প্রবন্ধ
হাশরের ময়দানের বিভিষিকা
৩ অক্টোবর, ২০২৬
৫৭০
০
نَحْمَدُهُ وَنُصَلِّيْ عَلَى رَسُوْلِهِ الْأَمِيْن. وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِيْنَ۔ أَمَّا بَعْدُ، فَأَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ۔ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ۔
যখন আল্লাহ পাক রব্বুল আলামিনের হুকুমে প্রথমবার সিঙ্গায় ফুঁৎকারের সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তে বদলে যাবে পৃথিবীর দৃশ্যপট। আকাশ, জমিন, পাহাড়-পর্বত, গাছপালা, তরুলতা—কিছুই আর আগের মতো থাকবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَمَن فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَن شَاءَ اللَّهُ ۖ ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَىٰ فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنظُرُونَ
“আর শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেওয়া হবে। ফলে আসমানসমূহে যারা আছে এবং যমীনে যারা আছে তারা সবাই বেহুঁশ হয়ে পড়বে, তবে আল্লাহ যাকে চান সে ব্যতীত। অতঃপর তাতে আবার ফুঁৎকার দেওয়া হবে, তখন তারা দাঁড়িয়ে যাবে এবং তাকাতে থাকবে।”(“সূরা আয-যুমার, আয়াত নং৬৮)
একটু কল্পনা করুন—যে পৃথিবীকে ঘিরে আমাদের কত ব্যস্ততা, কত পরিকল্পনা, কত অহংকার; যে পৃথিবীকে আমরা চিরস্থায়ী মনে করে বসে আছি, সেই পৃথিবীই একদিন আল্লাহর হুকুমে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে।
তারপর?
চারদিকে শুধু নীরবতা।
কেউ নেই, কোনো মানুষের কণ্ঠ নেই, কোনো পাখির ডাক নেই, নেই কোনো প্রাণীর চলাফেরা, কোনো শহরের কোলাহল, কোনো বাজার, ঘরবাড়ি কিছুই।
রাজা, বাদশাহ, ধনী, গরিব, শক্তিশালী, দুর্বল সবাই নিঃশেষ।
“আমার বাড়ি, আমার সম্পদ, আমার ক্ষমতা, আমার পরিচয়”—সেদিন তার কিছুই থাকবে না।
থাকবেন শুধু মহান রব্বুল আলামিন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ وَيَبْقَىٰ وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ﴾
অর্থ: “পৃথিবীর ওপর যারা আছে, সবাই ধ্বংসশীল। আর অবশিষ্ট থাকবে তোমার রবের মহিমান্বিত ও সম্মানিত সত্তা।” (সূরা আর-রহমান, ৫৫:২৬–২৭)
“তাঁর সত্তা ব্যতীত সবকিছুই ধ্বংসশীল।”(সূরা আল-কাসাস, ২৮:৮৮)
তারপর সেই নীরবতার মধ্যে কত দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হবে তার প্রকৃত পরিমাণ আল্লাহই ভালো জানেন। সহিহ হাদিসে প্রথম ও দ্বিতীয় ফুঁৎকারের মাঝখানে “চল্লিশ”-এর কথা এসেছে; কিন্তু সেটি চল্লিশ দিন, মাস না বছর, রাসূলুল্লাহ ﷺ তা নির্দিষ্ট করেননি। (সহিহ মুসলিম, ২৯৫৫)
ভাবুন তো!
একদিকে পুরো সৃষ্টি নিঃশেষ। অন্যদিকে আল্লাহ রব্বুল আলামিন-একাই চিরঞ্জীব।
তারপর যখন আল্লাহ তাআলা পুনরায় সৃষ্টিকে উঠিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা করবেন, তখন আবার সেই সিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে।
কবরগুলো ফেটে যাবে!
মাটির নিচে শুয়ে থাকা মানুষগুলো উঠে দাঁড়াবে। যে মানুষ হাজার হাজার বছর আগে মারা গিয়েছিল, সেও উঠে দাঁড়াবে। যে মানুষ পৃথিবীতে রাজত্ব করেছিল, সেও উঠে দাঁড়াবে। যে মানুষ দুনিয়ায় অসহায় ছিল, সেও উঠে দাঁড়াবে।
সবাই দাঁড়িয়ে যাবে—একজনও বাদ যাবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَىٰ فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنظُرُونَ
“অতঃপর তাতে আবার ফুঁক দেওয়া হবে; তখন তারা হঠাৎ দাঁড়িয়ে দেখতে থাকবে।” -সূরা আয-যুমার, ৩৯:৬৮
একটি ফুঁকে দুনিয়ার জীবন শেষ হয়ে গেল।
আরেকটি ফুঁকে-
কবরগুলো খুলে যাবে।
দলে দলে মানুষ কবর থেকে বেরিয়ে আসবে।
কেউ অবাক হয়ে তাকাবে, কেউ আতঙ্কিত হয়ে।
সবাই নিজের পরিণতি নিয়ে চিন্তিত থাকবে।
মানুষ বলবে-
يَا وَيْلَنَا مَن بَعَثَنَا مِن مَّرْقَدِنَا ۜ هَٰذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمَٰنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُونَ
“ হায় আমাদের দুর্ভাগ্য! কে আমাদেরকে আমাদের শয়নস্থান থেকে উঠিয়ে দিল? এটাই তো সেই বিষয়, যার প্রতিশ্রুতি পরম দয়াময় দিয়েছিলেন এবং রাসূলগণ সত্য বলেছিলেন।”-সূরা ইয়াসিন, ৩৬:৫২
যে মানুষটি মনে করেছিল—মৃত্যুর পর সব শেষ!
আজ সে বুঝতে পারবে- মৃত্যু শেষ নয়।
বরং মৃত্যু হলো পরবর্তী জীবনের দরজা।
যে মানুষ দুনিয়াতে আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল, আজ সে আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে।
যে মানুষ বলেছিল—“আরে সময় আছে, পরে নামাজ পড়ব।” “বুড়ো হলে তওবা করব।”
আজ সময় শেষ হয়ে গেছে।
মানুষ বিভিন্ন অবস্থায় উঠবে
কারও চেহারায় থাকবে আনন্দের ছাপ।
কারও চেহারায় থাকবে আতঙ্ক।
কারও মনে থাকবে আশা—আজ আমার নেক আমলের প্রতিদান পাওয়ার দিন।
আবার কারও মনে থাকবে ভয়—আজ আমার গুনাহের হিসাব হওয়ার দিন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلَى الرَّحْمَٰنِ وَفْدًا
“সেদিন আমি মুত্তাকিদের পরম দয়াময়ের কাছে সম্মানিত অতিথি হিসেবে সমবেত করব।”(সূরা মারইয়াম, ১৯:৮৫)
অর্থাৎ যারা দুনিয়াতে আল্লাহকে ভয় করে চলেছে, তাদের জন্য সেই দিন হবে সম্মানের দিন।
আর যারা অবাধ্য হয়ে জীবন কাটিয়েছে, তাদের জন্য সেই দিন হবে লাঞ্ছনা ও আতঙ্কের দিন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَنَحْشُرُهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَىٰ وُجُوهِهِمْ عُمْيًا وَبُكْمًا وَصُمًّا
“কিয়ামতের দিন আমি তাদেরকে তাদের মুখের ওপর ভর করে সমবেত করব- অন্ধ, বোবা ও বধির অবস্থায়।”(সূরা আল-ইসরা, ১৭:৯৭)
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিসে এসেছে, মানুষকে তাদের কর্ম ও অবস্থার ভিত্তিতে বিভিন্নভাবে সমবেত করা হবে।
কেউ হেঁটে আসবে।
কেউ বাহনে থাকবে।
কেউ মুখের ওপর ভর করে চলবে।
অর্থাৎ সেদিন মানুষের অবস্থা নির্ভর করবে তার দুনিয়ার জীবন ও আমলের ওপর।
সবাই ছুটবে হাশরের ময়দানের দিকে
কবর থেকে বের হওয়ার পর মানুষ আর নিজের ঘরের দিকে যাবে না। যাবে না নিজের অফিস, দোকান, জমি-জমা বা স্ত্রী-সন্তানের কাছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَوْمَ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَجْدَاثِ سِرَاعًا كَأَنَّهُمْ إِلَىٰ نُصُبٍ يُوفِضُونَ
“যেদিন তারা কবর থেকে দ্রুত বের হবে, যেন তারা কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে ছুটে যাচ্ছে।” (সূরা আল-মাআরিজ, আয়াত-৪৩)
কী ভয়াবহ সেই দৃশ্য!
লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি মানুষ—
সবাই ছুটছে একদিকে!
কেউ নিজের আমল নিয়ে আশাবাদী।
কেউ নিজের গুনাহ নিয়ে আতঙ্কিত।
কেউ লজ্জিত।
কেউ ভীত।
কেউ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।
কারও চেহারায় আলো।
কারও চেহারায় অন্ধকার।
কিন্তু সবাই যাচ্ছে এক জায়গায়।
আর সেই জায়গার নাম-
হাশরের ময়দান।
যে ময়দানের কথা কুরআন আমাদের জানিয়েছে।
যে ময়দানে পৃথিবীর প্রথম মানুষ থেকে শেষ মানুষ পর্যন্ত সবাই একত্রিত হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَيَوْمَ نُسَيِّرُ الْجِبَالَ وَتَرَى الْأَرْضَ بَارِزَةً وَحَشَرْنَاهُمْ فَلَمْ نُغَادِرْ مِنْهُمْ أَحَدًا
“যেদিন আমি পাহাড়গুলোকে চলমান করব এবং তুমি পৃথিবীকে উন্মুক্ত দেখতে পাবে, আর আমি তাদের সবাইকে একত্রিত করব; তাদের কাউকেই বাদ দেব না।”(সূরা আল-কাহফ, ১৮:৪৭)
রাজা-প্রজা—
ধনী-গরিব—
শক্তিশালী-দুর্বল—
শিক্ষিত-অশিক্ষিত—
পরিচিত-অপরিচিত—
কেউ বাদ যাবে না।
সবাইকে উপস্থিত করা হবে হাশরের ময়দানে।
হাশরের ময়দানের ভয়াবহতা
সেদিন মানুষের আমলনামা প্রকাশ করা হবে। একদিকে মানুষ নিজের ছোট-বড় প্রতিটি আমল চোখের সামনে দেখতে পাবে।
আমলের হিসাবের জন্য মিজানের পাল্লা স্থাপন করা হবে।
সেই আমলের উপর ভিত্তি করেই প্রতিটা ব্যক্তির জন্য হাশরের ময়দান ধারণ করবে ভিন্ন ভিন্ন ও ভয়াবহ রূপ-
সময় যত যাবে সেই ভয়াবহতা ক্রমশ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
সূর্য মানুষের অত্যন্ত নিকটে চলে আসবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কিয়ামতের দিন সূর্য মানুষের এত নিকটে চলে আসবে যে তা মাত্র এক মাইল দূরে থাকবে। মানুষের ঘাম তাদের আমল অনুযায়ী বিভিন্ন পরিমাণে হবে—কারও ঘাম হাঁটু পর্যন্ত, কারও কোমর পর্যন্ত এবং কারও ঘাম মুখ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮৬৪)
মানুষ নিজের আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে ডুবে থাকবে।
প্রিয় ভাইয়েরা!
দুনিয়ার সামান্য গরমেই আমরা অস্থির হয়ে যাই।
একটু রোদ উঠলে আমরা ছায়া খুঁজি।
একটু গরম হলে ঠান্ডা পানি খুঁজি।
কিন্তু হাশরের সেই দিন?
সেদিন কোথায় যাবে মানুষ?
কোথায় পাবে আশ্রয়? কোথায় পাবে শান্তি?
সেদিন মানুষের একমাত্র আশা হবে—আল্লাহর রহমত।
জাহান্নামকে হাশরের ময়দানে নিয়ে আসা হবে
সেই দিনের ভয়াবহতা আরো বহু গুনে বেড়ে যাবে জাহান্নামকে হাশরের ময়দানে উপস্থিত করার মাধ্যমে- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«يُؤْتَى بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ لَهَا سَبْعُونَ أَلْفَ زِمَامٍ مَعَ كُلِّ زِمَامٍ سَبْعُونَ أَلْفَ مَلَكٍ يَجُرُّونَهَا»
অর্থ: “সেদিন জাহান্নামকে নিয়ে আসা হবে। তার সত্তর হাজার লাগাম থাকবে; প্রত্যেকটি লাগামের সঙ্গে সত্তর হাজার ফেরেশতা তা টেনে নিয়ে আসবেন।”(সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮৪২)
কী ভয়াবহ দৃশ্য হবে সেটি!
যে জাহান্নাম থেকে আল্লাহ তাআলা আমাদের বারবার সতর্ক করেছেন, সেই জাহান্নাম যখন হাশরের ময়দানে উপস্থিত করা হবে, তখন পাপিষ্ঠদের আতঙ্কের আর কোনো সীমা থাকবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
«إِذَا رَأَتْهُم مِّن مَّكَانٍ بَعِيدٍ سَمِعُوا لَهَا تَغَيُّظًا وَزَفِيرًا»
অর্থ: “যখন জাহান্নাম তাদেরকে দূর স্থান থেকে দেখবে, তখন তারা তার ক্রোধের গর্জন ও প্রচণ্ড শব্দ শুনতে পাবে।”—সূরা আল-ফুরকান, ২৫:১২)
জাহান্নামের গর্জনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে পুরা হাশরবাসীর হৃদয়ে, ভয়ে আতঙ্কে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়বে।
হাশরের ময়দানের বিভীষিকা ও ভয়াবহতার চরম পর্যায়-
হাশরের ময়দানের ভয়াবহতা এবং এর বিভীষিকা চরম আকার ধারণ করবে আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীনের রাগ, গোসসা ও ক্রোধ প্রকাশ হওয়ার মাধ্যম।
এক বর্ণনায় এসেছে, সেদিন আল্লাহ তাআলার ক্রোধ এমন হবে, যা এর আগে কখনো প্রকাশ পায়নি এবং পরেও এমনভাবে প্রকাশ পাবে না।(জামে তিরমিজি,হাদিস ২৪৩৪)
হাশরের ময়দানের সেই বিভীষিকা এবং ভয়াবহ কষ্টের মধ্যে কেটে যাবে এক দীর্ঘ সময়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ
অর্থ- ফেরেশতাগণ ও রূহ তাঁর দিকে আরোহণ করে এমন এক দিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর। (সূরা আল-মা‘আরিজ, ৭০:৪)
এই দীর্ঘ সময়ের কষ্ট, পেরেশানি ও পরিস্থিতির ভয়াবহতায় মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়বে । এমন ভয়াবহ অবস্থায় পড়ে তারা তাদের জন্য একজন সুপারিশকারী তালাশ করতে থাকবেন।
সহিহ হাদিসে এসেছে, মানুষ প্রথমে আদম (আ.)-এর কাছে যাবে। এরপর নূহ (আ.), ইবরাহিম (আ.), মূসা (আ.) ও ঈসা (আ.)-এর কাছে যাবে। অবশেষে তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে আসবে।
আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীনের রাগ গোসসা ও ক্রোধের প্রভাবে সেদিনের পরিস্থিতির ভয়াবহতা এত বেশি হবে যে-
আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ সেদিন সুপারিশও করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন—
«يَوْمَئِذٍ لَّا تَنفَعُ الشَّفَاعَةُ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَٰنُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلًا»
অর্থ: “সেদিন কোনো সুপারিশ উপকারে আসবে না, তবে যার জন্য পরম দয়াময় অনুমতি দেবেন এবং যার কথায় তিনি সন্তুষ্ট হবেন,তার কথা ভিন্ন।”(সূরা ত্বহা, ২০:১০৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ তখন আল্লাহর অনুমতি নিয়ে সিজদায় পড়বেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করবেন। এরপর তাঁকে বলা হবে—
“হে মুহাম্মদ! আপনার মাথা উঠান, সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ৭৫১০)
অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম সুপারিশ করবেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুপারিশ কবুল করার মাধ্যমে হাশরের ময়দানের বিচার কার্যক্রম শুরু করা হবে-
প্রত্যেককে তার আমলনামা দেয়া হবে-
আজ আমরা কত কিছু করি, আবার কত কিছু ভুলে যাই।
অবহেলার ছলে কখনো মনে হয়—এই সামান্য কাজটা আর কী?
একটু মিথ্যা বললাম,একটু গীবত করলাম,কাউকে সামান্য কষ্ট দিলাম-এটাও কি হিসাব হবে?
আবার কখনো মনে হয়—
একজন মানুষকে একটু সাহায্য করলাম, এতো সামান্য কাজ-এটারই বা কী মূল্য?
কিন্তু কিয়ামতের দিন বোঝা যাবে- আল্লাহর কাছে কোনো আমলই হিসাবের বাইরে ছিল না।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
«وَوُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَٰذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا»
অর্থ: “আর আমলনামা সামনে রাখা হবে। তখন তুমি অপরাধীদের দেখতে পাবে, তাতে যা আছে তার কারণে তারা ভীত হয়ে পড়েছে। আর তারা বলবে, ‘হায় আমাদের দুর্ভাগ্য! এ কেমন আমলনামা! এটি তো ছোট-বড় কোনো কিছুই বাদ দেয়নি; বরং সবকিছুকে সংরক্ষণ করেছে।’(সূরা আল-কাহফ, ১৮:৪৯)
সেদিন যখন মানুষের হাতে তার আমলনামা তুলে দেওয়া হবে, তখন সে অবাক হয়ে বলবে—
“يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَٰذَا الْكِتَابِ”
“হায় আমাদের দুর্ভাগ্য! এ কেমন আমলনামা!”
যে গুনাহটি আমি ভুলে গিয়েছিলাম-সেটাও এখানে আছে!
যে কথাটি আমি মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে বলেছিলাম, যে মানুষের গীবত করেছিলাম, যে মানুষের হক নষ্ট করেছিলাম, যে হারাম টাকা উপার্জন করেছিলাম-যে চোখের গুনাহ করেছিলাম, সেটাও এখানে আছে!
কোনো কিছুই বাদ যায়নি।
আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের চোখের সামনে সেই দৃশ্যটি তুলে ধরছেন—
“لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا”
“ছোট-বড় কোনো কিছুই বাদ দেয়নি; সবকিছুই সংরক্ষণ করেছে।”
অণু পরিমাণ আমলও সামনে আসবে।
হিসাবের জন্য মিজান বা দাঁড়িপাল্লা কায়েম করা হবে-
দুনিয়াতে করা ভালো-মন্দ প্রতিটি কাজই আমরা দেখতে পাবো আমাদের আমল নামায়। প্রতিটি আমল উল্লেখ থাকবে হিসাবের খাতায়।
অতঃপর আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন সেই আমলের হিসাব করার জন্য স্থাপন করবেন মিজান বা দাঁড়িপাল্লা-
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا
অর্থ: “কিয়ামতের দিন আমি ন্যায়ের পাল্লাসমূহ স্থাপন করব। অতএব কোনো ব্যক্তির প্রতি সামান্যও জুলুম করা হবে না।”(সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৪৭)
মানুষকে হিসাব প্রদানের জন্য মিজানের সামনে উপস্থিত করা হবে-
মিজান—আমল পরিমাপের পাল্লা!
হ্যাঁ, এটাই সেই মিজানের পাল্লা, ইনসাফের পাল্লা। যেখানে কারো উপর কোন জুলুম করা হবে না, কেউ যদি সামান্য পরিমাণ ভালো করে থাকে তাকে বঞ্চিত করা হবে না, আর কেউ যদি সামান্য পরিমাণ অন্যায় করে থাকে তাহলেও সেখানে তার উপর জুলুম করা হবে না।
অতঃপর প্রতিটি মানুষকে এক এক করে ডাকা হবে মিজানের পাল্লার সামনে।
সে দাঁড়িয়ে আছে মিজানের সামনে।
এই পাল্লায় দুনিয়ার টাকা-পয়সা উঠবে না।
ব্যাংকের হিসাব,জমি-জমা, পদমর্যাদা কিছু ই উঠবে না।
উঠবে—শুধুমাত্র আমল।
একদিকে নেক আমল, অন্যদিকে গুনাহের হিসাব।
মানুষের বুক কাঁপতে থাকবে- অজানা আশঙ্কায়!
আমার পাল্লা কোন দিকে যাবে? ভারী হবে, নাকি হালকা হবে?
আজ কারো ব্যবসার চিন্তায় নেই, নেই চাকরি, ঘর-বাড়ি বা অন্য কোন চিন্তা।
সেদিন মানুষের সামনে শুধু একটাই চিন্তা—আজ আমার কী হবে?
আমার আমলের পাল্লা কেমন হবে?
আমার নেক আমল কি আমার নাজাতের কারণ হবে?
নাকি আমার গুনাহ আমাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে?
রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত হয়েছে, হাশরের ময়দানে এমন তিনটি স্থান রয়েছে যেখানে মানুষ অন্য কারও কথা মনে রাখবে না। তার একটি হলো মিজানের সামনে, যতক্ষণ না সে জানতে পারে তার পাল্লা ভারী হয়েছে, নাকি হালকা হয়েছে। এরপর আমলনামা দেওয়ার সময়—যখন সে জানবে না তার কিতাব ডান হাতে আসবে, নাকি বাম হাতে, নাকি পেছন দিক থেকে। আর তৃতীয় স্থান হলো পুল-সিরাতের সময়, যখন তা জাহান্নামের ওপর স্থাপন করা হবে। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৭৫৫)
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالْوَزْنُ يَوْمَئِذٍ الْحَقُّ ۚ فَمَن ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَٰئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُم
“সেদিন ওজন করা হবে যথাযথভাবে। যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই সফল। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।” (সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:৮–৯)
আর সূরা আল-মু’মিনূনেও আল্লাহ ঘোষণা করেছেন—যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই সফল, আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারা নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
আমলের প্রতিদান-
অতঃপর আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন তাঁর বান্দাদের কৃতকর্মের প্রতিদান দিবেন, আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন ঘোষণা করেন-
«فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ»
অর্থ: “অতএব, যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, সেও তা দেখতে পাবে।”(সূরা আয-যিলযাল, ৯৯:৭–৮)
প্রিয় ভাইয়েরা!
অণু পরিমাণ!
আমরা যেটাকে চোখে দেখেও তুচ্ছ মনে করি—আল্লাহর কাছে সেটাও তুচ্ছ নয়।
আপনি হয়তো কাউকে এক গ্লাস পানি পান করিয়েছেন—সেটাও আমল।
আপনি হয়তো একজন অসহায় মানুষকে সামান্য সাহায্য করেছেন, কাউকে একটি ভালো কথা বলেছেন সেটাও আমল।
ঠিক তেমনিভাবে,
আপনি কাউকে অপমান করেছেন, কারও গীবত করেছেন, কারও হক নষ্ট করেছেন,গোপনে কোনো গুনাহ করেছেন সেটাও আমল।
দুনিয়ার মানুষ না জানলেও আল্লাহ জানেন।
মানুষের চোখ এড়িয়ে গেলেও আল্লাহর জ্ঞান থেকে কিছুই আড়াল হয় না। আমরা অনেক কিছু ভুলে গেছি, কিন্তু আমাদের আমলনামা ভুলে যায়নি।
কেয়ামতের দিন আমাদের আমলনামা আমাদের সামনে ছোট থেকে ছোট নেক আমল এবং বদ আমল সবই প্রকাশ করে দিবে, আমি আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন তিনি তার বান্দাদেরকে সে আমলের প্রতিদান দান করবেন।
আজ আমরা অনেক কথা মনে রাখি না, কিন্তু আমাদের আমলনামা তা সংরক্ষণ করে রেখেছে।
কিয়ামতের দিন মানুষ নিজের আমলনামা দেখে বলবে—
“হায়! আমি কেন এমন করেছিলাম?”
পরিস্থিতির ভয়াবহতায় আতঙ্কে যখন চারদিক থরথর করে কাঁপবে, তখন খোদাদ্রোহী, কাফেররা নিজেদের পরিণতি দেখে অসহায় হয়ে আফসোস, অনুশোচনা ও আক্ষেপে চিৎকার করে বলবে—
يَا لَيْتَنِي كُنتُ تُرَابًا
অর্থ: হায়! আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম! (সূরা আন-নাবা: ৪০)
অর্থাৎ “হায়! আজ যদি আমি মাটি হয়ে যেতাম! যদি এই ভয়াবহ দিনের মুখোমুখি আমাকে হতে না হতো!”
কিন্তু তখন আফসোস করে কোনো লাভ হবে না।
একটু ভাবুন!
আজ যে সুযোগ আছে, সেদিন সেই সুযোগ থাকবে না।
আজ যে তওবা করা যায়, সেদিন তওবা করে ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না।
আজ যে নামাজ পড়া যায়, সেদিন নতুন করে নামাজ পড়ার সুযোগ থাকবে না।
আজ যে মানুষের হক ফিরিয়ে দেওয়া যায়, সেদিন নতুন করে হক আদায় করার সুযোগ থাকবে না।
তাই আসুন!
আজ হতেই আমরা প্রত্যেকেই নিজেদের আমল গুলো ঠিক করে নিই, আমলের মাধ্যমে আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীনের নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করি।
হাশরের সেই কঠিন ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে আল্লাহর হুকুম গুলো রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম ও তার সাহাবায়ে কেরামের তরিকা মতো আমল করা। নিজের জীবনকে সাহাবায়ে কেরামের আদর্শে পরিচালিত করা।
আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন আমাদেরকে তার আপন রহমতে হাশরের ময়দানের সেই ভয়াবহতা ও বিভীষিকার পেরেশানি থেকে হেফাজত করুন,
امين يا رب العالمين
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
লেনদেনে সততা ও হালাল জীবিকা
...
সন্তুষ্টি ও সমর্পণ
আল্লাহ পাক তাঁর পবিত্র কালামে ইরশাদ করেন, (তরজমা) ‘আমি তোমাদেরকে কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ...
সত্যের পথে অবিচলতা: গুরুত্ব, টিকে থাকার উপায় ও বিচ্যুতির কারণসমূহ
সত্যের উপর অবিচল থাকার গুরুত্ব মানবজাতির চিরন্তন সফরের সবচেয়ে কঠিন অথচ অনিবার্য পরীক্ষা হলো সত্যের ...
তাকওয়া ও খোদাভীতি
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন