গুলিস্তান বা ফুটপাতে ‘কাস্টমসে আটকে থাকা মাল’ নামে বিক্রি হওয়া পণ্য কেনার শরয়ি হুকুম
প্রশ্নঃ ১৬৮৯৩২. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, গুলিস্তান থেকে কম দামে মাল বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলাম কেন দম দামে বিক্রি করে, তখন সে বলল এই মাল এয়ারপোর্টে টেক্স না দেয়ার কারনে, আটকে রাখা মাল।এখন অন্যের মাল, সে না নেয়ার কারনে, তার কাছে কম দামে বিক্রি করে দেয়া হইসে,, এখন কি আমাদের এই মাল কিনা জায়েজ হবে?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
কাস্টমের মালামাল কেনার শরয়ি হুকুম
কাস্টমের মালামালের কয়েকটি সুরত রয়েছে।
১. জরিমানা হিসেবে বাজেয়াপ্তকৃত মাল
আইন লঙ্ঘন, নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত পণ্য আমদানি বা নিষিদ্ধ পণ্য আনার কারণে সরকার কোনো মালামাল জরিমানা হিসেবে বাজেয়াপ্ত করতে পারে। শরিয়তের দৃষ্টিতে এভাবে মালকে আর্থিক জরিমানা হিসেবে বাজেয়াপ্ত করা জায়েজ নয়। তাই এমন মাল বাজেয়াপ্ত করে নিলাম করা হচ্ছে, এ বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানা থাকলে তা কেনা বা নিলামে অংশ নেওয়া জায়েজ নয়।
২. ট্যাক্স আদায়ের জন্য নিলামকৃত মাল
কোনো আমদানিকারক বৈধভাবে মাল আমদানি করলেও নির্ধারিত ডিউটি বা ট্যাক্স পরিশোধ না করলে কাস্টমসের পক্ষ থেকে তাদের নোটিশ দেয় যে, এতদিন সময়ের মধ্যে ডিউটি পরিশোধ করে নিজেদের মালামাল নিয়ে যান, অন্যথায় সমস্ত মাল বাজেয়াপ্ত করা হবে। নির্ধারিত সময়ে মধ্যে কেউ মাল না নিলে সে মাল বাজেয়াপ্ত করা হয়। এমন মাল কেনা থেকেও বেঁচে থাকা উচিত; কারণ এই মাল বিক্রির ওপর মূল মালিক রাজি থাকে না, আর মূল মালিকের অনুমতি ছাড়া তার মাল বিক্রি করা জায়েজ নয়।
৩. ডেমারেজ আদায়ের জন্য নিলামকৃত মাল
মাল বন্দরে বা গুদামে দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে নির্ধারিত ডেমারেজ বা গুদাম ভাড়া জমতে থাকে। মালিক ডেমারেজ দিয়ে মাল গ্রহণ না করলে, কাস্টম কর্তৃপক্ষ নিজেদের প্রাপ্য ডেমারেজ আদায়ের জন্য মাল নিলাম করতে পারে। এ ধরনের মাল কেনা জায়েজ। তবে মাল বিক্রি করে ডেমারেজের চেয়ে বেশি টাকা পাওয়া গেলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে অতিরিক্ত টাকা মূল মালিকের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
৪. মালিকের স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেওয়া মাল
কখনো আমদানিকারক বেশি ডিউটি, কম লাভ, আমদানির সীমাবদ্ধতা বা অন্য কোনো কারণে মাল গ্রহণ না করে বন্দরে ফেলে রাখে। নোটিশ দেওয়ার পরও সে মাল গ্রহণ করে না। বাস্তব অবস্থা এমন হয় যে, সে স্বেচ্ছায় মাল ছেড়ে দিয়েছে বলে বোঝা যায়। মাল গ্রহণ করতে যে খরচ হবে তাতে তার লাভ হবে না। তাহলে এর হুকুম লুকতাহর মতো। কাস্টম কর্তৃপক্ষ এমন মাল নিলাম করতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জন্য তা কেনা জায়েজ। তবে প্রয়োজনীয় খরচ বা ভাড়া বাদ দিয়ে যদি অবশিষ্ট থাকে তাহলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে অবশিষ্ট টাকা মালিককে ফেরত দেওয়া জরুরি।
৫. লাওয়ারিস বা মালিকবিহীন মাল
কাস্টমে থাকা কোনো মালামালের মালিকের সন্ধান না পাওয়া গেলে এবং যথেষ্ট সময় অপেক্ষা ও অনুসন্ধানের পরও তার কোনো সন্ধান পাওয়া না গেলে, এর হুকুমও লুকতাহর মতো। তখন কাস্টম কর্তৃপক্ষ তা বিক্রি করতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জন্য তা কেনা জায়েজ। তবে বিক্রয়লব্ধ টাকা কাস্টম কর্তৃপক্ষের নিজস্ব সম্পদ হবে না; তা মালিকের জন্য আমানত হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। মালিক পরে পাওয়া গেলে তাকে টাকা দিয়ে দিতে হবে। মালিককে পাওয়া না গেলে তার পক্ষ থেকে গরিব-মিসকিনদের সদকা করে দেওয়া উচিত।
অজ্ঞতার অবস্থা
ক্রেতা যদি নিলামকৃত মালটির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত না থাকে—এটি ডেমারেজ আদায়ের জন্য বিক্রি হয়েছে, লুকতাহ হিসেবে বিক্রি হয়েছে, মালিক স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছে, কোনো পাওনা আদায়ের জন্য বিক্রি হয়েছে বা অন্য কোনো বৈধ কারণে নিলাম হয়েছে, তাহলে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে তার উপার্জনকে নাজায়েয বলা যাবে না। তবে এ ধরনের অস্পষ্ট মাল কেনা থেকে বিরত থাকা উত্তম।
কাস্টমস প্রক্রিয়ায় কখনো কখনো অনিয়ম বা জুলুমের আশঙ্কা থাকে। তাছাড়া মালটি কোন কারণে ও কীভাবে বিক্রি হচ্ছে তা নিশ্চিত না হলে মূল মালিকের সম্মতি ছাড়া বিক্রির আশঙ্কাও থেকে যায়। তাই মালের বাস্তব অবস্থা স্পষ্ট না হলে সতর্কতাস্বরূপ তা কেনা থেকে বিরত থাকাই উত্তম।
উল্লেখ্য যে, গুলিস্তান বা ফুটপাতের দোকানে কোনো বিক্রেতা যদি বলে, “এগুলো এয়ারপোর্টের কাস্টমসে আটকে থাকা মাল” বা “ট্যাক্স না দেওয়ায় বাজেয়াপ্ত হওয়া মাল”, তাহলে শুধু বিক্রেতার কথার ওপর ভিত্তি করে তা সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। কারণ কখনো কখনো ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার জন্য এ ধরনের কথা বিক্রির কৌশল হিসেবেও বলা হতে পারে। এমনকি কোথাও চোরাই বা অবৈধভাবে সংগৃহীত মালও বিক্রি হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে।
সুতরাং কোনো মাল চোরাই বা অবৈধভাবে সংগৃহীত হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেলে, অথবা মালের অবস্থা ও পরিস্থিতি দেখে প্রবলভাবে এমন ধারণা হয় যে এটি চোরাই বা অবৈধ পণ্য, তাহলে তা কেনা জায়েজ হবে না।
তথ্যসূত্র :
عن أبى هريرةَ، عن النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم، أنَّه قال: مَنِ اشتَرَى سَرِقَةً وهو يَعلَمُ أنَّها سَرِقَةٌ، فقَد شرِكَ في عارِها وِإثمِها.
السنن الكبرى للبيهقي، رقم الحديث : 10928
(قَوْلُهُ وَيَنْتَفِعُ بِهَا لَوْ فَقِيرًا وَإِلَّا تَصَدَّقَ عَلَى أَجْنَبِيٍّ وَلِأَبَوَيْهِ وَزَوْجَتِهِ وَوَلَدِهِ لَوْ فَقِيرًا) أَيْ يَنْتَفِعُ الْمُلْتَقِطُ بِاللُّقَطَةِ بِأَنْ يَتَمَلَّكَهَا بِشَرْطِ كَوْنِهِ فَقِيرًا نَظَرًا مِنْ الْجَانِبَيْنِ كَمَا جَازَ الدَّفْعُ إلَى فَقِيرٍ آخَرَ وَأَمَّا الْغَنِيُّ فَلَا يَجُوزُ لَهُ الِانْتِفَاعُ بِهَا فَإِنْ كَانَ غَيْرَ الْمُلْتَقِطِ فَظَاهِرٌ لِلْحَدِيثِ فَإِنْ لَمْ يَجِئْ صَاحِبُهَا فَلِيَتَصَدَّقْ بِهَا وَالصَّدَقَةُ إنَّمَا تَكُونُ عَلَى الْفَقِيرِ كَالصَّدَقَةِ الْمَفْرُوضَةِ وَإِنْ كَانَ الْمُلْتَقِطُ فَكَذَلِكَ ..... وَإِنَّمَا فَسَّرْنَا الِانْتِفَاعَ بِالتَّمَلُّكِ لِأَنَّهُ لَيْسَ الْمُرَادُ الِانْتِفَاعَ بِدُونِهِ كَالْإِبَاحَةِ وَلِذَا مَلَكَ بَيْعَهَا وَصَرْفَ الثَّمَنِ إلَى نَفْسِهِ كَمَا فِي الْخَانِيَّةِ أَطْلَقَ فِي عَدَمِ الِانْتِفَاعِ لِلْغَنِيِّ فَشَمِلَ الْقَرْضَ وَلِذَا قَالَ فِي فَتْحِ الْقَدِيرِ وَلَيْسَ لِلْمُلْتَقِطِ إذَا كَانَ غَنِيًّا أَنْ يَتَمَلَّكَهَا بِطَرِيقِ الْقَرْضِ إلَّا بِإِذْنِ الْإِمَامِ وَإِنْ كَانَ فَقِيرًا فَلَهُ أَنْ يَصْرِفَهَا إلَى نَفْسِهِ صَدَقَةً لَا قَرْضًا اهـ.
البحر الرائق شرح كنز الدقائق، 5/170
قُلْت: وَسَيَجِيءُ فِي الْحَجْرِ أَنَّهُ يُبَاعُ مَالُهُ لِدَيْنِهِ عِنْدَهُمَا وَبِهِ يُفْتَى وَحِينَئِذٍ فَلَا يَتَأَبَّدُ حَبْسُهُ فَتَنَبَّهْ.
(قَوْلُهُ: وَحِينَئِذٍ فَلَا يَتَأَبَّدُ حَبْسُهُ) أَيْ عَلَى قَوْلِهِمَا وَكَذَا عَلَى قَوْلِهِ إنْ كَانَ مَالُهُ غَيْرَ عَقَارٍ وَلَا عَرْضٍ بَلْ كَانَ مِنْ الْأَثْمَانِ، وَلَوْ خِلَافَ جِنْسِ الدَّيْنِ كَمَا قَدَّمْنَاهُ.
الدر المختار وحاشية ابن عابدين، 5/390
(لَا) يَبِيعُ الْقَاضِي (عَرَضَهُ وَلَا عَقَارَهُ) لِلدَّيْنِ (خِلَافًا لَهُمَا وَبِهِ) أَيْ بِقَوْلِهِمَا بِبَيْعِهِمَا لِلدَّيْنِ (يُفْتَى) اخْتِيَارٌ وَصَحَّحَهُ فِي تَصْحِيحِ الْقُدُورِيِّ، وَيَبِيعُ كُلَّ مَا لَا يَحْتَاجُهُ فِي الْحَالِ.
الدر المختار مع رد المحتار، 6/150-151
وَفِيهِ: الْحَرَامُ يَنْتَقِلُ، فَلَوْ دَخَلَ بِأَمَانٍ وَأَخَذَ مَالَ حَرْبِيٍّ بِلَا رِضَاهُ وَأَخْرَجَهُ إلَيْنَا مَلَكَهُ وَصَحَّ بَيْعُهُ، لَكِنْ لَا يَطِيبُ لَهُ وَلَا لِلْمُشْتَرِي مِنْهُ،
(قَوْلُهُ الْحَرَامُ يَنْتَقِلُ) أَيْ تَنْتَقِلُ حُرْمَتُهُ وَإِنْ تَدَاوَلَتْهُ الْأَيْدِي وَتَبَدَّلَتْ الْأَمْلَاكُ، وَيَأْتِي تَمَامُهُ قَرِيبًا (قَوْلُهُ وَلَا لِلْمُشْتَرِي مِنْهُ) فَيَكُونُ بِشِرَائِهِ مِنْهُ مُسِيئًا؛ لِأَنَّهُ مَلَكَهُ بِكَسْبٍ خَبِيثٍ، وَفِي شِرَائِهِ تَقْرِيرٌ لِلْخُبْثِ، وَيُؤْمَرُ بِمَا كَانَ يُؤْمَرُ بِهِ الْبَائِعُ مِنْ رَدِّهِ عَلَى الْحَرْبِيِّ؛ لِأَنَّ وُجُوبَ الرَّدِّ عَلَى الْبَائِعِ إنَّمَا كَانَ لِمُرَاعَاةِ مِلْكِ الْحَرْبِيِّ وَلِأَجْلِ غَدْرِ الْأَمَانِ، وَهَذَا الْمَعْنَى قَائِمٌ فِي مِلْكِ الْمُشْتَرِي.
الدر المختار وحاشية ابن عابدين، 5/98
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
উস্তাজ, ইদারাতুত্ তাখাসসুস ফিল উলূমিল ইসলামিয়া, আজিমপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন