প্রবন্ধ
অহেতুক কসম ও লানত- দুটি বিপজ্জনক কথার অভ্যাস
১৭ অক্টোবর, ২০২৬
০
০
মানুষের শরীরের সবচেয়ে ছোট অঙ্গগুলোর একটি হলো জিহ্বা; কিন্তু এর মাধ্যমে মানুষ যেমন আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে, তেমনি ভয়াবহ গুনাহেও লিপ্ত হতে পারে। একটি সত্য কথা মানুষকে সম্মানিত করতে পারে, আবার একটি মিথ্যা কথা তার দুনিয়া-আখিরাত ধ্বংসের কারণ হতে পারে। একটি সুন্দর বাক্য মানুষের হৃদয় জয় করতে পারে, আবার একটি লানত ও অভিশাপ সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে।
আমাদের সমাজে জবানের কিছু অপব্যবহার প্রায় স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কথায় কথায় কসম করা, নিজের বক্তব্যকে জোরালো করার জন্য আল্লাহর নাম ব্যবহার করা, গায়রুল্লাহর নামে কসম করা, মিথ্যা কসম করে নিজের স্বার্থ হাসিল করা এবং রাগের সময় মানুষকে লানত করা- এসব বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ অত্যন্ত কঠোর সতর্কতা দিয়েছে।
কসম কী?
আরবি يَمِين ও حَلِف অর্থ শপথ বা কসম। শরিয়তের পরিভাষায় কোনো বিষয় করা বা না করার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার নাম বা তাঁর কোনো গুণের উল্লেখ করে দৃঢ় অঙ্গীকার করাকে কসম বলা হয়।
কসম মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই এটিকে সাধারণ কথাবার্তার অলংকার বানানো মুমিনের শোভা নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
مَنْ كَانَ حَالِفًا فَلْيَحْلِفْ بِاللَّهِ أَوْ لِيَصْمُتْ
“যে ব্যক্তি কসম করবে, সে যেন আল্লাহর নামে কসম করে; অথবা চুপ থাকে।” -সহিহ বুখারি, হাদীস ২৬৭৯
অতএব কসম করতে হলে আল্লাহর নামেই করতে হবে। ‘বাবার কসম’, ‘মায়ের কসম’, ‘সন্তানের কসম’, ‘কাবার কসম’ ইত্যাদি বলে কসম করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
مَنْ كَانَ حَالِفًا فَلَا يَحْلِفْ إِلَّا بِاللَّهِ أَلاَ
সাবধান! যদি তোমাদের শপথ করতে হয় তবে আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো নামে শপথ করো না। সহিহ বুখারি, হাদীস ৩৮৩৬
এমনকি কোনো ব্যক্তি গায়রুল্লাহর নামে কসম করে ফেললে তাকে তাওহিদের বাক্য উচ্চারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে বোঝা যায়, গায়রুল্লাহর নামে কসমের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর।
কথায় কথায় কসম করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلَّافٍ مَّهِينٍ
এবং অত্যধিক কসমকারী হীন ব্যক্তির কথায়ও চলো না। -সূরা আল-কলম, ৬৮:১০
এখানে حَلَّاف অর্থ অধিক কসমকারী। অর্থাৎ কথায় কথায় কসম করা এমন একটি নিন্দনীয় অভ্যাস, যা কুরআন একজন মানুষের নিকৃষ্ট চরিত্রের সঙ্গে উল্লেখ করেছে।
যে সকল কাফের মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধাচরণে অগ্রণী ভূমিকা রাখছিল এবং যে-কোনও উপায়ে তাকে দীনের প্রচার কার্য হতে বিরত রাখার চেষ্টা করছিল, তাদের মধ্যে কয়েকজন আখলাক-চরিত্রের দিক থেকে অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ের ছিল। তাদের একটি বদঅভ্যাস ছিল অত্যধিক কসম করা। -তাফসীরে উসমানী
যার দিলে আল্লাহর নামের আজমত ও মর্যাদা নেই। ফলে সে মিথ্যা শপথ করাকে এক মামূলী বিষয় মনে করে। তাছাড়া যেহেতু মানুষ তার কথায় আস্থা রাখে না, এজন্য তাদের বিশ্বাস অর্জনের উদ্দেশ্যে বারবার সে শপথ করে, আর এভাবে মানুষের নিকট লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়।
আরও একটি আয়াত থেকেও বোঝা যায়, অহেতুক কসম করার কোনো সুযোগ নেই। কসম করতে হলে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
আর আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَاحْفَظُوا أَيْمَانَكُمْ
“তোমরা তোমাদের কসমসমূহ সংরক্ষণ করো।” -সূরা আল-মায়েদা, ৫:৮৯
কসমকে সংরক্ষণ করার অর্থ হলো- অপ্রয়োজনে কসম না করা, কসমকে খেলাচ্ছলে ব্যবহার না করা এবং কসম করলে তার ব্যাপারে দায়িত্বশীল থাকা।
কসম করা কোনও তামাশার বিষয় নয়। সুতরাং প্রথমত চেষ্টা থাকতে হবে, কসম যত কম করা যায়। বিশেষ প্রয়োজনে যদি কসম করতেই হয়, তবে সাধ্যমত তা পূর্ণ করার চেষ্টা থাকা চাই। -তাওযীহুল কুরআন
কসমের হেফাজতের অর্থ এই যে, প্রয়োজন ছাড়া কথায় কথায় কসম খাবে না; এ অভ্যাস ভাল নয়। আর কসম খেলে তা যথাসাধ্য পূর্ণ করবে এবং কোন কারণে ভঙ্গ করলে কাফ্ফারা দেবে। এ সবই 'কসমের হেফাজত'-এর অন্তর্ভুক্ত। -তাওযীহুল কুরআন
কসমের কারণে ভালো কাজ বন্ধ করা যাবে না
অনেক সময় মানুষ রাগের মাথায় কসম করে ফেলে- “আমি তার সঙ্গে আর কথা বলব না”, “আমি তার বাড়িতে যাব না”, “আমি তাকে কোনোদিন ক্ষমা করব না।” পরে ভালো কাজের সুযোগ এলেও সে কসমকে অজুহাত বানিয়ে তা থেকে বিরত থাকে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَا تَجْعَلُوا اللَّهَ عُرْضَةً لِّأَيْمَانِكُمْ أَن تَبَرُّوا وَتَتَّقُوا وَتُصْلِحُوا بَيْنَ النَّاسِ
এবং তোমরা নিজেদের শপথসমূহে আল্লাহ (-এর নাম) কে পুণ্য ও তাকওয়ার কাজসমূহ থেকে এবং মানুষের মধ্যে আপোস রফা করানো থেকে বিরত থাকার উপলক্ষ বানিও না। আল্লাহ সবকিছু শোনেন, জানেন। -সূরা আল-বাকারা, ২:২২৪
অনেক সময় মানুষ সাময়িক উত্তেজনাবশে কসম খেয়ে বসে যে, আমি অমুক কাজ করব না, অথচ সেটি পুণ্যের কাজ। যেমন একবার হযরত মিসতাহ (রাযি.)-এর দ্বারা একটি ভুল কাজ হয়ে গিয়েছিল। ফলে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.) কসম করেছিলেন যে, তিনি আর কখনও তাকে আর্থিক সাহায্য করবেন না। এমনিভাবে রূহুল মাআনীতে একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাযি.) নিজ ভগ্নিপতি সম্পর্কে কসম করেছিলেন, তার সঙ্গে কখনও কথা বলবেন না এবং তার স্ত্রীর সঙ্গে তার আপোসরফা করিয়ে দেবেন না। আলোচ্য আয়াত এ জাতীয় কসম করতে নিষেধ করছে। কেননা এতে আল্লাহ তাআলার নাম ভুল ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। সহীহ হাদীসে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কেউ এ রকম অনুচিত কসম করলে তার উচিত কসম ভেঙ্গে ফেলা ও তার কাফফারা দেওয়া। -তাওযীহুল কুরআন
কসম কোনো সাধারণ কথার অলংকার নয়
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَأَوْفُوا بِعَهْدِ اللَّهِ إِذَا عَاهَدتُّمْ وَلَا تَنقُضُوا الْأَيْمَانَ بَعْدَ تَوْكِيدِهَا
“তোমরা যখন আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার করো, তখন তা পূর্ণ করো এবং দৃঢ়ভাবে কসম করার পর তা ভঙ্গ করো না।” -সূরা আন-নাহল, ১৬:৯১
অতএব কসম কোনো কথার জোর বাড়ানোর উপকরণ নয়; এটি দায়িত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। যে ব্যক্তি কথায় কথায় কসম করে, সে মূলত কসমের এই মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ন করে।
ব্যবসায় বারবার কসম করা
ব্যবসায়িক লেনদেনে কসমের অপব্যবহার আরও ভয়াবহ। অনেক ব্যবসায়ী ক্রেতাকে আকৃষ্ট করতে বারবার বলেন- “আল্লাহর কসম, এত লাভ নেই”, “আল্লাহর কসম, এটাই শেষ দাম”, “আল্লাহর কসম, আমি এত টাকায় কিনেছি।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
الْحَلِفُ مُنَفِّقَةٌ لِلسِّلْعَةِ مُمْحِقَةٌ لِلْبَرَكَةِ
আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, মিথ্যা কসম পণ্য চালু করে দেয় বটে, কিন্তু বরকত নিশ্চিহ্ন করে দেয়। -সহিহ বুখারি, হাদীস ২০৮৭; সহিহ মুসলিম, হাদীস ১৬০৬
অর্থাৎ কসমের মাধ্যমে হয়তো সাময়িকভাবে বিক্রি বাড়ে, কিন্তু উপার্জনের বরকত নষ্ট হয়ে যায়।
আর এক হাদীসে এসেছে-
ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ... وَرَجُلٌ جَعَلَ اللَّهَ لَهُ بِضَاعَةً، فَلَا يَبِيعُ إِلَّا بِيَمِينِهِ وَلَا يَشْتَرِي إِلَّا بِيَمِينِهِ
“তিন ব্যক্তির সঙ্গে আল্লাহ কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না... তাদের একজন হলো সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর নামকে নিজের ব্যবসার পণ্য বানিয়ে নিয়েছে- কসম ছাড়া বিক্রি করে না এবং কসম ছাড়া ক্রয় করে না।” -মু’জামে সগীর-তাবরানি, হাদীস ৮২১; মু’জামে কাবীর তবারানী, হাদীস ৫৫৭৭; সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহাহ, হাদীস ৩৪৬১-এর অধীনে
কত ভয়ংকর সতর্কবার্তা! ব্যবসায় সামান্য সুবিধা নেওয়ার জন্য আল্লাহর মহান নামকে বারবার ব্যবহার করা কত বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে, এ হাদীস তারই শিক্ষা দেয়।
মিথ্যা কসম- আরও ভয়াবহ অপরাধ
অহেতুক কসমের চেয়েও ভয়ংকর হলো মিথ্যা কসম। কেউ নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করতে, মিথ্যাকে সত্য প্রমাণ করতে কিংবা ব্যবসায় পণ্য বিক্রি করতে জেনে-শুনে আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম করলে সে ভয়াবহ গুনাহে লিপ্ত হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلًا أُولَٰئِكَ لَا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ... وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
(পক্ষান্তরে) যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার ও নিজেদের কসমের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে, আখিরাতে তাদের কোনও অংশ নেই। আর আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের দিকে (সদয় দৃষ্টিতে) তাকাবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না। তাদের জন্য থাকবে কেবল যন্ত্রণাময় শাস্তি। -সূরা আলে ইমরান, ৩:৭৭
রাসূলুল্লাহ ﷺ-ও মিথ্যা কসমের মাধ্যমে মানুষের সম্পদ আত্মসাতের ব্যাপারে কঠোর সতর্ক করেছেন।
তাই মুমিনের নীতি হওয়া উচিত- সত্য কথা বলার জন্য কসমের প্রয়োজন নেই। যার কথায় সত্যতা আছে, সে প্রতিটি বাক্যের সঙ্গে কসম জুড়ে দেয় না।
লানত- জবানের আরও ভয়ংকর অপব্যবহার
কসমের অপব্যবহারের মতোই লানত করাও জবানের মারাত্মক অপব্যবহার। বরং এর মধ্যে এমন একটি দিক রয়েছে, যা একে আরও ভয়ংকর করে তোলে।
লানত অর্থ আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত হওয়া বা দূরে সরে যাওয়া। কাউকে লানত করার অর্থ হলো তার ওপর আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার বদদোয়া করা।
তাই এটি কোনো সাধারণ গালি নয় যে রাগের সময় মুখ দিয়ে বের হয়ে গেল আর বিষয়টি শেষ হয়ে গেল।
মুমিন লানতকারী হতে পারে না
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ، وَلَا اللَّعَّانِ، وَلَا الْفَاحِشِ، وَلَا الْبَذِيءِ
“মুমিন তিরস্কারকারী নয়, অধিক লানতকারী নয়, অশ্লীলভাষী নয় এবং অভদ্রভাষী নয়।” -জামে তিরমিজি, ১৯৭৭
অর্থাৎ মানুষের চরিত্রের সৌন্দর্য শুধু নামাজ, রোজা ও বাহ্যিক আমলে নয়; তার জবানও ঈমানের পরিচয় বহন করে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন-
لَا يَنْبَغِي لِصِدِّيقٍ أَنْ يَكُونَ لَعَّانًا
“কোনো সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তির জন্য লানতকারী হওয়া শোভনীয় নয়।” -সহিহ মুসলিম, ২৫৯৭
একজন সত্যবাদী, নেককার ও আল্লাহভীরু মানুষের জবান তাই লানত ও অভিশাপের জবান হতে পারে না।
আল্লাহর লানত ও গজবের দোয়া করা নিষেধ
রাগের সময় অনেকে বলে- “আল্লাহর লানত পড়ুক”, “আল্লাহর গজব হোক”, “জাহান্নামে যাক।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
لَا تَلَاعَنُوا بِلَعْنَةِ اللَّهِ، وَلَا بِغَضَبِ اللَّهِ، وَلَا بِالنَّارِ
“তোমরা পরস্পরকে আল্লাহর লানত, আল্লাহর গজব এবং জাহান্নামের আগুনের বদদোয়া করো না।” -সুনান আবু দাউদ, ৪৯০৬; জামে তিরমিজি, ১৯৭৬
সুতরাং রাগের মুহূর্তে এই ধরনের বাক্য উচ্চারণ করা থেকে নিজেকে কঠোরভাবে বিরত রাখতে হবে।
একজন মুমিনকে লানত করা কত ভয়ংকর!
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
وَلَعْنُ المُؤْمِنِ كَقَتْلِهِ، وَمَنْ رَمَى مُؤْمِنًا بِكُفْرٍ فَهُوَ كَقَتْلِهِ»
ঈমানদারকে লা'নত করা, তাকে হত্যা করার সমান। আর যে কেউ কোন ঈমানদারকে কুফরীর অপবাদ দিবে, তাও তাকে হত্যা করার সমান হবে।-সহিহ বুখারি, ৬১০৫; সহিহ মুসলিম, ১১০
এখানে শারীরিক হত্যার সঙ্গে লানতের বিধানকে এক করা উদ্দেশ্য নয়; বরং লানতের ভয়াবহতা বোঝানো হয়েছে। একজন মুসলমানের সম্মান ও মর্যাদার ব্যাপারে তাই জবানকে অত্যন্ত সতর্ক রাখতে হবে।
লানত ফিরে আসার ভয়
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا لَعَنَ شَيْئًا صَعِدَتِ اللَّعْنَةُ إِلَى السَّمَاءِ... فَإِنْ كَانَ لِذَلِكَ أَهْلًا وَإِلَّا رَجَعَتْ إِلَى قَائِلِهَا
“বান্দা যখন কোনো কিছুকে লানত করে, সেই লানত আকাশের দিকে উঠে যায়... যদি যাকে লানত করা হয়েছে সে এর উপযুক্ত হয়, তাহলে তা তার ওপর পতিত হয়; আর যদি সে এর উপযুক্ত না হয়, তাহলে তা লানতকারীর কাছেই ফিরে আসে।” -সুনান আবু দাউদ, ৪৯০৫
অতএব রাগের মুহূর্তে কাউকে লানত করার আগে একজন মুমিনের চিন্তা করা উচিত- আমি যাকে লানত করছি, সে কি সত্যিই এর উপযুক্ত?
কারণ সে যদি উপযুক্ত না হয়, তাহলে নিজের মুখ থেকে বের হওয়া অভিশাপ নিজের দিকেই ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
নারীদের জন্য বিশেষ সতর্কতা
একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ নারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন-
تَصَدَّقْنَ وَأَكْثِرْنَ الِاسْتِغْفَارَ، فَإِنِّي رَأَيْتُكُنَّ أَكْثَرَ أَهْلِ النَّارِ
“তোমরা সদকা করো এবং অধিক ইস্তিগফার করো; কারণ আমাকে দেখানো হয়েছে যে, তোমরাই জাহান্নামের অধিকাংশ।”
সাহাবায়ে কেরাম কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন-
تُكْثِرْنَ اللَّعْنَ وَتَكْفُرْنَ الْعَشِيرَ
“তোমরা অধিক লানত কর এবং স্বামীর অকৃতজ্ঞতা কর।” -সহিহ বুখারি, হাদীস ৩০৪; সহিহ মুসলিম, হাদীস ৭৯
এখানে নারীদের অবমাননা উদ্দেশ্য নয়; বরং লানত ও অকৃতজ্ঞতার মতো নির্দিষ্ট গুনাহের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা রয়েছে। একইভাবে পুরুষ-নারী উভয়ের জন্যই শিক্ষা হলো- জবানকে লানত ও অশ্লীলতা থেকে সংরক্ষণ করা।
লানতের ব্যাপারে শরিয়তের ভারসাম্য
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি- শরিয়তে যেখানে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ কোনো ব্যক্তি বা শ্রেণির ওপর লানত করেছেন, সেটি আলাদা বিষয়। যেমন আল্লাহ তাআলা কাফিরদের ব্যাপারে বলেন-
إِنَّ اللَّهَ لَعَنَ الْكَافِرِينَ وَأَعَدَّ لَهُمْ سَعِيرًا
“নিশ্চয় আল্লাহ কাফিরদের লানত করেছেন এবং তাদের জন্য জ্বলন্ত আগুন প্রস্তুত রেখেছেন।” -সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৬৪
তাই বিষয়টির সঠিক সারকথা হলো- ব্যক্তিগত রাগ, প্রতিশোধ, ঝগড়া কিংবা কথার উত্তেজনায় মানুষকে অকারণে লানত করা মুমিনের চরিত্র নয়।
কসম ও লানত- দুটোর মূল সমস্যা জবানের অসংযম
কসম ও লানত- দুটিকে পাশাপাশি রাখলে একটি গভীর শিক্ষা পাওয়া যায়।
কেউ নিজের কথাকে শক্তিশালী করার জন্য বারবার সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে বলে- “আল্লাহর কসম!”
আর কেউ নিজের রাগ প্রকাশ করতে বলে- “তোর ওপর লানত!”
প্রথম ব্যক্তি আল্লাহর মহান নামকে কথার জোর বাড়ানোর উপকরণ বানাচ্ছে; দ্বিতীয় ব্যক্তি এমন একটি বিষয়ে মুখ খুলছে, যার পরিণতি সে নিজেই জানে না।
মুমিনের জবান এর বিপরীত হওয়া উচিত।
সে প্রয়োজন ছাড়া কসম করবে না।
মিথ্যা কসম করবে না।
গায়রুল্লাহর নামে কসম করবে না।
ব্যবসায় কসমকে হাতিয়ার বানাবে না।
রাগের সময় লানত করবে না।
গালি ও অশ্লীল কথা বলবে না।
বরং তার মুখ থেকে বের হবে-
সত্য কথা, সুন্দর কথা, দোয়া, জিকির, ইস্তিগফার ও কল্যাণের কথা।
আজ থেকেই কয়েকটি অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করি-
১. কথায় কথায় ‘আল্লাহর কসম’ বলা পরিত্যাগ করি।
২. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে কসম করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকি।
৩. সত্য কথা বলার জন্য কসমকে প্রয়োজনীয় মনে না করি।
৪. ব্যবসায় পণ্য বিক্রি বা ক্রয়ের সময় বারবার কসম করা পরিত্যাগ করি।
৫. মিথ্যা কসমকে ভয় করি এবং অন্যের অধিকার আত্মসাতের মাধ্যম হিসেবে কসমকে ব্যবহার না করি।
৬. রাগের সময় লানত, গালি ও অভিশাপ উচ্চারণ না করার অভ্যাস করি।
৭. সন্তান, স্ত্রী, স্বামী, বন্ধু, কর্মচারী বা অধীনস্থদের রাগের সময় লানত না করি।
৮. কেউ ভুল করলে তার সংশোধনের জন্য দোয়া করি; অভিশাপ নয়।
৯. জবান দিয়ে কথা বের হওয়ার আগে এক মুহূর্ত চিন্তা করি- এ কথাটি কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করবে?
১০. কসম ও লানতের পরিবর্তে জবানকে ইস্তিগফার, দরুদ, জিকির ও উত্তম কথায় অভ্যস্ত করি।
শেষ কথা
জবান ছোট; কিন্তু এর গুনাহ অনেক বড় হতে পারে। একটি মিথ্যা কসম মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করতে পারে, ব্যবসার বরকত নষ্ট করতে পারে এবং আখিরাতে কঠিন শাস্তির কারণ হতে পারে। আবার একটি অকারণ লানত মানুষের হৃদয় ভেঙে দিতে পারে এবং লানতকারীর নিজের জন্যও বিপদের কারণ হতে পারে।
তাই মুমিনের পরিচয় হলো- সে কথা বলার আগে ভাবে, কসম করার আগে ভাবে এবং রাগের সময় সবচেয়ে বেশি ভাবে।
যেখানে সত্য কথা বললেই যথেষ্ট, সেখানে কসমের প্রয়োজন নেই। আর যেখানে নীরব থাকাই উত্তম, সেখানে লানত বা গালি দেওয়ার তো কোনো প্রশ্নই নেই।
আসুন, আমরা আমাদের জবানকে এমনভাবে গড়ে তুলি, যেন আমাদের মুখ থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে, আল্লাহর নাম সম্মানিত থাকে এবং আমাদের প্রতিটি কথা আমাদের জন্য নেকির কারণ হয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের জবানকে মিথ্যা, অহেতুক কসম, গালি, লানত ও সব ধরনের অশ্লীলতা থেকে হেফাজত করুন এবং আমাদের মুখকে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণকর কথায় অভ্যস্ত করুন। আমিন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
বাকশক্তির ব্যবহার : শৈথিল্য ও সীমালংঘন
...
তিনটি বড় গুনাহ- বদযবানী, বদনেগাহী, বদগুমানী
মুরাদাবাদ। একটি প্রসিদ্ধ শহর। ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি জেলা। এ শহরেই অবস্থিত প্রসিদ্ধ একটি মাদরাসা...
উক্তি ও উপদেশ
...
ঈমান-আমল সুরক্ষিত রাখতে হক্কানী উলামায়ে কেরামের সঙ্গে থাকুন, অন্যদের সঙ্গ ছাড়ুন
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর... قال الله تعالى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتّ...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন