স্বামীর অবাধ্যতার ভয়াবহতা ও দাম্পত্য জীবনে করণীয়
প্রশ্নঃ ১৬৬০৯৪. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, জামাইর কথা না শুনলে কি হয়?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
ইসলামে স্ত্রীকে স্বামীর বৈধ ও শরীয়তসম্মত আদেশ ও কথা মানা কে ওয়াজিব করা হয়েছে। স্বামী কোনো বৈধ বিষয়ে স্ত্রীকে নির্দেশ দিলে তা অমান্য করা স্ত্রীর জন্য জায়েয নয়। স্বামীর হক ও তার আনুগত্যের গুরুত্ব বোঝাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ একাধিক হাদীসে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,
لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ، لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا
“আমি যদি কাউকে অন্য কারও জন্য সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে তার স্বামীকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম।” (জামে‘ তিরমিযী, ১১৫৯)
এই হাদীস দ্বারা স্বামীর মর্যাদা ও স্ত্রীর ওপর তার অধিকারের অত্যন্ত গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে। অবশ্য ইসলামে আল্লাহ ছাড়া কাউকে সিজদা করা জায়েয নয়।
- স্বামীর অবাধ্যতার ভয়াবহতা
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বামীর বৈধ দাম্পত্য অধিকার আদায় করা। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ কঠোর সতর্কতা দিয়েছেন,
إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَأَبَتْ، فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا، لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ
“কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বিছানায় আহ্বান করলে সে অস্বীকার করে এবং স্বামী তার ওপর অসন্তুষ্ট অবস্থায় রাত কাটালে, ফেরেশতাগণ সকাল পর্যন্ত তার ওপর লানত করতে থাকেন।” (সহীহ বুখারী, ৫১৯৩)
অতএব, কোনো শরয়ি ওযর ছাড়া স্বামীর বৈধ অধিকার অস্বীকার করা অত্যন্ত ভয়াবহ বিষয়। স্ত্রীর উচিত স্বামীর অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও ইরশাদ করেছেন,
وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَا تُؤَدِّي الْمَرْأَةُ حَقَّ رَبِّهَا حَتَّى تُؤَدِّيَ حَقَّ زَوْجِهَا
“যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, তাঁর কসম! কোনো নারী তার রবের হক পূর্ণভাবে আদায় করতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার স্বামীর হক আদায় করে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, ১৮৫৩)
এ হাদীস থেকে স্বামীর হক আদায়ের গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
- স্বামীর সন্তুষ্টির গুরুত্ব
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,
أَيُّمَا امْرَأَةٍ مَاتَتْ، وَزَوْجُهَا عَنْهَا رَاضٍ، دَخَلَتِ الْجَنَّةَ
“যে নারী এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল যে তার স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (জামে‘ তিরমিযী, ১১৬১)
অন্যদিকে, নেককার স্ত্রীর গুণ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
الَّتِي تَسُرُّهُ إِذَا نَظَرَ، وَتُطِيعُهُ إِذَا أَمَرَ، وَلَا تُخَالِفُهُ فِي نَفْسِهَا وَلَا مَالِهَا بِمَا يَكْرَهُ
“উত্তম স্ত্রী সে, যখন স্বামী তার দিকে তাকায় তখন সে তাকে আনন্দ দেয় , সে কোনো বৈধ নির্দেশ দিলে স্ত্রী তার আনুগত্য করে এবং স্বামী যা অপছন্দ করেন, সে বিষয়ে নিজের ব্যাপারে ও তার সম্পদের ব্যাপারে তার বিরোধিতা করে না।” (সুনানে নাসাঈ, ৩২৩১)
- তবে আনুগত্যেরও সীমা আছে
মনে রাখতে হবে, স্বামীর আনুগত্য কেবল বৈধ ও শরীয়তসম্মত বিষয়ে। স্বামী যদি কোনো হারাম বা শরীয়তবিরোধী কাজের নির্দেশ দেন, তাহলে তা মানা যাবে না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لَا طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةٍ، إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ
“গুনাহের কাজে কোনো আনুগত্য নেই; আনুগত্য তো কেবল সৎ ও বৈধ কাজে।” (সহীহ বুখারী, ৭২৫৭)
- স্বামীর উপরও দায়িত্ব রয়েছে
ইসলাম শুধু স্ত্রীকে স্বামীর আনুগত্যের নির্দেশ দেয়নি; বরং স্বামীকেও স্ত্রীর সঙ্গে উত্তম আচরণ ও তার অধিকার আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম; আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।” (জামে‘ তিরমিযী, ৩৮৯৫)
সুতরাং, স্বামী স্ত্রীকে জুলুম করবেন না, তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন না এবং তার সঙ্গে কোমল ও সুন্দর আচরণ করবেন।
শরীয়তসম্মত কোনো বিষয় হলেও তা যদি স্ত্রীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে বা তার জন্য কষ্টকর হয়, তাহলে স্বামীর উচিত একতরফাভাবে চাপিয়ে না দিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্মতির মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করা। দাম্পত্য জীবনে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি ও পরামর্শের মাধ্যমে চলাই উত্তম।
সুতরাং স্বামীর দায়িত্ব হলো স্ত্রীকে সম্মান করা, তার ভরণ-পোষণ ও প্রয়োজনীয় অধিকার আদায় করা, তার সঙ্গে কোমল ও সুন্দর আচরণ করা এবং কোনো ধরনের জুলুম-অত্যাচার না করা। স্ত্রী যেমন স্বামীর বৈধ কথা মানবে, তেমনি স্বামীও স্ত্রীর শরয়ি অধিকার আদায়ে অবহেলা করতে পারবে না।
অতএব, দাম্পত্য জীবনে শুধু স্ত্রীর ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং স্বামী-স্ত্রী উভয়েই আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে একে অপরের হক আদায় করবে এটাই ইসলামের শিক্ষা।
- স্ত্রীর জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ
- স্বামীর বৈধ কথা অযথা অমান্য করা থেকে বেঁচে থাকুন।
- রাগ, অভিমান বা পারিবারিক সমস্যার কারণে স্বামীর বৈধ অধিকার নষ্ট করবেন না।
- স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার সম্মান, সম্পদ ও পরিবারের আমানত রক্ষা করুন।
- স্বামী কোনো হারাম কাজের নির্দেশ দিলে তা মানা যাবে না; তবে তা প্রত্যাখ্যান করার সময়ও শালীনতা ও উত্তম আচরণ বজায় রাখুন।
- স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমস্যা হলে একে অপরকে অপমান না করে আলোচনা ও মীমাংসার চেষ্টা করুন।
- স্বামীর জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ
- স্ত্রীর ওপর অযথা কোনো বিষয় চাপিয়ে দেবেন না; প্রয়োজন হলে পরামর্শ করুন।
- স্ত্রীর ন্যায্য অধিকার যথাযথভাবে আদায় করুন।
- স্ত্রীর ভুল হলে রাগ না করে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলুন।
- স্ত্রীকে তার মা-বাবা ও মাহরাম আত্মীয়দের সঙ্গে শরীয়তসম্মত সম্পর্ক বজায় রাখতে দিন।
- দাম্পত্য সমস্যায় জুলুম বা অপমান নয়; ধৈর্য, ভালোবাসা ও পরামর্শের মাধ্যমে সমাধান করুন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, দারুল কুরআন আল ইসলামিয়া মাদ্রাসা
মুহাম্মদপুর, ঢাকা
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন