কাজ ও আমল: বাস্তবতা ও গায়েবের নিরিখে
কাজ ও আমল: বাস্তবতা ও গায়েবের নিরিখে
الحمد لله نستعينه ونعوذ به من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا، من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلله فلا هادي له. ونشهد ان لا إله إلا الله ونشهد أن محمد عبده ورسوله.
فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم، بسم الله الرحمن الرحيم، مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ. (سورة النحل : 97)
وقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : هَلْ تُنْصَرُونَ وَتُرْزَقُونَ إِلَّا بِضُعَفَائِكُمْ.
أو كما قال عليه الصلاة والسلام.
দুনিয়ার মানুষ কাজে ব্যস্ত। আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন মানুষকে কাজ থেকে সরিয়ে আমলে নিয়োজিত করার জন্য।
কাজ ও আমলের পার্থক্য
কাজের বুনিয়াদ কী? বা কাজ কাকে বলে? ভাষাগত দিক থেকে কাজ এবং আমল একই জিনিস। অর্থাৎ, একটি অপরটির অনুবাদ। বাংলায় কাজ বলে আর আরবিতে আমল বলে। আর এই কাজের কর্তাকে বাংলায় শ্রমিক বলে আরবিতে উম্মাল (عُمَّال) বলে। অর্থাৎ একই জিনিস। কিন্তু আমরা যেভাবে ব্যবহার করি, সে ভাষায় কাজ এবং আমল ভিন্ন দুটি জিনিস।
ব্যবসা-বাণিজ্য-উপার্জন-জীবিকাকে কাজ বলে। জিকির-তিলাওয়াত-ইবাদতকে আমল বলে। অন্যভাবে বললে, 'নিজের পাওনা উসুল করাকে কাজ বলি আর পাওনা ছেড়ে দেওয়াকে আমল বলি।' দান করাকে আমল বলি। টাকা-পয়সার দিক থেকে যদি হিসাব করি তবে মোটামুটিভাবে বলা যেতে পারে যে, আমলের মাধ্যমে টাকা আসে না, বরং হাতের জমানো টাকা খরচ হয়; কিন্তু কাজের মাধ্যমে টাকা আসে। যেমন পাওনা উসুল করলে টাকা আসে। আর পাওনা উসুল করলাম না, বরং ছেড়ে দিলাম, অর্থাৎ যদি আল্লাহর ওয়াস্তে ইচ্ছাকৃত টাকা যদি ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে সেটাকে আমল বলে। উসুল করতে পারব না বলে ছেড়ে দিলাম, এটা তো অপারগতা। অপারগতায় নয়; বরং এই ভাবনায় যে, বেচারা গরিব মানুষ আর এ টাকা ছাড়াও আমার চলছে, তাই একজন মুসলমানকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে টাকার দাবি ছেড়ে দিলাম—এটি হলো আমল। তো কাজের মাধ্যমে টাকা-পয়সা-ক্ষমতা ইত্যাদি আসে আর আমলের মাধ্যমে এগুলো খরচ হয়। অর্থাৎ, একটি অপরটির বিপরীত।
আকিদা ও বাস্তবতা
কাজের বুনিয়াদ বলতে আমরা যেটাকে বুঝি, সেটা হচ্ছে 'বাস্তবতা'। আমল কিছু আকিদার নাম। আকিদা কী? আক্বদ শব্দের অর্থ হচ্ছে, গলায় বেড় দেওয়া, আটকে দেওয়া। আকিদার অর্থ হচ্ছে, মনের ভেতর কিছু কথা এমনভাবে থাকবে যে, টানাটানি করলে এ গিঁট ছুটবে না; বরং আরও টাইট হবে। সুতার মধ্যে যদি গিঁট লেগে যায় তখন সুই দিয়ে খুব সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মভাবে চেষ্টা করলে হয়তো খুলতে পারে কিন্তু সেটিকে খোলার জন্য যদি আপনি ভালোভাবে লক্ষ না করে এলোপাথারি টানাটানি করেন তাহলে সেটি তো খুলবেই না, বরং আরও টাইট হবে। ঠিক তেমনিভাবে আকিদা নিয়েও যদি কেউ টানাটানি করে তাহলে সেটি আরও টাইট হবে। আকিদা ছাড়ার জন্য যদি মারপিট করা হয় তাহলে আরও পোক্ত হবে। চাই তা শুদ্ধ আকিদা হোক বা ভুল আকিদা। মনের ভেতর কিছু কথা মজবুতভাবে বসে আছে—এটিকে আকিদা বলে।
এর বুনিয়াদ মুগাইয়্যাবাতের (গায়েব তথা অদৃশ্য)-এর উপর। যাকে বলা যেতে পারে বাস্তবতা বিরোধী তথা একেবারে বিপরীত জিনিস। দেখা যায় না, শোনা যায় না, মাপা যায় না, অর্থাৎ অবাস্তব।
বাস্তবতা ও গায়েবের উদাহরণ
এক বাচ্চাকে তার উস্তাদ পড়ান ওহু, গোসল, আলিফ, বা, তা, সা ইত্যাদি। এর সাথে সাথে কিছু বেহেশতের কথাবার্তাও বলেন। আবার কিছু কিছু অঙ্কও শেখান। তো ছেলেটির একদিন পরীক্ষা নিলেন যে, তোমার জান্নাতের আমের বাগানে বিশটি আম আছে। দশটি আম যদি তুমি খেয়ে ফেল তবে আর কতটি আম বাকি থাকবে? তো তার স্কুলের আরেকজন মাস্টার ছিল, যিনি ছেলেটিকে অঙ্ক শিখিয়েছিলেন। তাই সেই ছাত্রটি যোগ-বিয়োগ-ভাগ ইত্যাদি বেশ ভালো করেই জানত। সে সাথে সাথে উত্তর দিলো, দশটি আম খেয়ে ফেললে আর দশটি আম বাকি থাকবে। হুজুর বললেন, না। উত্তর ঠিক হয়নি। তাহলে কয়টি বাকি থাকবে? হুজুর বললেন, বিশটি আমই বাকি থাকবে। এটিও আরেক ধরনের অংশ, কিন্তু অবাস্তব। অর্থাৎ, ওই জান্নাতে তোমার গাছে আছে বিশটি আম, আর তোমাকে দিচ্ছে একশটি খাবার, কয়টি খেতে পারবে? একশটিই খেতে পারবে। বিশটি আছে বলে একশটি খেতে পারবে না—এমন কোনো সমস্যা নেই। যেটাকে আমরা বাস্তবতা বলি, সে বাস্তবতার হিসেবে তোমার যতই খাবারের ইচ্ছা হোক না কেন, আছে বিশটি, এর চেয়ে বেশি কোথায় পাবে! কিন্তু জান্নাতের বাগানে আছে দশটি, কিন্তু বিশটি খেতে চাইলে বিশটিই খেতে পারবে... একশটিও খেতে পারবে... অর্থাৎ, 'গায়েব'ই হচ্ছে অবাস্তব।
গায়েব ও প্রমাণের সীমা
আমরা এই গায়েবকে বাংলাতে বলে থাকি 'অদৃশ্য' আর ইংরেজিতে 'ইনভিজিবল' অর্থাৎ, যা দেখা যায় না। মূলত গায়েব অদৃশ্যের নামও নয়, ইনভিজিবলের নামও নয়। অনেককিছু আমরা বাস্তব হিসেবে জানি-মানি, কিন্তু দেখা যায় না। বাতাস দেখা যায় না। বিদ্যুৎ দেখি না। প্রচলিত কিছু বিষয় যেমন, ইলেকট্রন ইত্যাদি দেখি না; কিন্তু এগুলোর অস্তিত্ব মানি। আবার যৌক্তিক দাবিকেও মানি। তাহলে যেটা যৌক্তিক দাবি হিসেবে মানি, সেটা হচ্ছে বাস্তবতা। বাতাসকে মানি, কারণ এটি যুক্তিপ্রমাণ দিয়ে দেখানো যায়; দেখতে না পারলেও বাতাস যে আছে, এটি বিভিন্নভাবে প্রমাণ করা যায়। বিদ্যুৎ প্রমাণ করা যায়। যদি প্রমাণের দরকার হয় তবে ওই প্লাগে আঙুল দিয়ে দেখ। বুঝে নেবে যে, হ্যাঁ, বিদ্যুৎ আছে।
কিন্তু গায়েব... যা শুধু দেখা যায় না—এতটুকুই নয়; বরং এটি প্রমাণও করা যায় না। যদি এটি কেউ বিশ্বাস করতে না চায় তবে তাকে কোনো ধরনের যুক্তি দিয়ে মানানো যাবে না। আর যদি মানে তবে বিনা যুক্তিতেই মানবে।
কবরের ভেতর নেয়ামত আছে, আজাব আছে—এটি কোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে বের করা যাবে না। আধুনিক অনেক যন্ত্রপাতি আছে, যেগুলো কবরের ভেতর রেখে দেওয়া যায় যে, কবরের ভেতর কী হচ্ছে—সব সিগন্যাল পাঠাবে; কিন্তু কবরের অবস্থা কী হচ্ছে তার কোনো সিগন্যাল সে পাঠাবে না। তো এটিই হচ্ছে গায়েব।
আমল ও আকিদার সম্পর্ক
আমল হলো, যা মুগাইয়্যাবাতের (অদৃশ্য) উপর প্রতিষ্ঠিত। গায়েব থেকে খবর দেওয়া হয়েছে যে, এই এই করলে এই এই হবে। আর এগুলোকে মেনে নেওয়া হয়েছে। যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথাকে সত্য হিসেবে মানি, সে হিসেবে মেনে নিয়েছি। কোনো যুক্তিপ্রমাণ দিয়ে নয়। আকিদাগতভাবে মেনে নিয়েছি।
এর মোকাবেলায় বাস্তবতা মানুষ দেখে দেখে বিশ্বাস করে। বাস্তবতা কী? বাস্তবতা যেমন, লাঠি হচ্ছে লাঠিই। দেখছি যে, এটি লাঠি। আর সাপ হচ্ছে সাপ। লাঠি সাপ নয় আর সাপ লাঠি নয়। দুটো একেবারেই ভিন্ন জিনিস। পানি পানিই। পানিতে যদি কেউ যায় তবে ডুবে যাবে। আগুনে হাত দিলে পুড়বেই। এগুলো হলো বাস্তবতা। মানুষ দেখে দেখে এগুলো এতবেশি বিশ্বাস করে যে, এর বিপরীত সে কিছুই মানতে রাজি না।
বাস্তবতায় অন্ধবিশ্বাস
মানুষ বাস্তবতায় পূর্ণ বিশ্বাসী। অনেক সময় বিশ্বাসে টালমাটাল থাকে, পরিপূর্ণ বিশ্বাস করে না। তো বাস্তবতায় পূর্ণ বিশ্বাসী মানুষকে যদি বলা হয় যে, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম আগুনের মধ্যে পড়েছিলেন, সে বিশ্বাস করবে না। বলবে, কার কী কথা! সাংবাদিকরা কী না বানায়! এগুলো সে জামানার সাংবাদিকদের বানানো কথা। মিডিয়া আজ যেমন, পূর্বেও তেমনই ছিল। যদি হাল জামানার কোনো কথা বলা হয় যে, আমাদের এই নরসিংদীতে এরকম আগুনে পড়ে ছিল, কিন্তু পুড়েনি—সে বিশ্বাস করবে না। না করার জন্য যাকিছু বলা দরকার, সে বলবে। আরে এগুলো বোগাস কথা।
কিন্তু সে নিজেই যদি দেখে অথবা নিজে যদি পড়ে যায় আর তারপর আগুন থেকে বের হয়ে এসেছে, আর নিজের ঘটনা তো সাংবাদিকের উপর চাপিয়ে দিতে পারবে না, তো ওর আকিদা যদি মজবুত থাকে যে, আগুনে পড়লেই পুড়ে যায়, তবে নিজের অভিজ্ঞতাকেও সে বিশ্বাস করবে না; বরং বলবে, এটি হ্যালুসিনেশন ছিল। ধা ধা দেখেছি। কখনো কখনো বিশেষ ধরনের ড্রাগের কারণে—আমাদের দেশে ধুতুরা জাতীয় অনেক জিনিস আছে—এরকম অবাস্তব কল্পনা মনের মাঝে জাগতে পারে। আবার সে বইপত্র জোগাড় করে, খোঁজখবর নিয়ে বোঝাতে পারে যে, বিনা ড্রাগেও হ্যালুসিনেশন হতে পারে। বিশেষ অবস্থা এমনি এমনিও হতে পারে। অর্থাৎ, কোনো না কোনোভাবে সে ঘুরে ফিরে তার নিজেরটাও বিশ্বাস করবে না। কারণ, তার আকিদা এত মজবুত। ও নিজেই আগুনে পুড়েছিল, আর ওখান থেকে কেউ তাকে উদ্ধার করেছে, বা সে বের হয়ে যেতে পেরেছে অথচ পোড়েনি—এই অভিজ্ঞতা অর্জন করার পরেও সে এটি বিশ্বাস করতে চায় না।
কারণ তার বাস্তবতার উপর আকিদা এত মজবুত যে, বাস্তবতার বিপরীত সে কিছুই মানতে চায় না। এটাই হচ্ছে বাস্তবতার আকিদার শক্তি।
ঈমানের দাবি: বাস্তবতার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস
যে ব্যক্তি আল্লাহর নবীর কথা শুনেছে কিন্তু তারপরও সে বিশ্বাস করবে না। কারণ, এর বাস্তবতা এতই বিশাল যে বিশ্বাসই করবে না। বলবে, 'এটা হয়তো স্বপ্ন বা হ্যালুসিনেশন বা এ জাতীয় কিছু' বলে এ কথাকে উড়িয়ে দেবে। তো দুনিয়ার মানুষ এই বাস্তবতাকে কোনোভাবেই বিশ্বাস করবে না। আমরা যারা এখানে আছি, বাস্তবতার উপর আল্লাহর মেহেরবানি যে, আমাদের ওই মাত্রার আকিদা নেই যে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ঘটনাকে অস্বীকার করবে। বা যদি বলে যে, ওরকম কিছু হয়েছিল, তখন ঠিকই বিশ্বাস করবে। কিন্তু ভালো করে যদি যাচাই-জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তবে বলবে, 'লোকেরা তো অনেক কিছুই বানায়।' যেহেতু তার বাস্তবতার উপর পরিপূর্ণ আকিদা নেই, এজন্য সে বলবে, 'হতেও পারে।'
আল্লাহ তাআলা বড় মেহেরবানি করে আমাদের দীন দিয়েছেন। আর দীন আমাদের কাছে এই কথা দাবি করে যে, সাধারণত আগুনে পড়লে পুড়ে যায়, এ কথা মানি। কিন্তু আগুনে পড়লে পুড়বেই—এটা মানি না। এটা হলো যে আকিদা ঈমানদারদের নিকট দাবি করা হয়। প্রকৃত বাস্তব হলো সেটা, যা আল্লাহ তাআলা বলেন। আল্লাহ তাআলা যদি নারাজ হন এবং কাউকে জাহান্নামে ফেলে দেন তবে সেটা নিশ্চিত। আর দুনিয়ার কোনো মানুষ ভুলবশত আগুনের মধ্যে পড়ে গেল, তো সেক্ষেত্রে বেশির ভাগ সম্ভাবনা, সাধারণত সেটা হয়ে থাকে যে, পুড়েই যাবে; কিন্তু এটি সম্ভাবনা পর্যায়ের জিনিস। সাধারণত যেভাবে হয়, সে রকম হতেও পারে। আর এক্ষেত্রে আমার জন্য বিপরীত জিনিসকে বিশ্বাস করা কোনো কঠিন কাজ নয়।
হযরত আবু ইবরাহিমের পুত্রের ঘটনা
আমরা এক সাথে ইজতেমায় ছিলাম। আমাদের এক সাথী, নাম আবু ইবরাহিম আহমেদ মুশাররফ। আলেম। আরবের প্রসিদ্ধ আলেম উসাইমিন, সেই উসাইমিনের সরাসরি শিষ্য। বহুত খাস একজন শাগরেদ। তো আবু ইবরাহিম উসাইমিনের বাড়িতেই থাকতেন প্রায়। সেই আবু ইবরাহিম কোনো এক সফরে ছিলেন। বাচ্চাদের যেই সাইকেল থাকে, তিন চাকার হয়ে থাকে, সেই সাইকেল নিয়ে বাড়ির আঙিনায় খেলাধুলা করছিল। আর উনার বাড়িতে কোনো কারণে গর্তে আগুন জ্বালানো হয়েছে। আবু ইবরাহিমের সেই ছেলে সাইকেল চালাতে চালাতে আগুনের গর্তে গিয়ে পড়ল। সেই শিশুটির নাম ছিল ইবরাহিম।
ওর মা ছিল घরে। তো ঘরে যখন থাকে, তখন তো আর বোরকা ইত্যাদি পরিহিতা থাকে না, বরং ঘরের সাধারণ পোশাকেই থাকে। অর্থাৎ, সে পোশাকটি বাইরে যাওয়ার মোটেও উপযোগী নয়। উনি ওই পোশাকেই বাচ্চাটিকে আগুনের গর্ত থেকে তুলে প্রতিবেশীর নিকট নিয়ে গেলেন। অথচ তার গায়ে যে ঘরের পোশাক, সে হুশই তার ছিল না। প্রতিবেশীরা তাকে এই পোশাকে দেখে তো হতভম্ব। সেও কোনো কথা বলতে পারছে না, যেন বোবা হয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষণ পরে তার হুশ হলো। ঘরে ফিরে জামাকাপড় পরে নিলেন। পরে প্রতিবেশীরা জিজ্ঞেস করতে এলো যে, কী হয়েছে? ব্যাপারটা কী? কারণ, ছেলের মধ্যে আগুনে পোড়ার কোনো লক্ষণই নেই। না সে নিজে জ্বলেছে, না তার জামাকাপড় পুড়েছে।
আমরা যারা মুসলমান, আমাদের জন্য এটা বিশ্বাস করা কঠিন নয়। বস, এতটুকুই আমাদের দিক থেকে আকিদার তরে দাবি করা যে, এটা খুব হতে পারে। সাধারণত পুড়ে যায়, এটা জানি। কিন্তু পুড়বেই, এটি এমন কোনো জরুরি কথা নয়। সাধারণত পুড়ে থাকে। আগুনের উপর দিয়ে হেঁটে চলে গিয়েছে, এমনটিও খুব হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলাই করেন।
পানিতে ডুবে মৃত্যু থেকে জীবিত হওয়ার ঘটনা
আমরা যখন ছোট ছিলাম, আমাদের এক চাচা ছিলেন। চাচা বলতে আমার আব্বুর খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। উনি রিটায়ার্ড হেড মাস্টার ছিলেন। উনি ইন্তেকাল করেছেন বহু বছর হয়ে গেছে। প্রায় আমাদের বাড়িতে আসতেন, থাকতেন। উনার ছেলেবেলার ঘটনা শুনেছি যে, উনি যখন ছোট তো একবার পানিতে পড়ে গিয়েছিলেন। আর পানিতে পড়ে গিয়ে মারাও গিয়েছিলেন। উনাকে দাফন করা হবে। এমতাবস্থায় উনার মার পাগলের মতো অবস্থা যে, কিছুতেই দাফন করতে দেবে না। আর এজন্য মাকে বোঝাতে গিয়ে দেরি হয়ে গিয়েছে। এত দেরি হয়েছে যে, উনি ভাবলেন, 'কী আর করে যাবো!' অতঃপর জিন্দা হয়েই ফিরে এসেছেন। অর্থাৎ, বেঁচে উঠেছেন। আমরা তাকে বুড়ো বয়সে দেখেছি।
যদি এর ব্যাখ্যা চাওয়া হয় তবে বলবে, 'তিনি আসলে মরেননি। অনেক সময় মরার লক্ষণ দেখা যায়। কিন্তু আসলে মারা যায় না।' তার মানে বাস্তবতায় বিশ্বাস করে আর এটা অশুদ্ধ। আসলেই মারা গিয়েছে, এরপর আল্লাহ তাআলা জিন্দা করেছেন, এতে কী অসুবিধা। সাধারণত এরকম হয় না; কিন্তু হতেও পারে যে, সম্ভবত উনি মারা গিয়েছিলেন।
রফিক ভাইয়ের টেলিগ্রামের ঘটনা
ওই তো মুরশিদ সালাম বসে আছে। সম্পর্কে ওর মামা শ্বশুর ছিলেন, আমরা যাকে 'রফিক ভাই' বলে ডাকতাম। বয়সে অনেক বড় ছিলেন। উনি মুম্বাইতে পড়তেন। বহুকাল আগের কথা। আমাদের বয়স থেকে অনেক বড়। সম্ভবত বিএ-র ছাত্র ছিলেন। ওই সময় টাইফয়েড ইত্যাদি রোগগুলো বড় মারাত্মক ছিল। তো তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এক পর্যায়ে বাড়িতে টেলিগ্রাম এলো। টেলিগ্রাম পাওয়ার পর তো বাড়িতে কান্নাকাটি রোল পড়ে গেল। জিজ্ঞাসা করা হলো, কী হয়েছে? বলা হলো রফিক মারা গিয়েছে। তো বরুনার বাপের হাতে সেই টেলিগ্রামটি দেওয়া হলো। উনার বাবা ওই টেলিগ্রাম ভাঁজ করে রাখলেন। এরপর অজু করলেন, নামাজ পড়লেন, তেলাওয়াত করলেন। অনেক কিছু আমল করার পর সেই টেলিগ্রাম আবার খুলে পড়া শুরু করলেন। পড়ে বললেন, এখানে তো লেখা আছে অবস্থা খারাপ। তোমরা মারা গেছে বলছ কেন? আমরা সবাই আবার পড়লাম। এরপর সবাই বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবস্থা তো খারাপ। তো সবাই কেন আগে ভুল পড়ল?
দুর্বলদের কারণে রিজিক
মূলত বাস্তবতার ধাঁধার মধ্যে পড়ে দুনিয়ার মানুষ দীন থেকে সরে যায়। চাকরি করতে হয়; এটি বাস্তবতা যে, চাকরি ছাড়া চলবে না। উপার্জন-জীবিকা ছাড়া চলবে না। অথচ আল্লাহ তাআলা তার বিপরীত কথা আমাদের শেখাচ্ছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
هَلْ تُنْصَرُونَ وَتُرْزَقُونَ إِلَّا بِضُعَفَائِكُمْ
'তোমরা কি তোমাদের দুর্বল যারা, তাদের কারণেই রিজিক পাওনা?'
দুনিয়ার মানুষ বলে যে, সবলরা উপার্জন করে আর দুর্বলরা খেয়ে থাকে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন, দুর্বলরা উপার্জন করে আর সবলরা খায়।
মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির উদাহরণ
মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি একেবারে প্রথম জীবন থেকে শেষ জীবন পর্যন্ত দুর্বল ছিলেন। বিভিন্নভাবে... সারা জীবে প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। করতেন তাবলিগ কিন্তু বলতে পারতেন না কথা। আর যেটুকু কথা তিনি উচ্চারণ করতে পারতেন, সেখানেও ছিল তোতলামি। তারপর মানুষকে বোঝাতে গিয়ে উপযুক্ত শব্দ খুঁজে পেতেন না। মানুষকে বোঝানো দরকার হলে এমন শব্দ দিয়ে বোঝাতে হবে যাতে মানুষ বুঝে। উনি যে শব্দ দিয়ে বোঝাতে চাইতেন, লোকেরা সে শব্দের কিছুই বুঝতো না।
একটি উদাহরণ দিলে বুঝবেন যে, এক জায়গায় যাওয়ার কথা ছিল, তো সেখানে পৌঁছতে ট্রেন ইত্যাদির কারণে দেরিতে পৌঁছলেন। তাই দেরি হওয়ার কারণে ওজর পেশ করছেন। বললেন, **ايك مانع پيش آيا** 'মানে'—এটা আরবি শব্দ। উর্দুতে এটি ব্যবহৃত হয় বইপত্রে। দৈনন্দিন উর্দুতে ব্যবহৃত হয় না। তো তিনি বললেন 'মানে' পেশ আয়া। যখন বুঝলেন যে, 'মানে' কঠিন শব্দ হয়ে গেল, একটু সহজ করে বলা দরকার, তখন তিনি সহজ করে বললেন, **يعني ايك أحاديث پيش آيا** অর্থাৎ, 'মানে' তো কিছু কিছু মানুষ বুঝতে পারবে কিন্তু 'আহাদিস' শব্দটি বোঝার উপায়ই নেই। এখন তার মনে হলো, এই শব্দটিও বোধহয় কঠিন হয়ে গেল। আরেকটু সহজ করি, **يعني ايك عائد پيش آيا** এখন 'আয়েদ' শব্দটি বললেন। তো আয়েদ শব্দটি বিজ্ঞজনদের জন্য ডিকশনারি ঘাটাঘাটি করেও বের করা মুশকিল হবে। সুতরাং বলা যায়, তিনি সর্বদিক থেকে দুর্বল ছিলেন। শারীরিক অবস্থার দিক থেকে; কথা বলতে গিয়ে তোতলা ছিলেন; আবার উপযুক্ত শব্দ বের করতে পারেন না—এভাবেই তার জীবন চলছিল। কথা বলতেন মেওয়াতিদের মধ্যে। সাধারসিধা উর্দু বোঝাই তাদের জন্য মুশকিল, তারা আয়েদ বুঝবে কী করে? তাই তারা তার কথা বুঝতো না।
একবার তিনি বয়ান করছিলেন আর মেওয়াতিরা শুনছিল। উনার ভাষা তো কেউ বোঝার কথা না, কিন্তু তারা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। ওদের মাতব্বর জাতীয় একজন আমাদের দেশের চেয়ারম্যানের মতো, সে মজমার মাঝখান থেকে পেরেশান হয়ে লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল আর সবাইকে চিৎকার করে বলতে লাগলো, 'এই মৌলবির কথা তোমরা সবাই মেনে নাও, নাহলে সে মরেই যাবে।' অর্থাৎ, তারা হজরতের কথা পুরোটা বুঝতে না পারলেও কিছুটা তো বুঝছিল। আর এতটুকুতেই তার এই ভয় হয়েছে যে, তার কথা না মানলে তিনি মরেই যাবেন।
হযরত যাকারিয়া সাহেবের ওয়ালিদ, হযরত ইয়াহইয়া সাহেব উনার ভাইয়ের কাছে ছিলেন। উনার কাছেই বড় হয়েছেন। শিক্ষা-দীক্ষা উনার কাছেই হয়েছে। হিফয করার পর কিতাবের পাঠ উনার কাছেই হয়েছে। পড়াশোনার ব্যাপারে অতিবেশি দুর্বল ছিলেন না। সাত বছর বয়সে হিফয সম্পন্ন করেন। উনার ভাই উনার অভিভাবক ছিলেন। তো হিফয সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর উনাকে কয়েকদিনের ছুটি দিলেন। আমাদের এখানে মেট্রিক পড়ার পর যেমন ছেলেরা বাজার ঘুরে-বেড়িয়ে আসে, তো হিফয শেষ হয়ে যাওয়ার পর উনাকে কিছুদিনের জন্য ছুটি দিলেন। আর ছুটির রুটিন ছিল, রোজ এক খতম করে কুরআন তেলাওয়াত করতে হবে আর বাকি সারাদিন ছুটি। তো শর্ত মোতাবেক উনি ভাইয়ের কথা মতো রোজ এক খতম কুরআন তেলাওয়াত করে বাকি সারাদিন ছুটি কাটাতেন। এভাবে কয়েকদিন ছুটি কাটানোর পর কিতাব আরম্ভ করবেন। দুই-চার দিন পর মাওলানা সাহেব ইয়াহইয়া সাহেবের নিকট গিয়ে আরজ করলেন, 'সময় তো কাটে না, কিতাব আরম্ভ করে দিন।' অর্থাৎ ছুটি নিজেই ক্যান্সেল করে কিতাব আরম্ভ করে দিলেন। তার বেকার সময় কাটছেই না। সুতরাং পড়ালেখায় খুব একটা দুর্বল ছিলেন না। বাকি অন্যান্য ব্যাপারে দুর্বল ছিলেন।
ব্যবসায়িক দুর্বলতা এবং ঋণের ঘটনা
মাওলানা ইয়াহইয়া সাহেবের বইয়ের ব্যবসা ছিল। দীর্ঘদিনের ব্যবসা। উনি যখন ইন্তেকাল করেন, তখন এই বইয়ের ব্যবসার সূত্র ধরেই সম্ভবত আট হাজার টাকা ঋণ রেখে যান। ওই যামানায় আট হাজার টাকা তো বিশাল বড় অঙ্কের টাকা। কারণ, তখন মানুষ এক আনা, দুই আনা দিয়ে পুরো পরিবারের সব বাজার-সদাই করে ফেলত। তো উনি আট হাজার টাকা ঋণ রেখে ইন্তেকাল করেন। আট হাজার টাকা তো এক দিনেই হয়নি, জমতে জমতে হয়েছে। ওই ব্যবসাতে আট হাজার টাকা তো ঋণ হওয়ারই কথা। কারণ ওই ব্যবসার কর্মচারী ছিলেন হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ.। তো কর্মচারী যদি এই জাতীয় হয়... মাওলানা ইলিয়াস রহ. ম্যানেজার ছিলেন। মাওলানা ইয়াহইয়া রহ. নিজেও কিছু কাজ করতেন। আর মাওলানা ইলিয়াস রহ. ওই বইয়ের দোকানে কিছু কাজ করতেন। কিন্তু কাজ তিনি কিছুই করতেন না... শরীরও দুর্বল... কাজের মেজাজও নেই... ম্যানেজার যিনি ছিলেন, তিনি মাওলানা ইলিয়াস রহ. সম্বন্ধে ইয়াহইয়া রা.-এর নিকট অভিযোগ করলেন যে, 'ও তো কাজ-টাজ কিছুই করে না...' এই অভিযোগ শুনে উনার বড় ভাই মাওলানা ইয়াহইয়া রহ. ম্যানেজার সাহেবের উপর খুবই নারাজ হলেন। আর ম্যানেজারকে এর উত্তরে বললেন,
"هَلْ تُنْصَرُونَ وَتُرْزَقُونَ إِلَّا بِضُعَفَائِكُمْ"
অর্থাৎ, উনার ভাই এমনটি মনে করেন যে, ওর কারণেই তো আমি রিযিক পাচ্ছি! ওর কাজ না করার কারণেই পাচ্ছি!
দুনিয়া ও আখিরাতের দৃষ্টিভঙ্গি
তো দুনিয়ার মানুষ এমন মনে করে, শক্তিশালী মানুষ ভালো কাজ করছে। আর ওর ভালো কাজ করার কারণে রিযিক আসছে। আর আল্লাহওয়ালা মনে করেন, দুর্বল মানুষ, কিছুই করে না। আর এর কারণেই আমার লাভ বেশি হচ্ছে!
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন, যেটাকে মানুষ বাস্তব জগত বলে, বাস্তবতা বলে বিশ্বাস করে, এই বিশ্বাস ভাঙাতে। মূলত এগুলোর কোনোটাই বাস্তব না। আর এগুলোর কোনোটির উপর তাদের আকিদাও ছিল না।
## হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা.-এর ঘটনা
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা.-এর জামাতের সামনে পানি। পার হওয়ার জন্য কোনো মাধ্যম জাতীয় কিছুই নেই। জামাতকে আদেশ দিলেন, পানি অভিমুখেই চলো। পুরো জামাত ঘোড়াসহ টাইগ্রিস নদী পার হয়ে গেলেন। নদীকে আর পানিকে বুঝিয়ে দিলেন যে, যাকে বাস্তবতা বলে তারা সেটাকে বিশ্বাস করেন না। পানিতে সাধারণত ডুবে যায়, এটি তারা মানেন। আমরা কি সাধারণ নাকি? ওই বিশ্বাস তো পাবলিকের জন্য! 'পাবলিকের জন্য নিষিদ্ধ' আমরা হোমরা-চোমরা যারা গেলাম, আমরা পাবলিক নাকি! আমরা অমুকের প্রেরিত আর অমুকের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। তো দারোয়ান কাচুমাচু করে বলবে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক আছে, ঠিক আছে। আর গুরুত্বের সাথে গেট খুলে দেবে। নিজ পরিচয় যখন দেবে যে, আমরা অমুক জায়গা থেকে এসেছি, অমুক জায়গায় যাচ্ছি—তো যেখানে লেখা রয়েছে যে, 'পাবলিকের প্রবেশ নিষিদ্ধ'—এটা আমাদের জন্য প্রযোজ্য হবে না। কারণ, আমরা বিশেষ ব্যক্তির পত্রবাহক।
এই কথাকে মানুষ সাধারণ ধরে নেবে যে, অমুকের চিঠি নিয়ে এসেছে। দারোয়ানদের মধ্যেও সিনিয়র-জুনিয়র ইত্যাদির স্তর আছে। এখন যে নতুন নিয়োগ হয়ে এসেছে, সে যদি ভুল করে তাকে আটকায়, জেরা করে যে, কে আপনি? কোথায় যাবেন? তো সিনিয়র দারোয়ান যখন দূর থেকে দেখবে যে, অমুকের লোক, সে দৌড়ে এসে জুনিয়র দারোয়ানকে ধাক্কা দিয়ে বলবে, স্যার! প্লিজ যান! আর জুনিয়র দারোয়ানকে বলবে, বেওকুফ কোথাকার! কার সাথে কি কথা বলতে হয় জানিস না! তোর চাকরি তো যাবেই, সাথে আমার চাকরিও যাবে! খুব ধমকালো যে, কার সাথে কোন নিয়ম জানিস না? দেখে চলবি না?
ঠিক সাহাবায়ে কেরাম রা. আল্লাহর কথা বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন, উনার জন্য পানি এই আচরণ কেন করবে! কোনো সন্দেহই নেই। উনি পুরোপুরি পানির উপর হেঁটে হেঁটে পুরো জামাত নিয়ে পার হয়ে গেলেন। অর্থাৎ, মূল কথা হলো, উনি বাস্তবতায় বিশ্বাসী না।
হযরত আলা আল-হাযরামি রা.-এর ঘটনা
বাহরাইনের দিকে আলা আল-হাযরামি রা.-এর সম্পূর্ণ জামাত পানির উপর দিয়ে পার করেছেন। ওটা সম্ভবত সমুদ্রের অংশ ছিল কি না ঠিক বলতে পারছি না। তিনি সম্পূর্ণ জামাত নিয়ে পানির উপর দিয়ে পার হয়ে এলেন।
ঈমানের দাবি: বাস্তবতাকে অস্বীকার করা
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে যে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন, এই দাওয়াতের দাবি হলো, গায়েবের উপর এত বেশি বিশ্বাস করব যে, সাধারণ মানুষ যাকে বাস্তবতা বলে, সে বাস্তবতাকে নির্দ্বিধায় অস্বীকার করতে পারব। সাধারণের জন্য এটা 'ঠিক'—মানি। সাধারণত পানিতে ডুবে—এটাও মানি; কিন্তু পানিতে ডুবেই যাবে—এ বিশ্বাস নয়। যদিও প্রচলিত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে।
তো আল্লাহ তাআলা দ্বীন দিয়েছেন এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে মুগায়্যিবাতকে সত্য হিসেবে জানার জন্য। মানুষ একটি জিনিসকে বারবার করে দেখে থাকে। আর যে বারবার একটি জিনিসকে দেখছে, ওই জিনিসকে এতবেশি গভীরভাবে মেনে নেয় যে, এর অন্যথা হতেই পারে না।
চশমা ও বিড়াল হওয়ার উপমা
একজন গরমের সময় গাছতলায় ঘুমিয়েছে। চোখে চশমা ছিল, চশমা পাশে রেখে ঘুমিয়েছে। ঘুম থেকে উঠে দেখে চশমা নেই আর কাছেই একটি বিড়াল বসে রয়েছে। আরেকজন লোকও সেখানে ছিল। তাকে জিজ্ঞাসা করলো, আমার চশমা কোথায়? সে লোকটি ওই বিড়ালের দিকে ইশারা করলো। সে বললো, আরে! এটা তো বিড়াল। ওই লোকটি বললো, ওই চশমাই তো বিড়াল হয়ে গিয়েছে। সে বললো, পাগলের মতো কথা বলো! চশমা কখনো বিড়াল হয়ে যায় নাকি! লোকটি বললো, কেন হবে না? জিজ্ঞাসা করলো, এরকম জিনিস হতে কোথাও কখনো দেখেছো! লোকটি বললো, আমাদের বাড়িতে তো প্রায়ই হয়। জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়? লোকটি বললো, ডিম ছিলো, কিছুদিন পর দেখি মুরগির বাচ্চা হয়ে গিয়েছে। জিজ্ঞাসা করলো, আচ্ছা, ডিম থেকে তো মুরগিরই বাচ্চা হবে, তাই বলে কি চশমা বিড়াল হয়ে যাবে নাকি? চশমা একটি প্রাণহীন জিনিস আর বিড়াল একটি জীবন্ত জিনিস। লোকটি বললো, ডিমও তো প্রাণহীন আর মুরগি তো জীবন্ত। এমনটি তো হামেশাই হয়ে থাকে, তাই চশমার ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে।
এখন চশমা অন্বেষী ব্যক্তি ওই যুক্তি কোনোভাবেই মানতেই রাজি হচ্ছে না। অথচ লোকটি যৌক্তিক দাবি করছে। মূলত ডিম মুরগি হওয়া—এটাকে আমরা এতবেশি দেখেছি আর শুনেছি যে, এটি কোনো আশ্চর্য জিনিস মনেই হয় না; কিন্তু চশমার বিড়াল হওয়া যেহেতু কেউ কোনোদিন দেখেনি, শুনেনি, তাই এটা অসম্ভব। অথচ যুক্তির চাহিদা ছিল, ওইটা যদি সম্ভব হয়, তবে এটি অসম্ভব হবে কেন? ব্যাপারটি তো একইরকম। সেখানে ডিম থেকে বাচ্চা বের হয়েছে আর এখানে চশমা থেকে বিড়াল হয়েছে।
বাস্তবতার সংজ্ঞা
সুতরাং বাস্তবতা কাকে বলে? যেটাকে আমরা বারবার দেখেছি। দেখতে দেখতে, শুনতে শুনতে এমন হয়েছে যে, এটাকে আমরা মেনেই নিয়েছি; এতে কোনো সন্দেহই নেই। আর গায়েব হলো, যাকে দেখিনি, শুনিনি, তাই এতে সন্দেহ হয়।
ঈমানের দাবি হলো, মুগায়্যিবাতের চর্চা এত বেশি করা এত বেশি করা আর বাস্তবতার নফি এত বেশি করা, যেন এই বিশ্বাস উল্টে যায়। মাটিতে হাঁটার সময় পা দিয়ে একটু টিপে টিপে দেখে যে, এখানে পা ডুবে যাবে কি না, যদি ডুবে যায়। আচ্ছা, মাটিতে কি কেউ ডুবে নাকি? বলবে, পানিতে কত মানুষ ডুবে যায়, তাহলে মাটিতে ডুববে না কেন! মুগাইয়্যেবাতে বিশ্বাসী লোকের কাছে মাটিতে ডুবে যাওয়া এমনই মনে হবে, পানিতে ডুবে যাওয়া যেরকম সম্ভব।
আল্লাহ তাআলা এই বাস্তবতার নফি দিয়ে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন। মুসা আলাইহিস সালামকে প্রথম যে কথা শিক্ষা দিলেন... মুসা আলাইহিস সালাম তার লাঠিকে সাধারণ একটি লাঠি তথা একটি বাস্তব জিনিস ভেবেছিলেন। আল্লাহ তাআলা সম্বোধন করে বললেন, তোমার হাতে এটি কী? মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, এটি আমার লাঠি। এর উপর আমি হেলান দেই। এটি দিয়ে পাতা ঝেড়ে পশুকে খাওয়াই। এবং অন্যান্য কাজও এটি দিয়ে করি। এ কথাগুলো যে বলে যাচ্ছেন, এসব কথার আড়ালে লাঠির একটি বাস্তব রূপের উপর তার আস্থা প্রকাশ পায়। তার হাতে যদি সাপ থাকত তবে এ কথা বলতেন না যে, আমি এর উপর হেলান দেই, এটি দিয়ে পাতা পাড়ি। কারণ, সাপ দিয়ে এসব কাজ হয় না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এই লাঠির মধ্যেই সাপের আচরণ দিয়ে দিলেন। ফেলে দিতে বললেন,
**رَآهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ**
'তখন তারা দেখলেন ওইটা নড়ছে।' এটি যে সাপ হয়ে গিয়েছে, আলাদা করে এমনটি বলেননি। বরং বললেন,
**كَأَنَّهَا جَانٌّ**
'যেন এটি সাপ।' ওই লাঠি, লাঠিই আছে; কিন্তু সাপের মতো ওটি দৌড়াচ্ছে। বললেন, এটিকে ধরো! ধরলে আমি এটিকে এটির আগের আচরণে ফিরিয়ে দেব।
**سَنُعِيدُهَا سِيرَتَهَا الْأُولَى**
সিরাত বলা হয় আচরণকে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাত, এই সিরাত শব্দটি ওই সিরাত থেকেই। আল্লাহ তাআলা বললেন, তার আগের আচরণে ফিরিয়ে দেব। লাঠির আচরণের যে বিষয়টি থাকে যে, এটি সোজা থাকে; এটিতে হেলান দেওয়া যায়; এটি দিয়ে কাজ করা যায়—এর কোনোটিই বাস্তব জিনিস নয়। আর সাপ দর্শন করে—এটিও কোনো বাস্তব জিনিস নয়।
তো দুনিয়ার যেসব জিনিস মানুষ দেখছে, আর এ দেখার উপরই পরবর্তীতে চলছে; এর উপর চিন্তা করছে; ধারণা করছে; কল্পনা করছে; পদক্ষেপ নিচ্ছে—এসবই অবাস্তব। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
**وَتَرَى الْجِبَالَ تَحْسَبُهَا جَامِدَةً وَهِيَ تَمُرُّ مَرَّ السَّحَابِ**
'তুমি পাহাড়কে দেখ আর ধারণা করো যে, এটি স্থির। এটি তোমার ধারণামাত্র; মূলত এটি মেঘের মতো ভাসছে।'
অতএব, পাহাড় কোনো স্থির জিনিস নয়। দুনিয়ার মানুষ জায়গাগুলোতে পাহাড় স্থির দেখে এবং এটাকেই বাস্তব মনে করে। এই বাস্তবতার আকিদার উপর যা কিছু করা হয়ে থাকে, এগুলোকেই বলে 'কাজ'। কাজ হলো বাস্তবতার বুনিয়াদের উপর। আর গায়েবের বুনিয়াদের উপর যেগুলো করা হয় ওগুলোকে 'কাজ' বলে না, ওগুলোকে বলে 'আমল'।
দুই ভাই এক সাথে ডাক্তারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। একজন হাসপাতালে চাকরি নিয়েছে। আরেকজন আল্লাহওয়ালা দরবেশ, চাকরি-টাকরি নেয়নি। সকালবেলা পাশের বস্তিতে যায়। সেখানের ঘরে ঘরে খোঁজ করে। রোগী দেখলে নিজেই চিকিৎসাপত্র কিনে দেয়। প্রেসক্রিপশন দিয়ে তো লাভ নেই, নিজেই ওষুধ কিনে দেয়। ওদের প্রেসক্রিপশন দিয়ে কী লাভ, ওরা তো ওষুধ কিনতে পারবে না। দুই ভাই এক সাথে বের হয়, দুজনই সারাদিন রোগী দেখে, দুজন এক সাথে ঘরে ফেরে। বড় ভাই যিনি হাসপাতালে চাকরি করেন, তার সম্পর্কে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, আবদুল্লাহ কী করে? বলে, কাজ করে। আর আবদুর রহমান কী করে? বলে, ও মসজিদে যায়, নামাজ কালাম পড়ে, কিন্তু কিছুই করে না। তো ওরা কোথায়? বলে, আবদুল্লাহ কাজে গিয়েছে। আবদুর রহমান কোথায়? বলে, কোথায় টই টই করে ঘুরছে। জিজ্ঞাসা করলো, তো কোথায় কী টই টই করে? বলবে, খুব সম্ভবত ওই মসজিদে গেলে তাকে পাওয়া যাবে। মসজিদে গিয়ে কী করে? রোগী দেখছে।
তো দুজনই একসাথে বের হয়ে যায়, দুজনই এক সাথে রোগী দেখে, দুজনই এক সাথে ঘরে ফেরে; কিন্তু যে বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে, অর্থাৎ টাকা পাওয়ার জন্য কাজ করছে, তাকে বলে কাজ। আর যে কাজে কোনো টাকা পাবে না, অর্থাৎ বাস্তবভিত্তিক নয়, তার কাজকে বলে টইটই। কেউ কেউ হয়তো বলবে, খুব আল্লাহওয়ালা লোক; আমল করছে। কেউ বলতে পারে যে, সে তো সারাদিন রোগী দেখছে। আসলে ও রোগী দেখছে না, ও আসলে আমল করছে। আচ্ছা, তাহলে হাসপাতালে যে সমস্ত ডাক্তাররা রোগী দেখছে, তারা কি আমল করছে? এর উত্তর হলো, ওরা আমল করছে না; কাজ করছে। এটা কিভাবে? এর উত্তর হলো, ওখানে বেতন পায়, তাই ওটা কাজ আর এখানে বেতন তো পায় না, বরং নিজের পক্ষ থেকে রোগীদের ওষুধও কিনে দেয়, আল্লাহর ওয়াস্তে কাজগুলো করে, এজন্য এটি আমল। এটি তোমার তেলাওয়াতের চেয়েও বেশি সাওয়াব। তো বাহ্যিকভাবে দুটো কাজ একই যে, রোগী দেখা, তার ডায়াগনোসিস করা, তার প্রেসক্রাইব করা ইত্যাদি; কিন্তু যেটা বাস্তবতার উপর প্রতিষ্ঠিত, সেটি হলো কাজ আর যেটা মুগাইয়্যেবাতের উপর প্রতিষ্ঠিত, সেটি হলো আমল। কেন করছে? কারণ, আল্লাহ তাআলা এর আজর (প্রতিদান) দিবেন। কোথায় কী আজর, কোথায় পাবে—এগুলোর কিছুই জানা নেই; এটুকু জানা যে, আল্লাহ দেবেন—আল্লাহর ওয়াদা।
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন পুরো দুনিয়ার মানুষকে কাজ থেকে সরিয়ে আমলে নিয়োগ করতে। অর্থাৎ, বাস্তবতাকে অস্বীকার করাতে আমল মুগাইয়্যেবাতকে স্বীকার করাতে। কুরআনের ভাষায়: **يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ**।
এরকম বাস্তব পরিস্থিতি: বনি ইসরাইল এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েছে যে, যদি সামনে অগ্রসর হয় তাহলে সমুদ্রে ডুবে যাবে। আর যদি সামনে অগ্রসর না হয় তবে ফেরাউনের বাহিনী এসে ধরে মেরে ফেলবে। পরিস্থিতি ভয়াবহ রকমের খারাপ। তারা বলতে লাগলো যে, আমরা তো ধরা পড়ে যাব। অর্থাৎ, যুক্তিসঙ্গতভাবে এখান থেকে বের হওয়ার কোনো বুদ্ধি নেই। মুসা আলাইহিস সালাম বাস্তবতায় বিশ্বাস করেন না। আর বাস্তবতায় বিশ্বাস না করার কারণে তার দৃষ্টিতে এটি কোনো সমস্যাই নয়। তিনি উঠলেনই না; বরং বললেন,
**إِنَّ رَبِّي سَيَهْدِينِ**
তাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, আপনি কোন বুদ্ধিতে বললেন, সমস্যা নেই। তিনি বলবেন, আমি কোনো বুদ্ধিতে বলিনি। আমি বুদ্ধিতে চলা কোনো মানুষ নই। মূলত বুদ্ধিতে বনি ইসরাইল ভয় পাচ্ছে আর বিনা বুদ্ধিতে আমি শান্তিতে আছি। সব বুদ্ধি তো বাস্তবতা ভিত্তিক।
দুই পিতার দুই ছেলে... অসুস্থ... ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললো, উভয়ের ক্যান্সার হয়েছে। একজন পিতা বুদ্ধিমান। তার নিকট ক্যান্সার শব্দটি আর মৃত্যুর সংবাদ প্রায় একই জিনিস। ও একেবারে ভেঙে পড়ে কান্নাকাটি শুরু দিলো। এর আগেরদিন ছেলেকে অনেক শাসন করেছিল যে, পরীক্ষায় ভালো করে পড়তে হবে। ভালো রেজাল্ট করতে হবে। এডমিশনসহ দীর্ঘ প্রস্তুতির বিষয় রয়েছে; কিন্তু সন্তানের ক্যান্সার হয়েছে শুনে ছেলে তো পড়তে বসেই না। মাস্টার এসেছিল, ছেলে তাকেও বিদায় করে দিল। পিতা এই সবকিছুই দেখছে, কিন্তু কিছুই বলছে না। কেউ জিজ্ঞাসা করলো, ও তো পড়াশোনা করছে না! বললেন, পড়াশোনা করে কী আর হবে। জিজ্ঞাসা করলো, ও কি পরীক্ষা দেবে না!
এর বিপরীতে অন্য পিতা... বেচারার তো কোনো বুদ্ধিই নেই। সে তার ছেলেকে রীতিমতো শাসন করে যাচ্ছে যে, সামনে তো পরীক্ষা, পড়তে বসছিস না! ছেলে বললো, আব্বু বুঝতে পারছেন না! আমার তো ক্যান্সার! বাবা বললেন, হোক ক্যান্সার, আগে পরীক্ষা দাও। ক্যান্সার হয়েছে তো কী হয়েছে, আমাদেরও অনেক ক্যান্সার হয়েছে। এই বাবার সর্দি-কাশি হয়েছিল। ওটা দেখিয়ে সে বললো, আমাদেরও অনেক ক্যান্সার হয়েছে!! ক্যান্সার হয়েছে বলে পরীক্ষা দেবে না—এটা চলবে না। অর্থাৎ, পরিস্থিতি যেন বুঝেই না। আল্লাহ তাআলা আমাদের দ্বীন দিয়েছেন, এই দ্বীন দুনিয়ার ব্যাপারে যেন একেবারেই অবুঝ। যে বাস্তবতায় বিশ্বাস করে না, সে অবুঝ হবে না তো কী হবে। এতবেশি অবুঝ যে, মিয়াজী রহমাতুল্লাহি আলাইহির উপযুক্ত দৃষ্টান্ত হতে পারেন।
তার বিষয়ে কিছু বিষয় হয়তো সত্য, আর কিছু হয়তো লোকেরা এখান থেকে-ওখান থেকে বানিয়েছে। তার সম্বন্ধে বলা হয় যে, তিনি অনেক আল্লাহওয়ালা ছিলেন। একদিন কোনো এক জায়গা বসে ছিলেন আর কেউ এসে বললো, আপনার বাড়িতে সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে। জিজ্ঞাসা করলেন, কী হয়েছে? বললো, আপনার স্ত্রী বিধবা হয়ে গিয়েছে। তার বয়স তখন খুব বেশি নয় আর স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন। যখনই এই দুঃসংবাদ পেলেন, স্ত্রী বিধবা হয়ে গিয়েছে, তিনি খুব হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন— হায় আল্লাহ! এ বয়সে বেচারি বিধবা হয়ে গিয়েছে, তার কী উপায় হবে! কেউ এসে বোঝালো যে, আপনি তো রীতিমতো জিন্দা, তাহলে আপনার স্ত্রী কিভাবে বিধবা হলো? তিনি বললেন, একজন মুসলমান এই কথা বলেছে, সে কি আর মিথ্যা কথা বলবে! তুমি যে কথা বলছ, সেটাও ঠিক, একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো কথা নয়; কিন্তু একজন মুসলমান আমাকে এ কথা বলেছে। সে তো আর ফালতু বলবে না। অর্থাৎ, বাস্তবতা সে বুঝেই না যে, আমি এখনো জিন্দা। আমার জিন্দা থাকাবস্থায় আমার স্ত্রী কেমন করে বিধবা হবে!
হাদিসে এসেছে
যদিও হুবহু এই শব্দে না হলেও এর সমার্থক মর্মে বর্ণিত হয়েছে যে, **اهل الجنة بله** অর্থাৎ "জান্নাতিরা সাদাসিধে হবে।" তাদেরকে জাহেরিভাবে ছোটখাটো ব্যাপারে খুব ঠকানো যাবে। তারা চালাকচতুর হবে না। চালাক-চতুর মানে হলো, যারা বাস্তবতাকে খুব বোঝে। তবে সাদাসিধে মানুষকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঠকানো যাবে না। কারণ আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সাহায্য করবেন।
ইরশাদ হয়েছে:
**إِتَّقُوا فِرَاسَةَ الْمُؤْمِنِ، فَإِنَّهُ يَنْظُرُ بِنُورِ اللهِ**
অর্থ: "তোমরা ঈমানদার ব্যক্তির দূরদর্শিতাকে সমীহ করে চলবে। কেননা তিনি আল্লাহর নূরের আলোকে অনেক কিছুই দেখতে পান।"
ছোটখাটো বিষয়ে হয়তো বোকা মানুষকে ঠকাতে পারবে; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঠকানো যাবে না। কিন্তু জাহেরি বিষয়াদিতে তাদেরকে দেখা যাবে যেন কিছুই বোঝে না। "বোঝে না"—এর অর্থ হলো, যাকে বাস্তবতা বলে, সেটাকেই সে বোঝে না। যেটাকে সে মানেই না, সেটা বুঝবে কীভাবে! সে তো বাস্তবকেই দেখে না।
মূসা (আ.)-এর ঘটনা থেকে শিক্ষা
মূসা (আ.)-এর ক্ষেত্রে যেমন ফেরাউনের বাহিনী আর সমুদ্র—এ দুটোই তো তাঁর নিকট বাস্তব নয়। সমুদ্র তো কী হয়েছে! ফেরাউনের বাহিনী তো কী হয়েছে! বলা হলো, "বুঝতে পারছেন না যে, পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হয়ে গেছে!" কিন্তু না; তিনি বুঝতে পারছেন না। আর মূসা (আ.)-এর না বোঝাটাই শুদ্ধ। বনি ইসরাইল অতিরিক্ত বুঝে। যদিও কয়েকদিন পরে তারা বেঁচে গেল; কিন্তু মাঝখানে কয়েকটা দিন তাদের পেরেশানিতে কেটেছে।
তো এই বাস্তবতার যতবেশি জ্ঞান হবে, ততবেশি তার পেরেশানি বাড়বে। হাবাগোবা হয়ে গেলে কোনো পেরেশানি নেই।
দুনিয়ার জ্ঞান ও পেরেশানি
দুনিয়ার মানুষ যতবেশি বোঝে ততবেশি পেরেশান। যারা দেশ-দুনিয়া বোঝে, উন্নত জগৎ অর্থাৎ ইউরোপ-আমেরিকামুখী, জ্ঞান বৃদ্ধি করে লাভটা কী হয়েছে? বরং আত্মহত্যার হার বৃদ্ধি পেয়েছে; পেরেশানি বেড়েছে। অবাস্তবকে যদি বাস্তব মনে করে তাহলে পেরেশানি তো হবেই।
### সিলেটের ট্রেন দুর্ঘটনার ঘটনা
সিলেটে আগে ট্রেন একটাই ছিল, যাকে সুরমা এক্সপ্রেস বলে। এটি আগে খুব স্লো চলতো। সন্ধ্যায় রওনা দিয়ে সকালে সিলেট পৌঁছাত। সিলেট কলেজের একজন প্রফেসর ট্রেনের কেবিনে শুয়ে ছিলেন। রাস্তায় খুব ঝাঁকুনি হচ্ছিল। তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন আর স্বপ্নে ঝাঁকুনিকে তিনি দেখলেন যে, ট্রেন এক্সিডেন্ট করেছে। আসলে ঝাঁকুনি হয়েছে। আর যেহেতু তিনি খুব হুঁশিয়ার মানুষ ছিলেন, তাই ট্রেন থেকে দিলেন লাফ। তো ট্রেন তাঁকে ফেলে দিয়ে চলে গিয়েছে আর তিনি গেলেন হাসপাতালে।
তো কী কারণে এমনটি ঘটলো? কারণ তিনি বাস্তবতা বেশি বোঝেন আর তাই অবাস্তবকে বাস্তব মনে করছেন। গোটা দুনিয়ার মানুষ এমনটিই মনে করছে—ঝাঁকুনি খায় আর মনে করে এক্সিডেন্ট হয়েছে ধারণা করে বসে।
পাহাড় সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:
**وَتَرَى الْجِبَالَ تَحْسَبُهَا جَامِدَةً**
"পাহাড় সম্পর্কে তোমরা ধারণা করো যে, এটি স্থির। তোমার ধারণা। দুনিয়ার সবকিছুতেই ধারণা করছ। পাহাড় সম্পর্কে কিছু ধারণা করে, সমুদ্র সম্পর্কে কিছু ধারণা করে আর এই ধারণার উপরেই মরছে।"
উপর থেকে যারা লাফ দেয় আর পরবর্তীতে যখন তাদের পোস্টমর্টেম করা হয় তো অনেক ডাক্তারের রিপোর্টে এমন থাকে যে, সে মাটি স্পর্শ করার আগেই মারা গিয়েছে। তার প্রাণ ভয়ে আগেই শরীর ত্যাগ করেছে।
আবু ইবরাহিমের ভাইয়ের পাঠানো ঘটনা
কিছুক্ষণ পূর্বে শায়খ উসাইমিনের শিষ্য আবু ইবরাহিমের কথা বলেছিলাম। এই আবু ইবরাহিমের ছোট ভাই মুহাম্মাদ মুশাররাফ। কিছুদিন আগে একটি কথা সে ইমেইল করে আমার নিকট পাঠিয়েছে। কোন জায়গার ঘটনা, সে কোথায় পেয়েছে—আমি জানি না।
একটি বড় দোকানে বেশ কিছু কর্মচারী কাজ করত। দোকানের জিনিসপত্র রাখার জন্য বড় একটি ফ্রিজার ছিল। ফ্রিজটি আবার ঘরের মতো, দরজা দিয়ে ঢুকতে হতো। তো একজন কোনো প্রয়োজনে সেই ফ্রিজের রুমে ঢুকেছিল। অফিস টাইম শেষে সবাই দোকান বন্ধ করে বাইরে চলে গেল। সে যে ফ্রিজের রুমে কেউ তা খেয়াল করেনি। তখন ছিল শুক্রবার বিকাল, শনি-রবি দুইদিন দোকান বন্ধ। তিনদিন পরে এসে এই ফ্রিজার খোলা হবে। আর এই রেফ্রিজারেটরগুলোতে অনেক হাই টেম্পারচার থাকে। সে বেচারা নিরাশ হয়ে গেল যে, এবার নিশ্চিত মারাই যাচ্ছি। ফ্রিজের ভেতর কাগজ-কলম ছিল। সে বেচারা আত্মজীবনী লিখতে আরম্ভ করলো। মানুষ আত্মজীবনী লিখতে পছন্দ করে।
তো সে ব্যক্তি কোনোরকম করে লিখতে শুরু করলো যে, "ঠাণ্ডা হয়ে আসছে.... আমার শরীর জমে যাচ্ছে...." এরকম কিছু লেখার পরে আর কোনো লেখা নেই।
দুদিন পরে ফ্রিজের ভেতর থেকে তার লাশ বের হলো। আর এর বাস্তবতা ছিল এই যে, সে রেফ্রিজারেটরের কারেন্ট ফেইলিউর ছিল। ফ্রিজটি কোনো ঠাণ্ডাই হয়নি। কিন্তু তার বাস্তবতার বিশ্বাসের কারণে সে ঠাণ্ডা অনুভব করে মারা গিয়েছে। আল্লাহ তাআলা এই কথাই বলছেন, **تَحْسَبُهَا جَامِدَةً** "তুমি ধারণা করোমাত্র।" ধারণা করেই সে মারা গেল।
## ধারণাপ্রসূত পেরেশানি
দুনিয়ার মানুষ এমন অসত্য কথাকে সত্য ধারণা করে পেরেশান হচ্ছে। কেউ মরা পর্যন্ত চলে যাচ্ছে, কেউ পেরেশান হচ্ছে। দুনিয়াতে মানুষের যত পেরেশানি আছে, সেগুলো এই মুহূর্তের পেরেশানি নয়; বরং সব ভবিষ্যতের পেরেশানি। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পেরেশান করছে, আর সেই ধারণা করে পেরেশান হচ্ছে এই বর্তমানে। বনি ইসরাইল ধারণা করছে ভবিষ্যতে আর পেরেশান হচ্ছে বর্তমানে। আর যে ভবিষ্যতের ধারণা করল, দেখা গেল মূলত পেরেশানির কিছুই নেই। মূসা (আ.)-ও ফেরাউনের কবল থেকে বের হয়ে গেছেন, বনি ইসরাইলও বের হয়ে গিয়েছে। মূসা (আ.) মাঝখানে খুব আনন্দে ছিলেন অথচ ওরা পেরেশান থাকল।
তো ভাই, আল্লাহর পথে বের হয়ে নিজের এই ভুল ধারণার চর্চাকে মিটিয়ে দিতে হবে। বাস্তবতাকে অস্বীকার করা শিখি আর বাস্তবতা ভিত্তিক যত কাজ আছে, সব কাজের মোকাবেলায় আমলকে দাঁড় করাই। কাজ কমাবো, আমল বাড়াবো। ঠিক আছে ইনশাআল্লাহ! আল্লাহ তাআলা সবাইকে তাওফিক নসিব করুন।
**سبحان الله وبحمده**
---
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
বাহ্যিক উন্নতি নাকি আত্মিক সমৃদ্ধি?
اَلحَمْدُ لِلّٰهِ نَسْتَعِينُهُ وَنَعُوذُ بِاللهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَا...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
২১৬
জরুরত - মানুষের প্রয়োজন ও ইবাদত
(প্রদত্ত বয়ান হতে সংগৃহীত) স্থান: আলাইপুর মারকাজ মসজিদ, নাটোর তারিখ: ১৬ নভেম্বর,২০০৭ ,শুক্রবার ফজরে...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
২০০
আদরের ভাইটিকে বলছি
( দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের আলোকিত পরশে দ্বীন পাওয়া প্রতিটি কলেজ বা ভার্সিটির জেনারেল শিক্ষিত ছাত্র ...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১১১০২
নিভৃতচারী আল্লাহওয়ালাদের খোঁজে
হজরতের গড়া ছোট্ট, অথচ সুন্দর মাদ্রাসা। মাদ্রাসা থেকে এক ছাত্রকে রাহবার হিসেবে সাথে নিয়ে যখন হজরতের ব...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
৯৭৪৭
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন