ইসলাম শব্দের অর্থ কী শান্তি! বাউল মতবাদ। পর্ব—৪৯
ইসলাম শব্দের অর্থ কী শান্তি! বাউল মতবাদ। পর্ব—৪৯
ইসলাম ধর্ম মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এটি কেবল পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যই প্রেরিত হয়নি, বরং ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মহল পর্যন্ত—সর্বক্ষেত্রেই দিকনির্দেশনা প্রদানকারী একটি সর্বাঙ্গীণ ও চিরস্থায়ী জীবনব্যবস্থা। এই জীবনব্যবস্থার আইন-কানুনের সামনে আত্মসমর্পণ করার নামই ‘ইসলাম’ এবং যারা আত্মসমর্পণ করে, তারা মুসলিম।
বাউল ধর্মে কী বলে?
তাদের দাবি হলো—ইসলাম মানে আত্মসমর্পণ নয়, বরং শান্তি। এই শান্তির কাজ যারা করবে, তারাই মুসলিম। দেখুন, তাদের বক্তব্য—
‘ইসলাম' অর্থ শান্তি। যে ব্যক্তি চিন্তায়, বাক্যে ও আচরণে প্রশান্তিময় আত্মদর্শন দ্বারা সব সময় জ্ঞানময় বিশেষ হালে সজাগ থাকেন তিনিই ইসলামের সুশীতল ছায়ার প্রশান্তিময় স্পর্শ পেয়েছেন বলা যায়। তাই মোহাম্মদী অর্থাৎ সম্যক গুরুমুখী সর্বকালের আত্মদর্শনমূলক সকল ধর্মই ইসলাম ধর্ম। কিন্তু আমরা বাস্তবে দেখি তার বিপরীত। সেজন্যে ফকির লালন শাহ কুধর্মের জঞ্জালভরা পৃথিবীতে ধর্মাবতাররূপে আগমন করেন ধর্মবর্ণগোত্রজাতিভেদ কলুষিত, বহুধাবিভক্ত সাম্প্রদায়িক হানাহানির বিপরীতে কোরানের একেশ্বরবাদী তথা সর্বেশ্বরবাদী হিরন্ময় জ্ঞানদ্যুতির বিচ্ছুরণ ঘটাতে:
সবে বলে লালন ফকির কোন জাতের ছেলে।
কারে বা কি বলি ওরে দিশে না মেলে
একদণ্ড জরায়ু ধওে এক একেশ্বর সৃষ্টি করে
আগমনিগম চরাচরে তাইতে জাত ভিন্ন বলে।
জাত বলতে কি হয় বিধান হিন্দু যবন বৌদ্ধ খ্রিস্টান
জাতের আছে কিবা প্ৰমাণ শাস্ত্ৰ খুঁজিলে।
মানুষের নাই জাতের বিচার এক এক দেশে এক এক আচার
লালন বলে জাত ব্যবহার গিয়েছি ভুলে। —(অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৫৯)
অর্থাৎ তারা বুঝাতে চায়—শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ করলেই বা শান্তি পথে চললেই তাকে মুসলিম বলে।
ইসলাম কী বলে?
'ইসলাম' শব্দটি আরবী। আরবী ভাষার বিশ্ববিখ্যাত অভিধান 'লিসানুল আরব' সহ অন্যান্য অভিধান অনুযায়ী শব্দটির অর্থ হলো, 'আত্মসমর্পণ করা' বা 'রব্বের বিধান মেনে নেয়া’। এটা শুধু আরবী অবিধানেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এ অর্থটি খোদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেও প্রমাণিত। হযরত আসমা বিনতে আবু বকর রা. বলেন,
لما كان يومُ الفتح قال رسولُ اللهِ ﷺ لأبي قحافةَ أسلِمْ تسلَمْ
“মক্কা বিজয়ের দিন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু কুহাফাকে বললেন, আত্মসমার্পন করো, নিরাপত্তা লাভ করবে।” –(মাজমাউয যাওয়ায়েদ, খ. ৫ পৃ. ৩০৮)
অন্য হাদিসে এসেছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন,
اللَّهُمَّ لَكَ أَسْلَمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْكَ أَنَبْتُ وَبِكَ خَاصَمْتُ
“হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছেই আত্মসমর্পণ করেছি, আপনার প্রতিই বিশ্বাস স্থাপন করেছি, আপনার উপরই ভরসা করেছি, আপনার দিকেই ফিরে যাচ্ছি এবং আপনার সহযোগিতায়ই শত্রুদের বিপক্ষে যুদ্ধ করেছি।” –(সহিহ মুসলিম : হাদিস নং : ২৭১৭)
উক্ত হাদিসদ্বয় থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘ইসলাম’ শব্দটি মূলত আত্মসমর্পণের অর্থেই ব্যবহার করতেন—অর্থাৎ, আল্লাহপাকের বিধানসমূহের প্রতি সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করা। আরও বিস্তৃতভাবে, জিবরাঈল আ.-এর প্রশ্নের জবাবে ‘ইসলাম’ এর পরিচয় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন—
الإِسْلاَمُ أَنْ تَشْهَدَ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ وَتُقِيمَ الصَّلاَةَ وَتُؤْتِيَ الزَّكَاةَ وَتَصُومَ رَمَضَانَ وَتَحُجَّ الْبَيْتَ إِنِ اسْتَطَعْتَ إِلَيْهِ سَبِيلاً . قَالَ صَدَقْتَ
“ইসলাম হচ্ছে এই– তুমি সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন ইলাহ (মাবুদ) নেই, এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল, সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, রমযানের সওম পালন করবে এবং যদি পথ অতিক্রম করার সামর্থ্য হয় তখন বাইতুল্লাহর হজ্জ করবে। সে বললো, আপনি সত্যই বলেছেন।” –(সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৮)
উপরিউক্ত হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, ‘ইসলাম’-এর মূলভাব হলো—পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর বিধানসমূহের প্রতি আত্মসমর্পণ করা।
ষড়যন্ত্রের গভীর রূপরেখা :
মূলত বাউল সম্প্রদায় মুসলিমদের নজর ‘আল্লাহর বিধানসমেত আত্মসমর্পণ করা’ বিষয়টি থেকে সরিয়ে নিয়ে মিষ্টি কথার আড়ালে এক গভীর চক্রান্তে লিপ্ত। সেটা হলো—
ক. নাস্তিকদের দাবি ‘মানবতাবাদ’-কে সামনে রেখে মানুষের মনে এই ধারণা সৃষ্টি করা যে, শুধুমাত্র যারা শান্তির কাজ করে, তারাই একমাত্র ধার্মিক। অর্থাৎ নাস্তিকদের মিশনকে সত্যায়িত করাই বাউলদের মূল টার্গেট।
খ. ইসলামের মৌলিক লক্ষ্য হলো—আল্লাহর বিধান পালন করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা। কিন্তু এদের লক্ষ্য হলো—মানুষ যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইসলামের চর্চা না করে, বরং শুধুমাত্র পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে মনোযোগী হয়। এজন্য তারা কৌশলে ‘ইসলাম’ শব্দের অর্থকে সীমাবদ্ধ করে শুধুমাত্র ‘শান্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করে।
অতএব, যদিও ইসলামে শান্তি প্রতিষ্ঠার নির্দেশ রয়েছে, এটি ইসলামের মূল লক্ষ্য নয়। তাই ‘ইসলাম = শান্তি’ এই ধারণা গ্রহণ করা উচিত নয়।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কুরআনের চেয়ে মুমিন দামী! হেযবুত তওহীদ। পর্ব–১৬
পবিত্র কুরআন সরাসরি আল্লাহপাকের কালাম। পৃথিবীর সব কিছু মাখলুক হলেও আল্লাহ-র কালাম মাখলুক নয়। সুতরাং ...
মুফতী রিজওয়ান রফিকী
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
৪০৩৩
অনলাইন দাওয়াহ
অনলাইনে দাওয়াহর মূল উদ্দেশ্য কী? মূল টার্গেট অডিয়েন্স কারা? লেখালেখিসহ অন্যান্য কন্টেন্টের কোন উদ্...
আসিফ আদনান
১১ নভেম্বর, ২০২৪
১৫৭৪৪