খোলা তালাক
প্রশ্নঃ ১৪৮০৯৪. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, নারীরা যে খোলা তালাক নেয় এটা কি শরীয়তে জায়েজ আছে? থাকলে এর শরীয়ত সম্মত পদ্ধতি কী? বিস্তারিত জানতে চাই।
৭ এপ্রিল, ২০২৬
নোয়াখালী
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
মুহতারাম! ইসলাম কখনোই সংসার ভাঙ্গার পক্ষে নয়। স্বামী স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারলে শয়তান সবচে’ বেশি খুশি হয়। তাই সামান্য রাগারাগিতে ডিভোর্সের মত কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়া কখনোই সমীচিন নয়। পারিবারিকভাবে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করা উচিত।
স্ত্রী কর্তৃক অপ্রয়োজনীয় তালাক চাওয়ার বিষয়ে হাদীসে কঠিন নিষেধাজ্ঞা এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
أيما امرأة سألت زوجها طلاقا فى غير ما بأس فحرام عليها رائحة الجنة
যে মহিলা অহেতুক স্বামীর কাছে তালাক চায় তার জন্য জান্নাতের সুঘ্রাণ হারাম হয়ে যায়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২২২৬, সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং ১১৮৭)
হ্যাঁ, যদি স্বামী ভাল হবার কোন সম্ভাবনাই না থাকে, স্ত্রীর উপর মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন করতে থাকে, তাহলে পারিবারিক বা সামাজিকভাবে চাপ সৃষ্টি করে তালাক নেওয়া অথবা খোলা করা জায়েয আছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِنِ امْرَأَةٌ خَافَتْ مِن بَعْلِهَا نُشُوزًا أَوْ إِعْرَاضًا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَن يُصْلِحَا بَيْنَهُمَا صُلْحًا ۚ وَالصُّلْحُ خَيْرٌ ۗ وَأُحْضِرَتِ الْأَنفُسُ الشُّحَّ ۚ وَإِن تُحْسِنُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا [٤:١٢٨]
কোনও নারী যদি তার স্বামীর পক্ষ হতে দুর্ব্যবহার বা উপেক্ষার আশঙ্কা করে, তবে তাদের জন্য এতে কোন অসুবিধা নেই যে, তারা পারস্পরিক সম্মতিক্রমে কোনও রকমের আপোস-নিষ্পত্তি করবে। আর আপোস-নিষ্পত্তিই উত্তম। মানুষের অন্তরে (কিছু না কিছু) লালসার প্রবণতা তো নিহিত রাখাই হয়েছে। তোমরা যদি ইহসান ও তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে তোমরা যা-কিছুই করবে, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত আছেন। [সূরা নিসা-১২৮]
অন্যত্র ইরশাদ করেন,
ؕ وَلَا یَحِلُّ لَکُمۡ اَنۡ تَاۡخُذُوۡا مِمَّاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ شَیۡئًا إِلَّا أَن يَخَافَا أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا افْتَدَتْ بِهِ ۗ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا ۚ وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ [٢:٢٢٩]
তোমাদের জন্য বৈধ নয় যে, তোমরা নারীদেরকে দেওয়া কিছু ফিরিয়ে নেবে; তবে উভয়ে যদি আশঙ্কা বোধ করে যে, তারা (বিবাহ বহাল রাখা অবস্থায়) আল্লাহর স্থিরীকৃত সীমা কায়েম রাখতে সক্ষম হবে না, তবে ভিন্ন কথা। সুতরাং তোমরা যদি আশংকা কর, তারা আল্লাহর সীমা প্রতিষ্ঠিত রাখতে পারবে না, তবে তাদের জন্য এতে কোনও গুনাহ নেই যে, স্ত্রী মুক্তিপণ দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবে। এটা আল্লাহর স্থিরীকৃত সীমা। সুতরাং তোমরা এসব লংঘন করো না। যারা আল্লাহর সীমা অতিক্রম করে তারা বড়ই জালিম। [সূরা বাকারা-২২৯]
হাদীসে এসেছে,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ امْرَأَةَ ثَابِتِ بْنِ قَيْسٍ أَتَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، ثَابِتُ بْنُ قَيْسٍ، مَا أَعْتِبُ عَلَيْهِ فِي خُلُقٍ وَلاَ دِينٍ، وَلَكِنِّي أَكْرَهُ الكُفْرَ فِي الإِسْلاَمِ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَتَرُدِّينَ عَلَيْهِ حَدِيقَتَهُ؟» قَالَتْ: نَعَمْ، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اقْبَلِ الحَدِيقَةَ وَطَلِّقْهَا تَطْلِيقَةً»
ইবনে ‘আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, সাবিত ইবনে কায়স এর স্ত্রী নবী (ﷺ) -এর কাছে এসে বললঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ! চারিত্রিক বা ধর্মীয় বিষয়ে সাবিত ইবনে কায়সের উপর আমি কোন দোষারোপ করছি না। তবে আমি ইসলামে থেকে কুফরী করা (অর্থাৎ স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞতা) পছন্দ করছি না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তুমি কি তার বাগানটি ফিরিয়ে দেবে? মহিলা উত্তর দিলঃ হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তুমি বাগানটি নিয়ে তাকে (মহিলাকে) তালাক দিয়ে দাও। (সহীহ বুখারী, হাদিস নংঃ ৫২৭৩)
হাদিসের লিংকঃ https://muslimbangla.com/hadith/4894
খোলার বিধান ও মাসআলা
১. খুলা সম্পন্ন হওয়ার শর্ত
খুলা শুদ্ধ হওয়ার জন্য স্বামীর সম্মতি জরুরি। স্বামী খুলার প্রস্তাবে সম্মতি দিলে নারীর ওপর একটি বায়েন তালাক পতিত হয়। মূল বিষয় হলো, স্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রস্তাব আর স্বামীর পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করা। এটা বিভিন্ন শব্দেই হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ স্ত্রী স্বামীকে বলল, আমি আপনাকে ২ লাখ টাকার বিনিময়ে খোলার প্রস্তাব দিচ্ছি। উত্তরে স্বামী বলল, আমি রাজী।
ব্যাস খোলা সম্পন্ন হয়ে গেল এবং স্ত্রীর উপর একটি বায়েন তালাক পতিত হল।
এক্ষেত্রে লক্ষনীয় হলো, যদি স্বামীর পক্ষ থেকে অন্যায় বা নির্যাতন হয়ে থাকে, তাহলে খুলার বিনিময়ে কোনো অর্থ গ্রহণ করা স্বামীর জন্য মাকরূহ, কম হোক বা বেশি হোক।
আর যদি দোষ স্ত্রীর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে, তাহলে স্বামীর উচিত মহর হিসেবে যতটুকু দিয়েছিল, শুধু সেটুকুই গ্রহণ করা; এর বেশি নেওয়া মাকরূহ।
তবে এতদসত্ত্বেও যদি উভয়ের সম্মতিতে আরো বেশি পরিমাণ নির্ধারিত হয়ে যায়, তাহলে সেই নির্ধারিত পরিমাণই পরিশোধ করতে হবে।
৩. খোলা তালাকের পর ইদ্দতকালীন বিধান
এসময় নারীদের জন্য অযথা ঘর থেকে বের হওয়া, ভ্রমণ করা বা আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়া জায়েজ নয়। সাজসজ্জা করা, সুগন্ধি ব্যবহার, মেহেদি, সুরমা ইত্যাদি ব্যবহার করাও নিষিদ্ধ। বিয়ে বা বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করা জায়েজ নয়।
তবে যদি মাথাব্যথা হয় বা মাথায় উকুন দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসার প্রয়োজনে মাথায় তেল ব্যবহার করার অনুমতি রয়েছে।
এছাড়া ইদ্দত অবস্থায় নারীর জন্য ঘরের কোনো নির্দিষ্ট কক্ষে আবদ্ধ থাকা জরুরি নয়; বরং তিনি পুরো ঘরের ভেতরে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবেন। ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে থেকে খোলা আকাশের নিচেও যেতে পারবেন। প্রয়োজন হলে চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের কাছেও যেতে পারবেন এবং ঘরের দৈনন্দিন কাজকর্মও করতে পারবেন।
তবে ইদ্দতকালীন সময়ে কোনো নারীর জন্য অন্য কোথাও বিয়ে করা বৈধ নয়। একইভাবে, কোনো পুরুষের পক্ষ থেকেও তাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া জায়েজ নয়।
وفي بدائع الصنائع :
"وأما ركنه فهو الايجاب والقبول لانه عقد على الطلاق بعوض فلا تقع الفرقة ولا يستحق العوض بدون القبول".
(4/ 430، ط:رشيدية)
وفي الدر المختار:
"(وهي في) حق (حرة) ولو كتابية تحت مسلم (تحيض لطلاق) ولو رجعيا (أو فسخ بجميع أسبابه) ومنه الفرقة بتقبيل ابن الزوج نهر (بعد الدخول حقيقة، أو حكما) أسقطه في الشرح، وجزم بأن قوله الآتي " إن وطئت " راجع للجميع (ثلاث حيض كوامل).
(3/ 504، ط: سعيد)
وفي الهداية في شرح بداية المبتدي :
"وعلى المعتدة أن تعتد في المنزل الذي يضاف إليها بالسكنى حال وقوع الفرقة والموت "لقوله تعالى: {لا تخرجوهن من بيوتهن} والبيت المضاف إليها هو البيت الذي تسكنه، ولهذا لو زارت أهلها وطلقها زوجها كان عليها أن تعود إلى منزلها فتعتد فيه وقال عليه الصلاة والسلام للتي قتل زوجها " اسكني في بيتك حتى يبلغ الكتاب أجله ".
(2/ 279، ط:دار الكتب العلمية)
وفي الدر المختار وحاشية ابن عابدين:
"(وتعتدان) أي معتدة طلاق وموت (في بيت وجبت فيه) ولايخرجان منه (إلا أن تخرج أو يتهدم المنزل، أو تخاف) انهدامه، أو (تلف مالها، أو لاتجد كراء البيت) ونحو ذلك من الضرورات فتخرج لأقرب موضع إليه".
(رد المحتار3/ 536، ط:سعيد)
وفي الدر المختار وحاشية ابن عابدين :
"قلت: قدمنا الفرق هناك، وهو أن الخلع بائن وهو لايلحق مثله، والطلاق بمال صريح فيلحق الخلع".
(رد المحتار3 / 440، ط:سعيد)
وفي البناية شرح الهداية:
"وأما كون الخلع بائنًا فلما روى الدارقطني في كتاب "غريب الحديث" الذي صنفه عن عبد الرزاق عن معمر عن المغيرة عن إبراهيم النخعي أنه قال: الخلع تطليقة بائنة، وإبراهيم قد أدرك الصحابة وزاحمهم في الفتوى، فيجوز تقليده، أو يحمل على أنه شيء رواه عن رسول الله صلى الله عليه وسلم؛ لأنه من قرن العدول فيحمل أمره على الصلاح صيانة عن الجزاف والكذب، انتهى."
(٥/٥٠٩)
وفي الفتاوى الهندية:
"إذا كان الطالق بائنًا دون الثالث فله أن يتزوجها في العدة وبعد انقضائها."
(ج:۱، ص:۴۷۲ ط: ماجدیة)
وفي الفتاوى الهندية :
"عَلَى الْمَبْتُوتَةِ وَالْمُتَوَفَّى عَنْهَا زَوْجُهَا إذَا كَانَتْ بَالِغَةً مُسْلِمَةً الْحِدَادُ فِي عِدَّتِهَا كَذَا فِي الْكَافِي .وَالْحِدَادُ الِاجْتِنَابُ عَنْ الطِّيبِ وَالدُّهْنِ وَالْكُحْلِ وَالْحِنَّاءِ وَالْخِضَابِ ... وَإِنَّمَا يَلْزَمُهَا الِاجْتِنَابُ فِي حَالَةِ الِاخْتِيَارِ أَمَّا فِي حَالَةِ الِاضْطِرَارِ فَلَا بَأْسَ بِهَا إنْ اشْتَكَتْ رَأْسَهَا أَوْ عَيْنَهَا فَصَبَّتْ عَلَيْهَا الدُّهْنَ أَوْ اكْتَحَلَتْ لِأَجْلِ الْمُعَالَجَةِ فَلَا بَأْسَ بِهِ وَلَكِنْ لَا تَقْصِدُ بِهِ الزِّينَةَخ كَذَا فِي الْمُحِيطِ".
(11 / 252، ط:ماجدية)
فتویٰ نمبر : 144210200996
دارالافتاء : جامعہ علوم اسلامیہ علامہ محمد یوسف بنوری ٹاؤن
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
নাঈম সিদ্দীকী বিন আব্দুস সাত্তার
শিক্ষক, হাদীস ও ফিকহ বিভাগ
মারকাযুশ শরীয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা
শিক্ষক, হাদীস ও ফিকহ বিভাগ
মারকাযুশ শরীয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১