প্রবন্ধ
সমাজ বিনির্মাণে সুরা হুজুরাতের কালজয়ী শিক্ষা
৭ জানুয়ারী, ২০২৬
১২৭৮
০
পবিত্র কোরআনের ৪৯তম সুরা আল-হুজুরাত শুধু কতগুলো আয়াতের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি আদর্শ সমাজ ও উন্নত রাষ্ট্র কাঠামোর ইশতেহার। এই সুরা মুমিনদের পারস্পরিক আচার-আচরণ, পারিবারিক ও সামাজিক নিরাপত্তা এবং মনস্তাত্ত্বিক পবিত্রতার এক অনন্য মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে। এই সুরাটিকে ‘সুরাতুল আখলাক’ বা শিষ্টাচারের সুরা বলা হয়। এই সুরায় এমন ১০টি সামাজিক ও চারিত্রিক বিধান দেওয়া হয়েছে, যা মেনে চললে ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
এই প্রবন্ধে আমরা সেই ১০টি বিষয়ের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ করব।
১. নিচু স্বরে কথা বলা : সুরার শুরুতেই মুমিনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা কোনো বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর আগে বেড়ে কিছু না করে, বিশেষ করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে কথা বলার সময় কণ্ঠস্বর নিচু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি উম্মতের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত একটি মৌলিক আদর্শ যে ওহির বিধানের সামনে নিজের বুদ্ধি বা আবেগকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। (সুরা : আল-হুজুরাত, আয়াত : ১-৫)
২. তথ্য যাচাইয়ের আবশ্যকতা : সুরা হুজুরাতের সামাজিক মূলনীতি হলো যেকোনো সংবাদ বা তথ্যের সত্যতা যাচাই করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি কোনো ফাসেক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করো। (সুরা : আল-হুজুরাত, আয়াত : ৬)
বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির যুগে গুজব বা ফেক নিউজ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় আমরা না জেনেই কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করি বা মন্তব্য করি। ‘তবে তা যাচাই করো’-এর দাবি হলো, যেকোনো স্পর্শকাতর বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তার সত্যতা ও উৎস নিশ্চিত করা।
এটি না করলে ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে চরম বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
৩. বিবাদ মীমাংসা করা : সমাজের মানুষের মধ্যে মতভেদ ও দ্বন্দ্ব থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু ইসলাম সেই দ্বন্দ্বকে জিইয়ে রাখতে নিষেধ করেছে। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।’ (সুরা : আল-হুজুরাত, আয়াত : ৯)
এটি শুধু একটি নসিহত নয়, বরং এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। যখনই দুটি পক্ষ বা ব্যক্তির মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়, তখন তৃতীয় পক্ষকে ‘ইসলাহ’ বা সংশোধনের নিয়তে এগিয়ে আসতে হবে। বিবাদ মিটিয়ে দেওয়া ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত এবং এটি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে।
৪. ইনসাফ ও ন্যায়বিচার : মীমাংসা করার সময় ইসলাম যে শর্তটি জুড়ে দিয়েছে তা হলো ‘কিসত’ বা ন্যায়বিচার। পক্ষপাতমূলক সমঝোতা কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ন্যায়বিচার করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচারকদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আল-হুজুরাত, আয়াত : ৯)
ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা আত্মীয়তার ঊর্ধ্বে উঠে সত্যের ওপর অটল থাকাই হলো ইনসাফ। একজন মুমিন হিসেবে সমাজে ইনসাফ কায়েমের এই তাত্ত্বিক দিকটি আমল ও দাওয়াতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৫. উপহাসের ব্যাধি বর্জন : সামাজিক বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ হলো একে অপরকে তুচ্ছজ্ঞান করা। আল্লাহ বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে।’ (সুরা : আল-হুজুরাত, আয়াত : ১১)
উপহাসের মূলে থাকে অহংকার। যখন কেউ নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে, তখনই সে অন্যকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে। এই উপহাস শুধু ব্যক্তির মনে কষ্ট দেয় না, বরং এটি হিংসার বীজ বপন করে। ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি বংশ বা আভিজাত্য নয়, বরং তাকওয়া।
৬. দোষারোপের সংস্কৃতি পরিহার : কথা বা ইশারার মাধ্যমে কাউকে বিদ্ধ করা বা কারো দোষ অন্বেষণ করা নিষেধ। অনেক সময় আমরা পরোক্ষভাবে মানুষের সম্মানহানি করি। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা একে অপরকে দোষারোপ কোরো না।’ (সুরা : আল-হুজুরাত, আয়াত : ১১)
এই আদেশের উদ্দেশ্য হলো মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা। অন্যের ত্রুটি না খুঁজে নিজের ত্রুটি সংশোধনে মশগুল থাকাই হলো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
৭. মন্দ উপাধিতে ডাকার নিষেধাজ্ঞা : কাউকে এমন নামে বা উপাধিতে ডাকা, যা সে অপছন্দ করে, ইসলামে তা হারাম। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অপরকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না।’ (সুরা : আল-হুজুরাত, আয়াত : ১১)
শারীরিক গঠন, বংশ বা অতীত কোনো ভুলকে কেন্দ্র করে ব্যঙ্গাত্মক নাম দেওয়া সামাজিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। এটি মানুষের ব্যক্তিত্বকে খর্ব করে এবং সমাজে তিক্ততা সৃষ্টি করে। নাম হবে সম্মানের ও মহব্বতের।
৮. অমূলক ধারণা থেকে বেঁচে থাকা : সামাজিক ও পারিবারিক কলহের মূল উৎস হলো কু-ধারণা বা সন্দেহ। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা বেশির ভাগ অনুমান থেকে দূরে থাকো; কারণ কিছু অনুমান গুনাহ।’ (সুরা : আল-হুজুরাত, আয়াত : ১২)
যখন আমরা কারো কাজকে নেতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করি, তখন থেকে সম্পর্কের ফাটল শুরু হয়। সুধারণা ঈমানের দাবি। কোনো বিষয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কারো প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণ করা আধ্যাত্মিক উন্নতির অন্তরায়।
৯. গোয়েন্দাগিরি ও গোপনীয়তা লঙ্ঘন : ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ইসলামের এক পবিত্র আমানত। অন্যের দোষ খোঁজা বা গোপনে কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করাকে ইসলাম ‘তাজাসসুস’ হিসেবে গণ্য করেছে এবং তা নিষিদ্ধ করেছে। আধুনিক পরিভাষায় একে ‘প্রাইভেসি’ বলা হয়। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে জনসমক্ষে আনা বা তা নিয়ে নাড়াচাড়া করা আমানতের খেয়ানত। এটি আত্মিক ব্যাধি, যা মানুষের অন্তরকে কলুষিত করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! অনেক রকম অনুমান থেকে বেঁচে থাকো। কোনো কোনো অনুমান গুনাহ। তোমরা কারো গোপন ত্রুটির অনুসন্ধানে পড়বে না।’ (সুরা : আল-হুজুরাত, আয়াত : ৯)
এ আয়াতে বলা হয়েছে, অন্যের ছিদ্রান্বেষণ করা ও তার গোপন দোষ খুঁজে বেড়ানোও একটা গুনাহের কাজ। তবে কোনো বিচারক যদি অপরাধীকে খুঁজে বার করার জন্য অনুসন্ধান চালায়, তবে তা এর অন্তর্ভুক্ত নয়।
১০. গিবত বা পরনিন্দার ভয়াবহতা : তালিকার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে মারাত্মক বিষয়টি হলো ‘গিবত’। আল্লাহ একে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। গিবত হলো এমন এক অদৃশ্য আগুন, যা মানুষের নেক আমলকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। এটি শুধু সামাজিক অপরাধ নয়, বরং এটি মানুষের চরিত্র হননের শামিল। যে সমাজে গিবত চর্চা হয়, সেখানে পারস্পরিক বিশ্বাস ও মহব্বত টিকে থাকে না।
পরিশেষে বলা যায়, সুরা হুজুরাতের এই ১০টি মূলনীতি শুধু পড়ার জন্য নয়, বরং বাস্তব জীবনে প্রয়োগের জন্য। যদি কোনো সমাজ এই ঐশী বিধানগুলোকে তাদের জীবনপদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করে, তবে সেখানে কোনো হানাহানি, বিদ্বেষ বা অস্থিরতা অবশিষ্ট থাকবে না। একটি মানবিক ও শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়তে সুরা হুজুরাতের এই ১০টি শিক্ষার বিকল্প নেই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই গুণাবলি অর্জনের তাওফিক দান করুন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
মায়ের কোল শিশুর প্রথম বিদ্যালয়
আল্লাহ তা'আলা অনুগ্রহ করে পিতা- মাতাকে সন্তান উপহার দেন। শিশুরা আসলে জান্নাতের ফুল। প্রতিটি শিশুই স্...
মোয়াশারাঃ পারস্পরিক হক ও অধিকার
...
ইলম থেকে মাহরূমির কারণসমূহ ও প্রতিকার
ইলম আল্লাহ তা'আলার নেয়ামতসমূহের মধ্যে অন্যতম বড় নেয়ামত। হাদীসে এসেছে, 'আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাক...
শিক্ষার জন্য শিক্ষকের বিকল্প নেই
আল্লাহ তা'আলা সকল নর-নারীর জন্য ইলম অর্জন ফরজ করেছেন। ইলম আল্লাহ তা'আলার একটি সিফাত। আল্লাহ ত'আলা তা...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন