প্রবন্ধ
ইবাদতের প্রতি নারী সাহাবীদের আগ্রহ: নবীজির কাছে কিছু জিজ্ঞাসা
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
২৭
০
ইসলাম নারী জাতিকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে তুলে এনে জ্ঞানের সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন করেছে। ওহীর জ্ঞান অর্জন করা কেবল পুরুষদের জন্য একক কোনো অধিকার ছিল না, বরং নারী সাহাবীগণও অনুধাবন করেছিলেন যে, আখেরাতের কামিয়াবী ও আমলের সঠিক রূপরেখা জানতে হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকেই জ্ঞান আহরণ করতে হবে।
ইসলামের স্বর্ণযুগে নারী সাহাবীগণের জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দ্বীন শেখা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ব্যাকুলতায় তাঁরা ছিলেন অনন্য ও অতুলনীয়। সামাজিক লজ্জা বা সংকোচকে পাশে সরিয়ে রেখে দ্বীনের মৌলিক বিধিবিধান থেকে শুরু করে অত্যন্ত ব্যক্তিগত জীবন সংক্রান্ত বিষয়েও তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে প্রশ্ন তুলতে দ্বিধা করতেন না। তাঁদের এই অকুণ্ঠ জিজ্ঞাসা ও ইলমের প্রতি অগাধ ভালোবাসাই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য দ্বীন অর্জনের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
হযরত আয়েশা রা. আনসারী নারীদের প্রশংসা করে বলতেন:
نِعْمَ النِّسَاءُ نِسَاءُ الأَنْصَارِ لَمْ يَكُنْ يَمْنَعُهُنَّ الْحَيَاءُ أَنْ يَتَفَقَّهْنَ فِي الدِّينِ
অর্থ: আনসারী নারীরা কতই না উত্তম! দ্বীনের সঠিক ফিকহ অর্জনে লজ্জা কখনো তাদের বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি। সহীহ মুসলিম: ৩৩২, সহীহ বুখারী: ১৩০
দ্বীন শিক্ষার জন্য আলাদা সময় চাওয়া
পুরুষ সাহাবীগণ সর্বক্ষণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যে থাকতেন বলে নারীরা অনেক সময় নিজেদের বঞ্চিত মনে করতেন। ফলে তাঁরা সরাসরি আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে নিজেদের শিক্ষার জন্য পৃথক একটি দিন নির্ধারণের আবেদন জানান। নারীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বললেন:
غَلَبَنَا عَلَيْكَ الرِّجَالُ، فَاجْعَلْ لَنَا يَوْمًا مِنْ نَفْسِكَ
অর্থ: আমাদের শিক্ষার জন্য আপনার পক্ষ থেকে একটি দিন সুনির্দিষ্ট করে দিন। সহীহ বুখারী: ১০১, সহীহ মুসলিম: ২৬৩৪
হাদীসের শেষ অংশে উল্লেখ আছে,
فَوَعَدَهُنَّ يَوْمًا لَقِيَهُنَّ فِيهِ، فَوَعَظَهُنَّ وَأَمَرَهُنَّ
অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের এই ইলমী আগ্রহকে শ্রদ্ধার সাথে কবুল করেন এবং প্রতি সপ্তাহে তাঁদের জন্য একটি দিন নির্দিষ্ট করে দেন, যেখানে তিনি নারীদের দ্বীন শিক্ষা দিতেন, ওয়াজ করতেন এবং তাঁদের প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতেন।
কুরআনে নারীদের মর্যাদার আয়াত কামনা
কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন আয়াতে মুমিন পুরুষদের উদ্দেশ্যে সম্বোধন দেখে উম্মে আম্মারা রাযিয়াল্লাহু আনহা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একটি সুন্দর কথা বলেন। তিনি বলেন:
আমি দেখছি সমস্ত বিষয়ে কেবল পুরুষদের কথাই স্মরণ করা হয়, নারীদের কথা তো আলাদাভাবে এভাবে উল্লেখ করা হয় না?
এই প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা আহযাবের ৩৫ নম্বর আয়াত নাজিল করে নারীদের কথা আলাদা করে বলেন,
اِنَّ الۡمُسۡلِمِیۡنَ وَالۡمُسۡلِمٰتِ وَالۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتِ وَالۡقٰنِتِیۡنَ وَالۡقٰنِتٰتِ وَالصّٰدِقِیۡنَ وَالصّٰدِقٰتِ وَالصّٰبِرِیۡنَ وَالصّٰبِرٰتِ وَالۡخٰشِعِیۡنَ وَالۡخٰشِعٰتِ وَالۡمُتَصَدِّقِیۡنَ وَالۡمُتَصَدِّقٰتِ وَالصَّآئِمِیۡنَ وَالصّٰٓئِمٰتِ وَالۡحٰفِظِیۡنَ فُرُوۡجَہُمۡ وَالۡحٰفِظٰتِ وَالذّٰکِرِیۡنَ اللّٰہَ کَثِیۡرًا وَّالذّٰکِرٰتِ ۙ اَعَدَّ اللّٰہُ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃً وَّاَجۡرًا عَظِیۡمًا
অর্থঃ নিশ্চয়ই আনুগত্য প্রকাশকারী পুরুষ ও আনুগত্য প্রকাশকারী নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, ইবাদতগোজার পুরুষ ও ইবাদতগোজার নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, আন্তরিকভাবে বিনীত পুরুষ ও আন্তরিকভাবে বিনীত নারী, সদকাকারী পুরুষ ও সদকাকারী নারী, রোযাদার পুরুষ ও রোযাদার নারী, নিজ লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী পুরুষ ও হেফাজতকারী নারী এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও স্মরণকারী নারী আল্লাহ এদের সকলের জন্য মাগফেরাত ও মহা প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন। সূরাঃ আল আহ্যাব - আয়াত নং, ৩৫, জামে তিরমিজী: ৩২১১
ইবাদতের সর্বোত্তম সময় ও পদ্ধতি জানার ব্যাকুলতা
শুধুমাত্র ওয়াজ নসীহত ও মর্যাদার কথায় তারা ক্ষ্যান্ত হননি, বরং আমলের দিক দিয়ে অগ্রসর থাকার আকুল চেষ্টায় থাকতেন। আমলের সর্বশ্রেষ্ঠ রূপটি অর্জনের জন্য উন্মুখ থাকতেন। হযরত আয়েশা রা. রাসূলকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, তিনি যদি হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাত 'লাইলাতুল কদর' পেয়ে যান, তবে কোন আমল ও দোয়া করবেন?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিখ্যাত এই দোয়াটি শিখিয়ে দেন:
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করাকে পছন্দ করেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। জামে তিরমিজী: ৩৫১৩, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৮৫০
আবার শারীরিক অক্ষমতার কারণে কেউ হজ্জ করতে না পারলে তার বিকল্প আমল কী হতে পারে, তা জানতে চেয়েছিলেন উম্মে মা’কিল (রা.)। রাসূল তাঁকে জানান যে, রমজান মাসে একটি ওমরাহ আদায় করা নবীজির সাথে হজ্জ করার সমতুল্য সওয়াব এনে দেয়। সুনানে আবু দাউদ: ১৯৮৮
পুরুষদের চেয়ে আমলে অগ্রসর হওয়ার প্রতিযোগিতা
সর্বশ্রেষ্ঠ আমলের কথা জেনে তা বাস্তবায়ন করা তো বটেই, বরং পুরুষদের সাথে আমলে প্রতিযোগিতা করার মনোভাব প্রবল ছিল তাদের মধ্যে। যেসব আমল শুধু পুরুষদের জন্য প্রযোজ্য, সেসব বিষয়ে নারীদের চেয়ে পুরুষরা অগ্রসর হয়ে যাওয়ার আফসোস থাকত।
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ يَزِيدَ الأَنْصَارِيَّةِ أَنَّهَا أَتَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّي وَافِدَةُ النِّسَاءِ إِلَيْكَ... إِنَّ الرِّجَالَ فَضَلُونَا بِالْجُمُعَاتِ وَالْجَنَائِزِ وَالْجِهَادِ، فَمَا لَنَا فِي ذَلِكَ؟ فَقَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "أَخْبِرِي مَنْ وَرَاءَكِ مِنَ النِّسَاءِ أَنَّ حُسْنَ تَبَعُّلِ إِحْدَاكُنَّ لِزَوْجِهَا وَطَلَبَهَا مَرْضَاتِهِ يَعْدِلُ ذَلِكَ كُلَّه".
অনুবাদ: আসমা বিনতে ইয়াজিদ আনসারিয়া (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমি নারীদের প্রতিনিধি হয়ে আপনার কাছে এসেছি। পুরুষরা জুমার সালাত, জানাজা ও জিহাদের মাধ্যমে আমাদের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে আমাদের জন্য কী সওয়াব রয়েছে?" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "তোমার পেছনের নারীদের জানিয়ে দাও যে, তোমাদের কারও স্বামীদের আনুগত্য করা, তাদের সন্তুষ্টির সন্ধান করা এই সমস্ত কিছু পুরুষদের আমলের সমতুল্য।" শুআবুল ঈমান (বাইহাকী): ৮৩৬৯
শেষ কথা
এভাবে হাদিসের বিভিন্ন পাতায় আমরা দেখতে পাই, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ইবাদতের উচ্চ মর্যাদা হাসিলের উদ্দেশ্যে প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে নারী সাহাবাগণ কতটা ব্যাকুল ছিলেন। দ্বীনের বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয় জানার জন্য তারা কোনো দ্বিধা না করে বারবার নবীজির শরণাপন্ন হতেন। তাদের এই গভীর আগ্রহ ও জিজ্ঞাসার কারণেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আয়াত নাজিল হয়েছে এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক ফজিলতপূর্ণ হাদিস ইরশাদ করেছেন।
নারী সাহাবিদের এই ইলম পিপাসা ও আমলের তাড়না আমাদের জন্য এক যুগান্তকারী শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। এতে বোঝা যায়, দ্বীন শেখা ও উত্তম আমল করার বিষয়ে সচেতনতা কতটা জরুরি।
তাই আমাদেরও উচিত ইবাদতের প্রতি তাঁদের মতো আন্তরিক আগ্রহ গড়ে তোলা। সাহাবিদের মতো আমরাও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যেন হক্কানী ওলামায়ে কেরামের দ্বারে গিয়ে দ্বীনের বিশুদ্ধ মাসআলা-মাসায়েল ও ফজিলতপূর্ণ আমলগুলো জেনে নিতে পারি এবং সেই অনুযায়ী আমাদের পুরো জীবন পরিচালনা করতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সেই তৌফিক দান করুন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ স্বামী-স্ত্রীর সুখময় দাম্পত্য
(আম্মাজান আয়েশা রা.এর পবিত্রতম বিবাহ, পারিবারিক জীবন , রাসূলের বয়স পার্থক্য ও বিরুদ্ধবাদীদের আপত্ত...
সাহাবায়ে কেরামকে ভালোবাসা ঈমানের দাবি
প্রত্যেক মুসলিমের ওপর আবশ্যকীয় ঈমানের অংশ হলো—রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবায়...
সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ও সাহাবা সমালোচকদের পরিণতি
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবাগণের মর্যাদা ও ফযীলত কুরআন ও হাদীসের মাঝে বিস্তারিতভাব...
প্রসঙ্গ মুয়াবিয়া রাজিআল্লাহু আনহুঃ সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কিত ইতিহাস পাঠের মূলনীতি
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন