নিজস্ব পরিকল্পনা ছেড়ে আল্লাহর পরিকল্পনায় জীবন গড়া’
নিজস্ব পরিকল্পনা ছেড়ে আল্লাহর পরিকল্পনায় জীবন গড়া’
[আল্লাহর হুকুম দুই ধরনের: শরিয়তের হুকুম (নামাজ-যাকাত) ও তাদবিনি হুকুম (সূর্য ওঠা-অস্ত যাওয়া, বৃষ্টি ইত্যাদি)। এ দুটি পরস্পর জড়িত। মানুষ নিজের কল্পনায় লম্বা পরিকল্পনা করে, কিন্তু বাস্তবে যা হয় তা আল্লাহর পরিকল্পনা অনুযায়ী। নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হলে মানুষ পেরেশান হয়, অথচ আল্লাহর পরিকল্পনার সঙ্গেই সবকিছু চলে। একজন জ্ঞানী ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা ত্যাগ করে আল্লাহর তাকদিরের স্রোতে নিজেকে ছেড়ে দেন, ঠিক যেমন ঈগল পাখি বাতাসের স্রোতে ভেসে যায়—অল্প পরিশ্রমে অনেক উচ্চতায় পৌঁছে। অন্যদিকে, চড়ুইয়ের মতো নিজের পরিকল্পনায় ব্যস্ত ব্যক্তি বেশি কষ্ট করেও কম লাভবান হয়। ইবরাহিম (আ.)-কে মরুভূমিতে পরিবার রেখে আসার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাঁকে পরিকল্পনামুক্ত বানিয়েছিলেন। প্রকৃত মুমিন সেই, যে দুআ করে: “হে আল্লাহ, আপনি যা দিতে চান, আমিও তাই চাই।” এ অবস্থায় সব অবস্থাই তার কাছে ভালো লাগে—সুস্থতা-অসুস্থতা, ধনী-গরিব সবকিছুতে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। রাসূল (সা.) ফাতিমা (রা.) ও আলী (রা.)-এর কাছে গোলামের বদলে তাসবিহে ফাতিমা শিখিয়ে দিয়ে বুঝিয়েছেন যে, আল্লাহর পছন্দই উত্তম। অতএব, নিজের প্ল্যান ছেড়ে আল্লাহর প্ল্যান অনুযায়ী চলাই হলো ইত্মিনানের জীবন]
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমাদ রহঃ
১৫ মে, মুহাম্মদপুর চৌধুরীবাড়ি জামে মসজিদ
الحمد لله نستعينه ونعوذ به من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا، من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلله فلا هادي له. ونشهد أن لا إله إلا الله ونشهد أن محمد عبده ورسوله.
بسم الله الرحمن الرحيم — یٰۤاَیَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَىِٕنَّةُ ۲۷ ارْجِعِیْۤ اِلٰی رَبِّكِ رَاضِیَةً مَّرْضِیَّةًۚ ۲۸
وقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: الكيس من دان نفسه وعمل لما بعد الموت، والعاجز من أتبع نفسه هواه وتمنى على الله.
একটি ঘটনা বলা হয় — কেউ একজন বাহলুলকে জিজ্ঞেস করেছিল (যিনি সম্ভবত হারুনুর রশিদের চাচাত ভাই ও একজন দরবেশ ছিলেন; খুবই সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন), 'কেমন আছেন?'
উত্তরে বললেন, 'তাঁর কথাটি জিজ্ঞেস করো, যাঁর কথায় জগৎ চলে।'
তো প্রশ্নকারী অবাক হলো! জিজ্ঞেস করল, 'আপনি কি নিজেকে জগতের রব হিসেবে দাবি করেন?'
তিনি বললেন, না।
আমি নিজেকে জগতের রব হিসেবে দাবি করি না,
আমি আব্দ অর্থাৎ আল্লাহর বান্দা হিসেবে দাবি করি।
বললেন, আপনি বললেন, আপনার ইচ্ছায় জগৎ চলে অর্থাৎ আপনি কি বলতে চাইছেন, আপনার ইচ্ছায় জগৎ চলে? তিনি বললেন, আমি আল্লাহর বান্দা।
আমি নিজেকে আল্লাহর অধীনে সম্পূর্ণভাবে সোপর্দ করেছি। আমার ইচ্ছা আল্লাহর অধীনে। আল্লাহ যা চান, আমিও তাই চাই। যেহেতু আল্লাহর ইচ্ছায় জগৎ চলে, অতএব আমার ইচ্ছাতেই জগৎ চলে। অতএব, বান্দা যদি নিজেকে আল্লাহর হাতে সোপর্দ করতে পারে, তাহলে ঠিকই তার ইচ্ছায় জগৎ চলে। কিন্তু যদি নিজেকে সোপর্দ করতে না পারে, তাহলে পদে পদে বিরোধ দেখে।
একটি গল্প আছে। ভিনদেশি এক রাজকুমার ছিল; এই পৃথিবীতে ভ্রমণ করতে করতে এক রাজাকে পেল। রাজা সিংহাসনে বসে আছেন; খুব তৃপ্ত, সন্তুষ্ট। রাজা হিসেবে সন্তুষ্ট হওয়ারই কথা। ছোট্ট রাজকুমার রাজাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কে? উত্তরে বলল, আমি রাজা। তখন রাজকুমার জিজ্ঞেস করল, তুমি যদি রাজা হও, তাহলে তোমার প্রজা কোথায়? কারণ আশেপাশে কোনো লোকজন বা কিছুই নেই। তখন রাজা বলল, এই সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র, সমুদ্র, পর্বত — এরা সবাই আমার প্রজা।
সেই ভিনদেশি রাজকুমার দুনিয়ার মানুষের মতো ভাত-রুটি ভক্ষণ করত না; তার খাদ্য হচ্ছে সৌন্দর্য। সুন্দর কিছু দেখলেই তার তৃপ্তি হয়। সে রাজকুমার বলল, আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে। সূর্যকে অস্ত যেতে বলো। সূর্য যখন অস্ত যায়, তখন দেখতে খুব সুন্দর দৃষ্টিনন্দন হয়। আর ওইটাই আমার খাদ্য। আমি তোমার মেহমান; তুমি আমার মেহমানদারি করো। রাজা বলল, একটু অপেক্ষা করো; উপযুক্ত সময় আসুক। উপযুক্ত সময় এলো, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। রাজা সূর্যকে আদেশ করলেন, অস্ত যাও। যেহেতু তিনিই রাজা, আর তারা প্রজা; তাই সূর্য অস্ত গেল।
এরপর রাজা এই রাজকুমারকে রাজ্য শাসনের কিছু নীতিবাক্য শেখালেন। রাজার উচিত, সে যেন ন্যায়বিচার করে; প্রজার উপর অত্যাচার করা — এটা কোনো ভালো রাজার উচিত নয়। প্রজার সুবিধা দেখে চলা উচিত। দুপুরে বেলা যখন মাঝপ্রহরে, তখন যদি তুমি তাকে বলো, অস্ত যাও; তাহলে এটা তার নিয়মবিরুদ্ধ, তার কষ্ট হবে। এটা এক ধরনের জুলুম। জুলুম করা উচিত নয়। আমি যদি জুলুম করি, তাহলে আজ না-হয় কাল; কাল না-হয় পরশু, প্রজা বিদ্রোহ করতে বাধ্য হবে। আর আমি যদি ন্যায়বিচার করতে পারি, তাহলে সূর্য-চন্দ্র সবাই আমার কথা মানবে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, আমি করছি জুলুম। আর জুলুম যদি করি তাহলে সে কতদিন আর বাধ্য থাকবে, অবাধ্য হতে বাধ্য হবে।
আল্লাহ তা'আলা আম্বিয়া আ.-কে পাঠিয়েছেন, দুনিয়ার মানুষকে ন্যায়বিচারের দিকে আনার জন্য। নিজে যদি ন্যায়ের উপর চলতে পারে তবে গোটা দুনিয়া ন্যায়ের উপর চলবে এবং তার বাধ্য থাকবে। আর আমি যদি নিজে ন্যায়ের উপর চলতে না পারি, তাহলে আমার অন্যায় দিয়ে, আমার জুলুম দিয়ে গোটা জগতকে আমার বিরুদ্ধে দাঁড় করাব। কারণ, সে অন্যায়কে বেশি সহ্য করবে। আল্লাহ তা'আলা মানুষকে আহকাম দিয়েছেন, আর আল্লাহ তা'আলা সব হুকুম বড় আদল ও ইনসাফের সাথে দিয়েছেন। আল্লাহর হুকুমের মধ্যে কোনো জুলুম নেই। সবকিছু সুন্দর, মাপামাপা; একটির সাথে আরেকটি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আল্লাহর হুকুম দুই ধরনের। একটি হলো নামাজ, যাকাত — যেগুলো কিতাবে পাওয়া যায়, যেগুলো উলামাগণ শিক্ষা দিয়ে থাকেন। এগুলোকে শরিয়তের আহকাম বলে; আহকামে তাশরিয়্যাহ। শরিয়তের আহকামগুলো জগতের পরিবর্তনের আহকামের সাথে জড়িত। সূর্য অস্ত যাওয়া, সূর্য উদয় হওয়া; শীত বা গ্রীষ্মের পরিবর্তন হওয়া; বৃষ্টি হওয়া, অনাবৃষ্টি হওয়া — এগুলোও আল্লাহর হুকুম। এগুলোকে বলে আহকামে তাদবিনি অর্থাৎ সৃষ্টিজগতের আহকাম। আল্লাহ তা'আলা এই দুটোকে জড়িত করে রেখেছেন।
মাগরিবের নামাজের হুকুম সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে জড়িত। নামাজের হুকুম হলো শরিয়তের হুকুম, অস্ত যাওয়া তাদবিনি হুকুম। বান্দা যদি দুটো হুকুমই পালন করতে থাকে — শুধু পালন নয়, যেভাবে পালন করা উচিত গুরুত্ব দিয়ে আগ্রহের সাথে — তাহলে আল্লাহ তা'আলা তার জীবনকে বড় সুন্দর করে দেন। আর যদি সে আল্লাহর নাফরমানি করে, তাহলে আল্লাহ তা'আলার তরফ থেকে বড় আজাব-মুসিবত তার উপর আসে। মাঝামাঝি — সম্পূর্ণ নাফরমানি করছেও না, আবার পালন করছেও না — তাহলে যে মাত্রায় করবে, সে মাত্রায় আসবে।
যে মাগরিবের নামাজ পড়ার ব্যাপারে নিজেকে প্রস্তুত করেছে, তাহলে এটাও বোঝা যায় যে, সে সূর্য অস্ত যাওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে। কিছু লোক তো এই ধরনের আছে, যে মাগরিবের আগে থেকেই নিজের কাজ সম্পূর্ণ করে অজু করে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করে — কখন সূর্য ডুববে। কারণ, মাগরিবের নামাজ সে শুধু পড়ে তা নয়, বরং নামাজ পড়তে তার মন আগ্রহী। আর নামাজের জন্য যে আগ্রহী হবে, সে নামাজের জন্য তো আগ্রহী হবেই, সাথে সাথে সে সূর্য অস্তের ব্যাপারেও আগ্রহী হবে। নামাজ পড়তে আগ্রহী, কিন্তু সূর্য অস্ত ভালো লাগে না — এই দুটো পরস্পরবিরোধী কথা। যে মাগরিবের নামাজ পড়তে আগ্রহী, সে সূর্য অস্ত যাওয়ার বিষয়েও আগ্রহী। আগে থেকেই সে নিজেকে প্রস্তুত করে, অন্যান্য কাজ থেকে নিজেকে অবসর করে, পাক-সাফ হয়ে অপেক্ষা করে — কখন আজান হবে।
যেহেতু আগে থেকেই অপেক্ষা করছে, তখন মানুষ ওই জিনিসই পায়, যার জন্য সে অপেক্ষমাণ — তখন কাঙ্ক্ষিত জিনিস তার ভালো লাগে। যখন আজান হবে, তখন তার আজান শুনতে ভালো লাগবে। কারণ সে চাইছিল আজান। এখন আজান শুনতে তার ভালো লাগবে; অস্ত যাওয়া তার ভালো লাগবে। আর বড় আগ্রহ নিয়ে সে নামাজের জন্য অগ্রসর হবে।
আরেকটি হলো আগ্রহের অভাব। কোনো কাজের দায় সারা ভাবসাব। ভালো লাগে না। কাজের মধ্যে যাচ্ছে, তার ধ্যান কাজের দিকে — এই কাজটি সম্পূর্ণ করতে হবে, খুবই জরুরি। তার কাছে এই কাজের গুরুত্ব খুবই বেশি। এই কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকার মধ্যেই আজান হয়ে গেল। যখন সে আজান শুনবে, মুখে প্রকাশ করুন বা না করুন — একটা বিরক্তি তার মধ্যে আসবে, এত তাড়াতাড়ি আজান হয়ে গেল! কাজ তো শেষ হলো না! হয়তো বলবে, বা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বলবে না, কিন্তু মনের মধ্যে তার একটি বিরক্তি আছে। আর এই বিরক্তি আল্লাহ তা'আলার তাদবিনি হুকুম — সূর্যের অস্ত যাওয়ার উপর। যেন পরোক্ষভাবে আল্লাহ তা'আলাকে বলছে, বড় অসময়ে সূর্য অস্ত গেল; আরেকটু পরে সূর্য অস্ত যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তার বিরক্তির কারণে সূর্যের অস্ত যাওয়া বিলম্বিত হবে না। সূর্য তার নির্ধারিত সময়েই অস্ত যাবে। কিন্তু তার নিজের ভেতরে কষ্ট হবে, অশান্তি হবে, পেরেশানি হবে। যদিও সে নামাজ পড়ছে, কিন্তু নামাজের আগ্রহ না থাকার কারণে, নামাজের যে তাদবিনি হুকুম রয়েছে সেটি তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। মানতে সে বাধ্য, কিন্তু সে ঠেকায় পড়ে মানছে; আনন্দের সাথে নয়। এই ব্যক্তি তার মনের ভেতর ইত্মিনান অনুভব করবে না; এক অশান্তি কাজ করবে।
আল্লাহ তা'আলা তাঁর নেক বান্দাদের জন্য ওয়াদা করেছেন:
أَلَا بِذِكْرِ اللهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوْبُ
আল্লাহর জিকিরের মধ্যে কি দিলের ইত্মিনান নয়?
এই ব্যক্তি দিলের ইত্মিনান থেকে বঞ্চিত; যদিও সে আল্লাহর হুকুম পালন করে। অপর আরেকজন, যে এর জন্য প্রস্তুত, সে ইত্মিনান পাবে। কারণ, তার কাছে ভালো লাগে। নামাজ যদিও ফরজ, কিন্তু সূর্যের অস্ত যাওয়ার জন্য অপর ব্যক্তি প্রস্তুত নয়; আগ্রহী নয়। কেন? তার নিজের কিছু প্ল্যান-প্রোগ্রাম আছে। সে একটি কাজ হাতে নিয়েছে; আর সেই কাজ তার মনের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে কাজটিই সে সম্পন্ন করতে চায়। সে তা সম্পন্ন করার মধ্যে তার নিজের কোনো লাভ দেখে। তো ওইদিকে তার ধ্যান থাকার কারণে সূর্যের অস্ত যাওয়াটা সে আনন্দের সাথে গ্রহণ করতে পারছে না; ঠেকায় পড়ে গ্রহণ করছে।
দুনিয়ার বেশির ভাগ মানুষ তার নিজের প্ল্যান-প্রোগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত। সেই কাজটি কখনো কখনো জোহর পর্যন্ত যেতে পারে। বিকেল বেলা কাজ হাতে নিয়ে মাগরিবের আগে শেষ হলো না, এটা খুব সংক্ষিপ্ত একটি জিনিস। এক ঘণ্টা বা আধ ঘণ্টার প্রোগ্রাম। কিন্তু কখনো এমন হয়, তার জীবনের প্রোগ্রাম ষাট বছর বা চৌষট্টি বছরের বা তার চেয়েও বেশি দীর্ঘ। ব্যবসা করব, বড় লোক হব, বিয়েশাদি করব, সম্মানী হব — কত কিছু যে সে ভাবে। লম্বা প্রোগ্রাম। আল্লাহ তা'আলা আহকামও নাজিল করেছেন এবং অবস্থাও নাজিল করেছেন, আর সেও তার নিজস্ব ফিকির-প্ল্যান-প্রোগ্রাম করছে।
আল্লাহর তরফ থেকে তাকদিরের একটি প্রবাহ... প্রতি মুহূর্তে আল্লাহ তা'আলার একটি করে হুকুম আসছে। যেরকম শরিয়তের আহকাম নাজিল হয়, তো এই অবস্থার পরিবর্তনগুলোও আল্লাহর হুকুমে হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يُنَزِّلُ الْأَمْرَ مِنَ السَّمَاءِ
আল্লাহ তা'আলা আদেশ নাজিল করেন।
এই আদেশ অনুযায়ী সূর্যের অস্ত হয়, উদয় হয়; দিন হয়, রাত হয়; বৃষ্টি হয়, অনাবৃষ্টি হয়। গাছের পাতা পড়ে যাওয়া বা গাছ থেকে যাওয়া অর্থাৎ প্রতিটি ছোট-বড় সবকিছু আল্লাহর তরফ থেকে হয়। আর এর মোকাবেলায় সে তার নিজেকে উদ্বুদ্ধ করে এবং নিজেই তার কিছু প্ল্যান-প্রোগ্রাম বানায়। এটা করব, ওটা করব, এই হবে, সেই হবে — নানান ধরনের তার প্রোগ্রাম থাকে। অথচ বাস্তবে তার প্রোগ্রামমতো কিছুই হবে না। আল্লাহ যদি হুকুম করেন তবে গাছের পাতা পড়বে।
তার মন চাইল, গাছের পাতা এখন পড়ুন; কিন্তু তার মন চাওয়ামতো গাছের পাতা পড়বে না। আর মন চাইবে গাছের পাতা না পড়ুক, কিন্তু গাছের পাতা ঝরা থামবে না। সবকিছু তাই হবে যা আল্লাহ তা'আলা প্ল্যান-প্রোগ্রাম করেছেন। কিন্তু সে নিজে খামোখা একটি প্ল্যান-প্রোগ্রাম করে। আর যেহেতু তার পরিকল্পনামতো হয় না, তখন সে কষ্ট পায়; অস্থির হয়, পেরেশান হয়। আর মানুষ যখন পেরেশান হয়, তখন সাধারণত আরো দশজনকে পেরেশান করে।
একজনের দাঁতে ব্যথা; ব্যথার তীব্রতায় সে ঘুমাতে পারছে না। তো ব্যথা যদি একটু বেশি হয়, তাহলে বাড়ির মানুষকে সে ঘুমাতে দেবে না। হৈচৈ, চিৎকার ও পেরেশানি করে গোটা বাড়ি সে জ্বালিয়ে রাখবে। মানুষ যখন তার দিলের অবস্থার কারণে পেরেশান হয়, তখন সবাইকে সে পেরেশান করবে। আর পেরেশান সে এজন্য হয় যে, তার মন বিষয়টি খুব প্রবলভাবে চায়। আর এতবেশি চায় যে, সে মনে করে তার ইচ্ছামতো হয়েই যাবে; কিন্তু তার ইচ্ছামতো তো হবে না, হবে তো আল্লাহর হুকুমমতে।
ইউরোপের কোনো নামকরা শিল্পী মূর্তি বানানোর কাজ করে। হিন্দুরা তো মূর্তি বানিয়ে পূজা করে; আর আরো কিছু মানুষ আছে যারা মূর্তি বানানোর কাজ করে, যাদেরকে শিল্পী বলে। তো একজন শিল্পী এই কাজে এতবেশি আত্মনিয়োগ করেছে যে, তার মনে ধারণা হলো, সে এই মূর্তির মাঝে প্রাণও ঢালতে পারে; জীবিত করে তুলতে পারবে। তো সে বসে থাকা অবস্থার কোনো একটি মূর্তি বানিয়েছিল। এরপর সেই মূর্তিকে লক্ষ্য করে বলল, দাঁড়াও। এখন মূর্তি কি দাঁড়াবে? বললেই কি হয়ে যাবে? মূর্তি তো আর দাঁড়াল না। তো শিল্পীর এত রাগ হলো যে, আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলল। তো শিল্পীর চাওয়া তো অর্থহীন, তার চাওয়া তো পূরণ হওয়ার মতো নয়। একটি মাটির মুখ থেকে একটি লোকমাও বের করতে পারবে না। কিছুই করতে পারবে না; কিন্তু বড় বোকার মতো, বড় অবুঝ মানুষের মতো আসমান-জমিনের মতো কতকিছু চায়!
মানুষের চাওয়া যে কত অর্থহীন, এই সম্পর্কে একটি গল্প আছে যে, এক লোক মাথায় ডিম নিয়ে যাচ্ছিল আর কল্পনা করছিল — এই ডিম থেকে বাচ্চা ফুটবে। বাচ্চাগুলো মুরগি হবে। মুরগি বিক্রি করে আরো ডিম কিনব... এভাবে কল্পনা করতে করতে নিজেকে বিরাট বড়লোক ভাবতে আরম্ভ করল। এমনিভাবে তার কল্পনার মাঝে বিরাট বাড়িও কিনে ফেলেছে; রাজকুমারীও বিয়ে করে নিয়েছে। ইতিমধ্যে যার বিরাট বাড়ি হয়ে গিয়েছে, রাজকুমারীও হয়ে গিয়েছে, তার রাগও তো বেশি হবে। সে রেগে গিয়ে মাথা ঝাড়া দিল — আর মাথার ডিম সব পড়ে ভেঙে গেল। ডিমের মালিক খুব রাগ করল, কী করলে তুমি! ডিম ভেঙে ফেললে!
সে উত্তরে বলল, তোমার তো শুধু ডিম ভেঙেছে, আর আমার তো বিরাট রাজবাড়ি ভেঙে গিয়েছে!
সে যে ধরনের রাজবাড়ি বানিয়েছে, সে বাড়ি ভাঙতে বাধ্য। ওইটা ভাঙবেই; কারণ বাস্তবতার সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তো আল্লাহ তা'আলা আহকাম নাজিল করছেন, আর অবুঝ মানুষ তার নিজের কল্পনা দিয়ে একটি প্রবাহ চালাচ্ছে।
আল্লাহ তা'আলার হুকুম যেন নদীর মতো আসে। নদীতে যেমন নতুন নতুন পানির প্রবাহ আসে, ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহ তা'আলার আহকাম — প্রতি মুহূর্তে নতুন হুকুম নাজিল করেন। আর যে কল্পনা করে, তার কল্পনারও একটি স্রোত আছে। ধাপে ধাপে সে কল্পনা করে যায়; কিন্তু তার কল্পনামতো কিছুই হবে না। হবে তো ওইটাই যা আল্লাহ তা'আলা ফায়সালা করেন। এই ব্যক্তি যে কল্পনা করে, নিজেকে বোকা বানাবে, কষ্টও পাবে, অন্যকেও কষ্ট দেবে; আর ডিমওয়ালার মতো যদি হয় তো সে মানুষের কাছে রাজবাড়ি কল্পনা করলেও মানুষের মাঝে তার সম্মান বাড়বে না, বরং বেওকুফ হিসেবে পরিগণিত হবে। বোকা! কেন বোকা? কারণ, যা কল্পনা করে তার কোনো বাস্তবতাই নেই।
দুনিয়ার মানুষ এরকমই বোকা। ছেলে ছোট, তাকে নিয়ে কল্পনা করছে — বড় হবে, শিক্ষা দেবে, সম্মানী হবে, এই হবে, সেই হবে — এমন আকাশকুসুম কল্পনা; অথচ আল্লাহ তা'আলা তার তাকদিরে লিখে রেখেছেন যে, দুই বছর পর সে মারাই যাবে। অথচ এই বিষয়টি সে বাবার কল্পনার মধ্যেই নেই। যখন মারা যাবে, তখন তার কল্পনা ভেঙে যাবে। আর মানুষ বলেও থাকে যখন অপ্রত্যাশিত কিছু তার সাথে ঘটে — তখন দীর্ঘশ্বাস টেনে আর বলে, আমার সব স্বপ্ন ভেঙে গেল। আরে! এই স্বপ্ন দেখতে তোমাকে কে বলেছিল! স্বপ্ন তো ভাঙারই জিনিস। ওইটা তো ভাঙবেই। স্বপ্ন গড়ে আর স্বপ্ন ভাঙে... এর এটা দেখে সে পেরেশান হচ্ছে। দুনিয়ার মানুষ এরকম অবাস্তব সমস্যা ও নিজের কল্পনা নিয়ে পেরেশান। আল্লাহ তা'আলা কারো উপর কোনো পেরেশানি আসমান থেকে নাজিল করেননি, অথচ দুনিয়ার বেশির ভাগ মানুষ পেরেশান। সব পেরেশানি সে নিজের স্বপ্নকে বানিয়েছে।
এক ছেলে ঘুম থেকে উঠে কাঁদছে। বাবা-মা জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? সে বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে। কী সর্বনাশ হয়েছে? স্বপ্নে দেখলাম, আমার বুকের উপর দিয়ে তেলাপোকা হেঁটে চলে যাচ্ছে। তো বাবা-মা সান্ত্বনা দিচ্ছে যে, ঠিক আছে। স্বপ্নে দেখেছিলে। এখন তো ঘুমও শেষ, স্বপ্নও শেষ। এখন আর কান্নার কী আছে? ছেলে বলছে, সমস্যা তো শেষ হয়নি। কী শেষ হয়নি? ছেলে বলল, তেলাপোকা তো রাস্তা পেয়ে গেছে। এখন থেকে সে রোজ এই পথে যাবে। তার সমস্যা কে সামাধান করবে! যদিও তার এই কথা নিয়ে আমরা হাসছি, কিন্তু আমরা যদি আমাদের জীবনটাকে ভালোভাবে লক্ষ্য করি তো দেখব, আমাদের নিজেদের জীবনও এই ধরনের সমস্যায় জর্জরিত। কাল্পনিক সমস্যা আর কাল্পনিক কান্না; আর হাসিটাও পাগলের হাসি বা বোকার হাসি। কী নিয়ে হাসছে তাও জানে না; কী নিয়ে কাঁদছে তাও জানে না। বাস্তবে তো কোনোটাই নেই; অথচ কল্পনা করে বেড়াচ্ছে।
পরীক্ষায় রেজাল্ট হয়েছে, ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট! ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট! খুব খুশি। খুব খুশি কেন? তুমি কি এক পয়সা পেয়েছ? এক পয়সা পাওনি, কিন্তু ও ভাবছে পাবে। ও কল্পনায় ভাবছে, পাবে। এজন্য খুব খুশি। কবে সে এটা সে পাবে না-পাবে; কিন্তু বাস্তবতায় কী হলো, চাকরি পেল না। এখন তার খুব লাভ হচ্ছে না; বরং ক্ষতি। আমাদের জানাই হলো, তার চাকরি না পাওয়ার কারণ হলো, খুব ভালো রেজাল্ট। প্রথমে তো মনে করেছিল, আসমানের উপরের কোনো চাকরি পাবে বোধহয়। তারপর দুনিয়াতে নামল। দুনিয়াতে নামার পর দেখা গেল, দুনিয়ার চাকরিও পাওয়া যাচ্ছে না। শেষ দিকে ফার্স্ট ক্লাস ডিভার্জ-ওয়ালা ছেলেটি শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে স্কুলের মাস্টারি করতে গেল।
দরখাস্ত দেখে ইন্টারভিউতে ডাকা হলো। ইন্টারভিউতে বলল, আপনি কি আর এই ছোটখাটো চাকরিতে থাকবেন? এত ভালো রেজাল্ট! সে বলল, আমি থাকব; কিন্তু তারা মানতে চায় না। ও যতই বলে, আরে, আমি তো আর কিছু পারি না, আমি থাকব; ততই তারা বলে, উনি থাকবেন না; খামোখা নেড়েচেড়ে দেখছে। এই কথা বলে চাকরি দিচ্ছে না।
একবার এক অফিসে গিয়েছিলাম তাবলিগের গাশতে। কথা প্রসঙ্গে বলল, সেখানে পিয়ন নেবে। আর পিয়নের জন্য দরখাস্ত জমা পড়েছে; বেশুমার দরখাস্ত। তার মধ্যে চারজন এম.এ. পাস। এই কথা বলার পর একটু ডানে-বামে তাকাল। দেখল, অতিথি কেউ আছে কি না। যখন দেখল, অতিথি কেউ নেই; সব আমরা বাইরের লোক — তখন বলল, এম.এ. পাস যারা, তাদেরকে আমি নেব না। কেন? আমি পিয়নকে বলব, চা এনে দাও। এই করো, সেই করো। এম.এ. পাস ছেলেকে আমি কেমন করে বলব, চা এনে দাও! আমার বলতে সংকোচ লাগবে আর তারও করতে ভালো লাগবে না যে, আমি এম.এ. করে চা-বিস্কুট আনার জন্য পাস করেছি। তারও ভালো লাগবে না, আমারও বলতে কষ্ট হবে; এজন্য আমরা এম.এ. পাসকে চাকরিতে নিয়োগ দেব না। তার চেয়ে ম্যাট্রিক ফেল হলে আমার বেশি ভালো। এই কাজগুলো সে ভালোভাবে করতেও পারবে। তো রেজাল্ট ভালো হওয়ায় সে ভেবেছিল, রেজাল্ট ভালো হয়েছে, কত খুশির আনন্দ; অথচ এটা তো বোকার হাসি। তো কেউ বোকার কান্না কাঁদছে, আর কেউ বোকার হাসি হাসছে। বর্তমান অবস্থা ভালো না, আর সে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করছে; অথচ কোনোটাই সত্যি নয়।
একজন পরীক্ষায় ফেল করল; তার মন খুব খারাপ। জিজ্ঞেস করা হলো, মন খারাপ কেন? বলল, আমি ভাই গরিবের ছেলে; আমার কী হবে! গরিবের ছেলের সাথে পরীক্ষায় পাস করা বা ফেল করার কী সম্পর্ক? বলছে, তোমরা তো ভাই বড়লোক। তোমরা ব্যবসা-বাণিজ্য কিছু করতে পারবে, মূলধন আছে। আমি তো গরিবের সন্তান, তেমন ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারব না। অর্থাৎ কাল্পনিক কথা। আর বাস্তবে এটা হওয়া অসম্ভব কিছু নয়, আর আমার জানাশোনায় এমন ঘটনা মনে পড়ছে না, তবে আপনাদের আশেপাশে খুঁজলে পেতে পারেন যে, ওই খারাপ রেজাল্টকারী ওই এম.এ. পাসওয়ালার সাথে চাকরি করে। এরকম দৃষ্টান্ত পাওয়া খুব মুশকিল নয়। কারণ মানুষের কল্পনার কোনো হাকিকত নেই। তার 'আশা'র যেমন হাকিকত নেই, তার 'নিরাশা'র কোনো হাকিকত নেই। এগুলো সব তার নফসের কল্পনা। অথচ আল্লাহ তা'আলা দ্বীন দিয়েছেন, আমি যেন আমার নফসের কল্পনা থেকে নিজেকে মুক্ত করি। আল্লাহ তা'আলার তাকদিরের যে প্রবাহ, তা যেন মানি। যে যত বেশি তাকদিরের প্রবাহ মানতে পারবে, তত বেশি তার থেকে ফায়দা উঠাতে পারবে।
কৃষক... তার সিস্টেম হলো, বৃষ্টি যখন হবে তখনই আমি চাষ দেব। অপরজন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। সে নিজেই প্ল্যান করে, নিজেই চিন্তা করে। সে তার তারিখ ঠিক করে রেখেছে, অমুক তারিখ চাষ দেব। বৃষ্টি হলো না; ও খুব পেরেশান। তারিখ করলে কেন? বোকামি করেছি।
আমার সম্পর্কে এক ভাই ছিলেন; ইন্তেকাল করেছেন। মাস্টার ছিলেন, লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিলেন। লেখাপড়ায় ভালো থাকা এক জিনিস আর বুদ্ধিসুদ্ধি ঠিক থাকা ভিন্ন জিনিস। বুদ্ধি তেমন ঠিক ছিল না। তো তাঁর ছেলের বিয়ের জন্য আমাদের বাসায় দাওয়াতের চিঠি পাঠিয়েছেন। তারিখও সব ঠিক; কিন্তু বিয়ে কার সাথে হবে — এটা ফাঁকা রেখেছেন। ওইটা (পাত্রী) ঠিক করেননি তখন পর্যন্ত; বাকি সব ঠিক। বাকি সব ঠিক থাকলেই কি হয়ে যাবে? একজন দরকার বিয়ে হওয়ার জন্য? তো বললেন, একজনের ব্যবস্থা হয়েই যাবে।
এমন মানুষকে নিয়ে আমরা হাসছি; কিন্তু নিজেদের অবস্থাও তার চেয়ে ভালো নয়। এর প্রমাণ হলো, আমার কত প্রোগ্রাম আমি করতে পারছি না। কেন পারছি না? কারণ এমন কিছুর সাথে আমার প্রোগ্রাম জড়িত, যার উপর আমার নিয়ন্ত্রণ নেই। তাহলে আমি এই প্রোগ্রাম করলাম কেন? কারণ, আমি ভেবেছিলাম ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আমি ভেবেছিলাম, এতদিনে আমার ছেলে বড় হয়ে যাবে। বিয়েশাদি দেব, চাকরি বা উপার্জন করব আর যাস্ট আরামে থাকব। তাহলে এখন আরামে থাকছ না কেন? কারণ, ছেলে মারা গেছে। তো সেই তিনি, যিনি বিয়ের দাওয়াত দিয়ে দিলেন; কার সাথে বিয়ে হবে, এখনো ঠিক হয়নি; তারিখও সব ঠিকঠাক করে ফেললেন — সেই ছেলের জন্ম-মৃত্যুর উপর যার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, সে-ই বা কী বুঝে এত প্রোগ্রাম করল? কত কষ্ট... এখন শেষে বসে বসে কাঁদে। তো মানুষ না বুঝে স্বপ্ন দেখে আর কল্পনা বানায়। আর এই সব তার নফস তাকে ধোঁকা দেয়। শয়তান উস্কে দেয় আর সে প্রোগ্রাম বানায়। আল্লাহ তা'আলা আম্বিয়া আ.-কে পাঠিয়েছেন যাতে মানুষ তার নফসের ধোঁকায় না পড়ে।
কেউ একজন গোলাম কিনেছেন। সে গোলাম ছিল ওলি-আল্লাহ। সে গোলামকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী নাম? গোলাম বলল, মালিক! আপনি যে নামেই আমাকে ডাকবেন সে নামই আমার নাম হবে। আপনার পছন্দের নামই হবে আমার নাম। মালিক বললেন, তুমি কী কাজ করবে? — আপনি যে কাজ করতে বলবেন। তুমি কী খেতে পছন্দ কর? গোলাম বলল, আপনি যা খেতে দেবেন। মালিকও ছিলেন ওলি-আল্লাহ। তিনি চান, আমি গোলামকে সন্তুষ্ট করব; সেজন্যই তাকে জিজ্ঞেস করছেন; কিন্তু যে প্রশ্নই করছেন তার উত্তরেই বলছে, আপনি যা বলবেন। আপনি যা খেতে দেবেন, আপনি যা পড়তে দেবেন, আপনি যে কাজ করতে দেবেন। এরপর মালিক বললেন, আরে ভাই! তোমারও তো কোনো পছন্দ আছে? বলো না আমাকে? তখন গোলাম বলল, আমার যদি পছন্দ থাকত, তাহলে তো আমিই মালিক হতাম। আমি তো গোলাম। গোলামের আবার নিজস্ব পছন্দ কী? নিজস্ব পছন্দ শুধু মালিকের থাকে। আমি তো গোলাম।
নিজেকে যত বেশি ছাড়তে পারবে, তত বেশি গোলামের গুণ ধারণ করবে। আর যে যত বেশি পরিকল্পনা ছাড়তে পারবে, সে তত বেশি আল্লাহ তা'আলার দেওয়া অবস্থা থেকে ফায়দা উঠাতে পারবে। যে এই কথা বলে, বৃষ্টি যখন নামবে তখন আমি হালচাষ করব, সে বৃষ্টি থেকে ফায়দা নিতে পারবে। সে বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করবে। আর যে বলে, আমি অমুক তারিখ থেকে হালচাষ করব, নামছে কি না নামছে — দেখা হবে না। বৃষ্টি যদি তার এক সপ্তাহ আগে এসে যায় আর ও তো প্রোগ্রাম করেছে আরো এক সপ্তাহ পরে।
সুতরাং যখন সে চাষ করতে নামবে তখন দেখা যাবে, মাটি আবার শুকিয়ে গেছে। আর বৃষ্টি না হওয়ায় তার ক্ষেত আর করা হবে না। দুনিয়ার মানুষ অনেক ব্যাপারে এই কথা বোঝে যে, আমার নিজস্ব প্ল্যান করে কোনো লাভ নেই। যেভাবে ঘটনা ঘটে, আমি সেভাবে সেখান থেকে ফায়দা নেব। তো কৃষিকাজের বড় একটি অংশ এই জ্ঞান হাসিল করেছে যে, আমি আমার পছন্দমতো তারিখ করে কোনো লাভ নেই; বরং আল্লাহ তা'আলা যেভাবে বৃষ্টি নামাবেন, সেভাবেই আমি করব।
জেলে মাছ ধরতে চায়... কত জেলে আছে মাছ ধরে তার সুবিধামতো। এখানে মাছ ধরলে সুবিধা, তাহলে এখানে জাল লাগাই। তাহলে মাছ? মাছকে বলব, মাছ যেন এখানে চলে আসে! মাছ কি তার কথামতো এখানে আসবে? অথচ ও জাল নিয়ে বসে আছে, যেন মাছ ধরা পড়ে। আরেকজন যে কিছু জ্ঞানবুদ্ধি রাখে, সে এই কথা বলবে না যে, আমি আমার পছন্দমতো জাল লাগাব; বরং সে বলে, মাছ যে পথে চলাচল করে আমি সে পথে জাল লাগাব; আমার পছন্দমতো নয়, মাছ তার পছন্দমতো পথেই চলে। আমার কথামতো আসবে না, আমাকে মাছের পথে যেতে হবে। মাছকে আমি আমার পছন্দমতো পথে আনতে পারব না।
কখন জাল ফেলব? — মাছ যখন আসে। এরকম নয় যে, আমার যেদিন সুবিধা সেদিন জাল ফেলব আর মাছকে বলব, তুমি চলে এসো। এমনটি হবে না; বরং মাছের নিয়ম বুঝতে হবে। মাছের নিয়মানুযায়ী যদি আমি আমার নিজেকে চালাই, তাহলে আমি সেই নিয়ম থেকে ফায়দা উঠাতে পারব। কৃষক ফায়দা উঠায়। পুরো দুনিয়ার মানুষ জগৎ থেকে ফায়দা উঠানোর জন্য নিজেকে তার জগতের নিয়ম মোতাবেক চালায়; আল্লাহ তা'আলা যে নিয়ম দিয়েছেন, আর নিজের নিয়মের উপর তাকে আসতে বাধ্য করে। যদি তার নিয়মকে বোঝে আর সে নিয়মকে কাজে লাগায়, তো দুনিয়ায় এখানে বসে বসে সূর্যকে দিয়ে তার কাজ করায়।
যুগ যুগ ধরে মানুষ কৃষিকাজ ইত্যাদিতে সূর্যকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে। সূর্যের ফায়দা নেয়, হালচাষ করে, ধান শুকায়, ধান পাকায়। সবকিছুতে সূর্যের প্রয়োজন; কিন্তু সূর্যকে সে আদেশ দেয় না যে, আমার ওই সুবিধামতো তুমি রোদ দাও; বরং সূর্য কখন রোদ দেয়, কখন আসে, সেটা ভালো করে বোঝার চেষ্টা করে। সূর্য তো তার নিয়মমতোই চলবে; আমাকে তার নিয়মমতো চলাতে হবে। সুতরাং যে নিজেকে ওই নিয়মমতো চালায়, সে তো ফায়দা উঠায়। আর যে বোকা চায় যে, আমার পছন্দমতো সূর্য চলবে, তাহলে সূর্য তো তার কথামতো চলবে না। যারা আরো বেশি অগ্রসর, তারা এখানে ঘরে বসে বসে সূর্যকে দিয়ে তার কাজ করায়।
একসময় ছিল ছোট ছোট হাতঘড়ি; সেই ঘড়িতে চাবি দিতে হতো। এগুলো কিছুদিন চলল। এরপর এলো অটোমেটিক ঘড়ি। এগুলো হাতে রাখলে, নড়াচড়া করলে অটোমেটিক চাবি হয়ে যেত। এটা বাজারে খুব বেশিদিন চলেনি। কারণ ওইটা বেশিদিন রেখে দিলে থেমে যেত। এরপর এলো ব্যাটারি। ব্যাটারি আবার কিছুদিন পরে চার্জ শেষ হয়ে যেত। এরপর এলো এমন ঘড়ি যা আলোতে কাজ করে। অর্থাৎ সোলার ঘড়ি। এটিতে চাবি দিতে হয় না, নাড়তে হয় না, ব্যাটারি দিতে হয় না। আল্লাহ তা'আলা আসমানে সূর্য দিয়ে রেখেছেন, ওইটা দিয়েই কাজ করে। তো কোথায় সূর্য আর আমি এখানে বসে তাকে দিয়ে কাজ করাচ্ছি।
কৃষক বলদকে দিয়ে কাজ করায়, এই বলদ তো তার নাগালের মধ্যে; কিন্তু সূর্য যে নিয়মের মধ্যে চলে, সে নিয়মটি ভালো করে বুঝে নেওয়ার কারণে সূর্য আমার নাগালের মধ্যে না থাকার পরেও তাকে দিয়ে আমি কাজ করাতে পারছি। কিন্তু এজন্য সূর্য আমার পছন্দমতো চলছে না, বরং সূর্যের পছন্দমতো আমি চলছি। যে ব্যক্তি সূর্যের এই রীতিনীতি বোঝে, সে অগ্রিম বলে দেয় সূর্যগ্রহণ কবে হবে। আর ঠিকই তার কথামতো সূর্যগ্রহণ হয়। তাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, তুমি কি মন্ত্র পড়েছ যে, সূর্য তোমার বাধ্য হয়ে গেল? সে বলবে, আমি কোনো মন্ত্র পড়িনি আর সূর্য আমার বাধ্যও নয়। আরে তুমি বললে যে, সূর্যগ্রহণ হবে আর ঠিকই সূর্যগ্রহণ হলো! তখন সে বলবে, আমার আদেশমতো সূর্যগ্রহণ হয়নি, সূর্যগ্রহণ তার নিয়মমতো হয়েছে। আমি শুধু সূর্যের পছন্দমতো তারিখটি বলে দিয়েছি। আমার আদেশে সূর্যগ্রহণ হয়নি, আমি শুধু সূর্যের পছন্দমতো তারিখটি বলে দিয়েছি।
আমেরিকার কোনো এক বিজ্ঞানী বলল, অমুক তারিখে সূর্যগ্রহণ হবে; কিন্তু গ্রহণ হলো না।
সে কাউকে এই কথা বলে না যে, সূর্য ভুল করেছে; বরং বলে, আমি ভুল করেছি। সূর্য ভুল করেনি, সূর্য তার নিয়মমতোই চলছে; ভুলটা আমার। যে যত বেশি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারবে, আল্লাহ তা'আলা যেভাবে চালাচ্ছেন সে নিয়মটি বুঝতে পারবে, তত বেশি ওইটা থেকে ফায়দা নিতে পারবে।
আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে ঈমান দিয়েছেন। ঈমানি মেহনত করে শরিয়তের আহকামকে আমি মেনে নেব। আল্লাহ তা'আলা আহকাম দিয়েছেন; আহকাম যেরকম আছে, সেরকমই আমাকে মানতে হবে। এমন নয় যে, আমার পছন্দমতো জোহরের নামাজ চার রাকাত, আসরের নামাজ চার রাকাত পড়ব। যারা ব্যবসা করে, তারা আসরের সময় বেশি ব্যস্ত থাকে। এই আসরের নামাজ তারা আগে বা পরে পরে পড়ে; ঠিক সময় নয়। আর যদিও পড়তে হয়, চার রাকাতই পড়ে। আবার চার রাকাতও তার নিকট অনেক লম্বা হয়ে যায়। কিন্তু একজন সাধারণ মুসলমান এই কথা জানে যে, এই বিষয়ে নিজস্ব মতামত দিয়ে কোনো লাভ নেই। এটা আল্লাহ তা'আলা নাজিল করেছেন, ফায়সালা দিয়েছেন; এভাবেই আমাকে মানতে হবে।
এইটুকু বিষয় একজন মুসলিম উম্মাহ বোঝে যে, শরিয়তের বিধানের উপর আমার কোনো হাত নেই। কিন্তু এইটা বুঝতে চায় না যে, তাদবিনি যে ঘটনাবলি আছে, সেগুলোর উপরও আমার হাত নেই। আমি কখন সুস্থ হব বা অসুস্থ হব, বা আমার ছেলেমেয়েরা সুস্থ হবে না কি অসুস্থ হবে, আমি ধনী হব না কি গরিব হব, মানুষের কাছে আমার সম্মান বাড়বে না কমবে — কোনো কিছুর উপরই আমার নিয়ন্ত্রণ নেই। অতএব, এই ব্যাপারে আমার চিন্তা করেও কোনো লাভ নেই। বরং আমি বোঝার চেষ্টা করি, আল্লাহ তা'আলা কখন কোন অবস্থা নাজিল করেছেন। যত বেশি আমি এগুলো বুঝব, তত বেশি আমি তার থেকে ফায়দা নিতে পারব।
মাছ ধরার জন্য জেলে বোঝার চেষ্টা করে যে, কোন মৌসুমে মাছ কীভাবে কোথায় ধরা পড়ে। যত বেশি যে মাছের আচরণ বোঝার চেষ্টা করবে, তার জন্য তত বেশি মাছ ধরা সহজ হবে। আমি আমার জীবন থেকে তত বেশি ফায়দা নিতে পারব, যত বেশি আমি বুঝতে পারব যে, আমার জীবন কোনদিকে চলবে। আমার জীবন আমি চালাচ্ছি না, আল্লাহ চালাচ্ছেন। যে এই কথার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবে, সে আল্লাহ তা'আলার দিকে এগিয়ে যাবে, আল্লাহর হুকুমের দিকে এগিয়ে যাবে। আর যে আল্লাহর দিকে এগিয়ে যাবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে ধীরে ধীরে বোঝার তাওফিক দান করবেন।
এজন্য অনেক আল্লাহওয়ালাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে তাদের অগ্রিম আভাস-ইঙ্গিতে বোঝা যায় যে, কবে চলে যাচ্ছেন। মৃত্যুর সময় কাছে... অনেক সময় আল্লাহ আল্লাহ জিকির করেন। কথাবার্তা, চালচলন বা আভাস-ইঙ্গিতে বোঝা যায়, অগ্রিম এর জন্য প্রস্তুতি আছে। তো যে প্রস্তুত হতে চায়, আল্লাহ তা'আলা তাকে কিছু আভাস-ইঙ্গিতও দেন। আর যে প্রস্তুত হতে চায় না, নিজের প্ল্যান-প্রোগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত, তার মন পড়ে রয়েছে আগামীকাল... সে লম্বা লম্বা প্রোগ্রাম করে কত বছরের। সে বুঝতেও চায় না, আল্লাহ তা'আলা তার তাকদিরে কী রেখেছেন। তো সে বুঝতেও চায় না, আল্লাহ তা'আলা তাকে বোঝানও না। সে অন্যের মতো চলতে থাকে, আর গিয়ে ধাক্কা খায়। আর যে বুঝতে চায়, আল্লাহ তা'আলা তাকে বোঝান।
বুঝতে কে চায়? যে নিজের পরিকল্পনাকে ছেড়েছে। আমার নিজের পরিকল্পনা যদি থাকে যে, এটা করব, ওইটা করব; তাহলে আল্লাহ তা'আলা কী করবেন — এর দিকে তো সে খেয়ালই করবে না। এজন্য আল্লাহ তা'আলা দ্বীন দিয়েছেন আর দ্বীনের প্রস্তুতির জন্য বড় নিয়ম দিয়েছেন যে, তোমার নিজের পছন্দকে ত্যাগ করতে শেখো; নিজের পরিকল্পনাকে ত্যাগ করতে শেখো। আম্বিয়া আ.-কে বড় তালিম দিয়েছেন নিজের পরিকল্পনামতো না চলার জন্য।
ইবরাহিম আ.-কে বললেন, মরুভূমিতে চলে যাও। উর্বর ভূমিতে যদি কেউ থাকে... ইবরাহিম আ. ছিলেন শামদেশে; বড় উর্বর ভূমি, ভালো বাগান। যেখানে জমি ভালো, পানি ভালো। সেখানে মানুষ প্ল্যান করবে, চাষাবাদের প্ল্যান করবে, বাগানের প্ল্যান করবে, গাছ লাগাবে, ফল বড় হবে, নিজে খাবে, সন্তানদের খাওয়াবে; কত কিছু তার প্ল্যানে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা তার সব প্ল্যান ভেঙে দিলেন একটি কথা দিয়ে, মরুভূমিতে গিয়ে তোমার পরিবারকে রেখে আসো।
মরুভূমিতে রাখার পরে যদি তাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে, তোমার পরিবার সম্পর্কে তোমার কী পরিকল্পনা? কোনো উত্তর নেই। মরুভূমিতে রাখার পরে আর কোনো পরিকল্পনা কি থাকবে? কোনো উত্তর নেই। কোনো পরিকল্পনা নেই। আল্লাহ যদি বাঁচান তবে বাঁচাবেন। তাই তাঁর উত্তর হবে, আমার কোনো পরিকল্পনা নেই।
আল্লাহ তা'আলা নিজের পরিকল্পনাকে এতবেশি ভেঙেছেন যে, তোমার স্ত্রী-সন্তানদের মরুভূমিতে রেখে আসো। আর তা না হলে মানুষের মেজাজ এরকম, সে কিছু না কিছু একটা প্ল্যান করবেই। যতই সে অপারগ হোক, তবুও সে প্ল্যান করবে। কিছুই করতে পারে না, তবুও তার মনের ভেতরে জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকবে। যাতে মনের ভেতরে কোনো প্ল্যান করতে না পারে, এজন্য পাঠালেন একেবারে মরুভূমিতে। আর মরুভূমির মেজাজ হলো, সেখানে গেলে সামনের কিছু দেখা যায় না। এর মোকাবেলায়, মানুষ তার জীবন সমসময় গড়ে উর্বর জমিতে।
উর্বর জমিতে মানুষ যে সামাজিক জীবন গড়ে তোলে তাকে বলা হয় সভ্যতা। সভ্যতার বড় একটি বৈশিষ্ট্য হলো পরিকল্পিত জীবন। পরিকল্পনা করা হয় সেখানে। একজন মানুষের কোনো পরিকল্পনা নেই বা যদি কোথাও গোটা সমাজের পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে সেটা সভ্য সমাজই না। সভ্য সমাজের বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তার পরিকল্পনা থাকে। অর্থাৎ পরিকল্পিত জীবন। ধাপে ধাপে, বিভিন্নভাবে তাকে পরিকল্পনার উপর ওঠানো হয়। ছোট ছেলে ক্লাস থ্রিতে পড়ে। তাকে রচনা লেখায়: তোমার জীবনের লক্ষ্য কী? অর্থাৎ তাকে পরিকল্পনা শেখায়। আর এর মোকাবেলায় মরুভূমিতে গিয়ে সে কী পরিকল্পনা করবে? কোনো পরিকল্পনা নেই।
আল্লাহ তা'আলা মরুভূমিতে পাঠিয়েছেন মানুষকে তার পরিকল্পনামুক্ত বানানোর জন্য। কারণ পরিকল্পনামুক্ত যদি সে না হয়, তাহলে আল্লাহ তা'আলার দেওয়া তাকদিরের দিকে সে তাকাবেই না। নিজের কোনো পরিকল্পনা নেই, সে বাধ্য হবে আল্লাহ তা'আলার দিকে তাকাতে।
মরুভূমিতে যদি কোনো লোককে রেখে আসা হয় যে ঈমানদার নয়; কিন্তু কোনো কারণে সে মরুভূমিতে তার বউ-বাচ্চা রেখে এসেছে। তখন ওই ব্যক্তি যে ঈমানদার নয়, শুধু ঈমানদার নয় — এমন নয়, বরং নামাজও পড়ে না, এবং খুব কুফরি কথা বলে যে, নামাজ পড়ে কী হবে — এখন কোনো কারণে বা কোনোভাবে যদি তার বউ-বাচ্চা মরুভূমিতে আটকা পড়ে। ধরুন, সে মরুভূমির মাঝখান দিয়ে যাচ্ছিল। পেট্রোল শেষ হওয়ার কারণে গাড়ি বিকল হয়ে মরুভূমিতে আটকা পড়েছে। যেখানে বেঁচে থাকার উপকরণ যেমন পানি, খাবার ইত্যাদির কোনো ব্যবস্থা নেই। এমন ব্যক্তি যদি গতকাল বলে থাকে যে, নামাজ পড়ে কী হবে — তাকে দেখা যাবে আজ সে নামাজ পড়ছে। তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, শুনলাম, তোমার বউ-বাচ্চা নাকি মরুভূমিতে আটকা পড়েছে? সে বলবে, হ্যাঁ। — তাহলে এখন কী উপায় হবে? সে বলবে, আল্লাহ ভরসা। এখন সে ওলি-আল্লাহ হয়ে যাবে। কারণ, নিজের পরিকল্পনা থেকে আল্লাহ তা'আলা তাকে এতটাই মুক্ত করেছেন যে, এখন আল্লাহওয়ালা হয়ে যাওয়া কোনো কঠিন কাজ নয়। যতদিন পর্যন্ত নিজের কিছু চিন্তা করতে পেরেছে, তখন নিজের উপর তার ভরসা — আমি এটা করব, ওইটা করব। তাই আল্লাহ তা'আলা আম্বিয়া আ.-কে পাঠিয়েছেন এমন অবস্থায়, যেখানে নিজের করণীয় কিছুই নেই। যেন আল্লাহর উপর ভরসা করাওয়ালা হয়।
আম্বিয়া আ. পুরো দুনিয়াবাসীকে ডাকছেন যে, নিজের চিন্তা-পরিকল্পনাকে ছাড়ো, আর আল্লাহ তা'আলা যে তাকদির নাজিল করেছেন, তার উপর চলো। যে আল্লাহর দেওয়া তাকদিরের উপর সন্তুষ্ট হয়ে যায়, তার কাছে যখন যে অবস্থা আসবে, সে তারই প্রত্যাশী হবে। তার জন্যই অপেক্ষা করতে থাকবে। যে যার অপেক্ষায় থাকে তা যদি পায় তবে তার কাছে ভালো লাগে; শান্তি লাগে; আনন্দ লাগে আর আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে। আর আল্লাহওয়ালারা নিজে চিন্তা করেন না, বরং আল্লাহ তা'আলা যা দেন, তার জন্যই দু'আ করেন। মূসা আ. দু'আ করলেন:
رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
হে আল্লাহ! আপনি আমার জন্য যা অবতীর্ণ করতে চান, আমি তারই জন্য দু'আ করছি।
কী আশ্চর্য দু'আ! এই ধরনের দু'আ যে করে, তার দু'আ রদ হওয়ার কোনো উপায় আছে? এই দু'আ কবুল হতে বাধ্য। আল্লাহ তা'আলা তাকে যাই দেবেন সে বলবে, আমি তো এটাই চাইছিলাম। যদি খেতে দেন, তবে বলবেন, আমি তো এটাই চাইছিলাম। যদি না দেন, তখনো বলবেন, আমি তো এটাই চাইছিলাম। কারণ দু'আই তো করেছেন, 'হে আল্লাহ আপনি যা দিতে চান, আমি ওইটাই চাই।' তো যখনই যা নাজিল হবে বলবে, আল্লাহ তা'আলা বড় মেহেরবান। আমি যা চেয়েছি, আল্লাহ তা'আলা তাই দিয়েছেন। মুস্তাজাবুদ দাওয়াত হয়ে গিয়েছে। সুতরাং যে এই দু'আ করে যে, হে আল্লাহ, আপনি যা দিতে চেয়েছেন আমি ওইটাই চাই, তাহলে সে তো অগ্রিম মুস্তাজাবুদ দাওয়াত হয়ে গিয়েছে। তার দু'আ তো কবুল হয়েই গেল। যে দু'আই করবে, সেই দু'আই কবুল।
মানুষ এমন দু'আ কেমন করে করবে? এজন্য আল্লাহ তা'আলা তাকে আগেই নিজের পরিকল্পনা থেকে তাঁকে মুক্তি দিয়েছেন। যদি নিজের কোনো পরিকল্পনা বা প্ল্যান-প্রোগ্রাম থাকত, তবে এই কথা বলত না; বরং আল্লাহকে কিছু বুদ্ধি দিত যে, এই কাজ এইভাবে করুন। এজন্য মানুষ সম্বন্ধে নারাজ হয়ে আল্লাহ তা'আলা সূরা হুজুরাতে বলছেন:
أَتُعَلِّمُونَ اللهَ بِدِينِكُمْ
তোমরা আল্লাহকে দ্বীন শেখাতে চাও নাকি?
মুসলমানদেরকে আল্লাহ তা'আলা বলছেন, তোমরা আল্লাহকে দ্বীন শেখাতে চাচ্ছ? আল্লাহ কি দ্বীন জানেন না?
কী আশ্চর্য কথা, আল্লাহকে কে দ্বীন শেখাতে চায়? হ্যাঁ, শেখাতে চায়। দ্বীন এভাবে শেখাতে চায় যে, আল্লাহ তা'আলাকে বলে, হে আল্লাহ! এভাবে করুন, ওইভাবে করুন; ভালো হবে। তো আল্লাহকে বোঝায়, ভালো কী আর মন্দ কী। আল্লাহকে উপদেশ দেয়। আর যে নিজেকে আল্লাহর হাতে সমর্পণ করেছে, আল্লাহ তা'আলা তাকে ইখতিয়ার (ইচ্ছাধীন) দিলেও সে নিজের ইচ্ছামতো চলে না; বরং আল্লাহর নিকট দু'আ করে, হে আল্লাহ, আপনার ইচ্ছানুযায়ী আমাকে পরিচালিত করুন।
মিরাজ গমনের সময় রাসূল সা.-এর সামনে মেহমানদারি হিসেবে সরবত পেশ করা হলো। দুধ, পানি আর জান্নাতি শরাব। ইখতিয়ার দেওয়া হলো, যেটা পছন্দ সেটাই নিন। রাসূল সা.-কে যখন ইখতিয়ার দেওয়া হলো তখন তিনি নিজের ইখতিয়ার প্রয়োগ করলেন না; বরং আল্লাহ তা'আলা যেটা পছন্দ করলেন, সেটাই নিলেন। আর তা এভাবে যে, রাসূল সা. জিবরাঈল আ.-এর দিকে তাকালেন। জিবরাঈল আ. ইঙ্গিত করলেন দুধের দিকে; রাসূল সা. দুধ নিলেন। অর্থাৎ নিজের পছন্দমতো নয়, বরং ওখানেও আল্লাহর পছন্দমতো। কারণ, আমার নিজস্ব পছন্দ তো নেই। আর আমি জানিও না যে, কোনটা ভালো। আল্লাহ তা'আলা যেটা ভালো জানেন, ওইটাই ভালো।
একজন সাহাবি রাসূল সা.-এর কাছে এসে বললেন, একটি কুরআন দিন। রাসূল সা. বললেন, এখানে আছে; তোমার পছন্দমতো নিয়ে যাও। সাহাবি উত্তরে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি আপনার পছন্দমতো দিন। নিজস্ব প্ল্যান-প্রোগ্রাম থাকলে নিজের পছন্দমতো নিত, কিন্তু তা নয়। আর প্রায়ই দেখা যায়, যখন কোনো মানুষ নিজস্ব পছন্দমতো চেয়েছেন, তখন রাসূল সা. তা বদলে দিতেন।
ফাতিমা রা. এলেন গনিমতের মালের জন্য। রাসূল বললেন, তুমি যদি চাও পাঁচটি ছাগল দেব, আর যদি চাও তবে পাঁচটি কথা দেব। ফাতিমা রা. বললেন, পাঁচটি কথাই দিন। ছাগলের চিন্তায় গিয়েছিলেন, ওইটা বাতিল করে অন্য জিনিস দিলেন। ফাতিমা রা.-এর আগে যে চিন্তা-ফিকির ছিল, যে পরিকল্পনা ছিল, সেগুলোর কিছুই দিলেন না। পাঁচটি কথা আর পাঁচটি ছাগল তো সমান নয়। পাঁচটি ছাগল জবাই করে খাওয়া যায় অথবা তার দুধ খাওয়া যায়। পাঁচটি কথা দিয়ে কী করবেন? মূলত ভুলিয়ে দিলেন যে, নিজের পছন্দ নয়; আল্লাহর পছন্দমতোই হবে।
আলি রা. রাসূল সা.-এর কাছে এসে গনিমতের মাল চাইলেন। অন্যায় কোনো চাওয়া নয়, গনিমতের মাল দেওয়া হচ্ছে। তাঁরও হক আছে; সে হিসেবে চাইলেন। রাসূল সা. বললেন, যদি চাও তাহলে তোমাকে পাঁচ হাজার ছাগল দেব, আর যদি চাও তাহলে পাঁচটি কথা। আবারো সেই একই কথা। পাঁচ হাজার ছাগল নেবেন না, পাঁচটি কথাই নেবেন। তো বারবার আল্লাহ তা'আলা আম্বিয়া আ.-কে দিয়ে... আম্বিয়া আ.-ও নিজেরা নিজেদের পছন্দমতো চলেননি, আর তাঁর নেক বান্দাদেরও নিজেরা কোনো কিছু ভেবে থাকলে বদলে দিয়েছেন। তাদের ইচ্ছা ত্যাগ করিয়ে আল্লাহর ইচ্ছায় পরিচালিত করেছেন।
ফাতিমা রা. কষ্ট করেন কাজে; একজন গোলাম থাকলে সুবিধা হতো। আলি রা. ও ফাতিমা রা. মিলে রাসূল সা.-এর নিকট একটি গোলাম চাইলেন। রাসূল সা. বললেন, এর চেয়ে আরো ভালো দেব। সেটা কী? তখন রাসূল সা. তাসবিহে ফাতিমা শিখিয়ে দিলেন। অর্থাৎ সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার এগুলো বললেন। এভাবে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ধীরে ধীরে তারবিয়্যাত করে নিজের ইচ্ছামতো চলা থেকে মুক্ত করেছেন। আর প্রতি মুহূর্তে তার মোকাবেলায় একটি দু'আ শেখাতেন যে, আল্লাহর পছন্দ কোনটা, ওইটা মোতাবেক চলা। আর যখন আল্লাহর পছন্দমতো চলা শিখতেন, তখন আল্লাহ তা'আলাও তাদেরকে ইত্মিনানের জিন্দেগি দান করতেন। কারণ, প্রতিটি অবস্থায় যদি বান্দা ওইটাই চায়, যা আল্লাহ তা'আলা নাজিল করেছেন, তখন যেটাই নাজিল হয়, ওইটাই ভালো লাগে। আমি রোদও চাইছি না, বৃষ্টিও চাইছি না; আমি যাই হবে, তাই চাইছি। যাই হবে তাই ভালো। যদি রোদ হয়, বলব যে, আমার মনমতোই হয়েছে। বৃষ্টি হলেও বলব, আমার মনমতোই হয়েছে। কারণ, তার মন তো ওই অবস্থার সাথে মিলে আছে যে, যাই হবে আমার মন তাই চায়। সুতরাং অসুস্থ হলো, আলহামদুলিল্লাহ। কেন আলহামদুলিল্লাহ? এটাই বড় ভালো হয়েছে। সুস্থ হলো, আলহামদুলিল্লাহ।
একজন আল্লাহওয়ালা বিপরীত অবস্থা হলেও শুকরিয়া আদায় করেন। সুস্থ... কেমন আছ? আলহামদুলিল্লাহ। অসুস্থ... বিছানায় পড়ে কাতরাচ্ছেন। যখন জিজ্ঞেস করা হয়, কেমন আছ? বলছেন, আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ বড় ভালো রেখেছেন। বানিয়ে বলছেন না; বরং তার মন এই কথা সমর্থন করছে যে, বড় ভালো আছি। একটার মধ্যে একেক ধরনের ফায়দা দেখেন। সুস্থতায় সুস্থতার ফায়দা দেখছেন। অসুস্থ অবস্থায় অসুস্থতার ফায়দা দেখছেন। আর ফায়দা দেখে সে গভীরভাবে আলহামদুলিল্লাহ বলছেন; বানিয়ে বলছেন না।
এজন্য আল্লাহর পথে বের হয়ে আল্লাহর কথামতো চলা শিখো। আল্লাহর কথা বলতে আল্লাহর শরঈ আহকাম নয়; আল্লাহ তা'আলা যে তাকদির আমাদের প্রতি মুহূর্তে নাজিল করে যাচ্ছেন, তার জন্য আমি আমার নিজেকে প্রস্তুত করি যে, আল্লাহ তা'আলা আমাকে যে অবস্থায় রাখেন, আমি ওই অবস্থাতেই সন্তুষ্ট। আর ওই অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার যে হুকুম, সে হুকুম আমি আদায় করব। ধনী হয়েছে... দেখবে, এই অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার কী হুকুম। সে হুকুম খুঁজে আদায় করবে। গরিব হয়েছে... এখন আল্লাহ তা'আলার কী হুকুম; দেখবে এবং আদায় করবে। সুস্থ হলো... আল্লাহর কী হুকুম; সে হুকুম বোঝার চেষ্টা করবে এবং আদায় করবে। অসুস্থ হলো, এই অবস্থায় আল্লাহর কী হুকুম, বোঝার চেষ্টা করবে এবং আদায় করবে।
প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর হুকুমমতো যে চলতে চায় এবং হুকুম অনুযায়ী যে অবস্থা নাজিল হয়েছে, সে অবস্থা থেকে আল্লাহর হুকুম খুঁজে বের করা। যেমন সন্ধ্যা হলো, আল্লাহর কী হুকুম? তুমি মাগরিবের নামাজ পড়ো। ভোর হলো, আল্লাহর কী হুকুম? ফজরের নামাজ পড়ো। সব অবস্থাকে সে দিল থেকে মানে, গ্রহণ করে, আনন্দিত হয়। আল্লাহর কাছে শুকর আদায় করে আর আল্লাহর হুকুম পালন করে।
এই ঈমানদার রাসূল সা.-ও যখন ভোর হতো, তখন আল্লাহর শুকর আদায় করতেন:
أَصْبَحْنَا وَأَصْبَحَ الْمُلْكُ لِلهِ، وَالْحَمْدُ لِلهِ
যখন সন্ধ্যা হতো তখন দু'আ করতেন:
أَمْسَيْنَا وَأَمْسَى الْمُلْكُ لِلهِ، وَالْحَمْدُ لِلهِ
ভোর হয়েছে, বড় ভালো; আলহামদুলিল্লাহ। সন্ধ্যা হয়েছে, বড় ভালো; আলহামদুলিল্লাহ। প্রতিটি অবস্থায় নিজ নিজ ফায়দাও দেখছেন, আর নিজ নিজ হুকুম আদায় করছেন।
আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকেও তাওফিক নসিব করুন, আমরাও যেন সব অবস্থায় আল্লাহর হুকুমকে দেখি এবং তা আদায় করি। আর নিজ থেকে যেন কোনো দাবি না করি যে, এই অবস্থাটি হোক। এজন্যই দ্বীনের মেহনত করা হয় যে, আমি আমার চিন্তা-পরিকল্পনাকে ছাড়তে পারি এবং আল্লাহ তা'আলা যে তাকদির নাজিল করেছেন, তা যেন মন-প্রাণে গ্রহণ করতে পারি। এটাকে দ্বীনের মেহনত বলা হয়।
অনেক সময় আল্লাহর পথে বের হই। আল্লাহর পথে বের হয়ে মেহনত করি যেন ধীরে ধীরে আল্লাহ তা'আলা আমার নফসের খাঁচা থেকে আমাদেরকে নাজাত দান করুন। আমরা নফসের খাঁচার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছি আর ওখানেই ঘুরতে থাকি ও পেরেশান হই। আর আল্লাহ তা'আলা চান, আমাদেরকে এই নফসের খাঁচা থেকে মুক্ত করবেন এবং আল্লাহ তা'আলা যে আহকাম নাজিল করেছেন, তার মধ্যে আমাদেরকে নিয়ে আসবেন। যে আল্লাহর হুকুমের মধ্যে চলতে পারবে, তার জন্য জীবন বড় সহজ, আর বড় উন্নতি।
কিছু পাখি আছে, যা খুব উচ্চে আকাশে চলে। ঈগল ইত্যাদি পাখি অনেক উপরের আকাশে ওড়ে। সে পাখিগুলো খুব বেশি পরিশ্রম করে না। তারা আকাশে গিয়ে ডানা মেলে বসে থাকে, আর ধীরে ধীরে উপরে উঠতে থাকে। অনেকক্ষণ পরে দেখা যায়, অল্পসল্প ডানা নাড়ায়। এর মোকাবেলায় দেখা যায়, একটি চড়ুই সেকেন্ডে কতশত ডানা নাড়ায়। যারা এই সম্পর্কে গবেষণা করেন তারা বলেন, চড়ুই মিনিটে নয়, সেকেন্ডে কতশত বার ডানা মেলে। এত দ্রুত ডানা চালনায় তার কত পরিশ্রম ও কত ক্লান্তি; কিন্তু যায় কত দূর? সর্বোচ্চ মানুষের মাথার উচ্চতা পর্যন্ত। চড়ুই পাখি সর্বোচ্চ ভেন্টিলেটর পর্যন্ত যায়। কত পরিশ্রম করে; কিন্তু এর মোকাবেলায় ঈগল পাখি কোনো পরিশ্রমই করে না, আর কত উপরে চলে যায়। ও কী করে? সে বাতাসের স্রোতের সাথে নিজেকে ছেড়ে দেয়, আর এই বাতাসই তাকে টেনে নিয়ে যায়। ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহওয়ালাদের জীবনে বেশি ক্লান্তি দেখা যায় না, ইত্মিনান।
আল্লাহ তা'আলা বলেনও না যে, তুমি খুব পেরেশান হও। এমনকি নামাজের ইকামত শুরু হয়ে যাচ্ছে আর মসজিদে আসছে, তখনো হুকুম নয় যে, দৌড়ে আসো; বরং ধীরে ধীরে আসো। ইত্মিনানের সাথে আসো। সুতরাং নামাজের হুকুমেও যদি দৌড়ে আসার হুকুম না থাকে, তাহলে কখন আর দৌড়ানোর হুকুম হবে? সুতরাং আল্লাহ তা'আলা একটি সহজ জীবনব্যবস্থা বান্দাদেরকে দিয়েছেন। এত সহজভাবে চলেই আল্লাহওয়ালাগণ কত উপরে চলে যাচ্ছেন। আর যারা দ্বীন থেকে দূরে, তাদের তো ক্লান্তি ছাড়া কোনো মুহূর্তই নেই।
বর্তমান আধুনিক জগতে মানুষ পেরেশান থাকে... বসে খাওয়া তো বর্তমান সমাজে একটি বিলাসিতা। তারা হেঁটে হেঁটে বা দৌড়ে দৌড়ে খায়। তারপর গেল কোথায়? সেই পেরেশান। কিন্তু এর মোকাবেলায় সুন্নাতই হচ্ছে, বসে খাওয়া। অথচ তাদের বসে খাওয়া? এত সময় কোথায়। আচ্ছা, তুমি যে এত কাজ করছ, গেল কোথায়? তোমার ক্লান্তি তো আর শেষ হলো না।
আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে ইত্মিনানের জীবন দিয়েছেন; আল্লাহ তা'আলার তাকদিরের হাতে আমি আমাকে অর্পণ করি, তাকদিরই আমাকে বহু উপরে নিয়ে যাবে। যেভাবে বাতাসের স্রোত পাখিকে বহু উপরে নিয়ে যাবে; তাকে কিছুই করতে হবে না। কিন্তু এজন্য আমাকে আল্লাহর হাতে অর্পণ করতে হবে। এজন্য আল্লাহর পথে বের হয়ে নিজ থেকে নিজেকে মুক্ত করি, আল্লাহর হাতে নিজেকে অর্পণ করি। এজন্য বলি, ভাই কারা কারা তিন চিল্লার জন্য প্রস্তুত আছেন? আমি আমার হাতে নিজেকে ছাড়ব না, আল্লাহর পছন্দমতো চলব!
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
আল্লাহর হাতে সোপর্দ: দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনের পথ
ছোট বাচ্চাকে নিয়ে মা-বাবা সফর করছেন। সফরে ট্রেনের ঝামেলা ইত্যাদি নানান অসুবিধায় মা-বাবা পেরেশান! ব...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৯ জানুয়ারি, ২০২৬
৪৫৫৪
নফি ও ইসবাত: দ্বীনের মৌলিক ভিত্তি
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ، فَاعۡلَمۡ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلّ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারি, ২০২৬
৩২৭৬
আল্লাহর ইচ্ছায় নিজের ইচ্ছা: পরিপূর্ণ বান্দা হওয়ার পথ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] স্থান: বারিধারা ডি.ও.এইচ.এস. সময়: মাগরিবের পর :১০/০৬/২০০৬ তারিখ أعُوْذ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১১ জানুয়ারি, ২০২৬
৩১২৭
দাওয়াতের প্রাণ মুহাব্বত
আল্লাহ তাআ’লা আমাদেরকে ইখলাসের হুকুম দিয়েছেন। ইবাদতের মধ্যে যেমন ইখলাস দিয়েই তার মূল্য। পরিমাণে খুবই...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৭ জানুয়ারি, ২০২৬
৪১৯৫