আল্লাহর হাতে সোপর্দ: দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনের পথ
আল্লাহর হাতে সোপর্দ: দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনের পথ
(প্রদত্ত বয়ান হতে সংগৃহীত
اَلْحَمْدُ للهِ نَسْتَعِيْنُهُ وَنَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَن يُهْدِهِ الله فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْهُ فَلَا هَادِيَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِله إِلَّا الله وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ.
فَأَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيْمِ، بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ.
وَأُفَوِّضُ أَمْرِي إِلَى اللَّهِ إِنَّ اللهَ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ.
وَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَا حَيُّ يَا قَيُّوْمُ بِرَحْمَتِكَ نَسْتَغِيْثُ، أَصْلِحْ لَنَا شَأْنَنَا كُلَّهُ، وَلَا تَكِلْنَا إِلَى أَنْفُسِنَا طَرْفَةَ عَيْنٍ أَوْ كَمَا قَالَ عَلَيْهِ الصَّلوةُ وَالسَّلَامُ.
ছোট বাচ্চাকে নিয়ে মা-বাবা সফর করছেন। সফরে ট্রেনের ঝামেলা ইত্যাদি নানান অসুবিধায় মা-বাবা পেরেশান! বাবা খোঁজখবর করছেন, অস্থির হচ্ছেন, পরস্পরে পরামর্শ করছেন যে কী করা যায়। এক হয়রানকর অবস্থা। ঠিক একই সময় তাদের সাথে থাকা ছোট বাচ্চার কোনো পেরেশানি নেই। দিব্যি আরামে ঘুমাচ্ছে, কখনো জাগছে, কখনো আঙুল চুষছে। আবার খাচ্ছে, আবার ঘুমাচ্ছে। এদিক-ওদিকে তাকাচ্ছে। তার মা-বাবা যে এত পেরেশান, এর কোনোটাই তাকে স্পর্শ করছে না। সে শুধু বসে বসে আরামে আঙুল চুষছে। কারণ, তার নিজের ওপর কোনো দায়িত্ব নেই। মা-বাবা যেসব জিনিস নিয়ে চিন্তিত, পেরেশান ও অস্থির, সেগুলো তাদেরই দায়িত্ব। সে নিজের ওপর কোনো দায়িত্ব নেয়নি, সে এসব ব্যাপারে খোঁজখবরও নেয় না।
এই ট্রেনই কি যাবে? এই ট্রেন কি লেট হয়ে যাচ্ছে? এই ট্রেন লেট হওয়ার কারণে পরবর্তী যে ট্রেন ধরার কথা, সেই ট্রেন ধরতে পারবে কি না? যদি ট্রেন ধরতে না পারে তবে মাঝরাতে স্টেশনে কী করবে? কোথায় গিয়ে থাকবে—এসব বিষয় নিয়ে মা-বাবা পেরেশান। কারণ, সম্ভবত ট্রেন যাচ্ছে না বা স্লো যাচ্ছে। আর এদিকে বাচ্চা... সে যেহেতু কোনো দায়িত্ব নেয়নি, তাই সে আরামসে তার আঙুল চোষার মধ্যেই আছে।
আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে মানুষকেও পাঠিয়েছেন। মানুষের যেভাবে চলার কথা, তার যেটুকু দায়িত্ব আছে, সেটুকু নিয়েই যদি সে ক্ষান্ত থাকত, আর যা তার ওপর নয়, নিষ্প্রয়োজনীয় দায়িত্ব যদি অকারণে না নিত, তাহলে প্রত্যেক মানুষের জীবনও সেই শিশুর মতো আরামে আঙুল চুষে চুষে অতিবাহিত করতে পারত। কিন্তু অবুঝ মানুষ নিষ্প্রয়োজনীয় অনেক চিন্তা নিয়ে পেরেশান হতে থাকে, যে ব্যাপারে তার করণীয় কিছুই নাই। অনেকদিন আগে প্রায় ১৯৬৫ সালের দিকে আমেরিকায় ইলেকশন। আমাদের দেশ বড় ইলেকশনপ্রেমিক একটি দেশ। যে দেশেরই ইলেকশন হোক না কেন, আমাদের দেশের লোকজন সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর আমেরিকার হলে তো কথাই নেই। তো আমেরিকায় ইলেকশন হচ্ছে। সেই ইলেকশনে এই ফরিদপুরের ভেতরেও দুই পক্ষ হয়ে গেল। কারণ, ইলেকশনের একজন ক্যান্ডিডেট হামফ্রে ছিল, আর অপরজন ছিল নিক্সন। তো ফরিদপুরের ভেতরেও দুই পক্ষ হয়ে গেল। কাচারির সামনে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল হইচই আর তর্কাতর্কি চলতে চলতে একপর্যায়ে গিয়ে মারামারি লাগার উপক্রম।
কিছুদিনের মধ্যেই হবে ইলেকশন; কিন্তু সেই ইলেকশন ফরিদপুরে নয়, আমেরিকায়। অথচ ওই ইলেকশন নিয়ে ফরিদপুর খুবই গরম। এটা আমি স্বচক্ষে দেখিনি, বরং শুনেছি। তো আমাদের ফরিদপুরে যে পীর সাহেব ছিলেন মাওলানা আবুল কালাম সাহেব, তাঁর পিতা সে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি এই অবস্থা দেখে সবাইকে ডাকলেন যে,
'ও মিয়ারা! যাদের ইলেকশন দিয়ে তোমরা মাথা ফাটানোর উপক্রম করছ, তাদের কাছে তোমাদের মাথার মূল্য সামান্য কাঁচা মরিচের সমানও নয়। তো কার জন্য তুমি তোমার মাথা দিতে যাচ্ছ! আর কেনই বা দিচ্ছ!
অর্থাৎ, তারা এই ইলেকশনকে নিজের দায়িত্বে নিয়ে নিয়েছে। আফসোসের বিষয় হলো, কোথাকার কোন ইলেকশন আর তারা সেটা নিয়ে মাথা ফাটানোর উপক্রম হয়ে গিয়েছে। অথচ এই সময়ে সে দিব্যি আরামে ঘুমাতে পারত, আঙুল চুষতে পারত আর কিছু না করুক; কিন্তু সে তা করছে না; বরং সে বড়ই ব্যস্ত।
১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময়ের ঘটনা
১৯৭১ সালে যখন যুদ্ধ চলছিল, আমরা তখন পাকিস্তানে ছিলাম। একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি যিনি জ্ঞানী ও শিক্ষিত মানুষ। জ্ঞানী ও শিক্ষিত মানুষ সবসময় চিন্তাবিদ হয়ে থাকে। তো চিন্তাবিদ একদিন একটা পত্রিকা হাতে করে মসজিদে এলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী কী বলেছে, সেটাকে পত্রিকায় বড় অক্ষরে হেডিং করা হয়েছে।
সে মসজিদের ভেতরে এক জামাত ছিল, তাদের মধ্যে একজন বয়স্ক মুরব্বি টাইপের সাদাসিধে এক লোক তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এই যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এই কথাটা বললেন, এ সম্পর্কে আপনার বা তাবলীগ জামাতের কী মতামত?
ওই মুরব্বি বললেন, **'ইন্দিরা অনেকদিন ধরে প্রাইম মিনিস্টার হয়েছে আর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কথা বলেছে; কিন্তু এ ব্যাপারে একবারও সে আমার মতামত নেয়নি। ওর যখন যে খেয়াল হয়েছে বলেছে, আমাকে জিজ্ঞেস পর্যন্ত করেনি। সে জন্য ওর সম্বন্ধে চিন্তা করা আমি ছেড়ে দিয়েছি। ও যদি আমাকে জিজ্ঞাসা না করেই ওর মতামত বলে দেয়, তবে আমার তো রাগ করারই কথা! আর আমি কেন খামোখা রাগ করব!'**
তো তিনি বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন, তাই চিন্তা করা ছেড়ে দিয়েছেন; কিন্তু অনেকে চিন্তা করা সারা জীবনও ছাড়েনি। জীবনে একবারও তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো না, আর সে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চিন্তা করতেই থাকল।
বড় আফসোসের কথা হলো, তারা যে চিন্তা করেই কথা শেষ হয়েছে, তা নয়; বরং এসব চিন্তা করার কারণে তার সম্পূর্ণ জীবনটাই বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে রয়েছে। সহজেই এ বিষয়গুলো নজরে পড়ে না। তবে ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, মানুষের জীবনের প্রধান অংশ ওইসব চিন্তা-ফিকির-দুশ্চিন্তার পেছনে খরচ হচ্ছে, যা তার সাথে কোনোভাবেই প্রাসঙ্গিকই ছিল না। এটা তার কোনো বিষয়ই ছিল না। অন্যের বিষয়াদি নিয়ে সে তার জীবনটাই শেষ করে দিচ্ছে।
অপ্রয়োজনীয় চিন্তার কুফল
এই মৌলভীবাজার শহরের কেন্দ্রে নয়, অথচ এর একেবারে বস্তিতেও দেয়ালে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ইত্যাদি লেখা দেখি। আর নিশ্চয়ই এগুলো নিয়ে মাথা ফাটাফাটি হয়ে থাকে। কোথায় ব্রাজিল আর কোথায় আর্জেন্টিনা! যারা এখানে এদেরকে নিয়ে মারামারি করছে, তাদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, ব্রাজিল কোথায়? ডানে না বাঁয়ে? উপরে না নিচে—বলতে পারবে না। বলতে পারার কথাও না; কিন্তু এটা নিয়ে সে বড়ই চিন্তার মধ্যে।
এই দুশ্চিন্তার মধ্যে সে তার জীবন শেষ করে দিচ্ছে, তার রক্তচাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার হার্টে পেরেশানি আসছে, অস্থির হচ্ছে, ঘুমাতেও পারছে না। মোটকথা, সে খুবই পেরেশানির মধ্যে আছে। প্রধানমন্ত্রীর একটা উক্তি যা তার জন্য খুবই অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু সে এটা নিয়ে রাত জাগছে। যদিও এগুলো তার কোনো প্রয়োজন ছিল না। যদিও সে ভাবছে, আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করছি।
অথচ যদি সে এই চিন্তাগুলো ছাড়তে পারত, তবে সেও আরামে ঘুমাতে পারত; কিন্তু বেশুমার চিন্তা নিয়ে তার ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে, পেরেশান হচ্ছে। শুধু যে তার ঘুম হারাম হচ্ছে, তা নয়; বরং এই সময় নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে সে তার নিজের প্রয়োজনীয় কাজ যেগুলো ছিল, সেগুলোও করতে পারছে না।
ফরিদপুরের ওই বিবাদমান দুই পক্ষ যদি আমেরিকার ইলেকশন নিয়ে ব্যস্ত না হত, তবে চাওয়ালা হয়তো আরেক পেয়ালা চা বেশি বিক্রি করতে পারত, আর এতে তার দু পয়সা লাভ হত। কৃষক আরেকটু বেশি জমি হাল চাষ করতে পারত, আর এতে তারও দু পয়সা বেশি লাভ হত। আর যদি আল্লাহ তায়ালা তাকে আরও বেশি জ্ঞানবুদ্ধি দিতেন তবে নামাজ পড়তে পারত, তাসবিহ আদায় করতে পারত, একবার সুবহানাল্লাহ বলতে পারত। এই সব জিনিসগুলো তার জন্য বড়ই লাভের ছিল; কিন্তু বেকার জিনিসের পেছনে গিয়ে শুধু যে লাভের জিনিসগুলো হারাল তা নয়, বরং পেরেশানি আর অস্থিরতা সঙ্গী করে নিল।
---
আত্মহত্যার ঘটনা
এমন খবরও কখনো কখনো পত্রিকায় আসে যে, কোথাকার কোন চিত্রকর মারা গিয়েছে, আর তার দুঃখে একজন আত্মহত্যাই করে বসে। আমি যখন এই বিষয়টা শুনলাম তখন খুবই কষ্ট লাগল। আগে তো জানতাম, এই বিষয়গুলো ওই আমেরিকাতেই ঘটে। এখন দেখছি আমাদের দেশেও এমন আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে।
যদিও একজন বুদ্ধিমান মানুষের জন্য এই কথাগুলো বিশ্বাস করা অত্যন্ত কঠিন যে, একজন মানুষ কী মাত্রায় অবুঝ হতে পারে। সুতরাং যার বুঝ রয়েছে, তার জন্যে এটা কল্পনা করাও মুশকিল। যেমন, একজন বুদ্ধিমান লোক অঙ্ক ইত্যাদি খুব ভালো করে জানে। তাকে যদি বলা হয় যে, দুই আর দুই মিলে চার হয়—এ বিষয়টা হিসাব-নিকাশ করে মেলানো যাচ্ছে না। তখন একজন সাধারণ মানুষের জন্য এ কথাটা বোঝা খুবই মুশকিল যে, দুই আর দুই মিলে যে চার হয়—এই সামান্য কথাটা মেলাতে পারছে না!
আর কিছু না পাক, দুটো আঙুলকে দুটো আঙুলের সাথে মেলালেই তো চার হয়ে যায়—এটা প্রমাণ করা যায়। সুতরাং তার জন্য বোঝা মুশকিল যে, এই সহজ বিষয়টা কেন সে বুঝবে না! না বোঝার কী হল এর মধ্যে! তো একজন সাধারণ মানুষ যখন বিবেচনা করে, তার জন্যও চিন্তা করে বের করা মুশকিল, মানুষ কত অবুঝ হতে পারে আর কত তুচ্ছ তুচ্ছ জিনিসের জন্য নিজেকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
কোথায় কে মারা গেল... সেটা আমার কিছু নয়, আমার লাভেরও কিছু নয়, সে কোথাকার কোন ব্যক্তি, তার কোনো কিছুই আমার জন্য মূল্যবান নয়। তার নিজের জীবনও আমার জন্য মূল্যবান নয়, এরকম হাজারো লাখো মানুষ মরে গেলে দুনিয়ার কোনো ক্ষতি হয় না। অথচ ওরকম একজন মানুষ মরে গেল আর তার দুঃখে সে আত্মহত্যা করে ফেলল! বড়ই আশ্চর্যের কথা।
---
কুকুরের হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা
আমাদের সিলেটে বড়লেখা নামে একটা এলাকা আছে। সেখানকার অধিবাসী আমার এক আত্মীয় বর্তমানে তিনি ইংল্যান্ডে ডাক্তারি পেশায় আছেন। তো ইংল্যান্ডের জিপি-দের একটা দায়িত্ব থাকে যে, ওই অঞ্চলের রোগীরা ডাক্তারকে যেকোনো সময় ডাকতে পারে। তো একদিন রাত ১২টার সময় তার ডাক পড়লে তিনি গেলেন। গিয়ে দেখলেন একজন বয়স্ক মহিলা। জিজ্ঞাসা করলেন, কী সমস্যা?
মহিলা বললেন, সমস্যা হলো, আমার কুকুরের হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হচ্ছে। কুকুরটা বড়ই অস্থির। তাই আশঙ্কা করছি যে, কুকুরের হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতে পারে। সে জন্যই আপনাকে ডেকেছি।
ডাক্তার বললেন, কুকুরের হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে, তো কুকুরের ডাক্তারকে ডাকবেন। আমাকে কেন ডেকেছেন! আমি তো মানুষের ডাক্তার।
মহিলা বললেন, না, না। আপনাকে ডেকেছি—এর যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে। কারণ, কুকুরের এই অবস্থা দেখে আমারও ভয় হচ্ছে, আমার বুঝি হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে।
অর্থাৎ মহিলা কুকুরের অস্থিরতা দেখে ভয় পেয়ে ভাবছে নিজেরও হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতে পারে। আর এ ভয়েই ডাক্তার ডেকেছে। তো কুকুরের হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতে পারে এই ভয়ে কুকুরওয়ালা নিজেই মরে যাবে দুঃখে—সাধারণ মানুষের জন্য এই কথাটা বোঝা একটু কঠিন; কিন্তু মানুষ যখন অবুঝ হয় তখন কত যে অবুঝ হতে পারে, এটা মানুষের কল্পনাতীত। মানুষ যে কত বেকুব হতে পারে, মানুষ তার মূল্যবান জীবন কত তুচ্ছ জিনিসের জন্য নষ্ট করে দিতে, ধ্বংস করে দিতে পারে তা অবিশ্বাস্য; কিন্তু মানুষ এমনটিই করছে।
আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর উদ্দেশ্য
আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন, দুনিয়ায় মানুষের এই জ্ঞানহীনতা, তার বুদ্ধিহীনতা আর তার নিজের হাত থেকে যেন তাকে উদ্ধার করতে পারেন। যদি সে উদ্ধার হয় তবে আল্লাহ তায়ালা সবার জন্য 'হায়াতে তাইয়্যেবা'-র ওয়াদা করেছেন।
মানুষকে দুনিয়ায় পাঠানোর আগে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য নির্ধারিত পথ এবং সে পথের সমাপ্তিতে বড় সুন্দর জান্নাত নির্ধারিত করেছেন। আর তাকে তার পথও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যে পথে চলার জন্য তাকে কোনো ধরনের পরিশ্রম করতে হবে না।
আকাশের তারকা যেরকম স্থির দেখা যায়... যারা এর সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, তারা বলেন এগুলো স্থির নয়, দ্রুত গতিতে চলছে। কিন্তু এই চলার জন্য তাকে কোনো ধরনের কষ্ট করতে হচ্ছে না। এই পৃথিবীও যেরকম চলছে, পৃথিবীর চলার জন্যও কোনো ধরনের কষ্ট করতে হচ্ছে না। বিনা পরিশ্রমে মহাশূন্যে পৃথিবী স্বীয় গতিতে চলছে। এই চলার ভেতরই তার নিরাপত্তা। যদি এই চলা থেমে যায় তবে তা পড়ে যাবে, ভেঙে যাবে।
আকাশের তারকাগুলো তার নিজ নিজ পথে যাকে কক্ষপথ বলা হয়, এতে সে তার নির্ধারিত গতিতে চলমান রয়েছে। এই চলার পথেই তার সৌন্দর্য আছে, নিরাপত্তাও আছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
আল্লাহ তায়ালা আকাশকে তাঁর আদেশ দিয়েছেন, গ্রহ-নক্ষত্রকে তাঁর আদেশ দেওয়া হয়েছে। আর এই আদেশগুলো তারা পালন করছে। আর এর ভেতর দিয়ে আল্লাহ তায়ালা আকাশের সৌন্দর্যও দিয়েছেন, নিরাপত্তাও দিয়েছেন।"(সূরা ফুসসিলাত, আয়াত ১২)
এই তারকাগুলো যে নিজ নিজ কক্ষপথে চলছে, এই চলার মধ্য দিয়ে তাদের নিরাপত্তাও আছে, সৌন্দর্যও আছে। যদি সে তার কক্ষচ্যুত হয় তবে আকাশের সৌন্দর্যও থাকবে না, নিজেদের নিরাপত্তাও থাকবে না, অন্যের নিরাপত্তাও থাকবে না।
আল্লাহ তায়ালা মানুষকেও সেরকমভাবে নিজেদের নিরাপত্তার একটি পথ দিয়েছেন। এই পথে চলায় তার কোনো ক্লান্তি নেই। যদি সে ওই পথেই চলতে থাকে, তবে বড় নিরাপত্তার চলা হবে, বড়ই সুন্দর চলা হবে আর অবশেষে সে জান্নাত পাবে।
সাহাবীদের দৃষ্টান্ত
আল্লাহ তায়ালা মানুষের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে কসম খেয়েছেন 'তারকার অবস্থানের'। তারকার অবস্থানের কসম করার সামঞ্জস্যও আছে। রাসূল (সা.) মানুষকে, সাহাবীদেরকে তারকার সাথে তুলনা করেছেন। কারণ সাহাবীদের ওই আকাশের তারকার মতো জীবন ছিল। ইসলাম কবুলের পরে দুশ্চিন্তাহীন জীবন, সহজ জীবন আর তারা এভাবে বহু দূর পৌঁছে যাচ্ছেন।
সুহাইব রুমী (রা.)-এর ঘটনা
সুহাইব রুমী (রা.) হিজরত করে মদিনায় এসে পৌঁছলেন। ইতিপূর্বে যখন তিনি হিজরত করতে মনস্থির করলেন তখন মক্কাবাসী তাকে বাধা দিল। বলল, "তুমি বিদেশি লোক। এখানে এসে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছ, ধনসম্পদ উপার্জন করেছ, এগুলো নিয়ে যেতে পারবে না। তুমি এখানে এসে বিয়ে করেছ, তোমার পরিবারের লোকদেরকেও নিয়ে যেতে পারবে না।"
অতঃপর তিনি তার পরিবার ছেড়ে, সম্পদ ছেড়ে, দাস-দাসী ছেড়ে, ঘরবাড়ি ছেড়ে অর্থাৎ সবকিছু ছেড়ে একেবারে রিক্তহস্তে মদিনা এসে পৌঁছলেন। বিদেশি ভাষায় একে বলে, "শুধুমাত্র দাঁতের চামড়া সাথে নিয়ে।" আসলে দাঁতের আবার চামড়া কোথায়? অর্থাৎ, কিছুই না। কারণ দাঁতের তো চামড়াই নেই।
তিনি যখন মদিনায় পৌঁছলেন, তখন তিনি নিঃস্ব, সব হারিয়ে এসেছেন। রাসূল (সা.) তাকে খুব খুশি প্রকাশ করে মারহাবা জানালেন। বললেন:
হে ইয়াহইয়ার পিতা, লাভের ব্যবসা করে এসেছ।
তিনি মদিনায় এসে যখন রাসূল (সা.)-এর দরবারে পৌঁছলেন, তখন রাসূল (সা.) খেজুর খাচ্ছিলেন। তিনিও সে খাবারে শরিক হয়ে খেজুর খেতে লাগলেন। ওদিকে তার এক চোখ উঠেছিল। 'চোখ উঠা অবস্থায় খেজুর খাওয়া ক্ষতিকর'—এরকম কথা প্রচলিত ছিল। তাই রাসূল (সা.) বললেন, "তোমার চোখ উঠেছে, আর তুমি খেজুর খাচ্ছ?" তিনি উত্তরে বললেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আমার অপর চোখের পক্ষে খেজুর খাচ্ছি।" অর্থাৎ, রসিকতা করলেন।
দেখুন, যে ব্যক্তি তার সমুদয় সম্পদ হারিয়ে এসেছে, সে এত রস কোথায় পেল যে এরপরও রসিকতা করছে! তার তো ওই দুশ্চিন্তাতেই কাঁদার কথা যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কী আর খেজুর খাব, আমার তো সবই শেষ। এখন না খাওয়ার রুচি আছে, না বসার রুচি আছে। কারণ, আমি তো সব হারিয়ে এসেছি।
যেখানে তার কাঁদার কথা ছিল, সেখানে তিনি রীতিমতো রসিকতা করছেন! এত রস পেলেন কোথায় এই দুশ্চিন্তার মধ্যে? কারণ, তিনি ওই শিশুর মতো, যার মা-বাবা বড় দুশ্চিন্তার মধ্যে আছে, কিন্তু সে দিব্যি আঙুল চুষছে। তার কোনো দুশ্চিন্তাই নেই। সে আঙুল চুষা নিয়েই ব্যস্ত। কারণ, কোনো দুশ্চিন্তাই তার নয়—এই সম্পদ গেলেই বা কী, আর এলেই বা কী? আমার রিজিকের নিশ্চয়তা তো আগে থেকেই আছে। আল্লাহ তায়ালা আসমানে রিজিক রেখেছেন।
সুতরাং যে এই ধ্রুব সত্য জানে, তার সব সম্পদ চলে গেলেও সে রিজিকের বিষয়ে আর কোনো চিন্তা করবে না। সবকিছু হারালে হারিয়ে যাক তবুও সে রিজিকের বিষয়ে কোনো চিন্তাই করবে না।
উমর (রা.) যখন অন্তিম শয্যায় শায়িত, তখন এই সুহাইব (রা.)-কে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ওসিয়ত করে গিয়েছিলেন, সুহাইব (রা.) যেন উমর (রা.)-এর জানাজার নামাজ পড়ান। জানাজার নামাজ পড়ালে কী হয়? কারণ মানুষ মান-সম্মানের বিষয়ে আকাঙ্ক্ষী হয়। সুহাইব (রা.)-এর কাছে কিছুই ছিল না। কিন্তু উমর (রা.) ওসিয়ত করলেন যে, সুহাইব যেন আমার জানাজার নামাজ পড়ায়। এটা দুনিয়ার দৃষ্টিতে কোনো ছোট বিষয় নয়—বহুৎ বড় মর্যাদা, অনেক বড় সম্মান।
সুতরাং ঈমানদারদের জন্য এগুলো আগে থেকেই নিশ্চিত, দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।
হায়াতে তাইয়্যেবার ওয়াদা
আল্লাহ তায়ালা নবীগণকে পাঠিয়েছেন হায়াতে তাইয়্যেবার ওয়াদা দিয়ে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
"যে নেক আমল করে, চাই সে পুরুষ হোক বা নারী, কিন্তু সে মুমিন—ঈমানওয়ালা, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য অগ্রিম হায়াতে তাইয়্যেবার ওয়াদা করেছেন।" (সূরা নাহল, আয়াত ৯৭)
হায়াতে তাইয়্যেবার বড় একটি অংশ হল দুশ্চিন্তামুক্ত মানুষ। অন্যান্য জিনিসও আছে, তবে সাথে সাথে দুশ্চিন্তামুক্ততাও আছে। কারণ, দুশ্চিন্তা এমন একটি জিনিস, যখন এটি থাকে তবে কোনো জিনিসের স্বাদ থাকে না। না নাতিকে আদর করা হয়, না খাবার উপভোগ করা হয়, না আরাম বিছানায় ঘুম থাকে—কোনো কিছুই স্বাদ থাকে না। সব নষ্ট হয়ে যায়।
মনে দুশ্চিন্তা থাকা অবস্থায় নাতি এসেছে, কিন্তু নাতির দিকে তাকিয়েও কোনো আনন্দ পাওয়া যাচ্ছে না। হালুয়া খেতে দিয়েছে, কিন্তু মুখে দেওয়ার পর কোনো স্বাদ পাওয়া যাচ্ছে না। আরামের বিছানায় ঘুমিয়েছে, কিন্তু কোনো আরাম পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ, ভেতরের দুশ্চিন্তা, পেরেশানি এই সব আরামকে ছিনিয়ে নিয়েছে। শরীরের আরাম, মনের আরাম—সব ছিনিয়ে নিয়েছে।
দুনিয়ার মানুষ সবকিছু পাওয়ার পর দুশ্চিন্তার কারণে সে কোনো আনন্দ পাচ্ছে না। যদি এই দুশ্চিন্তার উৎস খোঁজ করা হয় তবে জানা যাবে যে, এই দুশ্চিন্তার বিষয়বস্তুর সাথে তার ন্যূনতম কোনো সম্পর্কই নেই। কোথায় কে মরল আর কোথায় কে বাঁচল—এটি নিয়েই সে পেরেশান, বড় দুশ্চিন্তার মধ্যে সে ডুবে আছে। অথচ এ চিন্তা করা তার কোনো প্রয়োজন ছিল না।
আল্লাহ তায়ালা নবীগণকে পাঠিয়েছেন যেন মানুষকে তার কাজের দিকে ডাকা হয়। তুমি তোমার করণীয় যা, সে বিষয়ে চিন্তা করা শেখ আর দুনিয়ার সব অহেতুক চিন্তা থেকে নিজেকে মুক্ত কর।
বদর যুদ্ধের শিক্ষা
রাসূল (সা.) বদরের সময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। হঠাৎ করেই বদরের এই ঘটনা সামনে চলে এল। রাসূল (সা.) বদরের ময়দানে যখন গিয়েছিলেন তখন মক্কার কাফের বাহিনীর সাথে মোকাবেলা করার কোনো প্রস্তুতি নিয়ে যাননি এবং মোকাবেলা করতে হবে, এটা ধারণার মধ্যেও ছিল না। উপস্থিত হওয়ার পর সম্পূর্ণ বিষয় পরিবর্তন হয়ে গেল।
৩১৩ জন মুসলমান নিয়ে প্রায় অস্ত্রহীন, মাত্র দুটি তলোয়ার আর ৮টি বর্শা ছিল। অর্থাৎ, কোনো অস্ত্র নেই বললেই চলে। আর ওদিকে মক্কাবাসী সংখ্যায় হাজার জন, সবাই সশস্ত্র। ঢাল, তলোয়ার, বর্শা, গায়ে লোহার জামা, মাথায় লোহার শিরস্ত্রাণ পরে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তারা ময়দানে এল।
রাসূল (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে সম্পূর্ণ অবস্থা অবগত করে বললেন, "এ অবস্থায় আমরা কী করব?" পরামর্শ চাইলেন। আবু বকর (রা.) উত্তর দিলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি যাই বলবেন, আমরা করতে প্রস্তুত রয়েছি। আমরা পুরোপুরি তৈরি।"
আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর মধ্যে কোনো পেরেশানি নেই, কোনো অস্থিরতা নেই, সম্পূর্ণ তৈরি।
রাসূল (সা.) একই কথা আবারও বললেন। আবারও আবু বকর (রা.) বললেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।" রাসূল (সা.) আবারও বললেন, আর আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সেই একই উত্তর দিলেন।
রাসূল (সা.) যখন সেই একই প্রশ্ন আবার করলেন, তখন আনসারি সাহাবীদের সর্দার সাদ ইবনে উবাদা (রা.) বললেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি মনে হয় আমাদের অর্থাৎ আনসারদের কাছ থেকে কিছু শুনতে চান?
আমরা আপনাকে নবী হিসেবে গ্রহণ করেছি আর আপনাকে এই মদিনাতে আমরা এনেছি। এখন মদিনার ভেতরে লড়াই হলে আমরা আপনার পাশে দাঁড়াব আর মদিনার বাইরে লড়াই হলে আমরা যাব না—এমন নয়। বরং মদিনার ভেতরে হোক বা বাইরে আমরা আপনার পাশে থেকেই লড়ব।
আমরা মুসা (আ.)-এর কওমের মতো না, যারা বলেছিল: **'মুসা! তুমি আর তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ কর, আমরা এখানেই বসে থাকব।'** বরং আমরা বলব: **'আপনি ও আপনার রব যুদ্ধ করুন, আমরা আপনার সাথেই লড়াই করব।'**
যে সম্পদ আপনি আমাদের থেকে নিয়ে নিয়েছেন, ওই সম্পদ আমাদের কাছে রয়ে যাওয়া সম্পদ থেকেও বেশি প্রিয়, আমাদের কাছে বেশি আনন্দের। যে আত্মীয়তা আপনি রাখতে বলবেন, আমরা সে আত্মীয়তা রাখব। যে আত্মীয়তা আপনি বিচ্ছিন্ন করতে বলবেন, সে আত্মীয়তা আমরা ত্যাগ করব। যদি পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিতে বলেন, পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেব। যদি 'বরকে মাজেদ' (ইয়ামেনের নামকরা একটি পুকুর) চলে যেতে বলেন, উটের লাগাম উঁচু করে বরকে মাজেদ চলে যাব।"
রাসূল (সা.) এই উত্তর শুনে সন্তুষ্ট হলেন। তিনি এটাই চাচ্ছিলেন।
সাদ ইবনে উবাদা (রা.) কী বলছেন! যার মাথার উপর ঢাল তলোয়ার নিয়ে শত্রু বাহিনী আক্রমণ করতে উদ্যত অথচ এর বিপরীতে তার কাছে কিছুই নেই, সে অবস্থায়ও তিনি এত সাহিত্যরস পেলেন কোথায়?
রাসূল (সা.) যে প্রশ্নগুলো করলেন, সে প্রশ্নগুলোতে কী ইঙ্গিত, তা তিনি বুঝলেন। এবং সে ইঙ্গিতের লম্বা-চওড়া একটি উত্তর দিলেন। যে উত্তরের মূল প্রসঙ্গ বাদ দিয়েও যদি কোনো কবি এভাবে কাল্পনিকভাবে কিছু কথা বলতে পারে তবে নিজেকে সে ধন্য মনে করবে যে, আমি এত সুন্দর করে কথাগুলো সাজাতে পারলাম। কতই না সাহিত্যপূর্ণ ছিল তার এই বক্তব্য!
সা'দ বিন উবাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু যুদ্ধের ময়দানে যে অলংকারপূর্ণ ভাষণ দিচ্ছেন, শান্ত অবস্থায়ও মানুষ এই ধরনের বক্তব্য দিতে গিয়ে নার্ভাস হয়ে যাবে, ভাষণ এলোমেলো হয়ে যাবে। অথচ সেই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তাঁর মনের ভয় গেল কোথায়? বিশাল বাহিনী যে আক্রমণ করছে—সেই দুশ্চিন্তাই বা গেল কোথায়? না আছে ভয়, আর না আছে দুশ্চিন্তা; বরং ইতমিনানের (প্রশান্তির) মধ্যে আছেন। চূড়ান্ত ইতমিনান না থাকলে কথা এত সুন্দর সাজানো যায় না। কথা সাজানোর জন্য ইতমিনানের প্রয়োজন আছে।
আমরা তো দেখি, যখন নতুন কোনো সাথি জামাতে বের হয়, তখন তাকে ঘোষণা করতে বলা হলে সে ঘোষণায় গণ্ডগোল বাধিয়ে বসে।
একটি চমৎকার ঘটনা
আমরা এক জামাতে ছিলাম। যথারীতি একজনকে ঘোষণার দায়িত্ব দেওয়া হলো। দায়িত্বপ্রাপ্ত ভাই কিছুটা বয়স্ক আর তাবলিগে নতুন ছিলেন। ঘোষণা দিতে গিয়ে তিনি সালামের আগেই ঘোষণা দিয়ে দিলেন! কারণ, তাঁর মধ্যে নামাজের বৈঠকেও ঘোষণার চিন্তা আর পেরেশানি ছিল। দুই সালামের এক সালাম হয়েছিল; কিন্তু ঘোষণার চিন্তায় আরেক সালামের কথা তাঁর মনেই ছিল না।
ঠিক তেমনিভাবে সা'দ বিন উবাদা রাদিয়াল্লাহু আনহুদেরকে বদর যুদ্ধের ময়দানে যে বাহিনী এসে—আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল যে সব পিষে ফেলবে—সেই কঠিন অবস্থায় তাঁরা এতটা ইতমিনানের মধ্যে ছিলেন। আর যাঁরা সেই অবস্থাতেও এতটা মুতমাইন (প্রশান্ত) থাকেন, তাঁদের মুতমাইন না থাকাটাই অস্বাভাবিক।
শত্রুর তলোয়ারের নিচেও ঘুম
শত্রুর তলোয়ারের নিচেও তাঁদের ঘুম এসে যেত। যুদ্ধের ময়দানে তাঁদের তন্দ্রা চলে আসত। অথচ যুদ্ধের কথা শুনলে দূর-দূরান্তের গ্রামের মানুষদেরও ঘুম উড়ে যায়। কিন্তু সাহাবাদের যুদ্ধের ময়দানেই তন্দ্রা আসছে। তাঁদের তন্দ্রার বিষয়টি কুরআনেও উল্লেখ আছে।
কেন? কারণ, আল্লাহ তা'আলা তাঁদের অন্তর থেকে ভয় জাতীয় সবকিছু দূর করে দিয়েছিলেন। কেন দূর করেছেন? কারণ, তাঁরা নিজেদেরকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ তা'আলার হাতে সোপর্দ করতে শিখেছেন।
কুরআনের ভাষায়:
**وَأُفَوِّضُ أَمْرِي إِلَى اللهِ**
"আমি আমার সব বিষয় আল্লাহর কুদরতি হাতে অর্পণ করলাম।"
## রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশান্তি
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমানোর আগে যেসব দোয়া পাঠ করতেন, কখনো কখনো সেই দোয়াগুলোর মধ্যে এই দোয়াটিও পাঠ করতেন:
**أَسْلَمْتُ نَفْسِي إِلَيْكَ، وَفَوَّضْتُ أَمْرِي إِلَيْكَ**
"আমি আমার সব বিষয় তোমার কুদরতি হাতে সোপর্দ করে ঘুমালাম।"
আল্লাহর হাতে যদি সব বিষয় সোপর্দ হয়ে যায়, তাহলে কোনো চিন্তার দরকার নেই।
### তলোয়ারের নিচে প্রশান্তি
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তলোয়ার একটি গাছে ঝুলিয়ে তার ছায়ায় বিশ্রাম করছিলেন। এক কাফের তাঁকে দেখে ভাবল, এই তো সুযোগ পেয়েছি! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরে তলোয়ার তুলে ধরল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই সময় জেগে উঠলেন। তাঁর হাত খালি আর কাফেরের হাতে তলোয়ার। সে বড় দম্ভের সাথে বলল, "তোমাকে আমার তলোয়ার থেকে কে বাঁচাবে?"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো ভয় নেই, কোনো দুশ্চিন্তা নেই, ইতমিনানের সাথে বললেন, "আল্লাহ।"
অর্থাৎ, তিনি শুধু মৌখিক দোয়া পাঠ করে বলেননি যে, আমি নিজেকে আপনার কাছে সোপর্দ করলাম; বরং বাস্তবেই অন্তরে উপলব্ধির সাথে সোপর্দ আছেন যে, নিজের নিরাপত্তার চিন্তাও নিজেকে করতে হবে না।
শিশুদের মতো নিশ্চিন্ত
ছোট বাচ্চারা যেরকম—না তারা খাবারের চিন্তা করে, না তারা ঘুমের চিন্তা করে, না নিরাপত্তার চিন্তা করে; বরং কোনো চিন্তাই করে না, সবগুলোই তারা এমনিতেই পেয়ে যেতে থাকে।
ঈদের বাজারে যখন মানুষের শ্বাস নেওয়ার জায়গা নেই, অর্থাৎ প্রচণ্ড দমবন্ধ অবস্থা; সেখানে বাচ্চা দিব্যি আরামে ঘুমাচ্ছে আবার আঙুলও চুষছে। এত ভিড়, এত যাত্রীর মধ্যে আমি যে জায়গাটুকু পেয়েছি, তাতেই আমি খুশি থাকি—তাও নয়; তার কোনো পরোয়াই নেই। এরপর যদি তার গরম লাগে, তবে তাকে বাতাসও করতে হবে। কোনো কিছুর অভাবই সে মানবে না আর কোনো পরিস্থিতির চিন্তাও সে করবে না।
ঠিক এই ছোট বাচ্চার মতো তার বাবাও যদি থাকতে পারত, তাহলে ছোট বাচ্চা যেমন নানা ধরনের জিনিস দাবি করে, বাবাও সেসব জিনিস দাবি করতে পারত।
কাফেরের পরিণতি
তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "আল্লাহ!" এই উত্তরে তার উপর এত প্রভাব পড়ল, এত ভয় লাগল যে তার শরীর কাঁপতে কাঁপতে তলোয়ার পড়ে গেল।
এখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই তলোয়ার হাতে নিলেন এবং সেই একই প্রশ্ন করলেন যে, "বল! এখন তোমাকে কে বাঁচাবে?"
তো সে তো "আল্লাহ বাঁচাবে" এ কথা জানে না। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জীবন ভিক্ষা চাইল। বলল, "কুন খায়রা আখিয" অর্থাৎ, "উত্তম অস্ত্রধারী হও"—আমাকে মাফ করে দাও। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কালেমার দাওয়াত দিলেন; কিন্তু সে এই দাওয়াত কবুল তো করল না, তবে এই ওয়াদা করল যে, আমি আপনার বিরুদ্ধে লড়ব না আর আপনার বিরুদ্ধে যারা লড়ছে তাদের সাহায্যও করব না। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ছেড়ে দিলেন।
তো বিষয় হলো, শত্রু মাথার উপর তলোয়ার ধরে বলছে, "তোমাকে কে বাঁচাবে?" এই ভয়ংকর অবস্থাতেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো পেরেশানি নেই, পুরোপুরি মুতমাইন (নিশ্চিন্ত)।
মালিকের হাতে সোপর্দ
বান্দা যদি নিজেকে মালিকের হাতে ছাড়তে পারে, তবে তার কোনো চিন্তার দরকার নেই; আর সব বিলাসিতাই সে করতে পারবে। যেকোনো সময় যেকোনো দাবিই সে করতে পারবে। কারণ, নিজের উপর সে নির্ভরশীল নয়।
বাচ্চারা যেমন যেকোনো সময় যেকোনো দাবি করে বসে। যখন তখন দাবি করে। কোনোকিছুর পরোয়াই সে করে না।
মধ্যরাতে রসগোল্লা
আমার বোনের নাতিরা থাকে ঢাকায়। ওরা ছুটিতে সিলেটে বেড়াতে এসেছে। মাঝরাতে উঠে বলল, "রসগোল্লা খাব।" অসময়, তাই ঘুম পাড়ানোর নানান চেষ্টা করা হলো। এটা ওটা দিয়ে ভোলানোর পর মনে হলো, রসগোল্লার কথা হয়তো ভুলে গেছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার বলছে, "রসগোল্লা খাব।"
যেহেতু দাদি আর নাতিরা সবসময় কাছে থাকেও না, তাই আবদার পূরণ করবেন। শেষ পর্যন্ত সেই মাঝরাতেই মিষ্টিওয়ালার বাড়িতে লোক পাঠিয়ে মিষ্টিওয়ালাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে রসগোল্লা আনা হলো। আর নাতিও জেদ ধরে জেগে আছে যে সে রসগোল্লা খাবেই খাবে।
এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে গভীর রাতে রসগোল্লা কীভাবে পাওয়া যাবে—এ জাতীয় কোনো চিন্তা শিশুটি তার নিজের দায়িত্বে নেয়নি, তাই যখন তখন সে তার দাবি করতে পারে। আর যে এটি নিজের দায়িত্ব মনে করে, সে তখন অনেক চিন্তা করবে যে, এত রাতে রসগোল্লা কোথায় পাব? এখন না খেয়ে দিনে খেলেও তো হবে—ইত্যাদি ইত্যাদি। এর বিপরীতে যে কোনো চিন্তা করে না, সে যেকোনো কিছু দাবি করে বসতে পারে। যার দাবি পূরণ করার দায়িত্ব সে চিন্তাভাবনা করবে।
## আবু যর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনা
আবু যর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতে—তাঁর স্ত্রী বসে বসে কাঁদছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, "কেন কাঁদছ?" বললেন, "কাঁদব না! আপনি মারা যাচ্ছেন আর এই নির্জন জায়গায় দাফন-কাফনই বা কে করবে, জানাজাই বা কে পড়াবে? এই পাথুরে ভূমিতে কবর কে খুঁড়বে?"
আবু যর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, "তুমি কোনো চিন্তা করবে না। একটি কাফেলা আসবে। ওরা আমার দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করবে।" এ কথা শুনে স্ত্রী মুতমাইন হয়ে গেলেন, ব্যস কোনো চিন্তা নেই।
কেন? আবু যর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, "এক বিশেষ মুহূর্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আমরা চারজন ছিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমাদের মধ্যে একজন নির্জন জায়গায় ইন্তেকাল করবে। আর একটি কাফেলা এসে তার দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করবে।' তো আমার বাকি তিন সহচর ইতোমধ্যে ইন্তেকাল করেছেন; কিন্তু তাঁদের কেউই নির্জন জায়গায় ইন্তেকাল করেননি। আর সেই চার জনের মধ্যে আমি নির্জন জায়গায় ইন্তেকাল করছি। এর মানে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই ভবিষ্যদ্বাণীটি আমাকে উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছে যে, একটি কাফেলা এসে ব্যবস্থা করবে।"
স্ত্রীর ঈমান
তাঁর স্ত্রীও স্বামীর মতো ছিলেন। এদিকে স্বামী মারা যাচ্ছেন আর তিনি গিয়ে বড় হাঁড়িতে রান্না বসিয়ে দিলেন। কারণ, মেহমান আসবে। তাঁরা মেহমান নেওয়াজ ছিলেন, সারা জীবন মেহমান নেওয়াজি করে এসেছেন। তাই স্বামী মরুক আর বাঁচুক—মেহমানদেরকে মেহমানদারি করাতেই হবে।
তো তিনি হাঁড়িতে রান্না বসালেন মেহমানদের জন্য। আর মেয়েকে রান্না দেখভাল করতে দিয়ে বাইরে গিয়ে একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখার চেষ্টা করছিলেন, কাফেলা কোন দিক থেকে আসে। যেহেতু সেটি নির্জন জায়গা আর এটি কোনো পথের ধারেও না, তারপরও বিশ্বাস রয়েছে—কাফেলা আসবেই আসবে।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর আগমন
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর জামাতসহ এলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর জানাজার নামাজ পড়ানোর জন্য যে শুধু পাঠিয়েছেন তা নয়; বরং বলা যেতে পারে, উম্মতের সবচেয়ে বড় ফকিহকে তাঁর জানাজার জন্য পাঠিয়েছেন সেই নির্জন মরুপ্রান্তরে।
তিনি তাঁর সঙ্গীসহ এসে বললেন, "আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, আপনার দাফন-কাফনের সব ব্যবস্থা আমরা করব।" আবু যর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, "ঠিক আছে।" আর মনে মনে বললেন, "তুমি আর কী বলবে! আমাকে তো আগেই জানানো হয়েছে।"
কাফনের শর্ত
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন বললেন, "আমরা দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করব," তখন তিনি তাঁর কাফনের বিষয়ে খুবই কঠিন একটি শর্তারোপ করলেন। আজকালকার মানুষ তো বলে, "আমার কাফন তো দেবে ভালো কথা, সেটি যেন সোনার সুতার হয়।"
তো তিনিও সেরকম একটি শর্ত দিলেন যে, আমাকে এমন কেউ যেন কাফন না দেয়, যে কখনো আমির হয়েছে অথবা আমিরের পক্ষ থেকে তার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছে। কারণ, তিনি সব আমিরের বিষয়ে সন্দিহান—এরা কী না কী করে, এদের হালাল-হারাম বোধ বোধহয় ঠিক নেই। সাহাবাদের যুগের আমিরদের বিষয়ে তাঁর এই সন্দেহ।
সুতরাং যে আমির হয়েছে বা আমিরের পক্ষ থেকে কোনো দায়িত্ব পালন করেছে, এরকম কারও দেওয়া কাফন আমি কবুল করব না।
মনে হতে পারে, নির্জন জায়গায় মারা যাচ্ছেন তো কাফন-দাফন যে পাচ্ছেন, এটাই তো বেশি। তারপরও আবার কঠিন শর্ত আরোপ করছেন! আসল বিষয় হলো, তিনি জানেন, তিনি যা ইচ্ছা শর্ত লাগাতে পারেন কারণ আল্লাহ তা'আলা তা দেওয়ার বিষয়ে ওয়াদাবদ্ধ। দিতেই হবে। কারণ, এর ওয়াদা আগেই করা হয়েছে। তাই তিনি ইচ্ছেমতো শর্তারোপ করছেন।
শর্ত পূরণ
এক নওজোয়ান আনসারি ছিলেন। তিনি বললেন, "আমার কাছে দুটি চাদর আছে। আমার মা সেগুলো নিজ হাতে বুনেছিলেন। আর আমাকে তা দিয়েছেন। আমি বা আমার মা কখনো আমির হইনি আর আমিরের পক্ষ থেকে কখনো কোনো দায়িত্বও পালন করিনি।"
তিনি তখন কবুল করে নিলেন যে, "ঠিক আছে।" সেই কাপড় দিয়ে তাঁকে কাফন পরানো হলো আর জানাজা পড়িয়ে দাফনও করা হলো।
এই সবকিছুর ভিত্তি একটি জিনিস যে, আমার নিজের কোনো দায়িত্ব নয়; বরং অন্যের দায়িত্বে। আমি তাঁর ওয়াদার মধ্যে আছি। এখন যে ওয়াদা করেছেন, সবকিছু পূরণ করা তাঁর দায়িত্ব।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেহনত
তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারা জীবন এই মেহনত করেছেন, বান্দাকে এই কথা বোঝানো—তুমি নিজ দায়িত্ব ছেড়ে দাও আর মালিকের ওয়াদার মধ্যে চলে আসো।
মানুষ নিজ দায়িত্বে থাকতে চায় না। আগে বলেছিলাম, তারা বাংলাদেশে বসে বসে আমেরিকার নির্বাচন নিয়ে মাথা ফাটাচ্ছে। নিজের মাথাও হারানোর আশঙ্কা। তাকে যদি বোঝানো হয় যে, এগুলো বেকার চিন্তা, এগুলো ত্যাগ করো—তবে সে সহজে রাজি হবে না। সে বলবে, আমি একজন গণ্যমান্য মানুষ, আমি একজন শিক্ষিত মানুষ। আমি যদি এসব আলোচনাই না করলাম, তাহলে আমার শিক্ষা দিয়ে লাভ হলো কী! আমি এত শিক্ষিত মানুষ, আমার তো চিন্তা করতেই হবে। অতএব সে চিন্তার গুরু দায়িত্ব নিয়েছে! কারণ সে শিক্ষিত মানুষ, গণ্যমান্য মানুষ।
ভাই! যদি সে এগুলো ছেড়ে দেয় আর নিজেকে মালিকের হাতে সোপর্দ করে, তাহলে মালিক তার সব প্রয়োজন মিটাবেন। শুধু প্রয়োজন নয়, বরং তার আবদার-সহ প্রয়োজন মিটাবেন।
আবু যর গিফারী রা.-এর শর্তারোপ
আবু যর গিফারী রাদিয়াল্লাহু আনহু যে শর্তটি যুক্ত করলেন, এর প্রয়োজন ছিল না। যেখানে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এ দায়িত্ব নিচ্ছেন, সেখানে আবু যর গিফারী রা.-এর এই অতিরিক্ত শর্তারোপ করার কী দরকার ছিল! কিন্তু উনার বিলাসিতা—মালিকের হাতে নিজেকে সোপর্দ করে যেকোনো দাবি করার অধিকার নিয়ে নিয়েছেন।
হাকীমুল উম্মত থানবী রহ.-এর ঘটনা
থানবী রহ.-এর একটি ঘটনা শুনেছি। উনার নিকট একজন মেহমান এলেন। মেহমান ছিলেন খুবই মুত্তাকি। মেহমানের নিকট যখন খানা পেশ করা হলো, তিনি তাহকিক করছেন। কারণ, খানা-পিনায় তাহকিক করে খাওয়া সুন্নত। জানা প্রয়োজন, এগুলো শুদ্ধ কিনা।
থানবী রহ.-এর মেহমান যখন তাহকিক করছেন, থানবী রহ. যখন বুঝতে পারলেন যে বেচারা খুবই মুত্তাকি মানুষ, তখন উনি বললেন, "কাছেই জঙ্গল আছে আর সেখানে জংলি ডুমুর ইত্যাদি পাওয়া যায়। গিয়ে সেগুলো খান। ওগুলো পুরোপুরি হালাল। কোনো তাহকিকের দরকার পড়বে না।"
রুহানি বিলাসিতা
যেখানে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন, সেখানে আবু যর গিফারী রা.-এর এই শর্ত করাটা ছিল বিলাসিতা। যদিও তাদের ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য নয়। কারণ, তাদের মধ্যে মহব্বত, সুসম্পর্ক ইত্যাদি ছিল। আবু যর গিফারী রাদিয়াল্লাহু আনহু হায়াতে থাকতে ইবনে মাসউদ রা.-কে সর্বদা চোখের সামনে বেড়ে উঠতে দেখেছেন। আবু যর গিফারী রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে সর্বদা দিকনির্দেশনা দিয়ে গিয়েছেন যে, এটা করবে, এটা করবে না ইত্যাদি। আর সাহাবায়ে কেরাম তাদের কথাগুলোকে সর্বদা মূল্য দিয়েছেন, কদর করেছেন তাদের শাসনকে।
সে হিসেবে তার এই শর্তারোপকে রীতিমতো একটি রুহানি বিলাসিতা বলা যায়। বিলাসিতা নানান ধরনের হয়ে থাকে। এই দুনিয়ার জগতে যেমন খানা-পিনা ইত্যাদিতে বিলাসিতা রয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে তার এই চিন্তাধারা রুহানি বিলাসিতা। তিনি ঠিক সেই বিলাসিতাটিই করলেন। আল্লাহ তাআলা তার সে বিলাসিতাও কবুল করে নিলেন।
অর্থাৎ, দুনিয়াতে আমি একজনের ওয়াদার মধ্যে আছি। আমার সব আবদার তার পূরণ করতে হবে। সুতরাং নিজেকে যদি কেউ ওয়াদার মধ্যে নিয়ে আসতে পারে, তবে এরপর সে যা ইচ্ছা বিলাসিতা করুক। দুনিয়াতে বিলাসিতা করবে, মৃত্যুমুখে বিলাসিতা করবে, কবরে গিয়ে বিলাসিতা করবে, হাশরের ময়দানে বিলাসিতা করবে—সব জায়গায় বিলাসিতা করবে। কারণ, সে আল্লাহর নিকট ওয়াদাবদ্ধ। আল্লাহর ওয়াদার মধ্যে চলে এসেছে।
তাফবিজ - সবকিছু আল্লাহর হাতে সোপর্দ
আল্লাহ তাআলা বড় মেহেরবানি করে দীন দিয়েছেন। আমরাও যেন নিজ দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে মালিকের ওয়াদার মধ্যে চলে আসি। আর মালিক তার ওয়াদা করেন কিছুর বিনিময়ে। সেটা কী? সেটা হলো, তুমি নিজেকে সম্পূর্ণ আমার হাতে ছেড়ে দাও। তোমার চিন্তা, তোমার পরিকল্পনা, তোমার দাবি, তোমার চেষ্টা—সবকিছু তুমি আমার ওয়াদার মধ্যে ছেড়ে দাও। এটাকে তাফবিজ বলে।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
أُفَوِّضُ أَمْرِي إِلَى اللَّهِ
"আমি আমার সব বিষয় আল্লাহর কুদরতি হাতে অর্পণ করলাম।"
যে নিজেকে অর্পণ করে, তার সামনে যা কিছুই আসুক না কেন, সে কোনো ইতস্তত বোধ করে না, কোনো দোটানায় ভোগে না। বরং সবসময় বলে, আমি তৈরি। তার ধনসম্পদ সবকিছু মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে গেল, হয়ে গেল। অথচ সে কখনো এ কথা বলবে না, 'হায়!'। যদি 'হায়' বলে, তবে যার সাথে ওয়াদা করেছে, সে বলবে, তুমি ওয়াদা ভঙ্গ করেছ। আমিও তোমাকে ত্যাগ করে চলে গেলাম।
জাহাজ ডুবুক বা ভাসুক, তোমার বাড়িতে আগুন লাগুক বা না লাগুক, তোমার মাঠের ফসল উঠুক বা ধ্বংস হয়ে যাক—তোমার এসব বিষয়ে কোনো দুশ্চিন্তার দরকার নেই। যদি তুমি 'হায়' বলো, তবে তুমি ওয়াদার খেলাফ করলে। তুমি নিজেকে মনেপ্রাণে অর্পণ করলে না। আর তোমার ওয়াদা খেলাফ করার কারণে আমার পক্ষ থেকে ওয়াদা আর কতটুকু থাকবে!
সাহাবায়ে কেরামের মুতমাইন্নাহ
সাহাবাগণ সব অবস্থায় মুতমাইন থাকা শিখেছেন। আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন অবস্থা দিয়ে তাদের পরীক্ষা করেছেন। শত্রুর মুকাবেলায় দাঁড় করিয়ে, সমুদ্রের মুকাবেলায়, পিছনে শত্রু আর সামনে দুশমন—এ অবস্থায়ও তারা ছিলেন মুতমাইন (প্রশান্ত)। আল্লাহ তাআলা দেখলেন, তারা সব জায়গায় মুতমাইন। তারা সব জায়গায়ই ওয়াদার মধ্যে রয়েছেন। কারণ তারা সব জায়গায় নিজেকে আল্লাহর নিকট পরিপূর্ণরূপে সোপর্দ করেছেন।
আমাদের করণীয়
ভাই, আল্লাহ তাআলা আমাদের দাওয়াত দিচ্ছেন, আমরা যেন আমাদের নিজেকে আল্লাহর নিকট পরিপূর্ণরূপে সোপর্দ করি। আল্লাহর নিকট সঁপে দিই। যে সোপর্দ করতে পারবে, আল্লাহর আদেশ পালন করতে পারবে, আল্লাহ তাআলা তার কাছে ওয়াদাবদ্ধ। আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়াতেও ভালো জীবন দিবেন, আখেরাতেও ভালো জীবন দিবেন।
আমরা সবাই তৈরি না ইনশাআল্লাহ? এজন্য আমরা সবাই তিন চিল্লার পরিপূর্ণ নিয়ত করি যে, আমি আমার বাকি জীবন আমার কথামতো নয়, বরং আল্লাহ তাআলার পছন্দমতো জীবন চালাবো। এই ওয়াদা করি এবং ওয়াদাকে প্রকাশও করি যে, এখন থেকে আমি এই কথার উপর ওয়াদাবদ্ধ যে, আমার জীবনের পরিকল্পনা আমি করবো না, বরং আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে আমি চলবো। আল্লাহ তাআলা আমাকে যখন যেভাবে চালান, সেভাবে চলবো।
#mushfiqsir
#bayan
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কুরআন জীবিত হয় মুমিনের দিলে
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] আলেমদের মজমা তারিখ: ১১ অক্টোবর ২০১০ | স্থান: রংপুর | بِسْمِ اللهِ الرَّ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
১০৮৫
নফি ও ইসবাত: দ্বীনের মৌলিক ভিত্তি
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ، فَاعۡلَمۡ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلّ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
১৪৮৫
আদরের ভাইটিকে বলছি
( দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের আলোকিত পরশে দ্বীন পাওয়া প্রতিটি কলেজ বা ভার্সিটির জেনারেল শিক্ষিত ছাত্র ...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১১১০২
কাজ ও আমল: বাস্তবতা ও গায়েবের নিরিখে
الحمد لله نستعينه ونعوذ به من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا، من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلله فلا ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
২২৪
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন