প্রবন্ধ
তোমার জন্যই সাজানো এই জগৎ
১৮ আগস্ট, ২০২৬
৪৪৪
০
কল্পনা করুন, কোনো এক ব্যক্তি সুদূর কোনো দেশে পা রাখলেন, যেখানে তিনি জীবনে কখনো যাননি, কাউকে চেনেন না। কিন্তু বিমানবন্দরে নেমেই দেখলেন, তাঁর নামে ফুলের মালা প্রস্তুত, তাঁর জন্য গাড়ি অপেক্ষমাণ, থাকার ঘরে বিছানার চাদর থেকে শুরু করে টেবিলের ওপর তাঁর প্রিয় খাবার পর্যন্ত সব সাজানো। এই দৃশ্য দেখে তাঁর মনে একটি প্রশ্নই জাগবে, ‘এরা কীভাবে জানল আমি আসছি?’ উত্তর স্পষ্ট: কেউ না কেউ আগে থেকেই তাঁর আগমনের সংবাদ পেয়েছিল, আর সেই সংবাদের ভিত্তিতেই এই আয়োজন। কাকতালীয়ভাবে এত নিখুঁত প্রস্তুতি কখনো নিজে থেকে ঘটে না।
আবার উল্টো দৃশ্যও ভাবুন, কোনো গোয়েন্দা বা সেনাদল শত্রুশিবিরে আকস্মিক আক্রমণ চালাতে গিয়ে দেখল, প্রতিটি গলিতে ফাঁদ পাতা, প্রতিটি মোড়ে অতর্কিত প্রতিরোধ প্রস্তুত। তখনো বোঝা যায়, শত্রুপক্ষ আগেভাগেই তাদের আসার খবর পেয়েছিল, নইলে এত নিখুঁত ফাঁদ এত দ্রুত সাজানো সম্ভব হতো না।
এই দুটি দৃশ্যকল্প থেকে একটি সহজ সত্য বেরিয়ে আসে, যেখানেই আগে থেকে প্রস্তুতি দেখা যায়, সেখানেই থাকে পূর্বজ্ঞান, আর পূর্বজ্ঞানের পেছনে থাকে একজন জ্ঞানী পরিকল্পনাকারী।
এখন আসুন, এই একই দৃষ্টিতে তাকাই গোটা পৃথিবীর দিকে। মানুষ যখন প্রথম এই গ্রহে চোখ মেলে তাকায়, তখন সে দেখে বাতাসে ঠিক সেই পরিমাণ অক্সিজেন, যা তার ফুসফুসের জন্য উপযুক্ত। সে দেখে সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব এমন নিখুঁতভাবে নির্ধারিত যে, এদিক-সেদিক হলে হয় সব জমে বরফ হয়ে যেত, নয়তো পুড়ে ছাই হতো।
এই বিস্ময় শুধু সাধারণ মানুষের চোখেই ধরা পড়েনি, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অনেক দিকপাল বিজ্ঞানীও এই ‘সূক্ষ্ম-সমন্বয়’ (Fine-Tuning) দেখে হতবাক হয়েছেন।
বিখ্যাত জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী স্যার ফ্রেড হয়েল, যিনি নিজে ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন না, মহাবিশ্বের ভৌত ধ্রুবকগুলোর অবিশ্বাস্য নিখুঁত বিন্যাস দেখে মন্তব্য করেছিলেন যে, এমনটা নিছক কাকতালীয়ভাবে ঘটার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি, যেন কোনো ‘সুপার-ইন্টেলেক্ট’ পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে খেলা করেছে।
— Annual Review of Astronomy and Astrophysics, ১৯৮২, পৃ. ১৬
ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্যার মার্টিন রীজ তাঁর ‘Just Six Numbers’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করা মাত্র ছয়টি মৌলিক সংখ্যা এমনভাবে নির্ধারিত যে, তার সামান্যতম পরিবর্তনেও নক্ষত্র, গ্রহ কিংবা জীবনের অস্তিত্বই সম্ভব হতো না।
— Just Six Numbers: The Deep Forces That Shape the Universe, পৃ. ৪
পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রিম্যান ডাইসন একবার বলেছিলেন, মহাবিশ্বের গঠন পর্যালোচনা করলে মনে হয়, ‘মহাবিশ্ব যেন আগে থেকেই জানত যে আমরা আসছি’—এ যেন গোটা সৃষ্টিজগৎ মানুষের আগমনের অপেক্ষাতেই ছিল।
— Disturbing the Universe, Harper & Row, ১৯৭৯, পৃ. ২৫০
পদার্থবিজ্ঞানী পল ডেভিস তাঁর লেখায় বারবার উল্লেখ করেছেন যে, মহাবিশ্বের নিয়মগুলো এমনভাবে সাজানো, যা প্রাণের উদ্ভবের জন্য প্রায় অনুকূল।
— The Goldilocks Enigma: Why Is the Universe Just Right for Life? পৃ: ১৮
এই বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ যেন সেই প্রথম দৃশ্যকল্পের প্রতিধ্বনি; কেউ একজন আগে থেকে জানত মানুষ আসবে, তাই সবকিছু প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিল। বাতাস প্রস্তুত হয়েছিল নিঃশ্বাসের জন্য, পানি প্রস্তুত হয়েছিল তৃষ্ণা মেটানোর জন্য, মাটি প্রস্তুত হয়েছিল ফসল ফলানোর জন্য, সূর্য প্রস্তুত হয়েছিল আলো ও উষ্ণতা দেওয়ার জন্য। আর এসবই মানুষ পৃথিবীতে পা রাখারও বহু আগে থেকে সাজানো ছিল।
মানুষ যখন এই সাজানো জগতে চোখ খোলে, তখন তার বিস্ময়ের সীমা থাকে না, ‘গোটা পৃথিবী কীভাবে জানল যে আমি আসব, আর আমার জন্য এত কিছু প্রস্তুত করে রাখল?’ অথচ উত্তরটি সহজ, এই পৃথিবী কখনোই দৈবক্রমে তৈরি হয়নি। একে ডিজাইন করা হয়েছে, আর ডিজাইন করা হয়েছে মানুষেরই জন্য। যিনি এই বিশাল কারখানা নির্মাণ করেছেন, তিনি সৃষ্টির শুরু থেকেই জানতেন যে শেষ পর্যন্ত মানুষ আসবে। আর সেই জ্ঞান থেকেই তিনি প্রতিটি পরমাণু, প্রতিটি নিয়ম, প্রতিটি ভারসাম্য এমনভাবে সাজিয়েছেন, যেন মানুষ এসে দেখতে পায়, তার জন্যই সব প্রস্তুত ছিল।
প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে এই সত্যকে পবিত্র কুরআন এক লাইনেই ঘোষণা করে দিয়েছিল দ্ব্যর্থহীন ভাষায়।
উদ্দেশ্যহীন নয় এই সৃষ্টিজগৎ
‘আমি আসমান ও জমিন এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করিনি।’— সূরা আল-আম্বিয়া (২১:১৬)
‘আমি আসমান ও জমিন এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করিনি।’— সূরা আদ-দুখান (৪৪:৩৮)
‘আমি এগুলো সৃষ্টি করেছি শুধু যথাযথ উদ্দেশ্যেই, কিন্তু তাদের অধিকাংশ তা জানে না।’— সূরা আদ-দুখান (৪৪:৩৯)
‘আমি আসমান, জমিন ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু অনর্থক সৃষ্টি করিনি। এটা কাফিরদের ধারণা, সুতরাং কাফিরদের জন্য রয়েছে দুর্ভোগ, আগুনের শাস্তি।’— সূরা সোয়াদ ৩৮:২৭
‘তোমরা কি মনে করেছ, আমি তোমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে না?’—সূরা আল-মুমিনূন ২৩:১১৫
‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করনি, তুমি পবিত্র-মহান, অতএব আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা কর।’ — সূরা আলে ইমরান ৩:১৯১
সৃষ্টির উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে
‘আমি জিন ও মানুষ সৃষ্টি করেছি শুধু এই উদ্দেশ্যে যে, তারা আমার ইবাদত করবে।’— সূরা আয-যারিয়াত (৫১:৫৬)
‘তিনিই মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন এই পরীক্ষার জন্য যে, তোমাদের মধ্যে কে কর্মে উত্তম।’— সূরা আল-মুলক ৬৭:২
সৃষ্টিকর্তাকে চেনা ও বিশ্বাস করার আহ্বান
‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর, যিনি তোমাদের এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’— সূরা আল-বাকারা ২:২১
‘যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে বিছানা এবং আকাশকে ছাদ বানিয়েছেন, আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তা দিয়ে তোমাদের জীবিকাস্বরূপ ফলফলাদি উৎপন্ন করেছেন, অতএব তোমরা জেনে-বুঝে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করিও না।’ — সূরা আল-বাকারা ২:২২
এই পুরো আলোচনার শেষে আমরা একটা সহজ সত্যে এসে পৌঁছাই। যে জগৎ এত নিখুঁতভাবে মানুষের জন্য সাজানো হয়েছে, সেই জগৎ কখনো উদ্দেশ্যহীনভাবে তৈরি হয়নি।
একটা গাড়ির কথা ভাবুন। প্রকৌশলী প্রতিটি অংশ তৈরি করেছেন একটা লক্ষ্য মাথায় রেখে। গাড়িটি যদি গ্যারেজে পড়ে থেকে শুধু ধুলো জমায়, তার অস্তিত্বের কারণটাই অপূর্ণ থেকে যায়। একইভাবে একটা সফটওয়্যার তৈরি হয় নির্দিষ্ট কাজ সমাধানের জন্য।
তাহলে প্রশ্ন জাগে, গাড়ি, সফটওয়্যার যদি নির্মাতার একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য বহন করে, তাহলে যে মানুষ নিজেই এই বিশাল সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে সচেতন সৃষ্টি, তার অস্তিত্বের পেছনে কি কোনো লক্ষ্য থাকবে না? গাড়ি রাস্তায় না নামলে যেমন তার নির্মাণের উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যায়, মানুষও যদি তার স্রষ্টার নির্ধারিত লক্ষ্য থেকে দূরে সরে থাকে, তার অস্তিত্বও সেই একই শূন্যতায় ভুগবে।
সুতরাং যেই স্রষ্টা মানুষের জন্য এত যত্ন করে জগৎ সাজিয়েছেন, সেই একই স্রষ্টা মানুষের অস্তিত্বের পেছনেও নিশ্চয়ই একটা লক্ষ্য রেখে দিয়েছেন। বাতাস, পানি, সূর্য, মাটি সবকিছু যেমন নীরবে তাদের নির্ধারিত নিয়ম মেনে সেই লক্ষ্য পূরণ করে চলে, মানুষেরও উচিত সচেতনভাবে তার স্রষ্টাকে স্বীকার করা আর তাঁর নির্দেশনা মেনে সেই লক্ষ্যের পথে চলা।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ইসলামই পৃথিবীর ভবিষ্যত
...
নারীর ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
মহান রাব্বুল আলামীন দ্বীন শিক্ষাকে প্রত্যেক নর-নারীর উপর ফরজ করে দিয়েছেন। মানুষ সৃষ্টির সেরা , শরীয...
নাম রাখার ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন