প্রবন্ধ
শরীয়তের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য: ঈমান বিধ্বংসী এক নীরব ফেতনা
৩০ মে, ২০২৬
৪৪৩
০
ভূমিকা
মানব ইতিহাসে এমন একটা সময় ছিল, যখন মুসলমানরা শরীয়তের আইন বাস্তবায়নের ক্ষমতা রাখত না। জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়ে তারা কেবল আফসোস করত। বলত, "হায়! যদি আল্লাহর দেওয়া শরীয়তের শাসন থাকত! যদি ইসলামী বিচারব্যবস্থা চালু থাকত, তাহলে সমাজটা অন্যরকম হত।" এর ফলে সুবাতাস বইতো চারিদিক।
কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। আজ মুসলমান মাথায় টুপি দেয়, দাড়ি রাখে, নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, হজ্ব করে। আমলের কোনো কমতি নেই। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই আমলদার মানুষগুলোর একটা বড় অংশ এখন আল্লাহর দেওয়া শরীয়তের বিধানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সামান্য একটা ঘটনা ঘটলেই তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখছে, ভিডিও বানাচ্ছে "শরয়ী আইন থাকলেও ধর্ষণ বন্ধ হত না", "শরয়ী আইনে এই সমস্যার সমাধান নেই"।
এটা কি শুধুই মতামত? নাকি এটা ঈমান ধ্বংসের এক ভয়ংকর পথ? এই প্রবন্ধে আমরা শরীয়তের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ভয়াবহতা, কুরআন-হাদীসের আলোকে তার পরিণতি এবং আমাদের করণীয় নিয়ে আলোচনা করব।
১. শরীয়ত কী এবং মুসলমানের সাথে তার সম্পর্ক কী?
শরীয়ত হলো, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দেওয়া জীবনব্যবস্থা। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে রচিত এই বিধান মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সকল দিককে নিয়ন্ত্রণ করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ ۖ فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
অনুবাদ: "এবং (হে রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), আমি তোমার প্রতিও সত্যসম্বলিত কিতাব নাযিল করেছি, তার পূর্বের কিতাবসমূহের সমর্থক ও সংরক্ষকরূপে। সুতরাং তাদের মধ্যে সেই বিধান অনুসারেই বিচার কর, যা আল্লাহ নাযিল করেছেন। আর তোমার নিকট যে সত্য এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না। "-সূরা মায়িদা, আয়াত ৪৮
একজন মুমিনের কাজ হলো শরীয়তের প্রতিটি বিধানকে মাথা পেতে মেনে নেওয়া। আল্লাহ বলেন:
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَن يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا ۚ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
অনুবাদ: "মুমিনদেরকে যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ডাকা হয়, যাতে রাসূল তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেন, তখন তাদের কথা কেবল এটাই হয় যে, তারা বলে আমরা (হুকুম) শুনলাম এবং মেনে নিলাম। আর তারাই সফলকাম।"— সূরা নূর, আয়াত ৫১
২. তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ভয়াবহতা: ঈমান ভেঙে যায়
ইসলামের একটি মৌলিক আকীদা হলো, শরীয়তের যেকোনো বিধানকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা কুফরি। কোনো ব্যক্তি যদি নামাজ না পড়ে, রোজা না রাখে, হজ না করে, সে গুনাহগার, ফাসেক। সে তওবা করলে আল্লাহ তাআলা তাকে মাফ করে দিতে পারেন। কারণ এগুলো আমলের ঘাটতি।
কিন্তু কেউ যদি নামাজ-রোজা না পড়েও বলে, "নামাজ-রোজা খুব গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, না করতে পারলে আমার আফসোস হয়" তার ঈমান ঠিক থাকবে।
অন্যদিকে, কেউ যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, দাড়ি রাখে, হজও করে, কিন্তু মুখ দিয়ে বলে, "শরীয়তের এই বিধানটা অপ্রয়োজনীয়", "এই আইনটা যুগের সাথে যায় না", "এটা দিয়ে ধর্ষণ বন্ধ হবে না" তাহলে তার সব আমল মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যাবে। কারণ সে আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করছে, তুচ্ছ করছে।
আল্লাহ তাআলা কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন:
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ۚ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ (65) لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ
অনুবাদ: "তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, তারা অবশ্যই বলবে, আমরা তো হাসি-তামাশা ও ফূর্তি করছিলাম। বল, তোমরা কি আল্লাহ, আল্লাহর আয়াত ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে ফূর্তি করছিলে? অজুহাত দেখিও না। তোমরা ঈমান জাহির করার পর কুফরীতে লিপ্ত হয়েছ।
ইমাম নববী রহ. বলেন, "শরীয়তের কোনো বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা, তা ছোট হলেও, সর্বসম্মতিক্রমে কুফরি।"
৩. আমাদের কলম ও কিবোর্ড: জিহ্বার চেয়েও ভয়ংকর
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مَا يَتَبَيَّنُ فِيهَا يَزِلُّ بِهَا فِي النَّارِ أَبْعَدَ مَا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ
অনুবাদ: "নিশ্চয় বান্দা এমন কথা বলে, যার পরিণাম সে চিন্তা করে না। অথচ এ কথার কারণে সে নিক্ষিপ্ত হবে জাহান্নামের এমন গভীরে, যার দূরত্ব মাশরিকের দূরত্বের চাইতেও অধিক।" — সহীহ বুখারী, হাদীস ৬০৩৩
আজকের যুগে জিহ্বার চেয়ে কিবোর্ড আরও বেশি ভয়ংকর। আমরা টাইপ করার আগে একবারও ভাবি না। স্পর্শকাতর ঘটনার পর অনেক মুসলমান ভাই-বোন আবেগের বশে লিখে ফেলছেন, "শরীয়ত আসলেও লাভ নেই"।
আপনি একবার ভেবে দেখুন, আপনি কাকে খুশি করতে চাচ্ছেন? নাস্তিকদের, সেক্যুলারদের? আর বিনিময়ে আপনি কী হারাচ্ছেন? আপনার সবচেয়ে দামি সম্পদ ঈমান।
৪. করণীয়: সাবধানতা ও তওবা
১. কলম ও কিবোর্ডে লাগাম দিন: লেখার আগে, পোস্ট করার আগে, ভিডিও বানোর আগে ১০ সেকেন্ড থামুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন "আমি কি আল্লাহর বিধানকে ছোট করছি? আমি কি কাফেরদের ভাষায় কথা বলছি?"
২. অজ্ঞতা দূর করুন: শরীয়ত সম্পর্কে না জেনে মন্তব্য করবেন না। কোনো আইন কেন দেওয়া হয়েছে, তার হিকমত কী এটা আলেমদের কাছ থেকে জানুন।
৩. ভুল হয়ে গেলে তওবা করুন: যদি ইতিমধ্যে এমন কোনো পোস্ট করে থাকেন, সাথে সাথে ডিলিট করুন এবং আল্লাহর কাছে খাঁটি মনে তওবা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا
অনুবাদ: "হে মুমিনগণ! আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা কর।" — সূরা তাহরীম, আয়াত ৮
সুতরাং, মুসলমান হিসেবে আমাদের পরিচয় হলো "সামি’না ওয়া আতা’না" (سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا) আমরা শুনলাম এবং মান্য করলাম। শরীয়তের প্রতিটি বিধান, তা আমাদের বুদ্ধিতে ধরুক বা না ধরুক, আমাদের মাথা পেতে নেওয়ার নামই ঈমান।
শরীয়তের প্রতি ভালোবাসা, তার প্রতি আফসোস করা, এটা ঈমানের আলামত। আর শরীয়তকে তুচ্ছ করা, তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা, এটা ঈমান ধ্বংসের আলামত।
আমরা আমাদের জিহ্বা, কলম ও কিবোর্ডকে হেফাজত করবো। কারণ, কিয়ামতের দিন এই কলমের খোঁচা-খোঁচিই আমাদের জান্নাতে নিয়ে যাবে, অথবা জাহান্নামে ঠেলে দেবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন এবং শরীয়তের প্রতি যথাযথ সম্মান করার তাওফিক দিন। আমীন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
বালা-মুসীবতের কারণ ও প্রতিকার
মহান রব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন- وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَع...
আপনি কি দ্বীনের খাদিম হতে চান?
...
পর্দা নারীর আভিজাত্য ও মর্যাদার প্রতীক
দু'টি চিত্র লক্ষ্য করুন। প্রথমটি ইসলামের স্বর্ণযুগের। আর দ্বিতীয়টি তথাকথিত প্রগতি-যুগের। চিত্র-১ খলী...
নাজাতের জন্য শিরকমুক্ত ঈমান ও বিদ'আতমুক্ত আমল জরুরী
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] الحمد لله وكفى وسلام على عباده الذين اصطفى، أما بعد فأعوذ بالله من الشي...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন