প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ছুটে যাওয়া রোজার কাজা ও একাধিক কাফফারা আদায়ের শরয়ি বিধান
প্রশ্নঃ ১৬৮১৯১. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, একজন মেয়ে বালেগা হওয়ার পর প্রায় তিন বছর পর্যন্ত রমযানের রোজা গুলো অর্ধেক রাখতো আর অর্ধেক ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিতো কিন্তু ও সেই সময় রোযা ছেড়ে দেওয়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতো না আর অনেক রোযা ভেঙেছে হায়েযের কারনে, মুহতারামের কাছে আমার প্রশ্ন ওই মেয়ের সংশোধনের জন্য করণীয় কী?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
বালেগা (প্রাপ্তবয়স্কা) হওয়ার পর থেকে প্রতিটি রমজানের রোজা রাখা ফরজ। এই তিন বছরের ছুটে যাওয়া রোজাগুলোর ব্যাপারে ওই মেয়ের সংশোধনের জন্য করণীয় বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. হায়েজ বা মাসিকের কারণে ছুটে যাওয়া রোজা:
হায়েজ অবস্থায় রোজা রাখা শরিয়তে নিষেধ। তাই হায়েজের কারণে যে রোজাগুলো রাখতে পারেনি বা ভেঙে ফেলতে হয়েছে, সেগুলোর জন্য কোনো গুনাহ হয়নি এবং কোনো কাফফারাও দিতে হবে না। তবে হায়েজের কারণে যতগুলো রোজা ছুটে গেছে, পরবর্তীতে সেগুলোর ‘কাজা’ আদায় করতে হবে (অর্থাৎ, একটির বদলে একটি রোজা রাখতে হবে)।
২. ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেওয়া রোজা (যা শুরুই করেনি):
যে রোজাগুলো সে ইচ্ছাকৃতভাবে রাখেনি, অর্থাৎ রোজার নিয়ত করেনি বা রোজা শুরুই করেনি, সেগুলোর জন্যও শুধু ‘কাজা’ আদায় করতে হবে। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, রোজা শুরু না করে ছেড়ে দিলে শুধু কাজা ওয়াজিব হয়, এর জন্য কোনো ‘কাফফারা’ (টানা ৬০টি রোজা) ওয়াজিব হয় না।
৩. রোজা রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে ফেলা:
যদি এমনটি হয়ে থাকে যে, সে কোনো দিন রোজার নিয়ত করে রোজা শুরু করেছিল, কিন্তু পরে হায়েজ বা গুরুতর অসুস্থতা ছাড়াই ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করে রোজা ভেঙে ফেলেছে, তবে সেই রোজার জন্য কাজার পাশাপাশি ‘কাফফারা’ আদায় করতে হবে। কাফফারা হলো একটি রোজার বদলে টানা ৬০ দিন রোজা রাখা। (তবে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, একাধিক রমজানের বা একই রমজানের একাধিক রোজা ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙার পর যদি আগে কোনো কাফফারা আদায় না করে থাকে, তবে সবগুলো ভাঙা রোজার জন্য একটি কাফফারাই যথেষ্ট হবে)।
একাধিক রোজা ভাঙার ক্ষেত্রে কাফফারার বিস্তারিত হুকুম:
রমজানুল মোবারকের রোজা—যার নিয়ত সুবহে সাদেকের আগেই করা হয়েছিল—তা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার বা স্ত্রী-সহবাসের মাধ্যমে ভেঙে ফেলা হয়, তবে তার ওপর কাফফারা ওয়াজিব হয়। এই রোজা ভাঙার ঘটনা যদি কোনো ব্যক্তির দ্বারা একাধিকবার ঘটে, তবে তার বিস্তারিত ফিকহি বিধান হলো:
১. পানাহারের মাধ্যমে একাধিক রোজা ভাঙলে:
যদি একের অধিক রোজায় পানাহারের মাধ্যমে একাধিক কাফফারা ওয়াজিব হয়—চাই তা একই রমজানের একাধিক রোজা হোক অথবা একাধিক বছরের ভিন্ন ভিন্ন রমজানের রোজা হোক—তবে সবগুলোর জন্য একটি কাফফারা আদায় করাই যথেষ্ট হবে।
শর্ত: পূর্বের কোনো রোজার কাফফারা ইতিমধ্যে আদায় করা না হয়ে থাকতে হবে।
উদাহরণ: যদি ২০২০ সালের রমজানে পানাহারের মাধ্যমে এক বা একাধিক রোজা ভেঙে থাকে এবং ২০২১ সালের রমজানেও একইভাবে রোজা ভেঙে থাকে, আর আগেরটির কাফফারা আদায় করা না হয়ে থাকে, তবে এখন একটি কাফফারা আদায় করলেই সবগুলোর কাফফারা আদায় হয়ে যাবে। তবে ২০২০ সালের কাফফারা আগেই আদায় করা হয়ে থাকলে, ২০২১ সালের জন্য নতুন করে কাফফারা দিতে হবে।
২. সহবাসের মাধ্যমে একাধিক রোজা ভাঙলে:
একের অধিক রোজায় সহবাস করার কারণে কাফফারা ওয়াজিব হলে এর বিধান দুটি:
একই রমজানে হলে: যদি একই বছরের রমজানে সহবাসের কারণে এক বা একাধিক রোজা ভেঙে থাকে, তবে সবগুলোর জন্য একটি কাফফারাই যথেষ্ট হবে (শর্ত হলো, মাঝে কোনো কাফফারা আদায় করা হয়নি)।
ভিন্ন ভিন্ন রমজানে হলে: যদি আলাদা আলাদা বছরের রমজানে সহবাসের মাধ্যমে রোজা ভেঙে থাকে, তবে প্রত্যেক বছরের জন্য আলাদা আলাদা কাফফারা আদায় করতে হবে। এক্ষেত্রে আগের কাফফারা আদায় করা না হয়ে থাকলেও একটি কাফফারা উভয় বছরের জন্য যথেষ্ট হবে না।
উদাহরণ: যদি ২০২০ সালের রমজানে সহবাসের মাধ্যমে রোজা ভেঙে থাকে এবং ২০২১ সালের রমজানেও একইভাবে রোজা ভেঙে থাকে, তবে ২০২০ সালের জন্য একটি এবং ২০২১ সালের জন্য আরেকটি পৃথক কাফফারা আদায় করতে হবে।
সারকথা:
ওই মেয়ের করণীয় হলো,
প্রথমত এই গুনাহ থেকে তাওবা করা। আল্লাহর কাছে কায়মানুবাক্যে ক্ষমা প্রার্থণা করা। পেছনের ছুটে যাওয়া সকল রোজার কাজা করা। সামনে এমন কাজ না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা।
আর তার কাফফারা আদায় করতে হবে কি না তা নির্ভর করছে, সে যদি ইচ্ছাকৃত পানাহারের মাধ্যমে এক বা একাধিক রোজা ভেঙে থাকে—তা একই রমজানের হোক অথবা ভিন্ন ভিন্ন বছরের রমজানের হোক—তবে সবগুলোর জন্য তার ওপর একটিমাত্র কাফফারাই ওয়াজিব হবে। তবে যদি সহবাসের মাধ্যমে (যদি বিষয়টি ঘটে থাকে) একাধিক ভিন্ন ভিন্ন রমজানে রোজা ভাঙার ঘটনা ঘটে থাকে, তবে তাকে প্রত্যেক বছরের জন্য পৃথক পৃথক কাফফারা আদায় করতে হবে।
কাফফারা আদায় করার পদ্ধতি :
কাফফারা হলো একটি রোজার পরিবর্তে ৬০টি রোজা রাখা। এই ৬০টি রোজা বিরামহীনভাবে রাখতে হবে। তবে একেবারেই রোজা রাখার সামর্থ্য না থাকলে রোজার কাফফারার আরেকটি বিকল্প আছে, তা হলো, ৬০টি রোজার পরিবর্তে ৬০ জন গরিব (যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত) মানুষকে দুবেলা খাওয়ানো। এ ছাড়া দাসমুক্তিও একটি মাধ্যম। ফকিহরা বলেন, বর্তমানে যেহেতু দাসদাসী বা গোলামের প্রচলন নেই, সুতরাং এ মাধ্যমটির সুযোগ আর বাকি নেই।
উল্লেখ্য, রমযানের রোযার কাফফারা আদায়ের ক্ষেত্রে দুই মাস লাগাতার রোযা রাখার মাঝে যদি কোনো মহিলার ঋতুস্রাব শুরু হয়, তাহলে তাকে নতুন করে আবার দুই মাস রোযা রাখতে হবে না; বরং সেক্ষেত্রে পবিত্র হওয়ার পর থেকেই কোনো দিন বাদ না দিয়ে বাকি রোযাগুলো পুরা করে নিলে উক্ত কাফফারা আদায় হয়ে যাবে।
দলীলসমূহ :
আয়াত :
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الصِّیَامُ کَمَا کُتِبَ عَلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ ۙ
অর্থঃ হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি ফরয করা হয়েছিল, যাতে তোমাদের মধ্যে তাকওয়া সৃষ্টি হয়। সূরাঃ আল বাকারা - আয়াত নংঃ 183
হাদিস :
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلٌ فَقَالَ: هَلَكْتُ، قَالَ: «وَمَا أَهْلَكَكَ؟» قَالَ: وَقَعْتُ عَلَى امْرَأَتِي فِي رَمَضَانَ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَعْتِقْ رَقَبَةً» قَالَ: لَا أَجِدُ، قَالَ: «صُمْ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ» قَالَ: لَا أُطِيقُ، قَالَ: «أَطْعِمْ سِتِّينَ مِسْكِينًا»
অনুবাদ- হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাঃ এর কাছে এক ব্যক্তি এসে বলল, আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। রাসূল সাঃ জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাকে কে ধ্বংস করেছে? সাহাবী বললেন, রমজানে আমি আমার স্ত্রীর সাথে সহবাস করে ফেলেছি। রাসূল সাঃ তাকে বললেন, তাহলে এর বদলে একটি গোলাম আযাদ কর। সাহাবী বললেন, আমি এতে সক্ষম নই। নবীজী সাঃ বললেন, তাহলে লাগাতার দুই মাস রোযা রাখ। সাহাবী বললেন, আমি এতেও সক্ষম নই। তখন রাসূল সাঃ বললেন, তাহলে তুমি ৬০ জন মিসকিনকে খানা খাওয়াও। {সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৬৭১, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৬৯৪৪, মুসনাদুল বাজ্জার, হাদীস নং-১১০৭, সহীহ ইবনে খুজাইমা, হাদীস নং-১৯৪৯, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৩৫২৭}
(بدائع الصنائع في ترتيب الشرائع، کتاب الصوم فصل حکم فساد الصوم ج نمبر ۲ ص نمبر ۱۰۱،دار الکتب العلمیہ)
«ولو جامع في رمضان متعمدًا مرارًا بأن جامع في يوم ثم جامع في اليوم الثاني ثم في الثالث ولم يكفر فعليه لجميع ذلك كله كفارة واحدة عندنا، وعند الشافعي عليه لكل يوم كفارة، ولو جامع في يوم ثم كفر ثم جامع في يوم آخر فعليه كفارة أخرى في ظاهر الرواية، وروى زفر عن أبي حنيفة أنه ليس عليه كفارة أخرى، ولو جامع في رمضانين ولم يكفر للأول فعليه لكل جماع كفارة في ظاهر الرواية.»
(فتاوی شامی، کتاب الصوم باب ما یفسد الصوم و ما لا یفسدہ ج نمبر ۲ ص نمبر ۴۱۲،ایچ ایم سعید)
«ولو تكرر فطره ولم يكفر للأول يكفيه واحدة ولو في رمضانين عند محمد وعليه الاعتماد بزازية ومجتبى وغيرهما واختار بعضهم للفتوى أن الفطر بغير الجماع تداخل وإلا لا»
(قوله: ولم يكفر للأول) أما لو كفر فعليه أخرى في ظاهر الرواية للعلم بأن الزجر لم يحصل بالأولى بحر (قوله: وعليه الاعتماد) نقله في البحر عن الأسرار ونقل قبله عن الجوهرة لو جامع في رمضانين فعليه كفارتان وإن لم يكفر للأولى في ظاهر الرواية وهو الصحيح. اهـ.
قلت: فقد اختلف الترجيح كما ترى ويتقوى الثاني بأنه ظاهر الرواية (قوله: إن الفطر) إن شرطية ح (قوله: وإلا لا) أي وإن كان الفطر المتكرر في يومين بجماع لا تتداخل الكفارة، وإن لم يكفر للأول لعظم الجناية ولذا أوجب الشافعي الكفارة به دون الأكل والشرب.
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা ৷
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন