতা দিয়ে নয়; বরং তার পাপড়ির সৌন্দর্য ও মাধুর্য দিয়ে। আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আ.-কে পাঠিয়েছেন এই কাঁটার সৌন্দর্য দিয়ে নয়; বরং ফুলের মাধুর্য দিয়ে।
রাসূল সা. জামাত নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। সেই দৃশ্য আব্বাস রা. আবু সুফিয়ান রা.-কে দেখাচ্ছেন। ইতিমধ্যে সাদ ইবনে ওবায়দা রা. তাঁর জামাতকে নিয়ে এলেন। আবু সুফিয়ান রা.-কে দূর থেকে দেখেই সাদ ইবনে আবু ওবায়দা রা. জোর গলায় ডাক দিলেন:
اَلْيَوْمَ يَوْمُ الْمَلْحَمَةِ، اَلْيَوْمَ أَذَلَّ اللهُ الْقُرَيْشَ
'আজ আক্রমণের দিন। আজকের দিনে আল্লাহ তায়ালা কুরাইশকে লাঞ্ছিত করলেন, যালিল করলেন।'
রাসূল সা. তাঁর অন্তরের সৌন্দর্যকেই প্রাধান্য দিতে চান। সাদ ইবনে ওবায়দা রা. যখন বললেন,
اَلْيَوْمَ يَوْمُ الْمَلْحَمَةِ، اَلْيَوْمَ أَذَلَّ اللهُ الْقُرَيْشَ
রাসূল সা. এগিয়ে এসে সাদ ইবনে ওবায়দা রা.-এর হাতে যে পতাকা ছিল, সেটি নিয়ে নিলেন। এরপর পতাকাটি তাঁর ছেলের হাতে দিলেন। অর্থাৎ, তাঁকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো এই একটি কথার কারণে। এই কথার জন্যই তাঁকে পদচ্যুত করা হলো।
এখন তিনি আর সেনাপতি নেই। কারণ তাঁকে দাঈ হয়ে আসতে হবে, সেনাপতি হয়ে নয়। তিনি যা বলেছেন, এই কথাগুলো একজন সেনাপতির কথা হতে পারে; কিন্তু একজন দাঈর কথা এমন হতে পারে না। কারণ, রাসূল সা. দাওয়াত নিয়ে এসেছেন। এই কারণে তাঁকে আর সেনাপতি রাখা হলো না। তাঁর নিকট থেকে পতাকা নিয়ে নেওয়া হলো; তাঁকে পদচ্যুত করা হলো। আর রাসূল সা. আরও জোরে ঘোষণা করলেন:
اَلْيَوْمَ يَوْمُ الْمَرْحَمَةِ
সাদ ইবনু ওবায়দা রা. বলেছিলেন 'লাম' দিয়ে আর রাসূল সা. বললেন 'রা' দিয়ে। লামকে রা দিয়ে বদলে দিলেন। মালহামা হলো আক্রমণ আর মারহামা হলো আত্মীয়তা। আজ হচ্ছে 'আত্মীয়তা' স্থাপনের দিন।
اَلْيَوْمَ أَعَزَّ اللهُ الْقُرَيْشَ
'আজকে আল্লাহ তায়ালা কুরাইশকে সম্মান দান করবেন'; যালিল নয়। আত্মীয় আত্মীয়তা করতে আসে, তাহলে এটা কি আক্রমণ? আক্রমণকারী আক্রমণের জন্য আসে আর অপরজন আত্মীয়তা করতে আসে। আক্রমণকারী আক্রমণ করতে আসে তলোয়ার নিয়ে আর আত্মীয় আত্মীয়তা করতে আসে হাদিয়া নিয়ে। গ্রাম থেকে কেউ আসলে পিঠা নিয়ে আসে। তার গরুর দুধের ঘি আনে, গাছের বড়ই আনে — আত্মীয়তা করবে। রাসূল সা. বললেন, আমি তো আত্মীয়তা করতে এসেছি।
اَلْيَوْمَ يَوْمُ الْمَرْحَمَةِ
আর আত্মীয় তার আত্মসম্মান বৃদ্ধির জন্য আসে। মেহমান যখন আসে, সে সম্মান নিয়ে আসে তাদের জন্য।
রাসূল সা. দীন নিয়ে এসেছেন অন্য ধর্মসমূহের উপর, অন্য জাতির উপর আক্রমণ নয়, বরং তাদের সম্মান বৃদ্ধির জন্য। তাদেরকে সুন্দর জীবনের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। আর রাসূল সা. তলোয়ারের শক্তি নিয়ে, কঠোরতার শক্তি নিয়ে আসেননি; বরং রাসূল সা. আখলাকের মাধুর্য নিয়ে এসেছেন দুনিয়াতে সুন্দর ও মাধুর্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য।
আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর জামানায় রোমানদের সাথে মোকাবেলা হলো। রোমানরা পরাজিত হলো ইয়ারমুকের যুদ্ধে। পরাজিত হয়ে ইয়ারমুক থেকে পালিয়ে দামেস্ক — যা তাদের রাজধানী ছিল — ত্যাগ করে আন্তাকিয়ায় গিয়ে আশ্রয় নিল। আন্তাকিয়া বর্তমানে তুরস্কের একটি ছোট শহর। ওই সময় রোমানদের অধীনে বড় শহর ছিল। রাজধানী ছেড়ে বৃহত্তর শহর আন্তাকিয়ায় গিয়ে আশ্রয় নিল।
আন্তাকিয়াতেও তাদের বড় ঘাঁটি বা ক্যান্টনমেন্ট ছিল। বাহিনীর সবাইকে ডেকে পরাজয় বিশ্লেষণ করতে বসল যে, পরাজয় কেন হলো? মুসলমানরা কি আমাদের চেয়ে সংখ্যায় বেশি ছিল? উপস্থিত সবাই বলল, না, আমাদের থেকে অনেক কম। নিশ্চয়ই অস্ত্র ও যুদ্ধ পদ্ধতি সম্পর্কেও আলোচনা হয়েছে; কিন্তু হায়াতুস সাহাবায় শুধু সংখ্যার কথা উল্লেখ আছে। অস্ত্রের দিক থেকেও মুসলমানরা ছিল দুর্বল, তাহলে আমরা কেন হেরে গেলাম আর তারা কেন জিতে গেল? এর উত্তর কোথাও পাওয়া গেল না। অপরাগ হয়ে হিরাক্লিয়াস তার বাহিনীকে জিজ্ঞাসা করল, তাহলে আমরা কেন হেরে গেলাম? বাহিনীর মধ্যে একজন রোমান অর্থাৎ খ্রিস্টান — যিনি বয়সে বার্ধক্যে পৌঁছে গিয়েছেন এবং বেশ জ্ঞান রাখেন — দাঁড়িয়ে বলল, আমি বলছি, আমরা কেন হেরে গেলাম আর মুসলমানরা কেন জিতে গেল।
সবাই জিজ্ঞাসা করল কেন? কারণ তারা রাত জেগে ইবাদত করে, ব্যভিচার করে না, জোরজবরদস্তি কারো জিনিস ছিনিয়ে নেয় না, ওয়াদা রক্ষা করে; কিন্তু আমরা এইরকম করি না। এই আচরণগুলো অর্থাৎ, রাত জেগে ইবাদত করা, ব্যভিচার না করা, জবরদস্তি কারো জিনিস ছিনিয়ে না নেওয়া, ওয়াদা রক্ষা করা — এই কথাগুলো যখন কেউ শুনবে তখন মানুষের মনে তাদের ব্যাপারে ভয়ের সঞ্চার হবে যে, এরা তো ভয়ংকর লোক! কিন্তু তা নয়; বরং তাদের মন থেকে সব ভয় দূর হয়ে গেল।
অজানা জায়গার নির্জন পথে চলছে আর মনে ভয় যে, কী জানি কী হয়। দূরে কিছু লোক দেখতে পেল কিন্তু তারা কারা — এটা বুঝতে পারছে না। দেখে আরও ভয় লাগছে যে, যদি ডাকাতের দল হয় বা কিছু একটা হয় তবে তো মেরেই ফেলবে। কিন্তু যদি তাদের ব্যাপারে শুনে যে, এরা রাত জেগে ইবাদত করে, ব্যভিচার করে না, মদ পান করে না, ওয়াদা রক্ষা করে — এই কথা শোনার পরে তার আর ভয় থাকবে না; ভয় দূর হয়ে যাবে। তো যুদ্ধের মধ্যে কী ভূমিকা হবে? কারণ সর্বকালে সব যুদ্ধের মানেই হচ্ছে, শত্রুর মনে ভয় সৃষ্টি করা। এটাই হলো যুদ্ধ। দুই বাহিনীর মোকাবেলা হবে আর যে ভয় পেয়ে যাবে, সেই হেরে যাবে।
আধুনিক জামানায় বেশ কিছুদিন আগে আফগানিস্তানে আক্রমণ করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত এক নতুন ধরনের যুদ্ধ চলেছে। যাকে বলা হতো, ঠান্ডা যুদ্ধ (কোল্ড ওয়ার)। ঠান্ডা যুদ্ধে কী ছিল? অস্ত্রের প্রদর্শনী ছিল, কিন্তু ব্যবহার ছিল না। অর্থাৎ, খুব ভাবভঙ্গি দেখায়। দুই পক্ষই নতুন নতুন অস্ত্র আবিষ্কার করে আর অপরপক্ষকে প্রদর্শন করে যে, দেখো। অতঃপর দ্বিতীয় পক্ষও নতুন অস্ত্র আবিষ্কার করে আর তা আকাশে উড়ায়। এটাই যুদ্ধ। যুদ্ধ মানেই হচ্ছে অপরপক্ষকে ভয় দেখানো। যদি সে ভয় ভেঙে ফেলে তবে তার যুদ্ধ শেষ।
ইঁদুরেরও নাকি যুদ্ধ হয়। যারা এই নিয়ে গবেষণা করে, তাদের জানার কথা। কোথাও যেন পড়েছিলাম যে, কোনো এক অঞ্চলের মধ্যে যখন ইঁদুরের সংখ্যা বেশি হয়ে যায়, তখন ইঁদুরেরা দুই দল হয়ে যায় আর এই দুই দলের মধ্যে যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধও হয় নেতৃত্ব নিয়ে। এই দলের এক নেতা আর ওই দলের আরেক নেতা। এই নেতাদ্বয় হলো নর-ইঁদুর। যেমন জঙ্গলে সিংহগুলোর মধ্যে সিংহের বাচ্চা যখন বড় হয়ে যায়, তখন বাপ-ছেলেতে সংঘাত লেগে যায়। অতঃপর হিংসাদুটো দুই জায়গায় গিয়ে আলাদা আলাদা অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে। তো ইঁদুরের যুদ্ধ হলো, যোদ্ধাদের দুজন নেতা মুখোমুখি হবে। এই কমান্ডের একজন, ওই কমান্ডের একজন সামনাসামনি হবে। যুদ্ধের পদ্ধতি হলো, উভয়ে মুখোমুখি হয়ে দাঁত বের করে বিকট ধরনের শব্দ করবে। তবে ভয়ংকরভাবে শুধু শব্দই করবে কিন্তু আক্রমণ করবে না; কিন্তু আক্রমণ করবে করবে ভাব থাকবে। এইরকম অনেকক্ষণ ধরে করতে করতে এক পর্যায়ে একজন ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে।
উভয়ের কেউই অপরজনকে আক্রমণ করে না, কামড়ও দেয় না, কিন্তু দাঁত টাত বের করে শক্তি প্রদর্শন করে। এক পর্যায়ে পরাজিত ইঁদুরটি পালিয়ে যায়। যে পালিয়ে যায়, যদিও তার শারীরিক কোনো আঘাত লাগেনি, কিন্তু একদিন-দুইদিন পরে সে মরে যায়। অর্থাৎ, পরাজয়ের কারণে ওর ভেতর থেকেই জীবন শেষ হয়ে যায়। মানুষের মধ্যেও এমন দেখা যায় যে, তারা অস্ত্র প্রদর্শন করে, অস্ত্র দেখায়। অস্ত্র দেখাতে দেখাতে এক পর্যায়ে ভয় পেয়ে বসে।
আল্লাহ তায়ালা সাহাবাদের জামাতকে পাঠিয়েছিলেন রোমানদের মোকাবেলা করার জন্য। রোমানদের শক্তিই ছিল ভয় প্রদর্শন। অন্যদেরকে তাদের হিংস্র রূপ প্রদর্শন করা। এইজন্য রোম সাম্রাজ্যের শক্তিই ছিল তাদের নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন যে, তারা কতটা নিষ্ঠুরতা দেখাতে পারে। এক দেশ জয় করে রাজার মাথা কেটে ডালে ঝুলিয়ে দিয়েছে। রক্ত টপ টপ করে ঝরছে। আর কাছেই খাবার রান্নার মাধ্যমে উৎসবের আয়োজন চলছে। ওখানে রানি ও রাজকুমারীদের নিয়ে আনন্দ-প্রমোদ হচ্ছে। একদিকে আনন্দ-প্রহ্লাদ হচ্ছে, অন্যদিকে রাজার মাথা থেকে রক্ত ঝরে পড়ছে। অর্থাৎ নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত প্রদর্শন যে, শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত দেয়নি, সেখানেই তার মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে আনন্দ উল্লাস করার মাধ্যমে পৈশাচিক নিষ্ঠুরতার প্রদর্শন। শুধু এটুকুই নয়, বরং রাজ্যে ঘোষণা দিয়ে জনসম্মুখে প্রদর্শন করা হচ্ছে।
আজকাল আমাদের বর্তমান দুনিয়াতে এগুলোর কিছু কিছু এখনো অবশিষ্ট আছে। এই লড়াই ইত্যাদিকে বক্সিং নাম দিয়ে খেলার পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে। ব্যথা যাতে না লাগে, এইজন্য বক্সিং খেলাতে গ্লাভস পরা হয়। এই গ্লাভসে থাকে স্পঞ্জ জাতীয় জিনিস, যাতে আঘাত করলে ব্যথা না লাগে; কিন্তু রোমানদের মাঝে প্রচলন ছিল আসল বক্সিং; যেখানে তারাও গ্লাভস পরত, কিন্তু সেই গ্লাভসটি ছিল পিতলের আর উপরে ধাতব পেরেক যুক্ত। এই গ্লাভস দিয়ে একটা ঘুষি দিলেই মাথা উড়ে যেত। এভাবেই তারা ওই খেলার মাঠে মোকাবেলা করে প্রতিপক্ষকে হত্যা করত। এটি ছিল তাদের স্বাভাবিক খেলা, যুদ্ধের মাঠের খেলা নয়। স্বাভাবিক অবস্থাতেই এসব খেলা তারা দেখত, আনন্দ করত আর এই নিষ্ঠুরতার চর্চা করে যেত। এটাই ছিল তাদের জাতীয়তা।
এমন স্বভাবধারী রোমানদের সাথে হচ্ছে মুসলমানদের মোকাবেলা। ওই চূড়ান্ত নিষ্ঠুর জাতি বিশাল বাহিনী নিয়ে এসেছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মোকাবেলা করতে। আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের বিজয় দান করলেন। রোমানরা পরাজিত হওয়ার পরে পর্যালোচনা করতে বসল যে, মুসলমানরা কেন জিতে গেল। তাদের এত শক্তির মোকাবেলায়, এত নিষ্ঠুরতার মোকাবেলায় মুসলমানরা কেন বিজয়ী হলো আর রোমানরা কেন পরাজিত হলো? তখন সেই প্রবীণ রোমান এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, আমি বলছি — ওরা কেন জিতে গেল।
কারণ, তারা রাত জেগে ইবাদত করে। মদ পান করে না, ব্যভিচার করে না, ওয়াদা রক্ষা করে। মূল্য পরিশোধ না করে জুলুম করে কারো জিনিস ছিনিয়ে নেয় না। এই বাক্যগুলো কোনো জাতি যদি শুনে, তাহলে তাদের মধ্যে পূর্বে ভয় থাকলেও শোনার পরে আর ভয় থাকবে না। এদেরকে ভয় করার মতো কোনো কারণ নেই। একদিকে রোমানরা এসেছে, যাদের শক্তিই হলো ভয় ও নিষ্ঠুরতা। অপরদিকে আল্লাহ তায়ালা মুসলমান জামাতকে পাঠিয়েছেন, তাদের শক্তিই হলো দয়া-মায়া-সৌন্দর্য।
আল্লাহ তায়ালা পুরো দীন-ইসলামকে এমনভাবে বানিয়েছেন যে, একজন মুসলমান জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, ছোট-বড় প্রতিটি কাজে সর্বপ্রথম বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম বলে আরম্ভ করে। আল্লাহর অন্য নামও আছে, কিন্তু কেউ 'বিসমিল্লাহিল কাহহারি জাব্বার' বলে খেতে আরম্ভ করে না। যদি বলা হয় আল্লাহর নামও নাও, তখন কেউ কি শুনেছেন যে, বিসমিল্লাহিল কাহহার কাজ্জাব বলেছে! এই নাম নিয়ে কেউ খেতে আরম্ভ করে না, জামাও পরে না, মসজিদেও ঢুকে না। আল্লাহর নাম উচ্চারণের সময় আসলে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' বলেই প্রবেশ করে। আর এই গুণগুলোই তার জীবনের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় — 'রাহমান', 'রাহিম।' আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা.-কে পাঠিয়েছেন এই সিফাতগুলো নিয়ে।
رَحْمَتِيْ سَبَقَتْ غَضَبِيْ
'
আমার রহমত আমার গজবের আগে আগে চলে।' দ্রুত চলে ঠিকই, তবে রহমত আগে পৌঁছে যায় আর এটাই প্রতিষ্ঠিত হয়।
আল্লাহ তায়ালা এক জামাতকে পাঠালেন আর তারা বিজয়ীও হলো; কিন্তু কী দিয়ে বিজয়ী হলো? রাতের নামাজ দিয়ে, ইবাদত দিয়ে, তাদের সৎ আচরণ দিয়ে। আল্লাহ তায়ালা দীন পাঠিয়েছেন, এই দীন সব আদিয়ান (ধর্মসমূহ)-এর উপর বিজয়ী হবে। কিন্তু বিজয়ী হবে তার সুন্দর আচরণ দিয়ে, নেক আমল দিয়ে। যে নেক আমল সুন্দর এবং মহব্বতকে আকর্ষণ করে। কারো মধ্যে যখন এই আখলাকগুলো থাকে, এই আমলগুলো থাকে, তার স্বাভাবিক পরিণতি হলো, তার প্রতি ভয়ের সৃষ্টি হয় না, বরং তার প্রতি মহব্বত, ভালোবাসা ও মুগ্ধতা সৃষ্টি হয়। তার দিকে মন আকৃষ্ট হয়। সুতরাং যে জামানায়, যে সমাজে যখন কেউ এই সিফাতগুলো নিজেদের মধ্যে নিয়ে আসে, সুন্নতের এই সিফাতগুলো অর্থাৎ, আল্লাহর ইবাদতগুলো করে, সুন্নতের উপর চলে। আর তার ভেতরে যদি এই আখলাকি সিফাতগুলো জাগে তবে তার স্বাভাবিক পরিণতি হলো, সে ওই জায়গায় মাহবুব হবে, প্রিয় হবে। শুধু ভালো মানুষের নিকট নয়, খারাপ মানুষের মধ্যেও মাহবুব হবে। শুধু ভালো মানুষকেই কি সুন্দর বলা হয় নাকি চোর-ডাকাতকেও সুন্দর বলা হয়? ডাকাত ডাকাতি করে ঠিকই, কিন্তু তারপরেও সে ডাকাত ফুলকে সুন্দরই বলে। ডাকাত... আমি ডাকাত বলে গোলাপফুলকে তাচ্ছিল্য করব আর তার গন্ধকে দুর্গন্ধ বলব — তা নয়। ডাকাত ডাকাতি করবে ঠিকই, কিন্তু সেও গোলাপের সুন্দরকে স্বীকার করবে; অস্বীকার করবে না। তো আল্লাহওয়ালাদের সৌন্দর্যকে কাফেরও স্বীকার করে, ডাকাতও স্বীকার করে। সব জামানায়ই করে। তারা সবসময় প্রিয়, সবসময় মাহবুব। কারণ, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে যে আমল দিয়েছেন, যে আমলের মাধ্যমে তারা মাহবুব হন। সুন্দর মানুষকে আল্লাহ তায়ালা ভালোবাসেন, মানুষও ভালোবাসে।
আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর জামানায় রোমানদের সাথে আরবদের যুদ্ধ হচ্ছে। একদিকে প্রধান সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা. আর অপরদিকে রোমানদের সেনাপতি জাগাস। রোমান বাহিনীতে এই কথা ছড়িয়ে পড়েছিল যে, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর হাতের তরবারিটি আসমান থেকে নাজিল হওয়া তলোয়ার। এই কথাটি মানুষ যখন শোনে যে, এই তরবারিটি আসমান থেকে নাজিল হওয়া তলোয়ার, এর সাথে মোকাবেলা করার সাহস কার থাকবে? এক কথাতেই শেষ — আসমানের তলোয়ারের সাথে জমিনের মানুষের মোকাবেলা করা অসম্ভব। যাহেরি শক্তির সাথে মোকাবেলা করা যায়, কিন্তু গায়েবি শক্তির সাথে মোকাবেলা করা যায় না।
রোমান বাহিনী এসে গেছে। সেই বাহিনীতে বিরাট বিরাট যোদ্ধা, বিরাট বিরাট শক্তিশালী অস্ত্রশস্ত্র। আধুনিক কালে হলে হতো ট্যাংক, কামান ইত্যাদি। এগুলোরও মোকাবেলা করা যায়; কিন্তু ওই বাহিনীর একজনের মাথা তলোয়ার দিয়ে কেটে ফেলা হয়েছে; এখন শরীরের উপর মাথা নেই। তারপরেও তিনি মাথাবিহীন শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছেন। মাথা নাই, মাথা কেটে ফেলা হয়েছে, কিন্তু তিনি পড়ে যাননি; বরং ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছেন। এই মাথাবিহীন একটা লাশ যদি দুই কদম সামনে আসে, তাহলে বিপরীত দিকে সৈন্যের সংখ্যা হাজার হোক বা লাখ, তারা এমনিতেই মরে যাবে। তো আসমান থেকে নাজিল হওয়া তো আরেক ধরনের জিনিস, কে এর মোকাবেলা করবে?
দজলা নদী সামনে.... খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা. দজলার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ঘোড়ায় সওয়ার। দুই সেনাপতি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। খালিদ রা.-কে বললেন, আমি তোমাকে কয়েকটি কথা জিজ্ঞেস করছি, তুমি সত্যি সত্যি উত্তর দিও। প্রথমত বিষয় হলো, একজন যোদ্ধার কাছে সত্য উত্তর জিজ্ঞাসা করা — এটাই বড়ই ব্যতিক্রমী জিনিস।
বলা হয় যে, 'যুদ্ধ এবং রাজনীতিতে সত্য-মিথ্যা বলে কোনো পার্থক্য নেই এবং শেষ কথা বলে কোনো কথা নেই।' সব শেষ কথার পরে আবার কথা আসবে। যেমন শেষ কথা হলো, এটাই সীমান্ত — মেনে নিলাম। সব সমস্যা শেষ। কিন্তু এক সময় অবস্থার পরিবর্তন হবে আর পূর্বে মেনে নেওয়াকে অস্বীকার করে বসবে। ইসরাইলিরা কতবার তাদের সীমানা নির্ধারণ করেছে আর প্রতিবার সেই মেনে নেওয়া সীমানা নিজেরাই বাতিল করে দিয়েছে। আমাদের দেশে ইংরেজরা দুইশত বছর শাসন করেছে। শাসনকালে অনেক যুদ্ধ করেছে, অনেক সন্ধি করেছে, অনেক ওয়াদা করেছে; কিন্তু এমন একটা দৃষ্টান্তও নেই যে, অবস্থার পরিবর্তনের পরে তারা সেই ওয়াদার উপর অটল ছিল।
ওয়াদা, ওয়াদার সময় ছিল, এখন সে ওয়াদা বাদ।
রোমানদের ইতিহাসও তাই, সত্য-মিথ্যা বলে যুদ্ধের ময়দানে কিছু নেই। যেখানে রোমানদের সেনাপতি জানে যে, যুদ্ধের ময়দানে সত্য-মিথ্যা বলে প্রকৃত কোনো জিনিস নেই, সেখানে সে কেমন করে আশা করে যে, খালিদ রা. সত্য কথা বলবে? কিন্তু তারপরেও সে আশা করল। কারণ, খালিদের ব্যাপারে এই ধারণা করা যে, তিনি সত্য কথা বলবেন — এর মানে হলো, আগে থেকেই সে পরাজিত হয়ে গেছে। কারণ সে জানে, তারা দুনিয়ার মানুষ নন, আসমানের মানুষ।
দুনিয়ার মানুষ হলে তার কাছ থেকে প্রত্যাশাই করত না যে, তিনি সত্য কথা বলবেন। এই কথা প্রত্যাশা করা যে, তিনি সত্য কথা বলবেন — এর মানেই হচ্ছে আসলে সে পরাজিত হয়েই গেছে।
সেই সেনাপতি এসে বলল, আমাকে সত্য কথা বলবেন। খালিদ রা. বললেন, হ্যাঁ, জিজ্ঞাসা করুন। সেনাপতি বলল,
প্রথম প্রশ্ন: তোমার হাতে যে তলোয়ার, সেটি কি সত্যিই আসমান থেকে নাজিল হওয়া? খালিদ রা. বললেন, না। আসমান থেকে নাজিল হওয়া তলোয়ার নয়। রাসূল সা. আমাকে এই তলোয়ার দেওয়ার সময় বলেছিলেন, 'আল্লাহর তলোয়ার তোমার হাতে তুলে দিলাম।' কিন্তু এই তলোয়ার আসমান থেকে নাজিল হয়নি।
যেমনটা সে আশা করেছিল, খালিদ রা. ঠিকই তার সাথে সত্যি কথা বললেন। আগে থেকেই সে পরাজিত ছিল এই আশা করে যে, খালিদ দুনিয়ার অন্যান্য যোদ্ধাদের মতো নয়, সে ভিন্ন। সে সত্য কথা বলবে। আর ঠিকই খালিদ রা. সত্য কথা বললেন। রোমান সেনাপতির যতটুকু পরাজয় বাকি ছিল, ততটুকু পরাজয়ও হয়ে গেল। এই রাজপ্রাসাদের মানুষকে এই কথা বলে দেওয়া যে, হ্যাঁ, এটা আসমান থেকে নাজিল হওয়া তলোয়ার — যুদ্ধ তখনই শেষ হয়ে যেত; কিন্তু তিনি তা বলেননি; সত্য কথা বলেছেন।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: এখন যে ব্যক্তি মুসলমান হবে, তোমাদের মাঝে তার অবস্থান কী হবে? খালিদ রা. বললেন, সে আমাদের ভাই; বরং আমাদের চেয়ে আরও ভালো। কারণ, আমরা রাসূল সা.-কে দেখেছি, ওহী নাজিল হতে দেখেছি আর আজ সে ইসলাম গ্রহণ করবে, সে রাসূল সা.-কে দেখেনি, ওহী নাজিল হতেও দেখেনি। অতএব তার ঈমান আমাদের চেয়েও বেশি ভালো; বরং তার ঈমান আমাদের চেয়ে আরও ভালো। অনেক আশ্চর্যকর যুদ্ধ হয়। প্রতিপক্ষরা হেরে যায়। তখন তারা দাস হিসেবে আসে। করুণ অবস্থা। তাদেরকে বড় লাঞ্ছনার মধ্যে রাখা হয়। জীবজন্তুর মতো তাদের সাথে আচরণ করা হয়। অথচ মুসলমানরা বলছে, 'তারা আমাদের ভাই, বরং আমাদের চেয়ে আরও ভালো।'
তৃতীয় প্রশ্ন: মুসলমান কীভাবে হওয়া যায়? খালিদ রা. বললেন, কালিমা পাঠ করার মাধ্যমে মুসলমান হওয়া যায়।
সেই সেনাপতি ঘোড়া খালিদ রা.-এর মুখোমুখি রেখে এতক্ষণ কথা বলছিলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ মুসলমান হয়ে ঘোড়া ঘুরিয়ে খালিদ রা.-এর পাশাপাশি দাঁড়ালেন আর যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গেল। দুই সেনাপতি এক দিকে। দারদা ওখানেই শহীদ হয়ে গেলেন। দারদা ইকতেদারের (প্রশাসনের) অনুসরণ করে নিহত হননি, বরং খালিদ রা., মুসলমান এবং ইসলামের সৌন্দর্যের মোকাবেলায় পরাজিত হয়েছেন। সুতরাং জয়-পরাজয় শুধু যুদ্ধের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয় না, বরং আত্মার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়। যেমন বলা হয়, মন জয় করা। মানুষ মন জয় করে, কিন্তু মন জয় করার এই যুদ্ধে কেউ পরাজিত হয় না। যুদ্ধের ময়দানে যখন যুদ্ধ হয়, তাতে একজন জয়ী হয় এবং অপরজন পরাজিত হয়। আর মনের জগতেও যুদ্ধ হয়, মনও জয় করে, যুদ্ধেও জয় করে; কিন্তু মন যখন যুদ্ধ করে জয় করে, সেখানে কেউ পরাজিত হয় না, বরং উভয়ই বিজয়ী। গল্প আছে প্রচুর... কাব্য জগতে মোকাবেলা হয়, সাহিত্যের জগতে মোকাবেলা হয়, শিল্পকলায় মোকাবেলা হয়। কেউ জিতে আর কেউ পরাজিত হয়; কিন্তু মনের জগতে যখন কেউ বিজয়ী হয়, তখন যাকে বিজয়ী করা হয়েছে, সেও জয়ী হয়। এই যুদ্ধে একজন রাজা হয় আর আরেকজন রানি হয়; পরাজিত কেউ হয় না। এর বিপরীতে অস্ত্রের জগতে আনুষ্ঠানিকভাবে হয়তো কেউ জিতে, কিন্তু পরাজিত হয় উভয়ই।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এত বিস্তৃত ছিল যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না — এমন একটা কথা প্রচলিত ছিল। কোথায় সে ফিজি থেকে নিয়ে আমেরিকার একটা অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এমনকি বেশ কিছুদিন আগেও আমেরিকার অনেক অনেক জায়গায় ব্রিটিশ কলোনি ছিল স্বাধীনতার আগেও। আজানের ক্ষেত্রে... কোথায় ফজরের আজান হচ্ছে, ঠিক সেই সময়ই কোথায় মাগরিবের আজান হচ্ছে, কোথায় ইশার আজান হচ্ছে, তথা পুরো দুনিয়াতেই একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন নামাজের আজান হচ্ছে। ঠিক তেমনিভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এত বিস্তৃত ছিল যে, পুরো সাম্রাজ্যে একসাথে সূর্য অস্ত যেত না। অর্থাৎ, সাম্রাজ্যের কোথাও না কোথাও সূর্য রয়েছেই। সেই সাম্রাজ্যই যুদ্ধের মাধ্যমে ছোট হতে হতে সংকুচিত হয়ে ছোট্ট একটা দ্বীপের মধ্যে এখন আছে। এটা হলো তাদের জিত তথা বিজয়। অর্থাৎ, তাদের সব সাম্রাজ্য হাতছাড়া হয়ে গেছে।
আমাদের দেশের যেখানেই যাওয়া হোক না কেন, যদি তাদের ছোট একটা পাঠশালায়ও যাওয়া হয়, সেখানেও একটা শহীদ মিনার আছে। পাঠশালার ঘর থাকুক বা না থাকুক, হয়তো সেই পাঠশালার ছাদ ভেঙে পড়েছে, কিন্তু বাঁশ দিয়ে হলেও একটা শহীদ মিনার আছে। ঠিক, ইউরোপেও এমনটা পাওয়া যায় যে, যে কোনো একটা ভাঙা পাড়া বা ভাঙা স্টেশন... যেখানেই যাওয়া হোক না কেন, একটা বিলবোর্ড লাগিয়ে সেখানে লিখে দিয়েছে যে, এখানে জার্মানির হাতে মারা গিয়েছিল অমুক অমুক... এখন পর্যন্ত বাস বা ট্রেনে যুদ্ধাহতদের জন্য রিজার্ভ সিট বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যদিও যুদ্ধাহতরা এখন খুব কম সংখ্যকই বেঁচে আছে; বেশিরভাগই মরে গেছে, কিন্তু তাদের জন্য সিট রিজার্ভ এখনো আছে।
কী যুদ্ধ? কে বিজয়ী হয়েছে? কীভাবে যুদ্ধ করেছে! উভয় পক্ষই তো ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু মহব্বতের ময়দানে যুদ্ধ হয়, বিজয়ী হয়, কিন্তু কেউ পরাজিত হয় না। আমাদের দেশে আল্লাহওয়ালাগণ এসে এই দেশকে জয় করেছেন। এই দেশের হিন্দুরা মুসলমান হয়ে পরাজিত হয়নি; বিজয়ী হয়েছে। বড় আনন্দের সাথে, অত্যন্ত মহব্বতের সাথে তাদেরকে স্মরণ করা হয়। এই খাজা আজমেরি রহ. আর মঈনউদ্দিন চিশতি রহ., তাদেরকে কেউ শত্রু মনে করে না; বরং তাদের ইহসান স্বীকার করতেই থাকে। তারাই আমাদের জন্য আমাদের জয় নিয়ে এসেছেন; অথচ ছিলেন ফকির, তলোয়ার নিয়ে আসেননি, এসেছেন তার দারিদ্র্য নিয়ে। তাদের নামই হচ্ছে 'ফকির।'
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দীন দিয়েছেন, দীন দিয়ে দুনিয়াকে জয় করতে। ফকিররা যাহেরি তথা বাহ্যিকভাবে দুর্বল; কিন্তু তার আমল-আখলাক পূর্ণ ছিল সৌন্দর্য দিয়ে। আল্লাহ তায়ালা বহুত মেহেরবান করে আমাদেরকে দীন দিয়েছেন। আমরাও এই দীন নিয়ে পুরো দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ব আর দুনিয়ার কোণায় কোণায় এই দীনকে পৌঁছে দেব। কিন্তু এই দীনকে পৌঁছাব তলোয়ার দিয়ে নয়; রাসূল সা.-এর সুন্দর আখলাক দিয়ে, সুন্দর ইবাদত দিয়ে। ঠিক আছে না ভাই? ইনশাআল্লাহ। এইজন্য আমরা নিয়ত করি, দীন নিয়ে চলব আর এই দীনকে পুরো দুনিয়ায় বহন করব। এইজন্য চিল্লার নিয়ত করি, তিন চিল্লার নিয়ত করি। কেমন করে সেই আখলাক আমাদের মধ্যে আনা যায় — তার প্রস্তুতি হিসেবে আমরা আল্লাহর পথে বের হব। ঠিক আছে না ভাই? ইনশাআল্লাহ।
এইজন্য সবাই দাঁড়িয়ে যাই, নাম লেখাই। মাশাআল্লাহ। যারা যেতে প্রস্তুত, সামনে এসে নাম লেখাই। আল্লাহ তায়ালা সবার নিয়তকে কবুল করুন। সবাই এই নিয়ত করি যে, যারা যারা চিল্লায় যাওয়ার নিয়ত করেছি, সেই চিল্লায় যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসার পূর্বে প্রত্যেক মাসে তিন দিন করে আল্লাহর রাস্তায় বের হব। নিজ মহল্লায়, নিজ মকামে কাজের মধ্যে শরিক হতে থাকি। এই আমলগুলো যদি করতে থাকি ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ তায়ালা পরবর্তী আমলগুলো সহজ করে দেবেন। কখনো শয়তান ধোঁকা দেয় যে, চিল্লায় তো যাবোই, কিন্তু যখন যাব তখন নাম উঠাব। এইরকম করলে চিল্লায় যাওয়া মুশকিল হয়ে যায়। কিন্তু আমল যদি করতে থাকি, আল্লাহ সহজ করে দেবেন, ইনশাআল্লাহ।
এখনো ইশার নামাজের প্রায় পঞ্চাশ মিনিট বাকি আছে। এই সময় ফিকির করতে পারি। সবাই গাশতে বের হই। একটু যদি বাইরে চলে যাই আর মহল্লার বা মসজিদের ধারে কাছে যারা আছি, তারা রাইবারি করি। তো সবাই বের হয়ে যাই। কোথাও কাউকে পেলাম আর কথাবার্তা বললাম। আর সম্ভব হলে মসজিদে নিয়ে এসে আরও কিছু কথা বললাম। ঠিক আছে না ভাই? ইনশাআল্লাহ।
সমাপ্ত।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
হাদীসের আলোকে মসজিদে ঘুমানোর শরয়ী বিধান
...
মুমিনের কিছু গুণ
ঈমান কী? ১. উমর ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদীস-হাদীসে জিবরীলে এসেছে- فَأَخْبِرْنِي عَن...
কিছু অমূল্য নসিহত
...
ইংরেজি পড়ব কি পড়ব না
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন