প্রবন্ধ
জিহাদের ভূমিকায় সাহাবায়ে কেরাম
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
২৯৯
০
أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ
ইসলামের ইতিহাসে সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম এমন এক অনন্য প্রজন্ম, যাঁদের জীবন ছিল ঈমান, ত্যাগ, আনুগত্য, আত্মশুদ্ধি, দাওয়াত, সমাজগঠন এবং আল্লাহর পথে সংগ্রামের উজ্জ্বল সমন্বয়। তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সান্নিধ্যে থেকে শুধু ইসলাম গ্রহণ করেননি; বরং নিজেদের জীবন, সম্পদ, পরিবার, স্বদেশ এবং প্রয়োজন হলে জীবন পর্যন্ত আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য উৎসর্গ করেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবিদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-
مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ۖ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا...
মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; আর যারা তাঁর সঙ্গে আছে, তারা কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি দয়াশীল। তুমি তাদেরকে রুকু ও সিজদায় অবনত দেখতে পাবে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে...। -সূরা আল-ফাতহ, ৪৮:২৯
এই আয়াত সাহাবায়ে কেরামের চরিত্রের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে। এখানে শুধু তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রের দৃঢ়তার কথা বলা হয়নি; বরং একই সঙ্গে তাঁদের ইবাদত, আল্লাহর সন্তুষ্টির আকাঙ্ক্ষা এবং পারস্পরিক ভালোবাসার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ সাহাবিদের শক্তি ছিল ঈমানের শক্তি; তাঁদের সংগ্রাম ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য; আর তাঁদের কঠোরতার পাশাপাশি ছিল অসাধারণ দয়া ও কোমলতা।
১. সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম
সাহাবায়ে কেরামের জীবন ও জিহাদের ভূমিকা বুঝতে হলে প্রথমেই তাঁদের মর্যাদা বুঝতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের প্রজন্মকে সর্বোত্তম প্রজন্ম হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
হযরত ইমরান ইবনু হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
خَيْرُ أُمَّتِي قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ
আমার উম্মতের সর্বোত্তম হলো আমার প্রজন্ম, অতঃপর তাদের পরবর্তী প্রজন্ম, অতঃপর তাদের পরবর্তী প্রজন্ম। -সহিহ বুখারি, ৩৬৫০; সহিহ মুসলিম, ২৫৩৩
তাঁরা এমন এক প্রজন্ম, যারা ইসলামকে কেবল বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে জানেননি; বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছ থেকে সরাসরি শিখেছেন, তাঁর নেতৃত্বে জীবন গড়েছেন এবং তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছেন।
তাই সাহাবায়ে কেরামের জিহাদ ছিল কোনো বিচ্ছিন্ন সামরিক কর্মকাণ্ড নয়; বরং তাঁদের সামগ্রিক ঈমানি জীবনের একটি অংশ এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে শেখা উম্মাহর কল্যাণে নিবেদিত।
২. “أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ”-এর প্রকৃত তাৎপর্য
সূরা ফাতহের ২৯ নম্বর আয়াতে সাহাবিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে-
أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ
অর্থাৎ, “তারা কাফিরদের প্রতি কঠোর।”
এখানে “কঠোরতা” বলতে এমন অন্ধ বিদ্বেষ বোঝায় না, যা প্রত্যেক অমুসলিম ব্যক্তির প্রতি অন্যায় আচরণের অনুমতি দেয়। বরং আয়াতটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গীদের ঈমানি দৃঢ়তা, ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুতার মোকাবিলায় অবিচলতা এবং সত্যের ব্যাপারে আপসহীনতার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে।
এর পরপরই আল্লাহ বলেন-
رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ
তারা নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি দয়াশীল।
এ দুটি বাক্য পাশাপাশি রাখা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একজন মুমিনের চরিত্রে যেমন সত্যের ব্যাপারে দৃঢ়তা থাকবে, তেমনি ঈমানদারদের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও দয়া থাকবে।
অর্থাৎ ইসলাম সাহাবিদের এমন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিল, যারা নীতির ক্ষেত্রে দৃঢ়, কিন্তু মানুষের সঙ্গে আচরণে ন্যায়পরায়ণ; ইসলামের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের ক্ষেত্রে প্রতিরোধী, কিন্তু নিরপরাধ মানুষের প্রতি অন্যায়কারী নয়।
৩. সাহাবিদের জিহাদ ছিল ঈমান ও আত্মত্যাগের বহিঃপ্রকাশ
সাহাবায়ে কেরামের জীবনে জিহাদকে শুধু যুদ্ধের অর্থে দেখলে তাঁদের জীবনকে অসম্পূর্ণভাবে দেখা হবে। তাঁদের জীবনের বড় অংশ ছিল ঈমান রক্ষা, দ্বীনের দাওয়াত, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, অত্যাচার সহ্য করা, হিজরত করা, সম্পদ ত্যাগ করা এবং আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের সর্বস্ব ব্যয় করা।
মক্কার প্রথম যুগে মুসলমানদের ওপর যে নির্যাতন নেমে এসেছিল, সাহাবায়ে কেরাম তা অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করেন। তাঁদের কেউ নির্যাতিত হয়েছেন, কেউ কারাবন্দি হয়েছেন, কেউ স্বদেশ ও সম্পদ ত্যাগ করেছেন, আবার কেউ জীবন দিয়েছেন।
হযরত বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু, খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু আনহু, তাঁর স্ত্রী হযরত সুমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা ও পুত্র হযরত আম্মার রাদিয়াল্লাহু আনহুম এবং অসংখ্য সাহাবির জীবন এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এ সময় তাঁদের হাতে ক্ষমতা ছিল না; কিন্তু তাঁদের অন্তরে ছিল ঈমান। ফলে তাঁদের প্রথম সংগ্রাম ছিল নিজেদের ঈমানকে অটুট রাখা।
৪. হিজরত- জিহাদের এক গুরুত্বপূর্ণ রূপ
সাহাবিদের ত্যাগের অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো হিজরত।
মক্কার ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য, আত্মীয়-স্বজন ও সম্পদ ছেড়ে তাঁরা মদিনায় চলে যান। আল্লাহ তাআলা তাঁদের এই আত্মত্যাগকে কুরআনে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন।
মুহাজির সাহাবিরা তাঁদের সম্পদ ও সামাজিক অবস্থান ত্যাগ করেছিলেন শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য। তাঁদের এই ত্যাগ প্রমাণ করে যে, আল্লাহর পথে সংগ্রাম কেবল অস্ত্র হাতে নেওয়ার নাম নয়; কখনো নিজের আরাম-আয়েশ, সম্পদ ও প্রিয় জিনিস ত্যাগ করাও আল্লাহর পথে বিরাট সংগ্রাম।
৫. আনসারদের ভূমিকা- জিহাদের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের অপূর্ব সমন্বয়
সাহাবায়ে কেরামের ইতিহাসে আনসারদের ভূমিকা অনন্য। তাঁরা মুহাজিরদের শুধু আশ্রয় দেননি; বরং তাঁদের সঙ্গে নিজেদের সম্পদ ও জীবন ভাগ করে নিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ
“তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়, যদিও নিজেরাই অভাবগ্রস্ত হয়।” -সূরা হাশর, ৫৯:৯
এখানেই “رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ” -তারা নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি দয়াশীল” -এর বাস্তব রূপ প্রকাশ পায়।
সাহাবিদের শক্তি শুধু যুদ্ধের ময়দানে ছিল না; তাঁদের প্রকৃত শক্তি ছিল এমন একটি ঈমানি সমাজ গড়ে তোলায়, যেখানে একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই ছিল।
কুরআনেও মুমিনদের এই বৈশিষ্ট্য ঘোষণা করা হয়েছে-
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ
মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা পরস্পরের সহযোগী ও বন্ধু। -সূরা আত-তাওবা, ৯:৭১
ইবন কাসির রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুমিনদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংহতির কথা উল্লেখ করেছেন।
৬. বদর: ঈমানি দৃঢ়তার ঐতিহাসিক অধ্যায়
সাহাবায়ে কেরামের জিহাদি জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো বদর যুদ্ধ।
মুসলমানদের সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম এবং তাঁদের সামরিক প্রস্তুতিও সীমিত ছিল। কিন্তু তাঁদের অন্তরে ছিল ঈমান, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি আনুগত্য এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা।
বদরের ঘটনা দেখায়, সাহাবিদের শক্তির মূল উৎস ছিল কেবল অস্ত্র বা বাহ্যিক সামর্থ্য নয়; বরং ঈমান ও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল।
তাঁরা নিজেদের শক্তিকে চূড়ান্ত মনে করেননি; বরং আল্লাহর সাহায্যকে আসল শক্তি মনে করেছেন। আর এ শক্তির বলে বলিয়ান হয়েই কাফেরদের চরমভাবে পরাস্ত করেছেন। ঈমান-ইসলামের প্রশ্নে এতটুকু ছাড় দেননি। নিজেদের জীবন বিপন্ন করে কাফের মুশরিকদের অশুভ শক্তির কালো থাবা থেকে ইসলামকে হেফাজত করেছেন। বিশ্বমানবতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন এ চূড়ান্ত অপারেশনের মাধ্যমে। ইসলামের ইতিহাসে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহের অন্যতম বদর যুদ্ধ।
৭. উহুদ: ভুল থেকে শিক্ষা এবং আনুগত্যের গুরুত্ব
জিহাদের রণাঙ্গনে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা উহুদ। সাময়িক কিছু সমস্যা হলেও চূড়ান্ত বিজয় সাহাবিদেরই হয়েছে।
উহুদের ঘটনা সাহাবিদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে কিছু সাহাবি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশের ক্ষেত্রে ভুল করেছিলেন। এর ফলে মুসলিম বাহিনী কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়।
কিন্তু এই ঘটনা সাহাবিদের মর্যাদা নষ্ট করে না। বরং এটি দেখায়- সাহাবিরা মানুষ ছিলেন; তাঁদের কাছ থেকেও ইজতিহাদি ভুল হয়েছে। আর আল্লাহ তাঁদেরকে তাওবা, শিক্ষা ও সংশোধনের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আদর্শ বানিয়েছেন।
উহুদের শিক্ষা হলো- আল্লাহর পথে সংগ্রামে আবেগের পাশাপাশি শৃঙ্খলা, নেতৃত্বের আনুগত্য, দায়িত্ববোধ এবং ধৈর্য অপরিহার্য।
৮. খন্দক: ঐক্য, কৌশল ও ধৈর্যের পরীক্ষা
খন্দকের যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। বিভিন্ন গোত্র ও শক্তি মদিনাকে ঘিরে ফেলেছিল। সাহাবায়ে কেরাম তখন শুধু অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেননি; বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।
এ ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিক্ষা দেয়- আল্লাহর পথে সংগ্রাম মানে বেপরোয়া ঝুঁকি নেওয়া নয়; বরং পরিস্থিতি বিবেচনা, পরামর্শ, পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা এবং যথাসাধ্য প্রস্তুতিও এর অংশ।
হযরত সালমান ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রস্তাব অনুযায়ী পরিখা খনন তার একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ। আধুনিক সমরকৌশলও যেখানে বিস্মিত।
৯. সাহাবিদের জিহাদ ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বাধীন
সাহাবায়ে কেরামের জিহাদকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্ব ও নির্দেশনা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না।
তাঁরা নিজেরা ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধ শুরু করতেন না; বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে সংঘটিত রাষ্ট্রীয় ও সামরিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতেন।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কারণ ইসলামের জিহাদের ধারণাকে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, বিশৃঙ্খলা, সন্ত্রাস বা ব্যক্তিগত উদ্যোগের সহিংসতার সঙ্গে এক করে দেখা ইসলামের ঐতিহাসিক ও শরঈ কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সাহাবিদের জীবন দেখায়- শরিয়তের বড় দায়িত্বগুলো যথাযথ কর্তৃত্ব, নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও নীতিমালার অধীনে পরিচালিত হয়।
১০. আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু: দ্বীনের ব্যাপারে দৃঢ়তার অনন্য দৃষ্টান্ত
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম সমাজ এক গভীর সংকটে পড়ে। বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে বিদ্রোহ ও বিভ্রান্তি দেখা দেয় এবং কেউ কেউ যাকাতের ফরজিয়ত অস্বীকার করতে থাকে।
এই কঠিন সময়ে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু অসাধারণ দৃঢ়তা প্রদর্শন করেন। তিনি দ্বীনের ফরজ বিধানকে খণ্ডিত করার কোনো সুযোগ দেননি।
তাঁর নেতৃত্বে রিদ্দাহ-সংক্রান্ত বিদ্রোহ দমন করা হয় এবং মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
এখানে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর দৃঢ়তা আমাদের শেখায়- ইসলামের মৌলিক বিধানের ব্যাপারে নেতৃত্বের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামকে সমুন্নত রাখতে প্রয়োজনে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে দ্বিধা করা সুযোগ নেই।
১১. উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু: শক্তি, ন্যায় ও জবাবদিহির সমন্বয়
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে দৃঢ়তা ও ন্যায়বিচারের অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তাঁর চরিত্রে একদিকে ছিল অসাধারণ সাহস ও দৃঢ়তা, অন্যদিকে ছিল আল্লাহভীতি, বিনয় ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ।
তাঁর শাসনামলে ইসলামী রাষ্ট্র বিস্তৃত হলেও তিনি বিজয়কে ব্যক্তিগত গৌরব হিসেবে দেখেননি। বরং নিজেকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহির অধীন একজন দায়িত্বশীল বান্দা মনে করতেন।
এটাই সাহাবিদের “أَشِدَّاءُ” চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক- শক্তি অর্জন করেও অহংকারী না হওয়া।
১২. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু: সামরিক দক্ষতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর সামরিক প্রতিভা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তিনি ইসলামের পূর্বে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন; পরে ইসলাম গ্রহণ করে ইসলামের অন্যতম দক্ষ সেনানায়ক হয়ে ওঠেন।
তাঁর জীবনে একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে- ইসলাম মানুষের অতীতকে নয়, তার ঈমান, তাওবা ও পরবর্তী জীবনকে মূল্যায়ন করে।
খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজের সামরিক দক্ষতাকে ব্যক্তিগত গৌরবের জন্য নয়, ইসলামী সমাজের প্রতিরক্ষা ও বৈধ সামরিক দায়িত্ব পালনে ব্যবহার করেন।
১৩. সাহাবিদের শক্তির সঙ্গে ছিল অসাধারণ ইবাদত
সূরা ফাতহের একই আয়াতে আল্লাহ তাঁদের সম্পর্কে বলেন-
تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا
“তুমি তাদেরকে রুকু ও সিজদায় অবনত দেখতে পাবে।”
এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় রয়েছে।
আল্লাহ আগে তাঁদের “أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ” বলেছেন; এরপর তাঁদের পরিচয় দিয়েছেন “رُكَّعًا سُجَّدًا”-রুকু-সিজদাকারী হিসেবে।
অর্থাৎ সাহাবিদের শক্তি মসজিদ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। তাঁদের বাহ্যিক সাহসের পেছনে ছিল রাতের ইবাদত, নামাজ, কুরআন, দোয়া, তাওবা ও আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক।
তাঁদের শক্তির প্রকৃত উৎস ছিল আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক। কারণ জিহাদ আল্লাহর বিধান, তা তাঁর দেওয়া শক্তির বিকল্প কিছু দিয়ে অসম্ভব।
১৪. “রুহামা-উ বাইনাহুম” সাহাবিদের কোমল হৃদয়
সাহাবিদের জীবন শুধু যুদ্ধের ইতিহাস নয়; বরং ভালোবাসারও ইতিহাস।
তাঁরা পরস্পরের জন্য কাঁদতেন, একে অপরকে সাহায্য করতেন, ক্ষুধার্তকে খাবার দিতেন, অসুস্থের খোঁজ নিতেন এবং বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়াতেন।
কুরআনের ভাষায়
رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ
“তারা নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি দয়াশীল।”
ইবন কাসির রহ. সূরা তাওবার ৭১ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় মুমিনদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন।
তাই সাহাবিদের চরিত্রের দুটি দিককে কখনো আলাদা করা যাবে না-
সত্যের ব্যাপারে, কুফ্ফারদের বিরুদ্ধে দৃঢ়তা + মুমিনদের প্রতি দয়া।
১৫. সাহাবিদের জিহাদে নৈতিকতার গুরুত্ব
সাহাবায়ে কেরামের জিহাদকে বুঝতে হলে ইসলামের যুদ্ধনীতির নৈতিক কাঠামোও বুঝতে হবে।
ইসলামের যুদ্ধ ছিল সীমাহীন প্রতিশোধের অনুমতি নয়। বরং যুদ্ধেরও বিধান, সীমা ও নৈতিকতা রয়েছে। নারী, শিশু, বৃদ্ধ, অযোদ্ধা, উপাসনালয় ও অন্যান্য নিরপরাধ মানুষের ব্যাপারে ইসলামী নীতিমালা রয়েছে।
অতএব সাহাবিদের জীবন থেকে “শক্তি” গ্রহণ করতে হলে একই সঙ্গে তাঁদের তাকওয়া, ন্যায়বিচার, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা গ্রহণ করতে হবে।
শুধু তাঁদের তরবারি দেখলে সাহাবিদের দেখা হবে না; তাঁদের সিজদা, কান্না, ইনসাফ, দয়া ও আল্লাহভীতিও দেখতে হবে।
১৬. সাহাবিদের বিজয়ের প্রকৃত রহস্য
সাহাবায়ে কেরাম পৃথিবীর ইতিহাসে অল্প সময়ের মধ্যে অসাধারণ পরিবর্তন এনেছিলেন। কিন্তু তাঁদের সাফল্যের কারণ কেবল সামরিক শক্তি ছিল না।
তাঁদের বিজয়ের পেছনে ছিল-
ঈমান, তাকওয়া, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য, পরস্পরের ভ্রাতৃত্ব, আত্মত্যাগ, শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার, দাওয়াত, জ্ঞান এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল।
তাঁরা প্রথমে নিজেদের পরিবর্তন করেছিলেন; তারপর সমাজ পরিবর্তন করেছিলেন।
এ কারণেই তাঁদের সম্পর্কে কুরআন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ভাষা ব্যবহার করেনি; বরং বলেছে-
تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا
“তুমি তাদেরকে রুকু-সিজদায় অবনত দেখতে পাবে; তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে।”
১৭. বর্তমান প্রজন্মের জন্য সাহাবিদের জিহাদি জীবন থেকে শিক্ষা
আজকের মুসলমানদের জন্য সাহাবিদের জীবন থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- দ্বীনের প্রতি গভীর আনুগত্য ও আত্মশুদ্ধি।
আজ আমাদের “জিহাদ” শব্দটি শুনলেই অনেক সময় শুধু যুদ্ধের কথা মনে পড়ে। অথচ সাহাবায়ে কেরামের জীবন দেখলে বোঝা যায়, একজন মুসলমানের জীবনে আল্লাহর পথে সংগ্রামের বহু ক্ষেত্র রয়েছে- নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, দ্বীনের জ্ঞান অর্জন, সত্য কথা বলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠা, পরিবারকে দ্বীনের ওপর গড়ে তোলা, সমাজে কল্যাণ প্রতিষ্ঠা এবং বৈধ উপায়ে মানুষের উপকার করা।
বিশেষ করে একজন আলেমের জন্য ইলম অর্জন ও প্রচার, একজন পিতার জন্য সন্তানকে ঈমান ও আদব শেখানো, একজন ব্যবসায়ীর জন্য হারাম থেকে বেঁচে হালাল উপার্জন করা এবং একজন সমাজকর্মীর জন্য মানুষের কল্যাণে কাজ করাও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হলে তা বৃহত্তর দ্বীনি সংগ্রামের অংশ হতে পারে।
১৮. “أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ” আমাদের কী শেখায়?
এই আয়াতের শিক্ষা আজকের দিনে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এর অর্থ এই নয় যে, একজন মুসলমান প্রত্যেক অমুসলিমের প্রতি ঘৃণা, অন্যায় বা আগ্রাসন প্রদর্শন করবে। বরং এর শিক্ষা হলো- ঈমানের ব্যাপারে দুর্বল হওয়া যাবে না; সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না; ইসলামের বিরুদ্ধে আগ্রাসন ও শত্রুতার সামনে মুসলমানরা নীতিগতভাবে দৃঢ় থাকবে। ইসলামবিরোধী ও বিদ্বেষী যে কোনো অপশক্তির সামনে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় অটল-অবিচল শক্তি প্রদর্শন করতে হবে।
একই সঙ্গে-
رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ
অর্থাৎ মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে হতে হবে দয়ালু, সহানুভূতিশীল ও সহযোগিতাপরায়ণ।
আজ মুসলিম সমাজের বড় প্রয়োজন হলো এই দুই বৈশিষ্ট্যের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা- আকীদা ও নীতিতে দৃঢ়তা, আর মানুষের সঙ্গে আচরণে রহমত।
শেষ কথা
সাহাবায়ে কেরামের জিহাদ ছিল তাঁদের ঈমানি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করেছেন, ত্যাগ করেছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন, হিজরত করেছেন, সম্পদ ব্যয় করেছেন এবং বৈধ নেতৃত্বের অধীনে ইসলামী সমাজের প্রতিরক্ষা ও প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন।
কিন্তু তাঁদেরকে শুধু যুদ্ধের ময়দানে দেখলে তাঁদের প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যাবে না।
তাঁদের এক হাতে ছিল দৃঢ়তা, অন্য হাতে ছিল দয়া; তাঁদের বাহ্যিক জীবনে ছিল সংগ্রাম, আর অন্তরে ছিল আল্লাহর ভয়; তাঁরা ময়দানে সাহসী ছিলেন, আবার রাতের অন্ধকারে সিজদায় কান্নারত ছিলেন।
এই জন্যই আল্লাহ তাআলা তাঁদের পরিচয় দিয়েছেন-
أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ
“তারা কাফিরদের বিরুদ্ধে দৃঢ় এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি দয়াশীল।”
এই আয়াতের শেষাংশও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ-
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
তাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। -সূরা আল-ফাতহ, ৪৮:২৯
অতএব সাহাবায়ে কেরামের জিহাদি জীবন আমাদের জন্য কেবল ইতিহাসের কোনো অধ্যায় নয়; বরং ঈমান, আত্মত্যাগ, আনুগত্য, ন্যায়, সাহস, ভ্রাতৃত্ব, ইবাদত ও আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে জীবন পরিচালনার এক উজ্জ্বল আদর্শ।
তাঁদের প্রকৃত অনুসরণ হলো- ঈমানে তাঁদের মতো দৃঢ় হওয়া, ইবাদতে তাঁদের মতো আন্তরিক হওয়া, দ্বীনের ব্যাপারে তাঁদের মতো দায়িত্বশীল হওয়া এবং মুসলিম ভাইয়ের প্রতি তাঁদের মতো দয়াশীল হওয়া।
সাহাবায়ে কেরামের শক্তি ছিল ঈমানের শক্তি, তাঁদের ঐক্যের ভিত্তি ছিল ভ্রাতৃত্ব, তাঁদের সংগ্রামের লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁদের জীবনের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা ছিল- আল্লাহর রেজামন্দি।
আর এ কারণেই তাঁদের প্রজন্ম শুধু ইতিহাসের একটি প্রজন্ম নয়; বরং কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি জীবন্ত আদর্শ।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
গবেষণা এবং গবেষণার হকদার কারা
প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা! আজ দুনিয়ার মাঝে ইলমী বন্দর এমন কিছু স্বাধীনচেতা লোক দখল করে নিয়েছে যে, তাদের অ...
হক ও বাতিল : বুঝার মানদণ্ড কী?
[গত ৭ শাবান ১৪৪০ হি. মোতাবেক ১৪ এপ্রিল ২০১৯ ঈ. রবিবার সন্ধ্যায় গাজীপুর তাবলীগ জামাতের মারকাযে হযরত ম...
বালা-মুসীবতের কারণ ও প্রতিকার
মহান রব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন- وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَع...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন