দুরাচারী স্ত্রীর সাথে সংসার করার ফজিলত
প্রশ্নঃ ১৫১৫২৮. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, স্ত্রীর তুচ্ছ বিষয় নিয়ে রাগারাগি, বাড়াবাড়ি, ভুল বোঝাবুঝি, সন্দেহ করা এবং শাশুড়ি, ননদ, দেবর এর সাথে সৌজন্যমূলক সম্পর্ক না রাখা এমন স্ত্রীর সাথে আল্লাহর রাজি খুশি ও সন্তুষ্টির নিয়তে সংসার জীবন অতিবাহিত করার ফজিলত কুরআন হাদিসের আলোকে বিস্তারিত জানানোর অনুরোধ করছি।
১০ মে, ২০২৬
বেগমগঞ্জ
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
ইসলামী শিষ্টাচারে কারো ওপর জুলুম করা জায়েজ নাই। আবার জুলুমের প্রতিবাদেও জুলুম করা জায়েজ নাই। প্রসিদ্ধ হাদিস হলো,
لا ضرر ولا ضرار
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসিনে কেরাম বলেন,
لا ضرر: لا يجوز أن يضر الإنسان أخاه، أو يلحق ضرراً بنفسه أو بغيره، وهو فعل الواحد.لا ضرار: لا يجوز مقابلة الضرر بضرر، أو تعمد إلحاق الضرر بالآخرين.
মানুষের জন্য নিজের ভাইয়ের ক্ষতি করা বৈধ নয়, কিংবা নিজের বা অন্যের কোনো ক্ষতি করাও জায়েজ নয়। এটি মূলত এককভাবে কারো ক্ষতি করার কাজকে বোঝায়।লা দিরার (لا ضرار): ক্ষতির বিনিময়ে পাল্টা ক্ষতি করা বৈধ নয়, কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যদের ক্ষতির সম্মুখীন করাও জায়েজ নয়।
কাজেই যথাসম্ভব চেষ্টা করতে হবে নিজে যেভাবে জুলুম করবে না, তেমনিভাবে অন্যের জুলুমের শিকারও যেন না হতে হয় সেব্যাপারেও স্বচেষ্ট থাকতে হবে।
স্বামী স্ত্রীর পরস্পর যদি জুলুম করে কিংবা কেউ একজন জুলুম করে তাহলে অপর পক্ষের উচিত পরস্পরের ইসলাহের ফিকির করা। কেননা ইসলাহ করা অনেক বড় সাওয়াবের কাজ। কুরআন সুন্নাহে এর ব্যাপারে অনেক উৎসাহিত করা হয়েছে। তাই প্রথম কাজ হলো, তাদের মাঝে ইসলাহের ফিকির করা।
যদি কোনোভাবেই ইসলাহ সম্ভব না হয় এবং আশা করা যায় আপতত সবর করলে ভবিষ্যতে সে ইসলাহ হবে তাহলে সেই চেষ্টা করা উচিত। এক বর্ণনায় পাওয়া যায় -
"وَقَالَ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم أَيّمَا رجل صَبر على سوء خلق امْرَأَته أعطَاهُ الله الْأجر مثل مَا أعْطى أَيُّوب عَلَيْهِ السَّلَام على بلائه وَأَيّمَا امْرَأَة صبرت على سوء خلق زَوجهَا أَعْطَاهَا الله من الْأجر مثل مَا أعْطى آسِيَة بنت مُزَاحم امْرَأَة فِرْعَوْن
অর্থ: নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেন: যে পুরুষ তার স্ত্রীর মন্দ বা কটু আচরণের ওপর ধৈর্য ধারণ করবে, আল্লাহ তাকে (হযরত) আইয়ুব (আ.)-এর বিপদে ধৈর্য ধরার সমপরিমাণ সওয়াব দান করবেন। আর যে নারী তার স্বামীর কটু আচরণের ওপর ধৈর্য ধারণ করবে, আল্লাহ তাকে ফেরাউনের স্ত্রী আছিয়া বিনতে মুজাহিমের সমপরিমাণ সওয়াব দান করবেন।
এই বর্ণনার মূল কথা হলো—স্বামী ও স্ত্রী প্রত্যেকের উচিত একে অপরের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া এবং নিজের পাওনা বা অধিকারের দাবিতে ছাড় দেওয়ার (ক্ষমা ও ধৈর্য ধরার) মানসিকতা রাখা।
সনদের বিচারে হাদিসটি যদিও দুর্বল কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হিসেবে এর মর্মার্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের দেওয়া কষ্টের ওপর ধৈর্য ধারণ করা ঈমানের দৃঢ়তার অন্যতম লক্ষণ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
: وَلَمَنْ صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ[الشورى:43]
وقال تعالى: وَلَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّابِرِينَ[النحل:126]
وقال تعالى: وَاصْبِرْ عَلَى مَا يَقُولُونَ وَاهْجُرْهُمْ هَجْراً جَمِيلاً[المزمل:10].
"অবশ্যই যে ধৈর্য ধারণ করে এবং ক্ষমা করে, তা নিশ্চয়ই দৃঢ় সংকল্পের কাজ।" (সূরা শুরা: ৪৩)
তিনি আরও বলেছেন: "আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, তবে ধৈর্যশীলদের জন্য সেটিই উত্তম।"(সূরা নাহল: ১২৬)]।
আল্লাহ আরও বলেন: "লোকেরা যা বলে তাতে আপনি ধৈর্য ধারণ করুন এবং সুন্দরভাবে তাদের এড়িয়ে চলুন।" (সূরা মুজাম্মিল: ১০)।
সুনানে তিরমিযীতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন:
الْمُسْلِمُ إِذَا كَانَ مُخَالِطًا للنَّاسَ وَيَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ، خَيْرٌ مِنَ الْمُسْلمِ الَّذِي لاَ يُخَالِطُّ النَّاسَ، وَلا يَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ
"যে মুসলিম মানুষের সাথে মেলামেশা করে এবং তাদের পক্ষ থেকে দেওয়া কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে, সে ওই মুসলিমের চেয়ে উত্তম যে মানুষের সাথে মেলামেশা করে না এবং তাদের কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে না।"
সুনানে ইবনে মাজাহ-তে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন:
مَنْ كَظَمَ غَيْظَهُ وَهُوَ يَقْدِر عَلَى أَنْ يَنْتَصِرْ دَعَاهُ الله تَبَارَكَ وَتَعَالَى عَلَى رُؤوسِ الْخَلاَئِقِ حَتّى يُخْيّرَهُ فِي حُورِ الْعِينِ أَيَتُهنَّ شَاءَ
"যে ব্যক্তি নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে অথচ সে তা কার্যকর করার (প্রতিশোধ নেওয়ার) ক্ষমতা রাখে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাকে সমস্ত সৃষ্টির সামনে ডেকে আনবেন এবং জান্নাতের হুরদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা বেছে নেওয়ার অধিকার দেবেন।"
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন:
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ [آل عمران:134 .
জান্নাত তাদের জন্য) যারা রাগ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আর আল্লাহ মুহসিনিনদের (সদাচারী) ভালোবাসেন।"
অতএব, সম্মানিত দ্বীনি ভাই!
আমরা আপনাকে পরামর্শ দেব স্ত্রীর দুরাচরণ যদি মেনে নেওয়ার মত হয় এবং তাতে ধৈর্য করা যায় তাহলে আপনি আরও বেশি ধৈর্য ধারণ করুন এবং ক্ষমা ও উদারতার নীতি অবলম্বনের করুন।
তবে নিজের ওপর থেকে জুলুম দূর করার জন্য অভিজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া অথবা অনন্যোপায় হলে আদালতের শরণাপন্ন হওয়াও নিষেধ নয়।
উল্লেখ্য এতোক্ষণে আমরা যদিও কষ্ট সহ্য করা এবং ধৈর্যে ধারণের ফজিলত বর্ণনা করেছি। কিন্তু সেটা কিছুতেই শরীয়ত পরিপন্থি কাজে নয়। কাজেই যদি স্ত্রী শরীয়াহ পরিপন্থি কোনো কাজ করে অধবা পরকিয়া কিংবা জিনার মতো কবিরাহ গুনাহে লিপ্ত হয় তাহলে কোনো অবস্থাতেই তার সাথে নম্রতার আচরণ করা বৈধ নয়। বরং সেটাকে হিকমতের সাথে শক্তহস্তে রোধ করে তাকে খাঁটি দিলে আল্লাহ তায়ালার কাছে তাওবাহ করাতে হবে।
کتاب الکبائر للذھبی: (ص: 179، ط: دار الباز)
وَقد رُوِيَ أَن رجلاً جَاءَ إِلَى عمر رَضِي الله عَنهُ يشكو خلق زَوجته فَوقف على بَاب عمر ينْتَظر خُرُوجه فَسمع امْرَأَة عمر تستطيل عَلَيْهِ بلسانها وتخاصمه وَعمر سَاكِت لَا يرد عَلَيْهَا فَانْصَرف الرجل رَاجعا وَقَالَ إِن كَانَ هَذَا حَال عمر مَعَ شدته وصلابته وَهُوَ أَمِير الْمُؤمنِينَ فَكيف حَالي فَخرج عمر فَرَآهُ مولياً عَن بَابه فناداه وَقَالَ مَا حَاجَتك يَا رجل فَقَالَ يَا أَمِير الْمُؤمنِينَ جِئْت أَشْكُو إِلَيْك سوء خلق امْرَأَتي واستطالتها عَليّ فَسمِعت زَوجتك كَذَلِك فَرَجَعت وَقلت إِذا كَانَ حَال أَمِير الْمُؤمنِينَ مَعَ زَوجته فَكيف حَالي فَقَالَ عمر يَا أخي إِنِّي احتملتها لحقوق لَهَا عَليّ إِنَّهَا طباخة لطعامي خبازة لخبزي غسالة لثيابي مُرْضِعَة لوَلَدي وَلَيْسَ ذَلِك كُله بِوَاجِب عَلَيْهَا ويسكن قلبِي بهَا عَن الْحَرَام فَأَنا أحتملها لذَلِك فَقَالَ الرجل يَا أَمِير الْمُؤمنِينَ وَكَذَلِكَ زَوْجَتي قَالَ عمر فاحتملها يَا أخي فَإِنَّمَا هِيَ مُدَّة يسيرَة.
আল্লাহ তায়ালা সবাইকে দ্বীন ও শরীয়তের হক আদায় করে জীবনযাপন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
https://alikhlasonline.com/detail.aspx?id=8469.
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
সাইদুজ্জামান কাসেমি
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১