প্রবন্ধ
দল টেকে স্বার্থে, জামাত টেকে হকে
২৮২
০
[وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيعًا — আল্লাহর রজ্জু ধরে সবাই একত্রিত হওয়াই হলো জামাতের বুনিয়াদ। দীনি জামাত আর দুনিয়ার দলের মৌলিক পার্থক্য এখানেই — দীনি জামাতে হুকুম মূল, দলে স্বার্থ মূল। ডাকাত, শ্রমিক, রাজনীতিবিদ — সবাই ঐক্যের কথা বলে, কিন্তু সেই ঐক্য নিজ স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার মাত্র।
বাতিলের চিহ্ন হলো — ভিন্নমত মানেই শাস্তি। ডাকাতের দলে নেতার বিরুদ্ধে একটি কথা বললেই গুলি, রাজনৈতিক দলে বিপক্ষ মত দিলে বহিষ্কার। ডেমোক্রেসির নামে আমেরিকা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার উৎখাত করে — এটাও একই কৌশল। নীতির জন্য দল নয়, দল টিকিয়ে রাখার জন্য নীতি।
হকের জামাতে উল্টো — যত বড় মুরব্বিই হোক, ছোট ছাত্রের দলিলও শুনতে বাধ্য। ইমাম আবু হানিফার বিরুদ্ধে তাঁরই শাগরেদের বেশুমার ফতোয়া, বাপ-ছেলের ঈদের মাসআলায় প্রকাশ্য দ্বিমত — এগুলো বেয়াদবি নয়, এটাই দীনের শক্তি। মাওলানা ইলিয়াস রহ.-এর সামনে ছোট বাচ্চার হাদিস শোনানো, মাওলানা পালনপুরি রহ.-এর ভুল স্বীকার ও সংশোধন — এই সংস্কৃতিই তাবলিগকে টিকিয়ে রেখেছে।
সত্য কথা বলার ও শোনার এই মেজাজটি উইপোকার মতো ভেতর থেকে নষ্ট হয়ে যায় — বাইরে থেকে টের পাওয়া যায় না। এটা যখন নষ্ট হয়, দীনের জামাত নামে থাকলেও কাজে আর জামাত থাকে না।]
[২৯শে রমজান (২০১৫ ইং), সকালের মোযাকারা, যাত্রাবাড়ি মাদরাসা]
"তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে ধরে আশ্রয় নাও, নিজেকে নিরাপদ করো, সবাই একসাথে।"
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيعًا
وَاعْتَصِمُوا — বলে আশ্রয় নেওয়া, নিরাপদ হওয়া। بِحَبْلِ اللهِ — হচ্ছে আল্লাহর রজ্জু ধরে। جَمِيعًا — মানে সবাই একসাথে। ইজতেমায়িভাবে থাকা, আল্লাহর রজ্জু ধরে। জামাত হলো একত্রিত আছে, কিন্তু এই একত্রিত থাকার বুনিয়াদ হলো আল্লাহর আহকাম। আল্লাহর আহকাম ধরে, সবাই আল্লাহর হুকুমকে ধরে এক হয়ে আছে।
এর মোকাবেলায় দুনিয়ার সব জামানায়, বিভিন্ন জাতি, বিভিন্ন দল — তাদের ক্ষেত্রেও ঐক্যের কদর সব সময় সমাজে ছিল এবং আছে। দুনিয়ার এমন কোনো হক বা বাতিল জামাত পাওয়া যাবে না যেটা ঐক্যকে মূল্য দেয় না। তা না হলে টিকতেই পারবে না। ডাকাতের দল টিকতে পারবে কি যদি ঐক্য না হয়? চোর চুরি করতে পারবে না, যদি তাদের মধ্যে ঐক্য না থাকে। পুলিশ ডাকাতের মোকাবেলাও করতে পারবে না, যদি তার ঐক্য না থাকে।
তো হক হোক আর বাতিল হোক, ঐক্য ছাড়া টিকা সম্ভব নয়। আর এই জাতীয় কথা সব জামানায় দল ইত্যাদির মধ্যে চলতে থাকে। 'ব্যক্তির চেয়ে দল বড়।' এটা নতুন কথা নয়, বহু পুরনো কথা এগুলো। চোরও এই কথা বলে, ডাকাতও এই কথা বলে। ভালো মানুষও বলে, মন্দ মানুষও বলে। জামানা ধরে যে ঐক্যের গান গায়, 'একসাথে থাকা, জাতি বা জাতীয়তাবাদ, ইংরেজিতে nationalism, এই সবগুলোর বুনিয়াদ ঘুরেফিরে সেই 'দলবদ্ধ থাকা।' আর দলবদ্ধ এইজন্য হয় যে, দলবদ্ধ হয়েছে — অন্যের মোকাবেলা করবে। শ্রমিকরা এক দল হয় মালিকদের কাছ থেকে তাদের দাবি-দাওয়া উদ্ধারের জন্য। এর মোকাবেলায় মালিকরাও এক দল হয়ে যায়, যাতে তারাও শ্রমিকদের মোকাবেলা করতে পারে। তো সব জায়গায় এই জিনিস হয়।
দীনি জামাত ও দুনিয়ার দলের মৌলিক পার্থক্য
দীনি জামাত আর দুনিয়ার যত জামানার, যত জাতির, যত দল — সবগুলোর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে, দীনি জামাত আল্লাহর আহকামকে ধরে আশ্রয় নেয়। হুকুম মূল। আল্লাহর হুকুমকে বাদ দিয়ে আমরা এক হয়ে গেলাম — এটা নয়। আর এর মোকাবেলায় দুনিয়ার বাকি যত জামানায়, যত দল ইত্যাদি আছে, ওখানে আল্লাহর হুকুম তো নেই। (এইসব ক্ষেত্রে) এক হলাম নিজ স্বার্থে। ডাকাতের দল যদি এই কথা বলে যে, 'আমরা আল্লাহর আহকাম ধরে দলবদ্ধ থাকি', তাহলে ডাকাতিই করা যাবে না। ডাকাতি করতে হলে প্রথমে আল্লাহর হুকুমকে ছাড়তে হবে। এক জাতি আরেক জাতির উপর আক্রমণ করছে, জোর করে তাদের ধন-দৌলত লুট করছে। কারণ তারা খাবে। ইংরেজরা এখানে এসে এদেশ শাসন করল তাদের স্বার্থে। যদি বলে যে 'আল্লাহর হুকুমের উপর আমরা একত্রিত হই' — তো নিজ স্বার্থই তো হবে না!
'জামাত' ও 'দল' — একই কিন্তু ভিন্ন
'জামাত' আর 'দল', অনুবাদ করলে আভিধানিকভাবে একই জিনিস। কিন্তু পরিভাষা দুটোর ভিন্ন। জামাত হলো আল্লাহর হুকুমকে বা আল্লাহর হুকুমের উপর ভিত্তি করে একত্রিত হওয়া। যেমন জামাতে নামাজ।
জামাতে আমরা নামাজ পড়ছি। মাঝখানে ইমাম যদি অন্যকিছু করতে আরম্ভ করে, তো তার পেছনে চলব নাকি? বরং ইমামের শর্ত যতগুলো আছে, ওই ইমাম যতক্ষণ ওই শর্তের অধীনে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানছি। ইমামকে আসলে মানছি না, বরং আল্লাহর হুকুমকে মানছি। ইমাম যতক্ষণ পর্যন্ত ওই হুকুমের মধ্যে আছে ততক্ষণ। আর অন্য জায়গায় আল্লাহর হুকুম কিন্তু নেই, তো তাকেই মানছে। ও যা বলে। এইজন্য ইমাম যদি ভুল করে তাহলে মুক্তাদি সংশোধন করে দেবে। এখানে মানদণ্ড কী? ভুল বলতে কী বোঝায়?
কিন্তু দলের মধ্যে যেখানে আল্লাহর হুকুমই নেই, ও (দলের প্রধান) যেদিকে যায় সেদিকেই যেতে হবে। সেক্ষেত্রে এর কোনো বিকল্প নেই। এই একই পার্থক্য একেবারে নিচস্তর পর্যন্ত।
আমাদের দেশে হাজারও দল আছে আর তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দলগুলো। রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোনো একটা দলের সদস্য, তার অধিকার নেই দলের বাইরে কোনো মত প্রকাশ করা, আনুষ্ঠানিকভাবে। ব্যক্তিগতভাবে বা ঘরের মধ্যে চা খেতে খেতে বলল, ওটা ভিন্ন জিনিস। পার্লামেন্টে যখন ভোট চাওয়া হয় কোনো একটা ইস্যু বা বিষয়ের উপর, তো ওখানে এমপিরা আছে, তারা তাদের মতামত দেয়। যে দলের এমপি, ও যদি নিজের দলের মতামত না দিয়ে অন্য দলের মতামতকে প্রকাশ করে যে, আমি ওই মতকে শুদ্ধ মনে করি, ওটা সমর্থন করি — দলীয় নীতিতে এটা সবচেয়ে বড় অপরাধ। এটা মার্জনার যোগ্য নয়। তারপর তাকে পার্লামেন্টে ওই সময় কিছু হয়তো হইচই করবে, বেশি কিছু করতে পারবে না, এরপর ওকে দেখবে। দলের সবাই যদি এইরকম শুরা হয় যে, কোনো শুরা একটা রায় দিয়েছিল, যে রায় মুরব্বিরা পছন্দ করছে না কিংবা কিছু একটা, ওখানে কিছু করবে না, কিন্তু পরে দেখবে। এই জিনিস হলো বাতিলের মৌলিক একটা ধর্ম — বাতিল।
আর এর মোকাবেলায় হক হলো এই যে দৃষ্টান্ত, খলিফার বিরুদ্ধে রায় দিল, লোকে মনে করল যে, ও ধ্বংস। এটা মনে করার কারণ কী? খোলাফায়ে রাশেদার পরে মানুষের মধ্যে অনেক বেদীনি এসে গেছে। আর ওই বেদীনি এসে যাওয়ার কারণে আমিররা বা খলিফারাও অনেক ভুল কাজ করেছে। পুরো দীনদারির উপর আস্থা অনেকখানি নষ্ট হয়ে গেছে। এই কথাই যদি উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর জামানায় হতো, ওই যে মজমা ভাবল যে, 'নিশ্চয়ই এই ব্যক্তি ধ্বংস' — উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর জামানা হলে এই কথা কেউ ভাবতই না। বরং আন্দাজ করত যে, নিশ্চয়ই বড় কোনো হাদিয়া নিয়ে আসবে। এটাই ধারণা করত। কারণ তারা জানে যে, ভুল কথা যে বলে দেয়, যত বিরুদ্ধেই হোক না কেন, সে পুরস্কৃত হবে। ওটাই ছিল হকের জামাত। আর তারপরে হয়ে গেল যে, তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।
আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়ম রয়েছে, প্রত্যেক ব্যক্তি যেন ভোট দেয়। যেমন পার্লামেন্ট। চাইছে প্রত্যেক ব্যক্তির ভোট, কিন্তু আসলে তার নিজস্ব মতামতের ভোট দেওয়ার অধিকার নেই। এই অধিকার যদি মেনে নেয়, তাহলে ওই পার্লামেন্টের মধ্যে ওই ভোট নেওয়ার কোনো অর্থই থাকে না। পার্টির কতজন মেম্বার আছে — গুনে নিলেই হলো। ওই পার্টির মতামত এটাই। এটা আলাদা করে জিজ্ঞাসা করার কী দরকার? আলাদা করে এই জন্য জিজ্ঞাসা করা হয় যে, ওটা নীতিগতভাবে একটা কথা আছে, কিন্তু বাস্তবে নাই। ওই নীতিগতভাবে থাকার কারণে আলাদা করে জিজ্ঞাসা করে, কিন্তু বাস্তবে তার মতামত প্রকাশ করার অধিকার নাই।
দীনের মধ্যে আর বেদীনের মধ্যে, জামাতের মধ্যে আর দলের মধ্যে এটা মৌলিক পার্থক্য।
ডাকাতের দলের মধ্যে কোনো একজন ডাকাত যদি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তার নেতার সাথে দ্বিমত করে — এই দ্বিমতের বদলা হচ্ছে সাথে সাথে ট্রিগার টানা। এখানে আর কোনো দেরি করার জায়গা নেই। (ধরা যাক) ও মারল না। (তবে) এ যদি বাঁচতে চায়, তাকে পাল্টা মেরে ফেলবে।
অনেকদিন আগে, একসময় ইউপি-র (উত্তর প্রদেশ) কিছু পাহাড়ি অঞ্চলে জঙ্গল ধরনের কিছু অঞ্চল আছে। বহুদিন ধরে ওখানে প্রতিষ্ঠিত ডাকাতের দলের বসবাস ছিল। ইদানীং আধুনিক টেকনোলজি যেমন হেলিকপ্টার ইত্যাদি নানান ধরনের জিনিস আসার ফলে সরকার ওটাকে দমন করতে পেরেছে। কিন্তু কয়েক বছর আগে পর্যন্তও ওদের দখলে ছিল। এই কথাগুলো যে বলছি, খুব বেশিদিন আগের হবে না, বিশ-ত্রিশ বছর আগের কথা মাত্র। ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্ট যখন দাপুটে গভর্নমেন্ট, তখনো ওই ডাকাত দল তার সমান দাপটের মধ্যে আছে। একবার সরকার একটা বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে এদেরকে এলিমিনেট করার জন্য, এই উদ্যোগের জবাব ওই ডাকাতদল এভাবে দিল যে, শহরে এসে একজন লোকের গলায় দড়ি দিয়ে শহরের মাঝখানের একটা জায়গায় ঝুলিয়ে গেল। অর্থাৎ "আমরা জানি তোমাদের সিদ্ধান্ত আর আমরা প্রস্তুত। এই হলো আমাদের উত্তর, তোমাদের যা কিছু করার করো।"
ওই ডাকাতদল যাচ্ছিল গাড়িতে, তো ওইরকম ওই ডাকাতের দলের মধ্যে নেতার বিরুদ্ধে তার একজন সদস্য একটা কথা বলেছে। ওরা তো নিজেদের মধ্যে গল্প-গুজব করছে আর একেবারে তো আর রাইফেল-পিস্তল হাতে নিয়ে নয়, ওদের কাঁধে আছে। যেমনি ওই সদস্য ওর বিরুদ্ধে একটা কথা বলেছে, ও হাত লম্বা করেছে রাইফেলের জন্য। সে তখনই ওকে গুলি করেছে, ও শেষ! যে এই ঘটনাগুলো বর্ণনা করছে, সে এইরকম উক্তি করল, "ওই যে ডাকাতের নেতা, এত দক্ষ ব্যক্তি, কিন্তু এই মারাত্মক ভুলটা সে কেমন করে করল?" 'মারাত্মক ভুল' কী? মারাত্মক ভুলটা হলো, ও যখন ওর বিরুদ্ধে কথা বলল, ও তখন রাইফেলের দিকে হাত বাড়াল। এটা একটা টেকনিক্যালি মারাত্মক ভুল। ওর এই কথা পলিটিক্যালি হাসি মুখে গ্রহণ করা উচিত ছিল, গল্পস্বল্প করত, রাইফেল হাতে নেওয়ার পরেই গুলি করত — এটা হলো টেকনিক। তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করল তো মরে গেল!
দীনের ময়দানে এটাই পার্থক্য। যে কোনো সময়, যে কোনো কারো মতামত প্রকাশ করার অধিকার আছে। ব্যক্তি অথবা সবাই। সবার একমত আর আমার একমত। যত বড় মুফতিই হোক, তার এক মত আর আমি যদি ফতোয়ার ব্যাপারে কিছুটাও জ্ঞান রাখি, যেমন একজন ছাত্র, সে বলবে "না, আমার মত এইরকম নয়।" ওই ছাত্র বিশ বছরে মাত্র ইফতায় ঢুকেছে, কিন্তু সে যদি কিছু দলিল বোঝার, বোঝাবার যোগ্যতা রাখে, বড় থেকে বড় মুফতি তার কথা শুনবে, শুনতে বাধ্য।
হানাফি মাযহাবে অসংখ্য ফতোয়া, একটা-দুটো নয়, বেশুমার ফতোয়া ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহির ফতোয়ার বিরুদ্ধে। তার মধ্যে একটা আমরা জানি। সেটা হলো এই ইতিকাফের ব্যাপারেই। ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহির ফতোয়া হলো, 'চব্বিশ ঘণ্টার নিচে ইতিকাফ হয় না।' আর ইমাম মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহি আলাইহির ফতোয়া হলো, 'যে কোনো অল্প সময়ের জন্য ইতিকাফ হয়।' তাঁরই শাগরেদ। দুনিয়ার ময়দানে, যদি দীনি মেজাজের না হয় — তো বলবে, "এ কেমন বেয়াদব, উস্তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে! এর মঙ্গল হবে না, ধ্বংস হবে, আল্লাহ দেখবে, এইরকম বেয়াদবি আল্লাহ সহ্য করবে না!"
আমরা যেভাবে দীন বুঝি, এটা আমাদের দীন বোঝার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। একজন উস্তাদের বিরুদ্ধে, একজন পীরের বিরুদ্ধে। বিরুদ্ধে মানে কিন্তু ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, তার মতামতের বিরুদ্ধে। উস্তাদের মতামতের বিরুদ্ধে, পীরের মতামতের বিরুদ্ধে কথা যদি সে বলে তো ধ্বংস, হালাক! হালাক! আর আল্লাহওয়ালারা বলছেন যে, এটাই একজন ঈমানদারের দাবি।
বাপ-ছেলে, এই হিন্দুস্তানের কথা — আমি ভুলে গেছি। সম্ভবত মাওলানা ইয়াহইয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহি হতে পারেন। মানে ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির ভাই। বা ওই পর্যায়ের বড় কোনো আল্লাহওয়ালা আলিম। ছেলে বাপ দুইজনের বাড়ি প্রায় পাশাপাশি। ঈদ হচ্ছে, দুইজনের মত ভিন্ন। একজনের মতে আজকে ঈদ হয়, আর আরেকজনের মতে হয় না। ছেলে বাপ দুইজন আলাদা। তৃতীয় আরেক লোক জিজ্ঞাসা করতে এসেছে আজ ঈদ কিনা। তো বাপ বললেন যে, আমি আজকে ঈদ করছি, কিন্তু ও করছে না। এখন তুমি দেখো তুমি কোনটা করবে। ওই বাপের মতামত বলে ছেলে মেনে নিচ্ছে না। একই গ্রামের মানুষ। যে দলিলের উপর বাপ বলছেন যে আজকে ঈদ হয়, ওই দলিল তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, যথেষ্ট নয়। তার মতে এই দলিল দিয়ে ঈদ হয় না।
আমরা যেভাবে আদবকে বুঝি বা ঐক্যকে বুঝি, 'এইসব হচ্ছে ধ্বংসের লক্ষণ'! এভাবে চললে এই জাতি আর টিকবে না! না আছে আদব, বড়দেরকে মানে না! ইত্যাদি, ইত্যাদি। অথচ দীনের বুনিয়াদি শক্তিই এটা। এটা যদি না থাকে, তার মধ্যে হকের রজ্জু থাকবে না। কথা হলো অগ্রাধিকার কোনটা? আদবের অগ্রাধিকার নাকি সত্য কথার অগ্রাধিকার? বা দলের স্বার্থের অগ্রাধিকার নাকি হকের অগ্রাধিকার? মৌলিক পার্থক্য এটা।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের দল বানাতে বলেছেন বা জামাতে চলতে বলেছেন বা আমিরের অধীনে চলতে বলেছেন হককে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। তার বিপরীত নয়। (এমন তো নয় যে) হক দিয়েছেন আমিরকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, যে আসল তো আমিরই। আসল হচ্ছে দলই। যেটা হলো পলিটিক্যাল ক্ষেত্র। পলিটিক্যাল ক্ষেত্রে তাদের নানারকম 'বাণী' থাকে। ঐক্য, স্বাধীনতা বা আরও যা কিছু পারা যায়। তাদের মধ্যে কিছু মৌলিক কথা তাকে, গুরুত্বপূর্ণ, খুব ধুমধামসে এগুলো প্রচার করে। 'ইউনিটি', 'ফেইথ', 'ডিসিপ্লিন' — এগুলো পাকিস্তানের সময় খুব ছিল। তো এইরকম কিছু মৌলিক কথা থাকে আর কথাগুলো নিয়ে একটা দল চলতে থাকে।
আসলে (তাদের কাছে) এই কথাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য দল নয়, (বরং) দলকে ধরে রাখার জন্য এই কথাগুলো। যদি কখনো দলকে ধরে রাখার স্বার্থে ওই 'ইউনিটি' হোক আর 'ফেইথ' হোক বা 'ডিসিপ্লিন' ছাড়তে হয়, ও ছাড়বে! কারণ ওটা আসল। আর এটা হচ্ছে একটা ছুতো, যেটা দিয়ে ধরে রাখবে। এইজন্য কিছু 'নীতি' নিজে বানায়, আবিষ্কার করে, সংগ্রহ করে বা যে যেইরকম শব্দই ব্যবহার করুক। (মূল কথা হচ্ছে) ওই নীতিগুলোর জন্য তারা নয়, (বরং) নিজেরা যেখানে অগ্রসর হতে চায় সেটাকে ধরে রাখার জন্য এই নীতিগুলো বানিয়েছে। পাবলিককে আনতে হলে এভাবে তো আর বলা যায় না যে, 'আমাদের কিছু স্বার্থ আছে, তোমরা তোমাদের জান আমার স্বার্থে দাও।' পাবলিক ওর স্বার্থে খামোখা জান দেবে নাকি? কিন্তু সুন্দর কথা দিয়ে অনেক মানুষকে ভোলানো যায়। সেইজন্য ইউনিটি, ফেইথ, ডিসিপ্লিন যত বাক্য আছে এগুলো বানায় যাতে মার্কেটে এই কথাগুলো চালাতে পারে। ওই কথা দিয়ে মার্কেট দখলে রাখবে আর দখল করে আনার পরে নিজস্ব বণ্টন নিজ স্বার্থে করবে, তখন কিন্তু ওই নীতিগুলো আর থাকবে না।
তো বাতিল, তার অনেক কথা আছে আর এই কথাগুলো তার কাছে তার দলকে রক্ষা করার জন্য বা তার নেতাকে রক্ষা করার জন্য। যদি এই কথা দিয়ে তার দল রক্ষা না হয়, তাহলে সে এই কথাগুলো ছেড়ে দেবে।
Democracy — গণতন্ত্রের মুখোশ
Democracy বর্তমান দুনিয়ায় খুব চালু কথা। বহুদিন আগে এক নামকরা আমেরিকান, সম্ভবত ইহুদি।
Statesman বলা হয়, যার নেতৃত্ব শুধু একটা দলের নেতা নয়, বরং তাকে একটা নীতিগত নেতা হিসেবে সবাই মেনে নেয়, এই জাতীয় একজন নেতার কথা। একদিকে ডেমোক্র্যাটিক দল আর অপরদিকে ফ্যাসিস্ট দল। ডেমোক্র্যাটিক দলের মধ্যে যদি কেউ ওই ডেমোক্রেসির স্বার্থ নিয়ে চলে, তো তার স্বার্থে মিলছে না। ইলেকশন হলো। যেমন ধরা যাক, আলজেরিয়ায় ইলেকশন হলে ইলেকশনে যারা জিতে তারা আমেরিকার পক্ষে নয়। ওরা আমেরিকাপন্থী নয়, ইলেকশনে যারা জিতে। বা এই জাতীয় ঘটনা গত তিরিশ-চল্লিশ বছরে বেশিরভাগ মুসলমান দেশে ঘটেছে। তুরস্কে কেউ যদি ইলেকশনে জিতবে, ওরা আমেরিকাপন্থী নয়। আলজেরিয়ায় যারা ইলেকশনে জিতছে, ওরা আমেরিকাপন্থী নয়। ইলেকশনের আগেও বোঝা যায়, ইলেকশনের পরেও বোঝা যায়। আর আমেরিকা হচ্ছে ডেমোক্রেসির পক্ষে। তারা নাকি ডেমোক্রেসি প্রতিষ্ঠা করতে চায়! ডেমোক্রেসির দাবি হলো ইলেকশনের রেজাল্ট মেনে নাও। কিন্তু আমেরিকার কথা হলো, যে ইলেকশনের ডেমোক্রেটিক পদ্ধতি ডেমোক্রেসির বিরুদ্ধে যায়, ওই পদ্ধতি মানব না।
"What good is there in their democracy which is against democratic spirit?"
'ওই ডেমোক্রেসির মধ্যে কোনো মঙ্গল নাই, যেটা ডেমোক্রেসি মনোভাব সমর্থন করে না।' তখন ওই খ্রিস্টানদের যে প্রচলিত নিয়ম ছিল, সেটা অস্পষ্ট ভাষার উপর চলে যায়। খ্রিস্টানদের প্রচলিত ভাষা হলো যে, 'Christian spirit', ফিকহ নাই, হালাল কোনটা, হারাম কোনটা ওটা কিছু জানি না, ওরা বলে যে তুমি 'Christian spirit'-এ চলো। তো যখন ডেমোক্রেসিকে লঙ্ঘন করতে হয়, তখন ডেমোক্রেটিক ইলেকশনে যে জিতেছে, ওকে যদি ক্ষমতা দেওয়া হয়, সে চলে যায় আমেরিকার বিরুদ্ধে। তখন আমেরিকা বলে 'তোমাকে ডেমোক্রেটিক স্পিরিট দেখাতে হবে।' এই যে পার্টি ডেমোক্রেটিক ইলেকশনে জিতেছে, এই কথা সত্য, কিন্তু ওদের তো ডেমোক্রেটিক স্পিরিটই নাই! সেইজন্য ডেমোক্রেসি রক্ষার স্বার্থে এদেরকে ধ্বংস করো। কারণ আমি আনডেমোক্রেটিক একটা পদ্ধতি গ্রহণ করছি "to defend democratic spirit"।
দীনের মধ্যে এগুলো কোনো কথাই নয়।
আসল হচ্ছে 'হক' আর ওই হককে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যদি আমার নেতার বিরুদ্ধে যেতে হয়, তাও যাব। দলের বিরুদ্ধে যেতে হয়, তাও যাব। আর এটাকেই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আল্লাহওয়ালা যারা ছিলেন, প্রত্যেক জামানায় এটা করেছেন। এটাই দীনের জ্ঞান। যখন থেকে ওটা নষ্ট হয়ে যায়, তখনই আর ওই জামাত মঙ্গলের কাজ করতে পারবে না।
ওয়ার্মউডের উপমা
একটা জিনিস যে নষ্ট হয়ে যায়, কখন নষ্ট হয়ে যায়? হঠাৎ করে আনুষ্ঠানিকভাবে তাবলিগের বদলে একটা রাজনৈতিক দল ডিক্লেয়ার করে দিল, একটা (দলীয়) ফ্ল্যাগ উঠানো হলো, তা তো হয় না। (বরং) ধীরে ধীরে তার আভ্যন্তরীণ নীতিগুলো নষ্ট হয়ে যায়। আর ওটা কখন, কোথায় নষ্ট হয়েছে — টেরও পাওয়া যায় না। অনেক হয়ে যাওয়ার পরে টের পায়। খায় তো উইপোকার মতো। উইপোকা ভেতর থেকে বিরাট একটা অংশকে খেয়ে ফেলছে, বাইরে থেকে দেখাই যায় না। একেবারে খেয়ে ফেলার পরে হঠাৎ একদিন কোনো ছোট বাচ্চা দিল ধাক্কা, হুড়মুড় করে পড়ে গেল। তো বাচ্চার ধাক্কায় পড়ে যায়নি, এর আগে উইপোকা ওটাকে খেয়ে ফেলেছে। তারপর বাচ্চার ধাক্কা কেন, একটা মুরগির ধাক্কাতেও পড়ে যাবে। আর ওই খেয়েছে কবে তা দেখা যায় না। ভেতরে ভেতরে আস্তে আস্তে করে নষ্ট হয়ে যায়।
তার মধ্যে একটা বড় জিনিস হলো হক কথা বলা বা না বলা।
মাওলানা ইলিয়াস রহ.-এর জীবনীর ঘটনা
মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির জীবনী, ছোট অল্প কয়েক পৃষ্ঠার বই, লিখেছেন আলী মিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহি। আল্লাহ তায়ালা হযরত মাওলানা আলী মিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে এমন এক সিফাত দিয়েছেন যে, একজন মানুষের জীবনী কয়েক পৃষ্ঠার মধ্যে কয়েকটি কথা বলতেন, সেই ব্যক্তির সম্পূর্ণ জীবন ফুটে উঠত। এর মোকাবেলায় আরেকজন জীবনীলেখক হয়তো সাত ভলিউম লিখবে আর সাত ভলিউম লেখার পরে অবস্থা এই যে, 'কিছুই বুঝলাম না।' সকালবেলায় ভাত খায় আর বিকালবেলায়, রাত্রিবেলায় ঘুমায় — এর বেশি কিছু বুঝলাম না! আলী মিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহি ওই ছোট কথার মধ্যে, অল্প কয়েকটি কথার মধ্যে, মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি কী, তাঁর লক্ষ্য কী, তাঁর কাজ কী — সব লিখে ফেলেছেন। একেকটা কথা দিয়ে একেকটা বিশাল জিনিস বুঝিয়েছেন। তার মধ্যে ওই ছোট একটা ঘটনা আছে।
ট্রেনে উঠেছেন, থার্ড ক্লাসের টিকেট করেছেন, সেকেন্ড ক্লাসে উঠেছেন। খাদেম হযরত মাওলানা এনামুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ছোট বাচ্চা। টিটির সাথে তর্ক হয়েছে টিকিট নিয়ে। টিটি বকাবকি করেছে, তিনিও পাল্টা শক্ত কথা বলেছেন। চলে যাওয়ার পরে মাওলানা এনামুল হাসান সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি — যিনি তৃতীয় হযরতজি, তখন তো ছোট বাচ্চা, খাদেম হিসেবে সাথে আছেন — তিনি মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে একটা হাদিস শুনালেন:
'ইন্নালিসাহিবিল হাক্কিমাকালা' — হকের উপর যে আছে, তার কথা বলার অধিকার আছে।
অর্থাৎ এই জায়গায় এই টিটির কথা বলার বা রাগ করার অধিকার আছে আর আপনি যেহেতু ভুল করেছেন, আপনার শক্ত কথা বলার অধিকার নেই। এতসব ব্যাখ্যা তিনি দিলেন না, হাদিস শুনিয়ে দিলেন। একদম ছোট বাচ্চা। তার মানে মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে ধরলেন। আর পরবর্তী স্টেশনে গিয়ে টিটির কাছে মাফ চাইলেন। এটা ছিল হকের বুনিয়াদ। অল্প বয়সের বাচ্চা, আর মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি কত বড় মুরব্বি, আল্লাহওয়ালা! সব ঠিক, কিন্তু একটা ভুল করেছেন, ভুল ধরিয়ে দেওয়া আমার দায়িত্ব। মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি এটাকে পছন্দ করেছেন, প্রশংসা করেছেন।
বহুদিন আগে আমি এই দৃষ্টান্ত আলোচনা করছিলাম আলিগড়ের জামাতের সাথে। তারা কথা শুনল আর শোনার পরে বলল, "কথা হলো মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি এটাকে খুশি খুশি গ্রহণ করেছেন, আর যদি তোমাকে ধরে পেটায় তখন করবে কী?" আর এটাই সমস্যা। কিন্তু তার উচিত হবে এর মোকাবেলা করা। আর এটাই তখন জিহাদের প্রশ্ন। খুশি খুশি যদি গ্রহণ করেন আর প্রশংসা করেন, তাহলে জিহাদের সাথে তুলনা করার কোনো দরকার নেই। কারণ তুমি তো পুরস্কৃত হলে। জিহাদ তখন হয়ে যায়, যখন উপরওয়ালার এটা গ্রহণ করার মেজাজ আর নেই। কিন্তু নিচওয়ালা যেন এটা মেনে না নেয়।
মাওলানা পালনপুরি রহ.-এর ঘটনা
আল্লাহর মেহেরবানি, তাবলিগের মধ্যে এখন পর্যন্ত এটা আছে। উপস্থিত কিছু জায়গায় না থাকলেও আছে। নিজামুদ্দিনে মাওলানা পালনপুরি সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি বয়ান করছিলেন। বয়ানের মধ্যে এই কথা বলেছেন যে, 'ফাতাহ মক্কার পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ দিলেন কয়েকজনের ব্যাপারে যে, তাদেরকে যদি পাও তাহলে তাদেরকে কতল করো।' আর তাদের মধ্যে ওয়াহশি রাদিয়াল্লাহু আনহু একজন। যেহেতু হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাতিল ছিলেন। তাঁকে কতল করার হুকুম দিলেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁকে হেদায়াত দিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতলের হুকুম দিয়েছেন — এই জাতীয় একটা ঘটনা বললেন। বয়ানের পরে আমি পালনপুরি সাহেবের কাছে গেলাম আর গিয়ে বললাম, "ওয়াহশি রাদিয়াল্লাহু আনহুর ইসলাম আনার যে ঘটনা হায়াতুস সাহাবায় আছে, ওটা আপনার কথার সাথে মিলে না।" বললেন, কী? আমি একটু বলতে চাইলাম। কিন্তু আমার কথা বেশি শুনলেন না, তিনি বললেন, "তুমি মাওলানা ইব্রাহিম সাহেবের কাছে যাও আর উনাকে গিয়ে বলো।" এর মানে, মাওলানা পালনপুরি সাহেব মাওলানা ইব্রাহিম সাহেবকে আলিম হিসেবে গ্রহণ করেন। অর্থাৎ আমার উপরে সমালোচনা উনার কাছে পাঠাও। ইব্রাহিম সাহেবের কাছে যাও, উনার কাছে গিয়ে বলো, তিনি কী বলেন এসে আমাকে শোনাও। ইব্রাহিম সাহেবের কাছে আমি গেলাম আর গিয়ে বললাম যে, ওয়াহশি রাদিয়াল্লাহু আনহু হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে যে কতল করেছিলেন, এর পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতাহ মক্কার পরে ওয়াহশি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে কতলের হুকুম দিয়েছিলেন, যদিও ওটা কার্যকর হয়নি, তিনি মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু হুকুম (তো) দিয়েছিলেন — এইরকম কথা নাকি? আর হায়াতুস সাহাবায় আছে অন্যরকম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাছে দাওয়াত পাঠালেন, তিনি ফেরত পাঠালেন। আবার (দাওয়াত) পাঠালেন, আবার ফেরত দিলেন। আবার দাওয়াত পাঠালেন এভাবে কয়েকবারের পরে কবুল করলেন। ইব্রাহিম সাহেব (মাওলানা পালনপুরি সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর মুরব্বি) সত্য কথাও বলবেন, আদবও রক্ষা করবেন। তিনি বললেন না যে, 'এই কথা ভুল।' বললেন, "ভাই, আমার তো এইরকম কথা জানা নেই।" পালনপুরি সাহেব এই কথা বলেছেন, আর তার প্রেক্ষিতে তিনি বললেন, আমার তো এইরকম কথা জানা নেই। তো আদবও রক্ষা করলেন, কিন্তু পালনপুরি সাহেবের কথাকে সমর্থন করলেন না। ভাষায় এই কথা বললেন না যে, 'তিনি ভুল বলেছেন', বললেন "আমার তো এইরকম কথা জানা নেই।"
তারপর এই কথা বললেন, হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে কতল করেছেন যুদ্ধের ময়দানে আর যুদ্ধের ময়দানের বিচার যুদ্ধের বাইরে আর হয় না। ওটার কিসাস হয় না। স্বাভাবিক সমাজে যে কিতাল হয়েছে, ওটার কিসাস আছে। যুদ্ধের ভেতরে কতলের জন্য যুদ্ধের বাইরে কিসাস হয় না। অতএব এটাতো নীতিগতভাবেও মেলে না। তো আমি এলাম পালনপুরি সাহেবের কাছে। তিনি আগেই বলেছিলেন তিনি (মাওলানা ইব্রাহিম সাহেব) কী বলেন এসে আমাকে শোনাবে। আমি গিয়ে পালনপুরি সাহেবকে গিয়ে শোনালাম। তখন তিনি বললেন যে, তাহলে তো আমার এই কথা বলা ঠিক হয়নি। সংশোধিত হয়ে গেলেন।
আমাদের মুরব্বিদের মধ্যে আল্লাহর মেহেরবানি যে, এই মেজাজ আছে আর এটাই দীন। এটা যখন নষ্ট হয়ে যায়, এরপর আর দীন থাকে না। এরপর ওটার মোকাবেলাই করতে হবে।
যতদিন পর্যন্ত ঢাল দিয়ে হোক আর তলোয়ার দিয়ে হোক, মারামারি করে হোক আর মার খেয়ে হোক, এটা টিকিয়ে রাখতে পারে তো ততদিন পর্যন্ত দীন হিসেবে টিকবে। আর যখন টিকাতেই পারবে না, ওটা শেষ।
আল্লাহ আমাদের দীনের হেফাজতের জন্য মেহনত করার তওফিক নসিব করুন। আমিন।
সমাপ্ত
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
এক আমেরিকান নওমুসলিম নারীর ঈমানদীপ্ত কাহিনী
...
‘এ দাওয়াত ও তাবলীগের উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্বীনের তলব পয়দা করা’
...
বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় ভিন দেশী সংস্কৃতির প্রবর্তন
...
কাদিয়ানী থেকে মুসলমানঃ ফিরে আসার গল্প - ০১
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন