হযরত উসমান (রা.)-এর সংকলন ও সূরার ক্রমবিন্যাস কি কুরআনের পরিবর্তন?
প্রশ্নঃ ১৬৯৩৪২. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, শায়েখ আমার একটি প্রশ্ন আছে। আশা করি আমার প্রশ্নের উত্তরটি দিবেন।
আমরা জানি, কুরআন কখনো পরিবর্তন হয়নি ও কিয়ামত পর্যন্ত হবে না। কিন্তু একটা বিষয় নিয়ে আলেমদের মধ্যে দ্বিমত আছে। সেটি হলো কুরআনের বর্তমান ক্রম। কুরআনে যেমন শুরুতে সূরা ফাতিহা তারপর বাকারা, আলে ইমরান, নিসা এরকম ক্রমানুসারে রয়েছে, অনেক আলেম বলছে এটা উসমান রা. এর সময়কার থেকে শুরু হয়েছে। আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত না। তাহলে কুরআনের সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন আসে, যে কুরআন পরিবর্তিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কুরআনের বর্তমান ক্রম কি উসমান রা. এর সময়ে করা হয়েছে? এটা কি আল্লাহর নির্ধারিত ক্রম না?সাহাবিদের ইজতিহাদের মাধ্যমে হয়েছে? আর যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে কুরআন কি পরিবর্তিত?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
মূল প্রশ্নের উত্তরের আগে প্রথমে দুটি ভিন্ন বিষয় আলাদা করে আলোচনা করা প্রয়োজন। যাতে উত্তর বুঝতে সহজ হয়।
১) একটি সূরার ভেতরে আয়াতের ক্রম
২) সূরাগুলোর পারস্পরিক ক্রম।
কুরআনের আয়াতগুলোর ক্রমবিন্যাস তাওকীফী তথা ওহীর মাধ্যমে নির্ধারিত
একটি সূরার মধ্যে কোন আয়াতের পর কোন আয়াত বসবে, তা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশে নির্ধারিত হয়েছে। আবু দাউদের বর্ণনায় উসমান (রা.) জানান, কোনো আয়াত নাজিল হলে নবী ﷺ ওহী লেখকদের বলতেন,
ضَعْ هَذِهِ الآيَةَ فِي السُّورَةِ الَّتِي يُذْكَرُ فِيهَا كَذَا وَكَذَا
অর্থ: এই আয়াত অমুক সূরার অমুক স্থানে সন্নিবেশিত করো, যার মধ্যে এই এই বিষয় আলোচিত হয়েছে।
[আবু দাউদ, হাদিস নং: ৭৮৬; সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং: ৩০৮৬]
(হাদিসের লিংক : https://muslimbangla.com/hadith/15132; https://muslimbangla.com/hadith/32731)
ইমাম সুয়ূতী (রহ.) এ বিষয়ে লেখেন:
الْإِجْمَاعُ وَالنُّصُوصُ الْمُتَرَادِفَةُ عَلَى أَنَّ تَرْتِيبَ الْآيَاتِ توقيفي لا شبهة في ذلك
অর্থ: ইজমা ও ধারাবাহিক দলিলসমূহ প্রমাণ করে, আয়াতের ক্রমবিন্যাস তাওকিফী (তথা ওহীর মাধ্যমে নির্ধারিত)। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
(আল-ইতকান ফি উলূমিল কুরআন, ১/২১১)
অর্থাৎ, সাহাবাগণ নিজেদের মতো করে আয়াত সাজাননি।
সূরার ক্রমবিন্যাস
এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অর্থাৎ সূরা ফাতিহা, সূরা বাকারা, সূরা আলে ইমরানের এই যে পারস্পরিক বিন্যাস, তা কি নবীজী ﷺ নিজেই ঠিক করে গেছেন, নাকি সাহাবায়ে কেরাম?
এখানে আলেমদের তিনটি মত পাওয়া যায়,
প্রথম মত: অধিকাংশ আলেমের মতে, এই ক্রম সাহাবাদের ইজতিহাদে নির্ধারিত।
দ্বিতীয় মত: বেশিরভাগ সূরার ক্রম নবীজীর যুগেই স্থির ছিল, কিছু সূরার ক্ষেত্রে সাহাবাদের ইজতিহাদের সুযোগ ছিল।
তৃতীয় মত: পুরো ক্রমই তাওকীফী, শুধু সূরা আনফাল ও তাওবার পারস্পরিক অবস্থান ভিন্ন আলোচনার বিষয়।
ইমাম সুয়ূতী (রহ.) নিজে তৃতীয় মতটি (ইমাম বায়হাকীর মত) পছন্দ করেছেন,
وَالَّذِي يَنْشَرِحُ لَهُ الصَّدْرُ مَا ذَهَبَ إِلَيْهِ الْبَيْهَقِيُّ وَهُوَ أَنَّ جَمِيعَ السُّوَرِ تَرْتِيبُهَا تَوْقِيفِيٌّ إِلَّا بَرَاءَةَ وَالْأَنْفَالَ
অর্থ: যে মতে মন প্রশান্ত হয়, তা হলো বায়হাকীর মত। তা হলো, সব সূরার ক্রমই তাওকীফী, শুধু বারাআত (তাওবা) ও আনফাল ব্যতিক্রম।
(আল-ইতকান ফি উলূমিল কুরআন, ১/২১৯)
তাই এটি একমাত্র ইজতিহাদের মাধ্যমেই নির্ধারিত, বলাও যথাযথ নয়। আবার এখানে কোনো মতভেদই নেই, বলাও যথাযথ নয়।
ইজতিহাদ মানে মনগড়া বিন্যাস নয়
ইমাম যারকাশী (রহ.) বলেন, যাঁরা ইজতিহাদী বলেন, তাঁরাও মনে করেন না যে সাহাবাগণ স্বাধীনভাবে নিজেদের পছন্দমতো সূরা সাজিয়েছেন। বরং তাঁরা নবীজীর তিলাওয়াত ও শিক্ষার আলোকেই এই ক্রমবিন্যাস ঠিক করেছেন।
ইমাম মালিক (রহ.), যিনি নিজেই ইজতিহাদী মতের প্রবক্তা। তিনি বলেন,
قَالَ الْإِمَامُ مَالِكٌ إِنَّمَا أَلَّفُوا الْقُرْآنَ عَلَى مَا كَانُوا يَسْمَعُونَهُ مِنَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم مَعَ قَوْلِهِ بِأَنَّ تَرْتِيبَ السُّوَرِ اجْتِهَادٌ مِنْهُمْ
অর্থ: ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, তাঁরা কুরআনকে সেভাবেই সাজিয়েছেন, যেভাবে নবী ﷺ-এর কাছ থেকে শুনতেন। অথচ তিনি সূরা ক্রমবিন্যাস সাহাবায়ে কেরামের ইজতিহাদ মনে করেন।
(আল-বুরহান ফি উলূমিল কুরআন লিল যারকাশী, ১/২৫৭)
অর্থাৎ, ইজতিহাদী মত গ্রহণ করলেও তা নতুন কোনো বিন্যাসের উদ্ভাবন নয়। বরং নবীজীর শেখানো পথের ওপরই ভিত্তি করে করা হয়েছে।
উসমান (রা.) কি নতুন করে কুরআন সাজিয়েছিলেন?
এই প্রশ্নের জবাব বুঝতে হলে ইতিহাসের ধারাবাহিকতাটা জানা জরুরি।
কুরআন একত্র হয়েছিল আবু বকর (রা.) এর যুগেই। ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক ক্বারী শহীদ হওয়ার পর উমর (রা.) এর পরামর্শে আবু বকর (রা.) যায়েদ ইবনু সাবিত (রা.) কে এই দায়িত্ব দেন। যায়েদ (রা.) বলেন,
فَتَتَبَّعْتُ القُرْآنَ أَجْمَعُهُ مِنَ العُسُبِ وَاللِّخَافِ، وَصُدُورِ الرِّجَالِ ... فَكَانَتِ الصُّحُفُ عِنْدَ أَبِي بَكْرٍ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللَّهُ، ثُمَّ عِنْدَ عُمَرَ حَيَاتَهُ، ثُمَّ عِنْدَ حَفْصَةَ بِنْتِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ
অর্থ: আমি খেজুরের ডাল, পাথরের টুকরা ও মানুষের মুখস্থ স্মৃতি থেকে কুরআন খুঁজে একত্র করলাম। এই সহীফা পরে আবু বকর, উমর, অতঃপর হাফসা (রা.) এর কাছে সংরক্ষিত ছিল।
[সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৯৮৬]
(পূর্ণ হাদীসের লিংক : https://muslimbangla.com/hadith/4625)
এরপর উসমান (রা.) এর যুগে ইসলাম বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার ফলে কিরাআত ও উচ্চারণে মতভেদ দেখা দিতে শুরু করে। হুযাইফা (রা.) এর অনুরোধে উসমান (রা.) হাফসা (রা.) এর কাছে সংরক্ষিত সেই মূল সহীফা থেকে একটি মানসম্মত মুসহাফ প্রস্তুত করান এবং তার অনুলিপি বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেন।
অর্থাৎ, উসমান (রা.) এর মূল কাজ ছিল, ইতিমধ্যে সংরক্ষিত একই মুসহাফকে সারা মুসলিম বিশ্বে একক ও অভিন্নরূপে ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে মুসহাফ নিয়ে মতভেদ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়। তিনি নতুন কিছু তৈরি করেননি, নিজের পক্ষ থেকে কোনো আয়াত বা সূরা যোগ করেননি, কিছু পরিবর্তনও করেননি। বরং নবীজী ﷺ এর যুগ থেকে যা সংরক্ষিত ছিল, তাই অবিকৃতভাবে বিস্তৃত করেছেন।
তবে এর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ব্যতিক্রমী ঘটনা আছে। সূরা আনফাল ও তাওবা প্রসঙ্গে। ইবনে আব্বাস (রা.) একবার উসমান (রা.) কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই দুই সূরাকে কেন পাশাপাশি রাখা হলো এবং মাঝে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম কেন লেখা হলো না। জবাবে উসমান (রা.) বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مِمَّا يَأْتِي عَلَيْهِ الزَّمَانُ وَهُوَ يَنْزِلُ عَلَيْهِ السُّوَرُ ذَوَاتُ الْعَدَدِ، فَكَانَ إِذَا نَزَلَ عَلَيْهِ الشَّىْءُ دَعَا بَعْضَ مَنْ كَانَ يَكْتُبُ فَيَقُولُ ضَعُوا هَؤُلاَءِ الآيَاتِ فِي السُّورَةِ الَّتِي يُذْكَرُ فِيهَا كَذَا وَكَذَا... وَكَانَتِ الأَنْفَالُ مِنْ أَوَائِلِ مَا نَزَلَ بِالْمَدِينَةِ وَكَانَتْ بَرَاءَةُ مِنْ آخِرِ الْقُرْآنِ، وَكَانَتْ قِصَّتُهَا شَبِيهَةً بِقِصَّتِهَا فَظَنَنْتُ أَنَّهَا مِنْهَا، فَقُبِضَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَلَمْ يُبَيِّنْ لَنَا أَنَّهَا مِنْهَا، فَمِنْ أَجْلِ ذَلِك قَرَنْتُ بَيْنَهُمَا، وَلَمْ أَكْتُبْ بَيْنَهُمَا سَطْرَ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর যখন একাধিক আয়াতবিশিষ্ট সূরা নাজিল হতো, তখন তিনি কোনো কাতিবকে ডেকে বলতেন, এই আয়াতগুলো অমুক অমুক বিষয় উল্লিখিত সূরায় বসাও। ... সূরা আনফাল ছিল মদীনায় নাজিল হওয়া প্রথমদিকের সূরাগুলোর একটি, আর তাওবা ছিল কুরআনের একেবারে শেষদিকে নাজিলকৃত। এর বিষয়বস্তু আনফালের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় আমার মনে হয়েছিল এটি বোধহয় আনফালেরই অংশ। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বলে যাওয়ার আগেই ইন্তেকাল করেন। তাই আমি এ দুটিকে পাশাপাশি রাখলাম এবং মাঝে বিসমিল্লাহ লিখলাম না।
[সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং ৩০৮৬]
(পরিপূর্ণ হাদীসের লিংক : https://muslimbangla.com/hadith/32731)
এই বর্ণনা থেকে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, উসমান (রা.) নিজেই বলছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ সাধারণত প্রতিটি আয়াত কোন সূরায় বসবে তা সুনির্দিষ্টভাবে বলে দিতেন। এটাই ছিল স্বাভাবিক নিয়ম। শুধু আনফাল ও তাওবার এই একটি জায়গায় তিনি স্পষ্ট নির্দেশনা না পাওয়ায় নিজের বিচক্ষণতা (বিষয়বস্তুর সাদৃশ্য বিবেচনা করে) প্রয়োগ করেছিলেন। ঠিক এই কারণেই ইমাম বায়হাকী ও ইমাম সুয়ূতী (রহ.) শুধু এই দুই সূরাকে ব্যতিক্রম ধরে বাকি সব সূরার ক্রমকে তাওকীফী বলেছেন।
সুতরাং, এই ঘটনা থেকে এতটুকুই প্রমাণিত হয় যে, একটি দুটি নির্দিষ্ট সূরার পারস্পরিক অবস্থান নিয়ে উসমান (রা.) এর সামান্য বিচক্ষণতাভিত্তিক সিদ্ধান্ত ছিল। এটি কখনোই বোঝায় না যে তিনি গোটা কুরআনের সূরাবিন্যাস নিজের ইচ্ছামতো তৈরি করেছেন। বরং বাকি সকল সূরার ক্রম নবীজী ﷺ এর সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ীই নির্ধারিত ছিল। এটি স্বয়ং উসমান (রা.) এর নিজের বক্তব্য থেকেই প্রতীয়মান হয়।
কুরআন নাজিলের ক্রম আর মুসহাফের ক্রমবিন্যাস দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন
এই পার্থক্যটি বুঝলে অনেক বিভ্রান্তি দূর হয়ে যায়। কুরআন আজকের মুসহাফের ক্রম অনুযায়ী নাজিল হয়নি। যেমন, সূরা আলাকের প্রথম আয়াতগুলো সবচেয়ে আগে নাজিল হওয়া ওহী, অথচ মুসহাফে তা ৯৬ নম্বর সূরা। আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন প্রয়োজনে আয়াত, সূরা নাজিল করেছেন, পরে তা মুসহাফে নির্দিষ্ট বিন্যাসে সংরক্ষিত হয়েছে। এতে কুরআনের কোনো অংশ বদলায়নি। শুধু নাজিলের ধারাবাহিকতা আর মুসহাফের বিন্যাস শুরু থেকেই তথা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগ থেকেই দুটি ভিন্ন ভিন্ন।
মূল প্রশ্নের জবাব, এ বিন্যাসের পরিবর্তনের কারণে কি কুরআন তাহরীফ তথা পরিবর্তিত হয়ে গেছে?
না, কখনোই নয়। কেননা তাহরীফ (বিকৃতি) মানে কী, তা স্পষ্ট বুঝতে হবে। কুরআনের তাহরীফ তথা পরিবর্তন বলতে বোঝায়, কোনো আয়াত বাদ দেওয়া, নতুন আয়াত যোগ করা বা শব্দ বদলে ফেলা। সূরাগুলোর পারস্পরিক বিন্যাস নিয়ে আলেমদের ইলমী আলোচনাকে এর সাথে এক করে দেখা ঠিক নয়। কুরআন আল্লাহ তাআলা যতটুকু অবতীর্ণ করেছেন, তা পরিপূর্ণ সেভাবেই আছে। এতে একটা অক্ষরও যোগ বা বিয়োগ হয়নি।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
অর্থ: নিশ্চয়ই আমি কুরআন নাজিল করেছি, আর নিশ্চয়ই আমিই এর সংরক্ষক।
[সূরা হিজর, আয়াত নং ৯]
আর এই সংরক্ষণ শুধু লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সাহাবাগণ কুরআন মুখস্থ করেছেন, লিখেছেন, নবীজীর মুখ থেকে শুনেছেন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দিয়েছেন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কুরআনের একটি শব্দও পরিবর্তিত হয়নি।
সূরার ক্রম সাহাবাদের ইজতিহাদে হয়েছে, ধরে নিলেও তাতে কুরআন বিকৃত হয়নি। কেননা,
- তাঁরা কুরআনের কোনো আয়াত বা শব্দ পরিবর্তন করেননি, শুধু ইতিমধ্যে সংরক্ষিত সূরাগুলো কীভাবে সাজানো হবে, তা ঠিক করেছেন।
- যা তাঁরা সংরক্ষণ করেছেন, তা নবীজীর কাছ থেকে সরাসরি শেখা কুরআনই।
- সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম এই উসমানী মুসহাফ গ্রহণ করেছেন। এ বিষয়ে কোনো আপত্তি ওঠেনি। সাহাবারাই ছিলেন কুরআন সংরক্ষণের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ সাক্ষী। সুতরাং এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা শরীয়াতে অকাট্য দলিলের অন্তর্ভুক্ত।
- যাঁরা কুরআনের সূরার তারতীব ইজতিহাদী মত দেন, তাঁরাও একে মনগড়া কাজ বলেন না। বরং নবীজীর তিলাওয়াত পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করেই এই কাজ হয়েছে বলে ব্যাখ্যা করেন (যেমনটি ইমাম যারকাশী স্পষ্ট করেছেন)।
সারকথা
১. আয়াতের ক্রম সম্পূর্ণ তাওকীফী। এতে কোনো মতভেদ নেই।
২. সূরার পারস্পরিক ক্রম নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ বলেন সম্পূর্ণ তাওকীফী (ইমাম সুয়ূতী এই মতই গ্রহণ করেছেন), কেউ বলেন সাহাবাদের ইজতিহাদ, কেউ বলেন মিশ্র।
৩. যাঁরা ইজতিহাদী মত দেন, তাঁরাও একে নবীজীর শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত মনে করেন, মনগড়া বিন্যাস নয়।
৪. উসমান (রা.) নতুন কুরআন তৈরি করেননি। আগে থেকে সংরক্ষিত পাঠকে মানসম্মত মুসহাফে সংকলিত করেছেন মাত্র।
৫. সূরার ক্রমবিন্যাস নিয়ে মতভেদ থাকা আর কুরআনের শব্দ, আয়াত পরিবর্তিত হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। সূরার ক্রমবিন্যাস যদি পরিবর্তন হয়েও থাকে, তাহলেও এর দ্বারা কুরআন বিকৃত বা পরিবর্তন হয়েছে বলা যাবে না।
সুতরাং, সূরার ক্রমবিন্যাস নিয়ে মতভেদ আছে বলে কুরআন পরিবর্তিত হয়েছে, এই যুক্তি সঠিক নয়। কুরআনের নাজিলকৃত পাঠ অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। আল্লাহ তাআলা নিজেই সংরক্ষিত রাখবেন। সূরার মুসহাফী বিন্যাস নিয়ে যে ইলমী আলোচনা আছে, তা নিছক একটি ইলমী বিষয়ের গবেষণা। কুরআনের তাহরীফ বা বিকৃতির প্রমাণ নয়।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
উস্তাজ, ইদারাতুত্ তাখাসসুস ফিল উলূমিল ইসলামিয়া, আজিমপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন